Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ছোটগল্প: ডজ

মো হা ম্ম দ  কা জী  মা মু ন

বাবাকে ইদানীং যতই দেখি, অবাক হই। তার তেমন কোনও সমস্যা ছিল না। একটু-আধটু জ্বর, আর মাঝেমধ্যে একটা-দুটো দীর্ঘকাশি, এই বয়সে কার না হয়! তাও তিনি হাসপাতালে যেতে চাইলেন। তার নাকি কিছু বিশেষ টেস্ট করানোর আছে। সর্বশেষ যেবার হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন, ডাক্তার নাকি বলে দিয়েছেন, এক বছর পর পরীক্ষাগুলো ফের করাতে হবে, শরীর খারাপ করুক বা না-করুক।

বিগত ট্রিটমেন্ট হিস্ট্রি দেখে ও কিছু রিসেন্ট কন্ডিশন শুনে নিয়ে ডাক্তার যখন আগের টেস্টগুলোর সাথে আরও দু-একটা যোগ করে নতুন প্রেসক্রিপশনটা লিখে দিলেন, বাবা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করে নেয়া যায়?’ প্রশ্নটা করার সময় বাবার মাথায় সম্ভবত ঘুরছিল— ভর্তি রোগী হিসেবে উনি হাসপাতাল-বেডে চড়েই টেস্ট ল্যাবগুলিতে পৌঁছে যাবেন, আর পাশেই খরগোশের মতো কান ও মাথা তোলা সাধারণ রোগীদের দীর্ঘ লাইন তা চেয়ে চেয়ে দেখবে। তাছাড়া, আরও একটা ব্যাপার মনে হয় ছিল, যা বাবার মধ্যে ভর্তির আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেছিল! সাধারণত ভর্তি থাকা অবস্থায় অবস্থায় করা টেস্টগুলোর পুরো ইন্সুরেন্স কভারেজ পাওয়া যায়; আর বাবার নিজের এরকম কোনও স্কিম না থাকলেও তার মেয়ের ছিল!

সঙ্গত কারণেই ডাক্তারের কাছে যুক্তিগুলো পেশ করেননি বাবা, যদি সব শুনে যদি ডাক্তার তার প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন! কিন্তু বাবার ভয় নিতান্তই অমূলক ছিল। হাসপাতালে সিট খালি আছে, আর ডাক্তারের কাছে অ্যাডমিশন চেয়েও পায়নি, এমন তো দুনিয়ার কোথাও ঘটে না। সুতরাং, ডাক্তার কিছু জিজ্ঞাসা-টিজ্ঞাসাও করলেন না, এমনকি কিঞ্চিৎ ভ্রূকুঞ্চন— তাও ফুটে উঠতে দেখা গেল না তার চকচক করা দেয়ালটিতে! অচিরেই অ্যাডমিশান রিকমেন্ডশনটা হাতে করে বাবা একটি বড়সড় কেবিন বেছে নিলেন, যেখান থেকে একটি বিরাট মাঠ আর বৃক্ষরাজি চোখে পড়ে। এরপর ডিউটি নার্সকে বিদায় করে দিয়ে বাসা থেকে পরে আসা জামা-কাপড় বদলে হাসপাতালের অ্যাপ্রোনে দ্রুতই সুসজ্জিত করে নিলেন নিজেকে।

খবর পেয়ে মা, আর আমি ছুটে এলাম হাসপাতালে। কিন্তু খানিকটা সময় আমরা তার সাথে কাটাই, এ বাবার একদম পছন্দ নয়। তাই একরকম জোর করেই বের করে দিলেন আমাদের। ওদিকে আমার বড়বোন অফিস থেকে উদ্বিগ্ন ফোনে কেবিন নাম্বার জানতে চেয়েছিল, সেই তাকেও তিনি পণ করিয়েছেন না আসার জন্য। এমনকি রাতে একজন কাউকে সাথে রাখার জন্য অনেক বলেকয়েও রাজি করানো গেল না তাকে। তার সেই এক কথা— হাসপাতাল কি সুস্থ মানুষদের জায়গা! কাজ-কর্ম ফেলে এখানে এসে পড়ে থাকার মানে হয়!

কিন্তু বাবা ঠিকই পড়ে থাকেন; প্রতি বছরই অন্তত একটিবার করে হাসপাতালে কাটিয়ে আসেন। বাবার শরীর থেকে এখন পর্যন্ত সিরিয়াস কোনও অসুখের হদিস বের করতে পারেননি ডাক্তার। তাও বাবা সারাক্ষণ কঠিন এক অসুখের চিন্তায় ধ্যানস্থ থাকেন। বলা যায়, হাসপাতালে যে ক’টা দিন থাকেন, তখনই বাবা সবচেয়ে ভাল থাকেন। বাকি বছরটা তার কাটে বিছানায় শুয়ে; একদম মৃত মানুষের মত নির্জীব দেখায় তখন তাকে!

বাবার বয়েস হয়েছে; কিন্তু তার চেয়ে বেশি বয়েসিরাও তো হেসে-খেলে, ঘুরে-ফিরে জীবনযাপন করছে, সমাজ-সেবা, ওরশ-মাহফিলে মশগুল থাকছে। কিন্তু বাবা আরও বছর পাঁচেক আগে থেকেই যেন কবর দেখতে পাচ্ছেন সামনে! তার কোথায় কী আছে, আর কীভাবে সেগুলো ভাগ হবে, তা নিয়ে আমাদের ভাইবোনদের সাথে বেশ কয়েকবার বসা হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। গেল বছর, যত দেনাপাওনা আছে, তাও চুকিয়ে ফেললেন। শুধু এক পাওনাদারকে নিয়েই ঘটে গিয়েছিল বিপত্তি। প্রায় তিরিশ বছর আগে বিপদে পড়ে সামান্য ক’টা টাকা হাওলাৎ করেছিলেন; কিন্তু দিনের পর দিন খুঁজেও পাওয়া গেল না লোকটিকে। পরে যখন জানা গেল, তিনি মারা গেছেন, আর তার কোনও ওয়ারিশও নেই, তখন কিছু অভাবি মানুষ খুঁজে নিয়ে তাকে দান করে দিতে হল সেই টাকাটা!

সব সময় যিনি বলতে থাকেন শরীর ভাল নেই, সময় ফুরিয়ে আসছে দ্রুত, সেই তিনিই যখন গ্রামের বাড়ি যেতে চাইলেন, আর তাও আমাদের সবাইকে ছেড়ে, একা একা, তখন পরিবারের সবাই আঁৎকে উঠল এবং গোলটেবিল বৈঠকে বসল। কিন্তু যেতে না দেবার সব ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে নিজের ব্রিফকেসটা হাতে একদিন বাসে চড়ে বসলেন আর ঠিক ঠিক পৌঁছেও গেলেন। আমার দাদাদাদি যে জায়গায় শুয়ে আছেন, সে জায়গাটা বেদখল হয়ে গিয়েছিল। আসলে বাবা তো আর দেশের বাড়িতে থাকতেন না; ঈদ-পার্বণে কালেভদ্রে যাওয়া হলেও দিনে দিনে ফিরে আসতেন। কিন্তু এবার বাবা বেশ ক’দিন কাটালেন, এলাকার মান্যি-গণ্যি লোকজনকে নিয়ে বিচারসালিশি করে জায়গাটা দখলে নিয়ে এলেন, এবং ঢাকায় ফিরে আমাদের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ রাখলেন, যেন তাকে তার বাবা-মা’র কবরের ওপর রেখে দেয়া হয় মৃত্যুর পর। আমাদের বুকটা হাহাকার করে উঠল, আর একই সঙ্গে একটা বিস্ময়ও জাগাল। আচ্ছা, বাবাকে কি কেউ বলেছে যে, তার মৃত্যু আসন্ন! কিন্তু সে কী করে সম্ভব! পৃথিবীর কোনও ডাক্তার তো কোনও রোগীকে মৃত্যুর দিনতারিখ বলে দেয় না; এমনকি সে যদি হয় জটিল ক্যানসারে আক্রান্তও!

বাবা কখনওই মরতে চাননি, না হলে চল্লিশ বছর বয়সেই একজন চেইন স্মোকার রাতারাতি সিগারেট ছাড়তে পারেন? একদিন যখন তার একটু বুকে ব্যথা হল, আর ডাক্তারের মুখে হৃদরোগে মৃত্যুঝুঁকির কথাই শুনলেন না শুধু, চেম্বার জুড়ে হাঁপাতে থাকা পেশেন্টও দেখতে পেলেন, বাসায় এসে সেই যে ছাড়লেন, আর কেউ ধরতে দেখেননি এখন পর্যন্ত। তবে শুধু সিগারেট না, আরও অনেক কিছুকেই ছাড়লেন তিনি মৃত্যুদূতকে দূরে সরিয়ে রাখতে। পুরো এক বল মাংস সাবাড় করে দিতে যিনি ওস্তাদ, তিনি রেড মিটকে যমের মতো ভয় পেতে শুরু করলেন।

এই সময়টা তাকে দেখে যে কারও ভ্রম হতেই পারত যে, এই বুঝি আজরাইল ফেরেশতা তার ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে, যে কোনও সময় হামলে পড়তে প্রস্তুত! আর তিনি প্রবল এক সাধনায় একটার পর একটা হার্ডল টপকে আজরাইলকে এড়িয়ে যাচ্ছেন! কখনও কখনও বুঝি আজরাইল তার সমর-কৌশল ধরে ফেলত, আর এই সময়টায় বাবাকে আবার পাল্টা ডজ দিতে হত; যেমন, একটু-আধটু মিষ্টি খেয়ে ফেলতে হত, আর কিছু অনিয়ম, যেমন, লাল মাংসে মুখ ডোবানো— যা মরণ-ফেরেশতার চোখে ঝিকঝিক ধাঁধা লাগিয়ে দিত, আর বাবাও সেই অবসরে নিরাপদ ডেরায় লুকিয়ে পড়তেন।

তিনি অনেক কিছু যেমন ছেড়েছিলেন, তেমন অনেক কিছু গ্রহণও করেছিলেন। ডাক্তার যখন বললেন, আর কিছু লাগবে না, শুধু ডায়াবেটিসটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখলেই হচ্ছে, তখন তিনি খাবারদাবার এমন করে বদলালেন যা দেখে হাসপাতালের রোগীরাও নিশ্চিত লজ্জা পেয়ে যাবে! তার নিরামিষের ব্যাঞ্জনটি ছিল দেখার মতো; ডাক্তারি চার্টের সাথে মিলিয়ে অক্ষরে অক্ষরে তাতে সবজি ও ফলমূল পুরে দেয়া চাই। ব্যাঞ্জনটি তার মনমতো বানাতে মা’কে প্রথম দিকে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল। তারপর যখন অনেকটাই রপ্ত করে এনেছেন, তখন আবার মিক্সচার চেঞ্জ করতে হল, প্রয়োজন পড়ল নতুন ব্যাঞ্জন। এভাবে বাবার রক্তে সুগারের মাপ এবং এর উচ্চ বা নিম্নচাপের সাথে সাযুজ্য রেখে নিত্যনতুন আইটেম যোগাড়যন্ত্র হয়ে দাঁড়াল আমাদের বাসার নিত্য যুদ্ধ, যার সাথে যুঝতে যুঝতে মায়ের সাথে সাথে আমাদেরও শরীর অকেজো হয়ে পড়তে লাগল দিন দিন।

কিন্তু তবু বাবাকে বাঁচাতে হবে, কোনওভাবেই তাকে পৃথিবীর মায়া কেটে যেতে দেয়া যাবে না। বাবার এই মৃত্যু-প্রতিরোধী যুদ্ধে আমরা ভাইবোনেরা সবাই অংশ নিতাম, যতটা পারতাম সহযোগিতা করতাম। তবে তিনি যে আমাদের ওপর খুব ভরসা করতে পারতেন, তা না। হল কী, তখন করোনাকাল শুরু হয়ে গেছে— একটা ভাইরাস সারা পৃথিবীর সমস্ত দরজাজানালা বন্ধ করে দিয়েছে। তখনও টিকা এসে পৌঁছেনি দেশে। সেই সময় মাঝে মাঝে সংবাদ বেরুত— এক গ্রাম্য বৈদ্যের হাতে রয়েছে করোনাকে ঘায়েল করার মহৌষধ!

তো দিনরাত সংবাদে আকণ্ঠ গুঁজে থাকা বাবা ব্যাকুল হয়ে পড়লেন ওই বৈদ্যের পড়া খেতে। আমরা যখন খবরগুলির অসারতা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি, তিনি ঘোর সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকান শুধু, আর নিস্তেজ হয়ে যেতে থাকেন একটু-একটু করে। সেই ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ সময়ে একখানি বেড পাওয়া হাসপাতালে— সাত জনমের ভাগ্যি ছিল। তারপরও আমরা সবাই মিলে চেষ্টাচরিত্র করে বাবাকে পৌঁছে দেই একটি নামী হাসপাতালের বেডে। কিন্তু করোনার প্রচুর সিম্পটম পাওয়া গেলেও করোনাকে হারিকেন ধরেও খুঁজেও পাওয়া গেল না। বাসায় ফিরিয়ে আনার সব পাকা বন্দোবস্ত করে ফেলেছি, এই সময় বাবা করুণ চোখে ব্যক্ত করলেন, ‘আর-একটাবার… মানে, কইছিলাম কী… টেস্টটা আবার করাইলে ভাল হইত না?’

সব সন্দেহকে উড়িয়ে দিয়ে এরপর যেদিন করোনার টিকা ল্যান্ড করল বাংলাদেশে, সেদিন থেকে শুরু হল বাবার নতুন এক যুদ্ধ। রেজিস্ট্রেশনের সাথে সাথেই টিকা কার্ডের জন্য অস্থির হয়ে পড়লেন। দিনে কয়েকবার করে চেক করতে হত আমাকে; কিন্তু যেই বলতাম, ‘আসে নাই দেখাইতেছে’, একটা প্রবল অস্বীকৃতি ভেসে উঠত তার চোখের কোণে, ‘…ঠিকমত এনআইডি নাম্বারটা বসাইছিলা তো? কম্পুটারে নাকি আজকাল ভাইরাস…’। একদিন অবশ্য টিকা কার্ড এল এবং বাবা সেই সুবহে সাদিকেই লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। আমরা ভাইবোনেরা কিছুটা আতঙ্কেই ছিলাম— কী জানি কী রিঅ্যাকশন দেখা দেয়, তাই একটু সবুর করতে চাইছিলাম! কিন্তু বাবা টিকা দিয়ে এসে সময়মতো নামায পড়লেন, আহার সারলেন, এবং ঘুমোলেন। আমরা তৃপ্তির নিশ্বাস ছাড়লাম। কিন্তু দিনদুয়েক না যেতেই আবার আমাদের অস্থির হতে হল, এবার টিকার দ্বিতীয় ডোজের জন্য তোড়জোড়। এরপর তা চলতেই লাগল… তৃতীয় ডোজ, চতুর্থ…।

বাবা এভাবে বেঁচে ছিলেন, বা, বলা ভাল, মৃত্যুকে সাফল্যের সাথেই ঠেকিয়ে রাখছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর সাথে লড়া সহজ কথা নয়, চিরদিন লড়া যায়ও না! বাবা যতই দিন যাচ্ছিল, স্বাস্থ্যহীন হচ্ছিলেন। তার শরীর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছিল। যেখানে হাঁটাকে তিনি করে নিয়েছিলেন জীবনের একমাত্র ব্রত, সেখানে মসজিদে যেয়ে নামাযটুকু সারতে পারছিলেন না, বাজার যাওয়া তো দূরের কথা। কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, বল পাচ্ছেন না। যে ব্যাঞ্জন তিনি সাব্যস্ত করে নিয়েছিলেন নিজের জন্য, তাও আর মুখে তুলতে পারছিলেন না। মা জোর করলে বলতেন, ‘পেডে গণ্ডগোল!’

বাবা কী যত্ন নিয়েই না স্বাস্থ্য ভাল রাখার খবরগুলি পড়তেন, টিভিতে ‘আপনার ডাক্তার’ প্রোগ্রামটা কখনওই মিস্‌ হত না তার। কিন্তু এখন তিনি আর ড্রইইংরুমেই বসেন না, শিয়রেও থাকে না কোনও পত্রিকা বা বই। জিজ্ঞেস করলে বিড়বিড় করতে শোনা যায়, ‘চোখ জ্বালা করে, পানি পড়ে।’ ঘরের দেয়ালে বা ফার্নিচারে কোনও খুঁত দেখা দিলে, তিনি হাতুড়ি, বাটালি নিয়ে নেমে পড়তেন। বলা যায়, তিনিই ছিলেন আমাদের বাসার ছুতোর বা রাজমিস্ত্রি! এখন ভাঙা চেয়ার আর সোফাগুলো মলিন ব্যাদানে তাকিয়ে থাকে, আর বাবা খালি ঝিমান; কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলেই বলেন, ‘হাত-পা কাঁপে!’

বাবার মুখটা যেন এই সময় বয়সের তুলনায়ও বেশি কুঁকড়ে যেতে থাকে। তার চামড়া এতটা ঝুলে যায় যে, কখনও ভূত দেখার মতো চমকে উঠতে হয়! যিনি সারাজীবন লিখে গিয়েছেন সরকারি বড় বড় রেজিস্টারগুলোতে, তার হাতের আঙুলগুলো ঠক্‌ঠক্‌ করে কাঁপতে থাকে। একটা সময় ছিল, রাতে উত্তম-সুচিত্রার সিনেমা না দেখে তিনি ঘুমোতে যেতেন না। আর সে কী ভলিউম! আমরা কেউ ঘুমোতে পারতাম না, কিছু বলতেও পারতাম না। এখনও অবশ্য আমরা ঘুমোতে পারি না, কারণ প্রতিদিনই তার একটা না একটা ‘যায় যায়’ অবস্থা তৈরি হয়!

এরই মাঝে একদিন খবর এল, বাবার এক বাল্যবন্ধু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছে। আমরা সবাই ভয় পাচ্ছি, বাবা হয়তো খবরটাতে আরও ভেঙে পড়বেন। কিন্তু বাবা যেন হঠাৎ শরীরে বল ফিরে পেলেন, আর হাতে ফোনটা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বললেন বন্ধুর সাথে। তারপর বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং সটান বন্ধুর বাসায় গিয়ে হাজির হলেন। যৌথ স্মৃতিতে থাকা মজার গল্পগুলোকে তুলে এনে তাকে সাহস দানের পাশাপাশি অনেক স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ প্রদান করে প্রায় একটি দিন কাটিয়ে বাবা যখন ফিরে এলেন, তখন তাকে এক তরতাজা যুবকের মতোই লাগছিল। কিন্তু ক’দিন যেতেই বাবা আবার নির্জীব হয়ে পড়লেন, চোখ-মুখ-হাত-পা-অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সব শুকোতে লাগল পাল্লা দিয়ে!

এই দৃশ্য চেয়ে চেয়ে দেখা সম্ভব ছিল না! আগেই বলেছি, বাবার মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখার মিশনে বাবার সাথে আমরাও ছিলাম। তো সেই মিশনের অংশ হিসেবেই একদিন কক্সবাজারে সমুদ্র পাড়ে একটি স্বাস্থ্যনিবাস দিন পনেরোর জন্য ভাড়া করলাম। ভাবলাম, বাবা বুঝি সমুদ্রের বাতাসে তাজা হয়ে উঠবেন। কিন্তু প্লেন থেকে নামার পর সেই যে বাবা বিছানায় গেলেন, এরপর হাজার বলেকয়েও তাকে সি-বিচে একটুখানি হাঁটার জন্য নিয়ে যাওয়া গেল না। বাবার কন্ডিশন শুধু খারাপের দিকেই যেতে লাগল; এমনকি চোখ-মুখ খুলে সাড়া দিতেও যেন কষ্ট হতে লাগল তার!

সমুদ্রের বাতাস হু হু করে বয়ে যেত আমাদের ঘিরে, আর অজানা সব আশঙ্কায় কেঁপে কেঁপে উঠত আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয়! এই রকম যখন দিন কাটাচ্ছিলাম, একদিন একটি সংবাদ এল। বাবার সেই বন্ধুটি, মানে, সেই যিনি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত চলে গিয়েছেন পৃথিবীর মায়া ছেড়ে। আমরা শিউরে উঠলাম! একদিকে বাবার এই অবস্থা, অন্যদিকে বাল্যবন্ধুর চিরবিদায়।

তাকে জানানো উচিত হবে কিনা এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে লম্বা বৈঠকে বসল পরিবারের সদস্যরা। খবরটা না জানানোর পক্ষেই জোরালো মত ছিল। তবে একটা বিষয় আমাদের খুব ভাবাল— আমরা না হয় খবরটা চেপে যেয়ে বাবার মৃত্যুটাকে বিলম্বিত করলাম, কিন্তু অন্তর্যামীকে তো আর চেপে যাওয়া যাবে না। আমাদেরও যখন মৃত্যু হবে, আর দাঁড়াতে হবে সৃষ্টিকর্তার সামনে, তখন তিনি এই চেপে যাওয়া বিষয়টি নিয়ে আমাদেরই চেপে ধরবেন না?

বাবাকে যখন শেষমেশ বলা হল, তখন প্রথমে তার কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল; আমরা বুঝতেই পারছিলাম না খবরটা ঠিকঠাক পৌঁছুল কিনা! কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি উঠে বসলেন, আর ‘ইন্নালিল্লাহি’ দোয়াটা তিনবার পড়ে ফেললেন। এবার আর তার কণ্ঠ ঘোলাটে ছিল না। অচিরেই তিনি জানতে চাইলেন— কখন ঘটনাটা ঘটেছে… কোথায় ঘটেছে… কোথায় কবর দেয়া হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। সবটা মনযোগ দিয়ে শোনার পর কারও সাহায্য ছাড়া একা একাই বাথরুমে চলে গেলেন তিনি, এবং অনেকটা সময় নিয়ে ওযু করলেন। তারপর জায়নামাজে বসে দীর্ঘ সময় নিয়ে নামায পড়লেন। বন্ধুর জন্য যখন দোয়া করছিলেন আল্লাহর দরবারে দু’হাত তুলে, তার দুচোখ বেয়ে অশ্রুর ধারা নেমে এসেছিল, আর চিক্‌চিক্‌ করছিল জায়নামাযের মখমল!

ঠিক কতদিন পর বাবা বিছানা ছেড়েছিলেন মনে নেই, কিন্তু সেদিনের পর অমন বিছানামুখী আর বাবাকে দেখিনি! হাত-পায়ে পুরো বল পাচ্ছেন এখন, চোখ আর জ্বালা করছে না, পেট রয়েছে শান্ত। তিনি এখন ফরয নামাযগুলো মসজিদেই আদায় করেন আধা কিলো পথ হেঁটে, নিয়ম করে তার ব্যাঞ্জনগুলো সেবন করেন, ড্রয়িং রুমে বসে পত্রিকা পড়েন, আর বাসার ফার্নিচার বা দেয়াল বা গৃহস্থালি উপকরণে কোনও গোলমাল দেখা দিলে হয়ে পড়েন মিস্ত্রি।

আজকাল বাবাকে যত দেখি, ততই অবাক হই! আর মনে হয়, বাবা নিজেও ব্যাপারটা জানেন যে তিনি পুরোই জীবিত এখন, আগের মতো মৃত নন!

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়
3 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
6 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Sourav Rahman
Sourav Rahman
8 months ago

অসাধারন লেখনি।

Wali ullah
Wali ullah
8 months ago

অনেক সুন্দর হয়েছে স্যার।

Murad Hossain
Murad Hossain
8 months ago

“কিন্তু তবুও বাবাকে বাঁচতে হবে। কোনওভাবেই তাকে পৃথিবীর মায়া কেটে যেতে দেয়া যাবে না। ” ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল বাবারা।❤️

হীরেন সিংহরায়
হীরেন সিংহরায়
8 months ago

বড়ো জীবন্ত লেখা নিজেকেই জেন দেখতে পেলাম

Md.Tareq Hasan
Md.Tareq Hasan
8 months ago

অসাধারণ। ❤️❤️❤️

অমিত চক্রবর্তী
অমিত চক্রবর্তী
8 months ago

খুব ভালো গল্পটা। মনে ধরলো খুব। এ যেন জীবনের চেয়ে বড় ক্যানভাসে আঁকা ছবির মত এক কাহিনী। কিন্তু হাল্কা রঙে আঁকা। আমি বলব এ ছবির রঙ aqua

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »