Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

সঞ্জীব রাহার বিশেষ নিবন্ধ

আছে দুঃখ আছে মৃত্যু

স ঞ্জী ব  রা হা

বাবার মৃত্যুর পর আমরা দিশেহারা। কী করব, কী না করব ভাবছি। বাবার স্মরণসভায় সবাই ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বসে স্মৃতিচারণ করছি আর আমরা ভাইবোন আত্মীয় পরিজনরা চোখের জলে ভেসে যাচ্ছি। এমন সময় এক বন্ধুপত্নী হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে গাইতে আরম্ভ করল, ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু’, ‘পুরানো সেই দিনের কথা’, ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন’, ‘আমার খেলা যখন ছিল’— শুনতে শুনতে কান্নায় দু’চোখের পাতা ভারী, মন তোলপাড়। কবির প্রতি ভক্তি, ভালবাসা ও ততোধিক বিস্ময়ে মাথা অবনত। এমনই কতশত দুঃখের দিনে আমাদের পরম আশ্রয়, চরম নির্ভরতা রবীন্দ্রনাথ। আমাদের ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার মতো স্নিগ্ধ শীতল লেপন হিসেবে বারবার তাঁকে পেয়েছি।

জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি পদক্ষেপে কবিগুরু কতটা প্রাসঙ্গিক, কতটা আধুনিক তা তাঁর কাব্যে, গানে, আচার-আচরণে বুঝতে পারি। একের পর এক প্রিয়জনের বিয়োগ ব্যথায় কষ্ট পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ভেঙে পড়েননি। মৃত্যু-মিছিল প্রত্যক্ষ করেছেন— থেকেছেন দৃঢ় ও অবিচল। ৭ অগ্রহায়ণ, ১৩০৯ (২৩ নভেম্বর, ১৯০২) মাত্র উনত্রিশ বছর বয়সে পত্নী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর পর ধৈর্যের পরিচয় দিলেও তাঁর মন বারবার ব্যাকুল হয়েছে। মানুষ মরে গেলেই যে একেবারে হারিয়ে যায় বা জীবিত প্রিয়জনের কাছে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, সে-কথা কবি বিশ্বাস করতেন না। কোনও একটা সমস্যায় পড়লে কবি তাঁর প্রিয় পত্নীর সান্নিধ্য অনুভব করতেন। বলছেন, ‘তিনি যেন এসে আমার সমস্যার সমাধান করে দেন।’ আবার কখনও বেদনার্ত হৃদয়ে স্বখেদে মৈত্রেয়ী দেবীকে বলেছেন, ‘সবচেয়ে কী কষ্ট হয় জানো? এমন কেউ নেই যাকে সব বলা যায়। সংসারে কথার পুঞ্জ অনবরত জমে উঠতে থাকে। ঠিক পরামর্শ নেবার জন্য নয়, শুধু বলা, বলার জন্যই। এমন কাউকে পেতে ইচ্ছা করে যাকে সব বলা যায়। সে তো আর যাকে তাকে দিয়ে হয় না।’ (মংপুতে রবীন্দ্রনাথ)। এমন ভালবাসা ও প্রিয়জন হারানোর হাহাকার ভুলতে প্ল্যানচেট মারফত তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সচেষ্ট হয়েছেন গুরুদেব।

দীর্ঘ একমাস ব্যাপী অহোরাত্রি স্ত্রীর সেবাযত্ন করেছেন নিজ হাতে। অথচ তাঁর মৃত্যুর পর শোকে যখন ভেঙে খানখান হওয়ার কথা সেই রাত্রেও একাকী ছাদে পায়চারি করে কাটিয়েছেন। পরের দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আগত সমস্ত সমবেদনা জানাবার লোকেদের সঙ্গে ধৈর্যের সঙ্গে কথা বলেছেন অক্লেশে। শ্রান্তিতে শরীর-মন ভেঙে পড়ার বদলে তার আত্মসংবরণ করে থাকার কৌশল আমাদের বিস্ময়াবিষ্ট করে রাখে। আজ যখন অল্পতে আমরা রুষ্ট হই, মনঃক্ষুণ্ণ হই, অকারণ ধৈর্যচ্যুত হই, তখন কবিগুরুর ধ্যানগম্ভীর মূর্তির কথা মনে পড়ে। তাই তো মৃণালিনী দেবীর শ্রাদ্ধ-শান্তির পর পুত্র-কন্যাদের নিয়ে শান্তিনিকেতনে ফিরে যান আপন কর্মযজ্ঞে ঝাঁপ দেবার জন্য। আর মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর এগারো দিন পর (৪ ডিসেম্বর, ১৯০২) দীনেশচন্দ্র সেনকে এক চিঠিতে লেখেন, ‘ঈশ্বর আমাকে যে শোক দিয়াছেন, তাহা যদি নিরর্থক হয়, তবে এমন বিড়ম্বনা আর কি হইতে পারে। ইহা আমি মাথা নীচু করিয়া গ্রহণ করিলাম। যিনি আপনার জীবনের দ্বারা আমাকে নিয়ত সহায়বান করিয়া রাখিয়াছিলেন তিনি মৃত্যুর দ্বারাও আমার জীবনের অবশিষ্ট কালকে সার্থক করিবেন। তাঁহার কল্যাণী স্মৃতি আমার সমস্ত কল্যাণকর্মের নিত্য সহায় হইয়া বলদান করিবে।’ রবীন্দ্রনাথের সহ্যক্ষমতার কথা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ জানতেন। তাই বলেছিলেন, ‘রবির জন্য আমি চিন্তা করি না। লেখাপড়া, নিজের রচনা নিয়ে সে দিন কাটাতে পারবে। ছোট ছেলেমেয়েগুলির জন্যই দুঃখ হয়।’ সত্যিই মহর্ষির বিচলিত হওয়ার যথেষ্ট কারণও ছিল। কলকাতা আসার পর অক্টোবরের (১৯০২) মাঝামাঝি রেণুকাও অসুখে পড়ে। প্রথমে সোর-থ্রোট (Sore-throat) দিয়ে শুরু করে যক্ষ্মারোগ।

রেণুকা/রানির জন্ম ২৩ জানুয়ারি, ১৮৯১ (১১ মাঘ, ১২৯৭ বঙ্গাব্দ)। বড় দিদি মাধুরীলতা পাঁচ বছরের বড় আর দাদা রথীন্দ্রনাথ তিন বছরের বড়। রেণুকা বেঁচেছিলেন মাত্র ১২ বছর ৭ মাস ১২ দিন। এই সংক্ষিপ্ত জীবনেই দিদি মাধুরীলতার বিয়ের মাসখানেক পরে ছোট্ট দশ বছরের নাবালিকা মধ্যম কন্যা রেণুকার বিয়ে হয় মাত্র তিন দিনের নোটিসে, ডাক্তার সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে। একরোখা, জেদি, ভাবগম্ভীর অভিমানিনী রেণুকার এই বিয়েতে মত না থাকলেও পিতা রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধাচরণ করেননি কখনও। রবীন্দ্রনাথ তাঁর মধ্যমকন্যার স্বভাব-ব্যবহার সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন বলেই বোধ হয় এই নাবালিকাকে বিয়ে দিয়েছিলেন। কবির যে সংসারের কত খুঁটিনাটি ব্যাপারে নজর ছিল তা সেই সময় কবিপত্নীকে লেখা চিঠি থেকে বুঝতে পারি— ‘রানিও যদি বিবাহ করে দূরে যায় তা হলে ওর ভালই হবে। অবশ্য প্রথম বছর দুই আমাদের কাছে থাকবে— কিন্তু তার পরে বয়স হলেই ওকে সম্পূর্ণভাবেই দূরে পাঠান ওর মঙ্গলের জন্যই দরকার হবে। আমাদের পরিবারের শিক্ষা রুচি অভ্যাস ভাষা ও ভাব অন্য সমস্ত বাঙালি পরিবার থেকে স্বতন্ত্র— সেই জন্যেই বিবাহের পর আমাদের মেয়েদের একটু দূরে যাওয়া দরকার। নইলে নূতন অবস্থার প্রত্যেক ছোটখাট খুঁটিনাটি অল্প অল্প পীড়ন করে স্বামীর প্রতি একান্ত শ্রদ্ধা ও নির্ভরকে শিথিল করে দিতে পারে। রানির যে রকম প্রকৃতি বাপের বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেই ও শুধরে যাবে— আমাদের সঙ্গে নিকট যোগ থাকলে ওর পূর্ব association যাবে না।’ ফুলশয্যার কয়েকদিন পরেই মায়ের পাশাপাশি রেণুকাও রোগশয্যায় শুতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি মায়ের মৃত্যু আর স্বামী অকৃতকার্য হয়ে বিলেত থেকে ফিরে আসায় শারীরিক দুর্বলতা ও নিদারুণ মানসিক আঘাতে জর্জরিত হয়েছেন। জ্বর প্রায় প্রতিদিন আসে ১০২ ডিগ্রি পর্যন্ত, সঙ্গে কাশি ও ক্ষয়রোগের লক্ষণ। কবি তখন ভীষণ ব্যস্ত, পাঁচজন ছাত্র নিয়ে শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম স্থাপিত হয়েছে ২২ ডিসেম্বর, ১৯০১ (৭ পৌষ, ১৩০৮)। এর আট-নয় মাসের মধ্যেই প্রথমে কবিপত্নী, পরে রেণুকার অসুস্থতা কবিকে বিচলিত করলেও কর্তব্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। কবি অনুভব করতেন, শান্তিনিকেতনে থাকলে তিনি জীবন-মৃত্যুর ওপরে মনকে রাখতে পারতেন। কিন্তু কলকাতাতে সেই আশ্রয় মিলত না। শান্তিনিকেতনের গাছপালা প্রকৃতি পরিবেশের মাঝে, তিনি তাঁর সকল রোগ-শোক-তাপ প্রশমিত করার চাবিকাঠি খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই তো মাতৃহারা সন্তানদের শেখাতেন উপনিষদের মহান মন্ত্র, শেখাতেন তার অন্তস্তলের মর্মার্থ। বারবার রেণুকাকে নিয়ে বিব্রতবোধ করায় মেয়েকে আতান্তর থেকে মুক্তির জন্য স্থানান্তরে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছেন। রোগের উপশমের আশায় ছোটমেয়ে ন’বছরের মীরা ও ছোটছেলে সাত বছরের শমীন্দ্রনাথকে নিয়ে হাওয়াবদলের জন্য হাজারিবাগে কালীকৃষ্ণ ঠাকুরের মনোরম বাগানবাড়ির মতো স্বাস্থ্যকর স্থানে কবি আশ্রয় নিয়েছেন। হাজারিবাগে পৌঁছে এক এক করে শমীন্দ্রনাথ, মীরা ও অন্যান্য সঙ্গী অসুস্থ হয়ে পড়েন। রেণুকার দীর্ঘ জ্বর ও কাশির চিকিৎসার জন্য কখনও হোমিওপ্যাথি, কখনও আয়ুর্বেদীয় বা গাছড়া ওষুধ খাইয়েছেন স্নেহময় পিতা হিসেবে। দিনদিন মেয়ের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ায় এক স্থানীয় এমডি মহিলা ডাক্তারের পরামর্শমতো অশেষ দুঃখ, কষ্ট মেনে নিয়ে সুদীর্ঘ পথ পেরিয়ে আলমোড়ায় আসেন। তখনকার আলমোড়া ছিল সত্যিই ফাঁকা এবং সুন্দর। চারদিকে বাগান দিয়ে ঘেরা স্বাস্থ্যকর স্থান।

মে, ১৯০৩ থেকে আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ কয়েক মাস আলমোড়ায় থাকার সময় রোগের বাড়াকমা চলতে থাকে, কিন্তু স্থায়ী উপশম হয় না। রক্তবমি পর্যন্ত চলে। তখন ছোটছেলে ও ছোটমেয়ে কলকাতায়, বড়ছেলে আমেরিকায় পাঠরত। আলমোড়ায় প্রাকৃতিক পরিবেশ কবি মনে প্রেরণা যোগালেও শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয় ও বিচ্ছিন্ন সংসারকে একত্রিত করার বাসনায় মন ব্যাকুল হয়েছে বারবার। চিকিৎসায় একটু সাড়া দিলে কবিমন আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠেছে, আবার রোগের বৃদ্ধিতে পিতৃহৃদয়ের টানাপোড়েনে নাস্তানাবুদ হয়েছেন। অনন্ত প্রতীক্ষা ও প্রতিজ্ঞায় পর্যবসিত করেছেন, বলেছেন— ‘সুসময় দুঃসময় জানবার জন্যে কোন কৌতূহল আর রাখিনে— যা ঘটে তা ঘটুক— ঈশ্বরের ইচ্ছার উপর আত্মসমর্পণ করে নিশ্চিন্ত চিত্তে আপনার কাজ করে যেতে চাই।’

বোলপুরের বিদ্যালয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে মামা নগেন্দ্রনাথ ও দিদিমা রাজলক্ষ্মী দেবীর উপর রেণুকার শুশ্রূষার দায়িত্ব দিয়ে কবি দুর্গম ও দুর্ভোগের পথ অতিক্রম করে ছুটে এসেছেন শান্তিনিকেতনে।

আবার টেলিগ্রাম পেয়ে আশঙ্কা দুশ্চিন্তা উদ্বেগে ব্যাকুল কবি ছুটে গিয়েছেন মেয়ে রেণুকার কাছে। মেয়ের কাতর অনুরোধে কথা দিয়েছেন, ‘এবার তোকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাব।’ প্রচণ্ড আস্থা এবং ভালবাসা ছিল হোমিওপ্যাথি ওষুধ ও চিকিৎসাশাস্ত্রে। বন্ধ করে দিয়েছেন সমস্ত অ্যালোপ্যাথি ওষুধ। শুরু করেছেন হোমিও চিকিৎসা। প্রাথমিক সাড়াও পাচ্ছিলেন সেই চিকিৎসায়। আলমোড়ায় এত টেনশনের মধ্যেও চালিয়ে গেছেন সাহিত্যকর্ম আর কবিতা লিখে শুনিয়েছেন পীড়িতা কন্যাকে। অনেকটা পথ পেরিয়ে ৭ ভাদ্র আলমোড়া থেকে রওনা দিয়ে ১২ ভাদ্র (২৯ আগস্ট) কলকাতা এসেছেন। কবি অসুস্থ কন্যার জন্য বাড়ির ছাদে রোদ লাগানো ভাল বলে একটা কাচের ঘর তৈরি করে দেন। আবার আলমোড়াতে যক্ষ্মার প্রতিষেধক হিসেবে পাইনের ছায়ায় পাইনের হাওয়া খাইয়েছেন আরোগ্য কামনায়। একে একে দাদা রথীন্দ্রনাথ, বোন মীরা, ভাই শমী সকলের সাক্ষাতের পর ১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯০৩ (২৮ ভাদ্র )-এ রেণুকা কবির হাত ধরে বলেছেন, ‘বাবা পিতা নোহসি বলো’। বাবার মুখে এই মন্ত্র শুনতে শুনতে অভিমানিনী কন্যা অনন্তলোকে পাড়ি জমিয়েছেন, পিতাকে সন্তান হারানোর প্রথম দুঃখসাগরে ভাসিয়ে, মাত্র তেরো বছর বয়সে।

রবীন্দ্রনাথের পঞ্চম ও কনিষ্ঠ সন্তান শমীন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেন ২৮ অগ্রহায়ণ, ১৩০৩ (১২ ডিসেম্বর, ১৮৯৬)। মাত্র ছ’বছর বয়সে তাঁকে তাঁর মা মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুশোক বহন করতে হয় ১৩ নভেম্বর, ১৯০২ (৭ অগ্রহায়ণ, ১৩০৯)। মায়ের মৃত্যুর পর শান্তিনিকেতনে দাদা-দিদি-জামাইবাবুদের সঙ্গে ফিরে আসেন মাত্র পনেরো দিন পরেই খড়ের চালের কুটির ‘নতুন বাড়ি’তে। সেই সময় তাঁর দিদিমা রাজলক্ষ্মী দেবী ছাড়া আর কেউই ছোট্ট ছয় বছরের শমীর দায়িত্ব নিতে চাননি। এই রকম টানাপোড়েনের সময় প্রিয়নাথ সেনকে চিঠিতে লিখেছেন, ‘সংসারের তরণীটি নানাপ্রকার তুফানের উপর ভাসিয়ে দিয়ে চলেছি— কবে একটা বন্দরে টেনে এনে নোঙর ফেলতে পারব জানি নে। ছেলেদের মধ্যে কেউ একদিকে কেউ আর এক দিকে, আমার বিদ্যালয় একদিকে এবং আমি অধিব্যাধি নিয়ে অন্য দিকে বিক্ষিপ্ত হয়ে চলেছি। বিচ্ছিন্ন সংসারটাকে এক জায়গায় জমাট করে নিয়ে বসবার জন্যে মন ব্যাকুল হয়েছে।’ ১৯ জুন, ১৯০৩ কবি শমীন্দ্রনাথকে শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। পড়ার ফাঁকেফাঁকে ছোট শমী বেড়াতে গেছেন ‘দাদা-বাবার সঙ্গে শিলাইদহের পদ্মাতীরে। ঘুরেছেন বড়দি মাধুরীলতার শ্বশুরবাড়ি মজঃফরপুর বা দিদিমার সঙ্গে গিরিডিতে।

Advertisement

শমীন্দ্রনাথের সঙ্গে কবি রবীন্দ্রনাথের চেহারা-স্বভাব, গান গাওয়া ও জোরে জোরে আবৃত্তি করার মতো অনেক ব্যাপারে মিল ছিল। শমীন্দ্রনাথ শান্ত সরল হাসিখুশি। নিরহংকারী নম্র-ভদ্র স্বভাবের জন্য সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। কেউ কখনও তাকে বিমর্ষ বা রাগত অবস্থায় দেখেনি। মুখস্থ করার সহজাত প্রবৃত্তি ও ভাল গানের গলা নিয়ে জন্মেছিলেন শমীন্দ্রনাথ।

১৯০৭ সালের পুজোর ছুটিতে আশ্রম বন্ধ থাকায় ও ছোটকন্যা মীরার অসুস্থতা নিয়ে। কবি বিব্রত। ঠিক হল শমী তার বন্ধু ভোলার মামাবাড়ি মুঙ্গেরে রওনা দেবে ১৬ অক্টোবর বিজয়া দশমীর দিন। কিন্তু পুজোর ছুটি শেষের মুখে শান্তিনিকেতনে। খবর এল শমীর দুর্দমনীয় উদরাময়ের। সঙ্গে সঙ্গে কবি চিকিৎসক সহ ১৭ নভেম্বর ছুটলেন মুঙ্গেরে। কিন্তু সকল চেষ্টা বিফলে গেল— সেই ৭ অগ্রহায়ণ (২৪ নভেম্বর) মাত্র এগারো বছর বয়সে শমীন্দ্রনাথ চলে গেলেন মায়ের কোলে, যেখানে মা মৃণালিনী দেবী ঠিক পাঁচ বছর আগে এমনই এক ৭ অগ্রহায়ণ পাড়ি জমিয়েছিলেন।

পুত্রশোকে কাহিল কবি পরের দিনই শান্তিনিকেতনের পথে রওনা দিলেন। রাত্রে ট্রেনে আসতে আসতে দেখলেন জ্যোৎস্নায় চারিদিক ভেসে যাচ্ছে, কোথাও কিছু কম পড়েছে তার লক্ষণ নেই। তাঁর মন বললে, কম পড়েনি— সমস্তের মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারই মধ্যে। তা সমস্তর জন্যে আমার কাজও বাকি রইল। যতদিন আছি সেই কাজের ধারা চলতে থাকবে। সাহস যেন থাকে, অবসাদ যেন না আসে, কোনওখানে কোনও সূত্র যেন ছিন্ন হয়ে যায়— যা ঘটেছে তাকে যেন সহজে স্বীকার করি, যা কিছু রয়ে গেল তাকেও যেন সম্পূর্ণ সহজ মনে স্বীকার করতে ত্রুটি না ঘটে।

এখানেই রবীন্দ্রনাথকে আর রক্তমাংসের মানুষ বলে মনে হয় না— মনে হয় কোনও ধ্যানগম্ভীর ঋষির মতো। কর্মই সেখানে ধর্ম হিসাবে দেখা দিচ্ছে। রোগ, শোক, দুঃখ, মৃত্যু বারবার তাঁর কাছে অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দেখা দিয়েছে। বাইরে থেকে শান্ত অবিচল থেকেছেন কর্মযজ্ঞে। ভিতরে ভিতরে পত্নী, কন্যা, ছোটপুত্রকে হারানোর বেদনায় দগ্ধ হলেও সংযম ও ধৈর্যের অসীম পথ অতিক্রম করেছেন অবলীলায়। কবি জীবনদেবতার পায়ে, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সঁপে দিয়ে ‘নতুন মানুষ’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করছেন। মায়ের গুরুতর অসুখ, মেজদির কাশি ও ক্ষয়রোগের মাঝে শমীন্দ্রনাথকে ১৩ নভেম্বর, ১৯০২ শান্তিনিকেতনে পাঠাতে বাধ্য হন কবি। সেই ১৩ নভেম্বর অত্যন্ত বিচলিত উদ্বিগ্ন কবি শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ের জন্য রচনা করেছেন কুড়ি পৃষ্ঠার ‘বিস্তৃত নিয়মাবলী’— আজও যা প্রথম সংবিধানরূপে স্বীকৃত। কোনও মানুষ তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর দশ দিন আগে পীড়িতা কন্যাকে শয্যায় রেখে এমন কর্ম সম্পাদন করতে পারেন? তাই তো জীবনের প্রতি, কর্মের প্রতি এই ভালবাসা, এই দায়বদ্ধতা আমাদের বিস্মিত করে। সেই ঋষিসুলভ কবি আবার রক্তমাংসের মানুষ পিতা হিসেবে ছোটপুত্রকে হারিয়ে চোখের জল ফেলছেন। তার সঙ্গলাভের কামনা করে প্ল্যানচেটে ডেকেছেন তাকে। কিছু কিছু রবীন্দ্ররচনায় শমীন্দ্রনাথের ছায়া আমরা দেখতে পাই ‘ডাকঘর’ নাটকের ছোট্ট প্রকৃতিপ্রেমিক চিররুগণ রঙিন স্বপ্ন দেখা বালক অমলের মধ্যে। আবার গাছপাগল ‘বলাই’-এর মধ্যে শমীর প্রতিচ্ছায়া যেন ভাসমান। আর রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং স্বীকার করেছেন যে, ‘শিশু’ কাব্যের নায়ক ‘খোকা’ যে আসলে শমীন্দ্রনাথ— তাতে কোনও ভুল নেই। পুত্র-বিয়োগের পর ফিরে এসেছেন শান্তিনিকেতনে। শমীর ব্যবহৃত জামাকাপড় বিলিয়ে দিয়েছেন ভুবনডাঙার গরিব ছাত্রদের মধ্যে। শত কর্তব্য পালন করেছেন নিরন্তর। শুধু শোকপ্রকাশ করে কুঁড়ের মতো বসে না থেকে শিলাইদহে অবস্থানকালে পল্লী পুনর্গঠনের কর্মযজ্ঞের সূচনা করেছেন।

ওই সময় লিখেছেন গোরা উপন্যাস। অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ-হাস্যকৌতুক। দূর থেকে বিদ্যালয় পরিচালনার কাজে সহায়তা করেছেন। শমীর মৃত্যুর মাত্র কুড়ি দিন পর শোকসাগর থেকে উঠে প্রার্থনা করেছেন, ‘অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে’। বলেছেন, ‘ঈশ্বর আমাকে বেদনা দিয়াছেন কিন্তু তিনি ত আমাকে পরিত্যাগ করেন নাই— তিনি হরণও করিয়াছেন পূরণও করিবেন। আমি শোক করিব না— আমার জন্যও শোক করিয়ো না।’ মধ্যম কন্যার মৃত্যু হয় ১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯০৩। তার প্রায় ছ’মাস পর ২৯ এপ্রিল, ১৯০৪ রেণুকার স্বামী সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয়ে যোগ দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন আর স্নেহাতুর রবীন্দ্রনাথ জামাতার ইচ্ছা পূরণ করেন। বিপত্নীক জামাইকে নতুন সংসার গড়ে দেবার জন্য উদ্যোগী হয়ে অবশেষে ১৯০৮ সালে ১৮ জুন (৪ আষাঢ় ১৩১৫) সতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের বালবিধবা কন্যার (ছায়া) সঙ্গে সত্যেন্দ্রর পুনরায় বিয়ে দেন কর্তব্যনিষ্ঠ পিতা হিসেবে। বিরাট হৃদয়ের পরিচয় দিয়ে নববধূ সহ সত্যেন্দ্রনাথকে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ঠাঁই দিয়েছেন নির্দ্বিধায়। অথচ তাঁর আদরের জামাতাকে বেশিদিন ধরেবেঁধে রাখতে পারলেন না কবি। পশ্চিম ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে জ্বরাক্রান্ত অবস্থায় কলকাতা ফিরে এসে ২৫-২৬ অক্টোবর, ১৯০৮ জগৎ সংসারের সকল বন্ধন ছিন্ন করে সত্যেন্দ্রনাথ চলে গেলেন মহাশূন্যতে।

রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীর চতুর্থ সন্তান মীরা ছিলেন রবীন্দ্রনাথের মতই জনম দুঃখিনী। ছোটবেলায় মাকে, পরে মেজদি রেণুকাকে, মেজ জামাইবাবু সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যকে— পরে ছোটভাই শমীকে হারিয়েছেন। মৃত্যু ও দুঃখ তাঁর জীবনে বারবার উঁকি দিয়েছে মিছিলের মতো। বাবার ঘর থেকে এসেছেন এতটুকু বাসা ও ভালবাসার জন্য, তাও ভালভাবে জোটেনি তাঁর জীবনে। ক্ষণকালের জন্য তা ধরা দিয়েই অধরা হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছোটমেয়ের এই সব দুঃখের দিনগুলো আদরে সোহাগে ভরিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন ক্ষণে ক্ষণে। দুঃখের দুয়ারে পাঁচিল হয়ে আড়াল তুলতে চেয়েছেন বিভিন্নভাবে। ছোটকন্যার দুঃখ ভরা দাম্পত্য জীবনকে সঠিক পথে চলার পরামর্শ দিয়েছেন বারবার। অবশেষে আইন অনুসারে বিচ্ছেদকে মেনে নিয়েছেন পরিণত বয়সে। মীরা ও নগেন্দ্রনাথের পুত্র ছোট নীতীন্দ্রনাথ জার্মানিতে ব্রঙ্কাইটিস ও গ্যালপিং টিবিতে আক্রান্ত হয়ে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে ২২ শ্রাবণ, ১৩৩৯ (৭আগস্ট, ১৯৩২) অকালে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়।

এই রকম অসংখ্য প্রিয়জনদের বিয়োগ ব্যথার অন্ধকারে কবি বারবার নিমজ্জিত হয়েছেন। আবার প্রাচীন মুনি-ঋষিদের প্রার্থনা ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়’ অন্ধকার হতে আলোতে ফিরতে চেয়েছেন। জগতে অন্ধকার না থাকলে যেমন আলো প্রকটিত হতে পারে না, তেমনই মৃত্যু ছাড়া প্রাণের অস্তিত্ব নির্ণয় করা কঠিন। রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের এই বাণীটি বুঝেছিলেন বলেই সমস্ত রকমের শোকতাপের মধ্যেও পেয়েছেন অনাবিল ত্যাগ-তিতিক্ষা ও মুক্তির স্বাদ। শত রকমের সংসার বন্ধনের মধ্যেও তাঁর উত্তরণ ঘটেছে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মহাআনন্দের উচ্ছ্বাসে। বিশ্বজোড়া ফাঁদ পাতাই আছে, এই বিতত বিতংসকে ফাঁকি দেওয়ার কোনও উপায় নেই, বরং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মেনে নেওয়া মানিয়ে নেওয়াই জীবন। ‘আকাশ ভরা সূর্য-তারা বিশ্ব ভরা প্রাণ’, তাহারি মাঝখানে তিনি স্থান পেয়েছিলেন। তিনি তাঁর অনিঃশেষ মহাপ্রাণ নিয়ে সততই বিরাজ করেছেন। আমাদের বলেছেন, ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু… নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ, নাহি নাহি দৈন্যলেশ’— আমরা নতজানু হব সেই পূর্ণতার পায়ে বার বার শতকোটি বার।

তথ্যসূত্র:
১. রবীন্দ্রজীবনী: প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
২. রবিজীবনী: প্রশান্তকুমার পাল
৩. পিতৃস্মৃতি: রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৪. স্মৃতিকথা: মীরা দেবী
৫. রবীন্দ্রনাথের পরলোক চর্চা: অমিতাভ চৌধুরী
৬. রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ: পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়
৭. মংপুতে রবীন্দ্রনাথ: মৈত্রেয়ী দেবী

চিত্রণ: মৃণাল শীল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 1 =

Recent Posts

তন্ময় চট্টোপাধ্যায়

তন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

ম্যাজিক রিয়ালিজম: বাস্তবতার ভেতরে জাদুর নিঃশব্দ আনাগোনা ত ন্ম য়  চ ট্টো পা ধ্যা য় বাস্তবতা কখনও কখনও বড্ড ক্লান্তিকর আর যুক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে। মানুষ

Read More »
উত্তম মণ্ডল

উত্তম মণ্ডলের বিশেষ নিবন্ধ

চর্যাপদে বাংলার ব্রাত্য জনজীবন উ ত্ত ম  ম ণ্ড ল খ্রিস্টীয় ১০০০ থেকে ১২০০ অব্দ পর্যন্ত সময়কালে বাংলা সাহিত্যে লৌকিক আটপৌরে ভাষার বদলে দেশীয় কথ্য

Read More »
রথীন চক্রবর্তী

ইউক্রেন ভ্রমণ: রথীন চক্রবর্তী

ইউক্রেনে প্রথম দু’টি রাত র থী ন  চ ক্র ব র্তী যাক, শেষপর্যন্ত ইউক্রেনের মাটিতে পা রাখা সম্ভব হল! ভিসা পাওয়ার জন্য কলকাতায় নিজের অফিস

Read More »
বিজন সাহা

রাশিয়া ভ্রমণ: বিজন সাহা

ভ্রমণবিহীন ভ্রমণকাহিনি বি জ ন  সা হা উত্তর গোলার্ধে বিশেষ করে রাশিয়ায় গ্রীষ্ম মানেই কোথাও বেরিয়ে পড়া। লোকজন সাধারণত দক্ষিণমুখী হয়। আমি নিজে পছন্দ করি

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর বিশেষ প্রতিবেদন

মহাকাশের ঈগল অলটিমিটার সু জি ত  ব সু চাঁদ যে পৃথিবীর একটি উপগ্রহ, তা আমরা সবাই জানি। আমরা অবশ্যই তার সৌন্দর্য উপভোগ করি কিন্তু বিজ্ঞানীদের

Read More »
সব্যসাচী সরকার

সব্যসাচী সরকারের বিশেষ প্রতিবেদন

সেই চক্রান্ত-ঘর স ব্য সা চী  স র কা র শ্রীপেরামবুদুরে গেলে, আপনি একটু থামবেন। হত্যার ইতিহাস যদি জানেন। দেশবাসী জানে। আপনিও জানেন। আপনি দুঃখ

Read More »