Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

এ কলকাতাকে চিনি না, চিনতেও চাই না

দিল্লির এক রোগশয্যা থেকে এই পত্র প্রেরণ করছি।

আমার নাম চিরশ্রী বিশী চক্রবর্তী, প্রয়াত প্রমথনাথ বিশীর একমাত্র জীবিত সন্তান ও কন্যা। পশ্চিমবঙ্গে সম্ভবত আমাকে কেউ চিনতে পারবেন না, কারণ সেখানে আমি অপরিচিত। আমি কোনও বুদ্ধিজীবী নই। দীর্ঘকাল দিল্লিবাসী, এখানকার কোনও এক নামী কলেজে দীর্ঘ ত্রিশ বছরের বেশি অধ্যাপনা করেছি। শিক্ষাই আমার জগৎ। আমার বয়স ৮০ বছর পূর্ণ হয়ে গেছে, দেহের ক্ষমতা কমলেও আশাকরি হৃদয়ের ক্ষমতা ও কলমের ধার এখনও ভোঁতা হয়নি।

আমার বাবা সম্ভবত এই বয়সেই শিক্ষা জগতের এক মারাত্মক অনৈতিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে তাঁর সহযোদ্ধা ড. সুকুমার সেন সহ বিদ্যাসাগর মূর্তির পাদদেশে অনশনে বসেছিলেন। আমার যদি শারীরিক ক্ষমতা থাকত, তাহলে আমাকেও আপনারা কলকাতার ধূলিলুণ্ঠিত রাস্তায় এই সমস্ত অত্যাচারিত, অবিচারগ্রস্ত, মা সরস্বতীর প্রতিনিধি ছাত্রবর্গের সঙ্গে দেখতে পেতেন। এঁরা আমার কেউ রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয় নন, এঁরা আমার আত্মার অঙ্গ। দুর্ভাগ্যক্রমে আমার এখন সে ক্ষমতা নেই। তাই লিখিতভাবে জানাই যে, এই শিক্ষা ও শিক্ষকজাতির প্রতি যে অপমান চলেছে, দীর্ঘদিন ধরে অ-বিলম্বে তার অবসান চাই। কেবল মুখের কথায় নয়, কাজে করে দেখানো হোক।

এ যেন, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি! রাজনীতি আমি বুঝি না, বুঝতেও চাই না। আমি ওদেশের ‘ভোটার’-ও নই। কাজেই আমার কোনও স্বার্থ আপনারা খুঁজতে চেষ্টা করবেন না। এটা আমার ধর্মনীতি, মনুষ্যনীতির প্রকাশমাত্র।

একি আমাদের চেনা সেই কলকাতা? যাকে নিয়ে চিরকাল আমরা স্বদেশে, বিদেশে গর্ব করে এসেছি? এখনকার এই মুণ্ডহীন, রসনা-সর্বস্ব কবন্ধ জনতাকে আমি চিনি না। একি সেই পাণ্ডবদের রাজসভা? যেখানে ভীষ্ম, কৃপ, দ্রোণাচার্য— মহা মহা হৃদয়বান, শক্তিমান পণ্ডিতেরা নিজেদের বিচারবুদ্ধিকে এক গোপন ও মিথ্যা প্রতিজ্ঞার বন্ধনে আবদ্ধ রেখে এক একজন বিচারহীন দর্শক বনে বসে আছেন? কিন্তু কেন? কেন? কেন? এখানেও কি পিতামহ ভীষ্মের আনুগত্যের মত কোনও প্রশ্ন আছে? এটা আমরা বিশ্বের শিক্ষিত জনতা মুক্তকণ্ঠে জানতে চাই।

আমিও সম্ভবত অশিক্ষিত নই। আমার সমস্ত ডিগ্রি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সম্মানের বিচারের আশায় ভূলুণ্ঠিত ছাত্রদের পদস্পর্শ করে ক্ষমা চাওয়া এবং তাদের শিক্ষাজগতে ফিরিয়ে আনা। এদের যথার্থ স্থান হোক, ক্লাশরুমে, ব্লাকবোর্ডের সামনে। সম্মুখে থাকুক একদল তাজা কচি শালতরু, মাথা উঁচু করে। এটাই আমার একমাত্র স্বপ্ন।

আর কলকাতার এই দর্শক কবন্ধ জনতা, তোমাদের জন্য ঘৃণার অন্ত নেই। এ কলকাতাকে আমি চিনি না। চিনতেও চাই না। ‘এ আমার এ তোমার পাপ—’!

আর একটা কথা মনে রাখা দরকার, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, ক্ষমা করেনি। এবারেও করবে না। তার প্রাচীনতর উদাহরণ আমাদের ‘মহাভারত’!

আমার করজোড় নিবেদন, আমার এই ‘খোলাচিঠি’ আমি বিভিন্ন বৈদ্যুতিন মিডিয়াতে প্রকাশ করছি। সেইসঙ্গে কলকাতার প্রত্যেক নামীদামি সংবাদপত্রেও পাঠাচ্ছি। আপনাদের ‘বুকের পাটা’ থাকে তো এ পত্র ছাপিয়ে প্রকাশ করুন। তাহলেই বুঝব মনুষ্যরক্ত এখনও আপনাদের বক্ষে প্রবহমান।

এত পাপ ধরিত্রীও সহ্য করবেন না, সর্বংসহা তিনি সত্যই নন।

নমস্কারান্তে

চিরশ্রী বিশী চক্রবর্তী।
জে-২১৭, সাকেত, নতুন দিল্লি- ১১০০১৭
৯৮১০০ ৮৮০৩০ ফোন নং

{ঠিকানা লেখার কারণ, এটা কোনও মেঘের আড়াল থেকে লেখা মেঘনাদের হুংকার নয়। ঠিকানা যাচিয়ে দেখতে পারেন।}

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »