
রম্যরচনা: চিরশ্রী বিশী চক্রবর্তী
বঙ্গভাষা জননী অকস্মাৎ দিবাস্বপ্নে “বঙ্গভাষা জননী” আবির্ভূতা হইলেন। অবিন্যস্ত কেশ, ক্লিন্ন বেশবাস, বিষণ্ণ বদনে অশ্রুচিহ্ন। গলদশ্রু মাতা কহিলেন, “বৎস, আজিকে দেশান্তরী হইবার লগ্ন আসন্ন। দীর্ঘ

বঙ্গভাষা জননী অকস্মাৎ দিবাস্বপ্নে “বঙ্গভাষা জননী” আবির্ভূতা হইলেন। অবিন্যস্ত কেশ, ক্লিন্ন বেশবাস, বিষণ্ণ বদনে অশ্রুচিহ্ন। গলদশ্রু মাতা কহিলেন, “বৎস, আজিকে দেশান্তরী হইবার লগ্ন আসন্ন। দীর্ঘ

India’s First Bengali Daily Magazine. কলকাতা অস্থায়ী ধর্নামঞ্চ অনেক দেখেছে, তাদের আবার পেছনে সিঁড়িও থাকত। এখানে কোনও গোপনীয়তা থাকবে না, সব খোলাখুলি, মাটির কাছাকাছি। কেবল, মাটির ক্লেদ বর্জিত বলে তোমাদের পক্ষে অপেক্ষাকৃত স্বাস্থ্যকর হবে। আশা করি এ বিষয়ে প্রতিপক্ষের কোনও প্রতিবাদ উঠবে না। কারণ, কে বলতে পারে ভবিষ্যতে তাদেরও হয়তো এই জাতীয় প্রয়োজন পড়ে যেতে পারে! ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে— নূতন বলে কিছু নেই, পুরাতনই নানা বেশে চক্রমণ করে!

India’s First Bengali Daily Magazine. একি আমাদের চেনা সেই কলকাতা? যাকে নিয়ে চিরকাল আমরা স্বদেশে, বিদেশে গর্ব করে এসেছি? এখনকার এই মুণ্ডহীন, রসনা-সর্বস্ব কবন্ধ জনতাকে আমি চিনি না। একি সেই পাণ্ডবদের রাজসভা? যেখানে ভীষ্ম, কৃপ, দ্রোণাচার্য— মহা মহা হৃদয়বান, শক্তিমান পণ্ডিতেরা নিজেদের বিচারবুদ্ধিকে এক গোপন ও মিথ্যা প্রতিজ্ঞার বন্ধনে আবদ্ধ রেখে এক একজন বিচারহীন দর্শক বনে বসে আছেন? কিন্তু কেন?

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।