Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

তীর্থঙ্কর মৈত্রর কবিতা

নতুন সময়

জাহাজ ভিড়েছে ফের একটি বন্দরে আজ;
কেবিনের থেকে দেখি, সূর্যোদয় দৃশ্য পৃথিবীর।
সমুদ্রের নীল জলে, তার ক্রম যে বিস্তার—
তুমি কি দেখছ! নাকি; এখনো ঘুমিয়ে আছ!
বন্দর জাগছে ফের, নতুন সূর্যের এ আভায়।

ওঠো, আলো দেখো ফের এসে পড়েছে জানলায়!
দ্বীপের অন্তরে লাগে তার নিষ্পাপ শরীর স্পর্শ।
জগতের মলিনতা মোছো এই আলোর উৎসব;
প্রাণে প্রাণে লাগে আজ, ক্লান্তিহীন কলরব!
আমি তো তাকিয়ে আছি, তুমি উঠে দেখছ এসব।

তীরে খোলা মাঠে ঘাস, দ্বীপের ঘোড়ারা সব
একে একে হয়ে জড়ো, হৃদয় আবেগ তারা
খায় সেই আলোমাখা নতুন যুগের এই ঘাস।
হতাশা নেই তো কোনো, নেই সহিসের তাড়া;
দিগন্তে পাখির দল, ডানায় পবিত্র রোদ ধরা!
জাহাজের গায়ে লাগে নতুন জলের ফেনা;
তাতে রোদ এসে পড়ে। নোঙরের শব্দ যেন ডানা
মেলা সামুদ্রিক পাখি, এসেছে জীবনের জয় নিয়ে;
পরাজয় নেই যেন আর! সাথে নব নব জাগরণ!
পৃথিবীতে আজ আর যুদ্ধ নেই— শান্তি পারাবার!

ওখানে কেবিনে কার গিটার রয়েছে পড়ে;
নীলাভ শরীরে তার নেই যেন ঘুম আর কোনো।
সেও যেন নতুনের। নতুন পেয়ালা ভরা মদে
মিশেছে কারোর লাল গোলাপের প্রিয় গান!
লীল আকাশের গায়ে শুভ্র মেঘ, সমুদ্রের নীল
জলে তার রূপ ভাসে; তীরে রয়েছে পাহাড়;
ছোট ছোট তারা সব। অচেনা গাছের দল;
তাদের সবুজ পাতা রুমাল নাড়ছে যেন…
আমাদের নাম ধরে ডাকছে তীরের বাতাস।
তোমার সোনালী চুলে, নামে আলোর উচ্ছ্বাস!

আমরা দু’জন আজ শুনি কান পেতে গান;
নতুন যুগের গান, যেন তার সুরের উদ্যান
ফুলে ফুলে ভরে আছে, মনোরম অতি মনোরম!
সুগন্ধ ছড়ায় তারা, তুমি কি পাওনি তার গন্ধ?
মৃদুমন্দ হাওয়া পাই, ছোট ছোট পাখি ডাকে,
রঙিন ফোয়ারা জলে রঙিন মাছের কত ঝাঁক,
প্রজাতির দল ফেরে… এমন সুরও আছে! আগে
কখনো শুনেছি বলো? তুমি মুগ্ধ! স্নিগ্ধ মুখে
শুধু তাকিয়ে রয়েছ আজ আমার দুচোখে!

Advertisement

হিংসা, ঘৃণাহীন মনে, পবিত্র জগতে আছে
এই সুর, এই রূপ, এই বন্দর যেখানে ভিড়ে
আছে আমাদের এই, শুভ্র জাহাজটি আজ।
তীরের বসতি দূরে, অপূর্ব এ সৈকতে ঢেউ,
নীল জলে তুলে দেখি ধুয়ে দেয় মুগ্ধকারী তীর;
ধবল ফেনায় লাগে কল্পনার কত কত রং!
এখানে শিশুরা খেলে, নারীদের দেহ যেন
মোমে গড়া, টানা টানা চোখ ও নাসিকা সব!
তারা যেন চির এক যৌবনের আনন্দ উৎসব!
পুরুষেরা দীর্ঘ সবাই, অবর্ণনীয় দেহসৌষ্ঠব;
নীল চোখ, ওষ্ঠে হাসি, প্রেমে পূর্ণ হয়ে আছে মন!

তুমি নীরব রয়েছ, আমিও নীরব, শব্দ শুধু
নীল এই সমুদ্রের! সেও যেন গান গায় একা,
জীবনের চিরন্তন আনন্দের এক গান, গেয়ে চলে!
জাহাজের গায়ে এসে আছড়ে পড়ে নীলঢেউ;
পৃথিবীর রাজনীতি, গদি, যুদ্ধ, এইসব থেকে
দূরে, বহু–দূরে এই সুন্দর বন্দর, তুমি আমি আর
আমাদের এই জাহাজটি, যেখান ফেলেছি নোঙর!
এ সমুদ্রতে হাঙর নেই, নীলতিমি কাঁদে না কখনো।
এই বন্দরে কোথাও সৈনিক নেই, অস্ত্র নেই!
তীরের সবুজ ঘাসে চরে সাদা ঘোড়া সারি সারি;
পাহাড়ে তুষার নেই, দুরবিনে রেখে দেখি চোখ।

তুমি গাঘেঁষে বসেছ, হাতে বিয়ারের ছোট ক্যান;
দুরবিন রেখে যেই তাকিয়েছি তোমার নীল চোখে;
দেখি কামনার ভাষা, প্রেমে পরিপূর্ণ আজ সমর্পণ!
মনে হল পৃথিবীর এইটুকু চাওয়া, কত বড়!
আলতো চুম্বন করি, বলি– ‘আজ মানবের সূর্যোদয়!’
এসেছে আবার দেখি পৃথিবীতে এক নতুন সময়!

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 − three =

Recent Posts

গৌতম চক্রবর্তী

ব্রিটিশ ছোটগল্প

আমি আগে থেকেই আমেরিকার পাখি বইটি সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু কখনও বইটির সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাইনি। ঠিক যেভাবে কেউ নদীর ধারে বসে সময় কাটায়। বাবার হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমি যেন ধৈর্যের অর্থ শিখে নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। এডি ঠিকই বলেছিল— আমিও মাছ ধরতে যেতে চাইছিলাম। জলের ধারে বসে থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু বাবাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো সম্ভব হয়নি। তাই আমি অডুবন-এর সরোবরসম বইয়ে আমার জাল ফেললাম।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
তপোমন ঘোষ

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে…

হঠাৎ চোখ পড়ে বুথের এক্সিট দরজাটার দিকে… একটা ছোট্ট ছায়া ঘোরাফেরা করছে! চমকে উঠে সে দেখে, সেই বাচ্চাটা না! মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল… মজা করে পোলিং অফিসার তার ছোট্ট আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভোটের কালি। হুড়োহুড়িতে মা ছিটকে গেছে কোথাও— নাকি আরও খারাপ কিছু! বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার। শুনশান বুথে পোলিং আর সেক্টর অফিসার গলা যথাসম্ভব নিচুতে রেখে ডাকতে থাকেন বাচ্চাটাকে। একটা মৃদু ফোঁপানি… একটা হালকা ‘মা মা’ ডাক— বাচ্চাটা এইসব অচেনা ডাকে ভ্রূক্ষেপও করে না, এলোমেলো পায়ে ঘুরতে থাকে।

Read More »