Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

মহাত্মা অশ্বিনীকুমার: মৃত্যুঞ্জয়ী প্রতিভা

অশ্বিনীকুমার দত্ত (২৫.০১.১৮৫৬-০৭.১১.১৯২৩) গান্ধীর-ও আগে ‘মহাত্মা’ উপাধি লাভ করেছিলেন। বরিশালবাসীর কাছে তিনি ছিলেন ‘মুকুটহীন সম্রাট’, আর দেশবাসীর কাছে এক আপসহীন রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, নানান যুগান্তকারী কর্মের উদ্যোক্তা এবং গ্রন্থকার। তাঁর ‘ভক্তিযোগ’ গ্রন্থটি একদিকে সনাতনধর্মে আস্থাশীল বঙ্কিমচন্দ্র, এবং অন্যদিকে ব্রাহ্মসমাজের প্রতিভূ রূপকার দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, উভয়ের কাছেই আদরণীয় হয়ে উঠতে পেরেছিল।
তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র ছিল ‘সত্য, প্রেম, পবিত্রতা’। তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুল ও কলেজে শব্দত্রয়ী খোদিত আছে, রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে যেমন কবির মর্মমূলের এই বাণীটি দীপবর্তিকারূপে সোচ্চার, ‘তিনি আমার প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি’।
এই দুই ব্রাহ্ম প্রায় এক-ই উদ্দেশ্য নিয়ে শিক্ষাঙ্গন তৈরি করেন স্ব স্ব জমিতে, আর দুজনেই শিক্ষকতা করতেন নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে, এবং বিনা বেতনে। রবীন্দ্রনাথ যেমন পেয়েছিলেন আত্মনিবেদিত শিক্ষকমণ্ডলী, অশ্বিনীকুমার-ও তাই। উপরন্তু অশ্বিনীকুমার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যে নৈতিকতাবোধ গড়ে দেন, তা ততটা দেখি না এমনকি রবীন্দ্রনাথে। কীরকম?
অশ্বিনীকুমার ছাত্রদের পাঠাতেন থানা থেকে ম্যাট্রিকের প্রশ্নপত্র আনতে। তাছাড়া তাঁর বিদ্যালয়ে ও কলেজে বার্ষিক পরীক্ষার সময় হলে কোনও গার্ড থাকতেন না, এমনটাই তিনি ছাত্রদের নৈতিকতাবোধ গড়ে দিয়েছিলেন। ছাত্ররাও তার মর্যাদা রাখত পুরোপুরি।

প্রসন্নময়ী ও ব্রজমোহন দত্তের সাত পুত্রকন্যার মধ্যে জ্যেষ্ঠ তিনি। প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষালাভ। কলকাতায় থাকাকালীন রাজনারায়ণ বসু, কেশবচন্দ্র সেন, রামতনু লাহিড়ী প্রমুখ ব্রাহ্ম নেতাদের সঙ্গে যেমন তাঁর পরিচিতি ঘটে, তেমনই দক্ষিণেশ্বর যাতায়াতের সূত্রে এসময় পরিচয় হয় শ্রীরামকৃষ্ণ ও নরেন্দ্রনাথের (পরবর্তীতে স্বামী বিবেকানন্দ) সঙ্গে। এর ফলে তিনি ধর্মের দিক থেকে উদারমনা হন। ১৮৮২-তে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করলেও তাঁর ধর্মীয় উদারতা তাঁকে দিয়ে ‘দুর্গোৎসবতত্ত্ব’ লিখিয়েছে। তাঁর শিয়রে থাকত কোরানশরীফ, সন্ত কবীরের দোঁহা, শিখদের পবিত্র ‘গ্রন্থসাহেব’। উত্তম ফার্সি-জানা এই মানুষটি মূল ফার্সি থেকে হাফেজ অনুবাদ করেন। ইংরেজিতে এম এ পাশ করার পাশাপাশি এলাহাবাদ থেকে ল পাশ করে কিছুদিন শ্রীরামপুরের চাতরায় একটি বিদ্যালয়ে প্রধানশিক্ষক হিশেবে যোগ দেন। পরে চলে যান ওকালতিতে যোগ দিতে নিজ দেশ বরিশাল। পিতা ব্রজমোহন দত্ত (১৮২৬-১৮৮৬) ছিলেন তখনকার ভারতীয়দের পক্ষে সর্বোচ্চ পদাধিকারী, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। অশ্বিনীকুমারের জীবনে পিতার প্রভাব ছিল বিশাল। তাঁর লেখা গ্রন্থ ‘মানব’ পুত্রকেও লেখক হতে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। তিনি পুত্র অশ্বিনীকুমারকে কিন্তু সরকারি চাকরি না করে ওকালতিকে পেশা হিশেবে নিতে বলেন। তবে পুত্রের পক্ষে ওকালতির সঙ্গে অসততার সহবাস, এবং নিয়তি তাঁকে অন্য এক মহান পেশায় নিয়োজিত করে,— শিক্ষকতা ও সাচ্চা মানুষ তৈরি।

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং চারণকবি মুকুন্দদাস তাঁর হাতে গড়া দুটি ইস্পাতের তরবারি। তাঁর প্রভাব ছাড়া চারণকবি কী করে লেখেন, ‘লাঠি মেরে মা ভোলাবি, আমরা মায়ের তেমন ছেলে!’ একথা ভাবলে শিহরিত হতে হয়, পার্লামেন্ট, যা গণতন্ত্রের চালিকাশক্তি, আর ইংল্যান্ডে বহুশতক ধরে যার ব্যাপ্তি ও প্রসার, এদেশে তার সূচনা ঘটাতে চেয়ে চল্লিশ হাজার বরিশালবাসীর স্বাক্ষর সংগ্রহ করে তা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাঠিয়েছিলেন তিনি!
ব্রজমোহন স্কুল ও কলেজকে তিনি এমনভাবে গড়ে তোলেন, যার ফলে অখণ্ড ভারতের সর্বত্র এখানকার ছাত্ররা চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেত। কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ, পাবনার এডওয়ার্ড, রংপুরের কার্মাইকেলের মতোই তৎকালীন সময়ে বি এম কলেজ ছিল বিখ্যাত। শিক্ষাসচিব এই কলেজ পরিদর্শন-শেষে বলেছিলেন, ‘বুঝি না, এরকম একটি কলেজ থাকতে ভারতীয়রা কেন অক্সফোর্ড-কেমব্রিজে পড়তে যায়!’ এখানে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের আগে তাঁরই কল্যাণে সহশিক্ষা প্রবর্তিত হয়েছিল। এ-কলেজের ছাত্রী শান্তিসুধা ঘোষ স্নাতক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ঈশান স্কলার হন। কবি জীবনানন্দ দাশ ছিলেন বি এম স্কুল ও কলেজের ছাত্র, এবং বি এম কলেজের অধ্যাপক। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বহু কৃতী ছাত্রছাত্রীর সূতিকাগার।

সাচ্চা মানুষ তৈরির জন্য তাঁর অপর হাতিয়ার ছিল রাজনীতি। সর্বভারতীয় রাজনীতির সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন জড়িয়ে ছিলেন, এবং জাতীয় কংগ্রেসে নিয়মিত যোগ দিতেন। কংগ্রেসের আবেদন-নিবেদনের রাজনৈতিক কার্যক্রম দেখে সিপাহী বিদ্রোহের পূর্ববর্তী বছরের জাতক এবং প্রখর প্রজ্ঞাবান অশ্বিনীকুমার ১৮৯৭-এর কংগ্রেসের অমরাবতী অধিবেশনে দৃঢ়তার সঙ্গে একে ‘Threedays’ mockery’,— ‘তিনদিনের তামাশা’ বলে উল্লেখ করেন। দুর্ভাগ্য দেশের, তাঁর কথা অনুধাবন করলেও কেউ গুরুত্ব দেননি। সে-অধিবেশনের সভাপতি চেট্টুর শঙ্করণ নায়ারকে নিয়ে অক্ষয়কুমার-অনন্যা পাণ্ডে অভিনীত বায়োপিক তৈরি হয়েছে। অথচ সারা উপমহাদেশ-কাঁপানো অশ্বিনীকুমারের মূল্যায়ন আজ-ও অপেক্ষিত।
উপমহাদেশ-কাঁপানো? অন্তত ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র বিভাগ তো সেটাই মনে করত। সারা ভারত শাসন করার দুটি অন্তরায় ছিল, তাদের মত। এক, সীমান্ত, এবং দুই, বরিশাল। তাঁর ‘স্বদেশ বান্ধব সমিতি’ স্বাদেশিকতায় এমন উদ্বেল ছিল যে কেবল বরিশাল জেলাতে দ্রুত এর ১৬০-টির ওপর শাখা গজিয়ে ওঠে। সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে লক্ষ্নৌ কারাগারে রাখে, এবং সমিতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
একজীবনে কত কাজ-ই না করে গিয়েছেন তিনি! বালিকা বিদ্যালয়, স্বদেশী ব্যাঙ্ক, হিন্দুস্থান কো-অপারেটিভ ইনশিওরেন্স, কো-অপারেটিভ নেভিগেশন, দুর্ভিক্ষদমন প্রয়াস, চা-শ্রমিকদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে Peoples Association গঠন, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড গঠনে ভূমিকা, পৌরসভার চেয়ারম্যান, বাখরগঞ্জ হিতৈষণী সভা, এসবের সঙ্গে ওতপ্রোত যুক্ত ছিলেন তিনি। এবং আরও।

Advertisement

তাঁর নামে কলকাতায় তিন ও শ্রীরামপুরে একটি জায়গা ও কলোনি নামাঙ্কিত। অশ্বিনীকুমার গবেষক সাবেক অধ্যক্ষ মাননীয় তপংকর চক্রবর্তী জানালেন, খোদ বরিশালে তাঁর নামে কোনও রাস্তা নেই। অথচ তাঁকে নিয়ে লিখেছেন রমেশচন্দ্র মজুমদার, সুমিত সরকার। জাপানের মাসায়ুকি উসুদা তাঁকে নিয়ে গবেষণা করেছেন, ঢাকা বাংলা একাডেমি থেকে তপংকর চক্রবর্তীর অশ্বিনী-জীবনী বেরিয়েছে। তাঁর রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন কবি শঙ্খ ঘোষের পিতা মণীন্দ্রকুমার ঘোষ, পরবর্তীতে জনাব বদিউর রহমান।

আজ মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্তের মৃত্যুদিন। তাঁকে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two + 17 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »
অপরাজিতা মৈত্র

গোদাবরীর গোমুখে

গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা।

Read More »
রুহ

রুহের কবিতাগুচ্ছ

একই আলোকমালায় কাটিয়েছি/ বহুকাল দু’জনে…/ বলিনি কখনও।/ তারা খসা দেখেছি একসাথে, যদিও/ গোপন থেকেছে চাওয়া-পাওয়া।/ মাঝে বহুদিন, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো/ একা… নীরবে বয়েছি যাতনা।/ আজ মিথ্যের নেই অবকাশ/ তোমাকে কি পড়েনি মনে/ কোনও মুহূর্ত বা ক্ষণে/ ভাবিনি কি একান্ত বন্ধু আমার—/ এতদিন পরে, পুনর্মিলনে বলেছ/ পাখি হতে চেয়েছিলে এ জীবনে

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

যুদ্ধ: বৈশ্বিক কসাইখানা, পুঁজির সংকট ও শ্রমের মুক্তি

অবিক্রীত পণ্যের পাহাড় যখন পুঁজির পুনরুৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন পুঁজিপতিরা তীব্র আতঙ্কে ভোগে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তারা প্রতিযোগী পুঁজিপতির বাজার ও পণ্য ধ্বংস করতে চায়। আর এই ধ্বংসের বৈধ হাতিয়ার হিসেবে তারা রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। অর্থাৎ, উদ্বৃত্ত পণ্য এবং অতিরিক্ত শ্রমকে ধ্বংস করে পুঁজির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই বুর্জোয়া যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য। এই শোষণের প্রক্রিয়াকে আড়াল করতে রাষ্ট্র একদল বুদ্ধিজীবী ও নীতিবিদ লালন করে, যারা কৃত্রিম ‘দেশপ্রেম’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’-এর আফিম খাইয়ে শ্রমিককে বিভ্রান্ত রাখে, যাতে তারা শোষক ও শোষিতের মধ্যকার মৌলিক শ্রেণি-পার্থক্য ভুলে যায়।

Read More »
প্রসেনজিৎ চৌধুরী

বিশ্বকাপ জৌলুসে আর্জেন্টিনা গণহত্যার বধ্যভূমি

বুয়েনস আইরেসের রিভার প্লেটের যে স্টেডিয়ামে তখন খেলা হত, তার মাত্র এক মাইল দূরে ছিল সামরিক সরকারের বন্দিশিবির নেভি স্কুল অব ম্যাকনিকস। সাংবাদিক ডেভিড কক্স ফুটবল বিশ্বকাপের খবর সংগ্রহ করতে গেছিলেন। তিনি ‘ডার্টি ওয়ার’ বইতে লিখেছিলেন, যখন স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার ম্যাচ চলত তখন ওই টর্চার সেল থেকে কান্নার শব্দ শোনা যেত। আর্জেন্টিনার ভুবনমোহিনী ফুটবলে লেগে আছে রক্ত।

Read More »
রাধাবল্লভ রায়

ধর্মযুদ্ধ

এই যে সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন শতমুখে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, এই যে ফেসবুক জুড়ে বিশেষ সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করে সম্মানীয় নেতা-মন্ত্রীদের কুৎসিত ইঙ্গিত, হিংসার প্রদর্শনী— এর প্রতিক্রিয়া কোথায় গিয়ে ঠেকে তাঁরা কি জানেন? পাড়ায় পাড়ায়, রকের আড্ডায়, ক্লাবের আড্ডায়— সর্বত্র বয়োজ্যেষ্ঠদের নির্বোধ অসংযত উচ্চারণ কোন শিশুর হৃদয়ে কেমন ভাবে প্রোথিত হয় তাঁরা কি জানেন? ভেবে দেখেছেন কি এই বিদ্বেষিতার মধ্যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আগামী প্রজন্ম?

Read More »