Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

চম্পা রায়ের ছোটগল্প

ডিঙি

চ ম্পা  রা য়

‘ও যদু… জাল নিয়া এগাও।’

মাঝ-নদীতে কারেন্ট জাল পাতছিল কালিচরণ। যদুকে ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাঁক দিল। যদিও কালিচরণ জানে, যদু কিছুতেই এ-বেলায় নদীতে নামবে না। বরাবর দেখে আসছে, সবাই জাল পেতে বাড়ি ফিরলে তবেই যদু নদীতে নামে। নিজেদের মধ্যে মাঝে মাঝে আলোচনা করে— যদুর মাথায় ছিট আছে। না হলে এই চৈত্র মাসে রাতে কেউ জাল পাতে?

নদীতে এখন বাটাই, চিড়াবাটাই, সরপুঁটি— এইসব মাছই আছে। শুধু এসব মাছের জন্য রাত জাগার কোনও দরকার নেই।

চৈত্র মাসে দামোদরে জল কম থাকে। ক্যানেলে জল দেওয়ার জন্য দুর্গাপুর ব্যারেজ থেকে জল ছাড়লে তবে নদী ভরে। অন্য সময় প্রায় পুরো নদীই হাঁটুসমান জল, কোথাও বা এক বুক। সন্ধ্যার দিকে কেউ আর গা ভেজাতে চায় না। তাই ডিঙি বেয়ে জাল পাতে সবাই। ভোর ভোর জাল তুলে নেয়।

সবাই নিজেদের ডিঙি ঘাটে বাঁধলে যদু ডিঙি ছাড়ে। অন্ধকারে ডিঙি নিয়ে নদী চষে বেড়ায়। যেন সে নদীতে গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছে। একান্তই একা সব গুপ্তধন সে সংগ্রহ করবে।

আজ পূর্ণিমা।

বিকেলেই চাঁদ চলে এসেছে। পূর্ণিমায় চাঁদ যেন আরও বেশি মায়াবী হয়ে ওঠে। এই সময় সারা রাত ডিঙিতে কাটায় যদু। এত মায়া! এত লাবণ্য! এক জীবনে এরকম ক’টা মাত্র রাত পাবে মানুষ? ভাবলেই যদুর বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে।

নদী ফাঁকা হয়েছে। আর একটা ডিঙিও ভাসছে না। সূর্যের আলো মুছে নদী এখন চাঁদের আলোয় আলোকিত। পুরো নদীটা কেমন যেন মায়াবী। সকল চরাচর যেন রূপকথার কোনও এক পৃথিবী। যদুর ইচ্ছে করে এই মায়ায় ডুবে যেতে।

ঘাটে দাঁড়িয়ে জাল গুটিয়ে ডিঙিতে রাখছিল যদু। সরু সুতোর জাল জড়িয়ে গেলে ছাড়ানো মুশকিল। তাছাড়া রাতে ছাড়ানো আরও দুঃসাধ্য। ঠিকমতো গুছিয়ে রাখলে জাল পাততে সুবিধা হবে।

‘আইজ ডিঙা ছাড়তে এত দেরি ক্যান?’

পেছন থেকে মহিলাকণ্ঠ ভেসে এল।

আচমকা শব্দে বুকের ভেতরটা ধক্ করে উঠল যদুর।

‘অবশ্যি এক দিকে ভালই হইছে। আইজ তুমার ডিঙাই সওয়ার হন যাইব।’

আবার সেই মহিলাকণ্ঠ।

এই স্বর যদুর খুব চেনা।

শরীরটা বোধ হয় কাঁপছে। শরীর কাঁপছে, নাকি মাটি কাঁপছে— বুঝতে পারছে না যদু।

পেছনে ফিরল না সে। খুঁটি থেকে ডিঙির দড়ি খুলে নিল। এবার এক ঠেলায় ডিঙিকে সামনে এগিয়ে দিয়ে নিজে উঠে পড়বে।

মহিলা পেছন থেকে সামনে এসে পড়ল। হাঁটু পর্যন্ত শাড়ি উঁচিয়ে নেমে পড়ল জলে। ডান হাতে টেনে ধরল ডিঙির এক কোণ।

‘এত বছর পর আমার ডিঙায় উঠার এত ইচ্ছা ক্যান?’

যদুর স্বর কেঁপে উঠল।

‘সে-সব তুমি বুঝবা না।’

ডিঙিটা টেনে ঘাটের দিকে এনে উঠে পড়ল মহিলা।

কথা বাড়াল না যদু। ডিঙির এক কোণে বসে বৈঠা বেয়ে জল কাটতে লাগল।

চাঁদটা এখন অনেকটা উপরে পৌঁছেছে। দক্ষিণের হাওয়া বইছে। নদীতে একটু বেশি জোরেই হাওয়া বয়। হাওয়ার তালে উড়ছে মহিলার শাড়ির আঁচল। আবছা আলোয় স্পষ্ট মুখ দেখা যায় না। তবে অবয়ব স্পষ্ট বোঝা যায়।

যদুর বুকের ভেতরের ধুকপুকানি বেড়েই চলেছে।

চারিদিকে কী ভীষণ নিস্তব্ধতা!

অন্যদিন নিস্তব্ধতা ভাল লাগে যদুর। আজকের এই নিস্তব্ধ, নিঃশব্দ সময়টুকু কী ভীষণ ভারী মনে হচ্ছে।

বৈঠা হাতে আকাশের দিকে তাকাল একবার। মনে হল, চাঁদটাও তার দিকে তাকিয়ে আছে।

‘জাল পাতবা না?’

মহিলাকণ্ঠ ভেসে এল।

যদুর মনে হল, অনেক দূর থেকে হাওয়ার সঙ্গে মিশে এসেছে কণ্ঠটা।

‘হ। পাতুম।’

বৈঠার বেগ বাড়াল সে।

মাঝ-নদীতে একটা বাঁশের খুঁটি পোঁতা আছে। জালের একটা কোণ সেই লগিতে বেঁধে জাল ছাড়বে।

‘সারা জেবন জাল পাতলা। কত মাছ পাইলা?’

‘হিসাব নাই। আইজকাল আর পাওয়া না পাওয়ার হিসাব রাখি না।’

কাঁপা স্বরে বলল যদু।

নদীতে পোঁতা খুঁটির কাছে পৌঁছে গেল ডিঙি। এই সময় জলে স্রোত থাকে না। তাই জাল পাতার সুবিধার জন্য সবাই নদীর মাঝে মাঝে খুঁটি পুঁতে রাখে।

একদিকে কাত হয়ে খুঁটির সঙ্গে জালের দড়ি বেঁধে দিল যদু। এবার ধীরে ধীরে জাল ছাড়বে। নৌকা নিজের মতো ভাসবে, যদু জাল ছাড়বে। আজ ডিঙিতে দু’জন। মাঝে মাঝে বৈঠা দিয়ে জল কাটতে হচ্ছে।

বৈঠার টুবটাব শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই।

দূরে গ্রামের আলো দেখা যাচ্ছে। ঘাট থেকে উঠে দাসদের বাঁশবাগান ঘেঁষে রাস্তা গ্রামে পৌঁছেছে। যদুর বাড়ি গ্রামের শেষে, নদীর কাছে। বাড়ি বলতে একখানা ঘর। কাশগাছের চাল, দরমার বেড়া। বারান্দার একদিকে রান্না-খাওয়ার জায়গা, অন্য দিকে, ছাগল থাকে।

সকালে যদু জাল তুলে নিয়ে বাড়ি আসে। যদুর স্ত্রী সাধনা জালের সব মাছ ছাড়িয়ে বেছে রাখে। যদু সেই মাছ বিক্রি করতে যায়। কখনও পাড়ায় ঘুরে বিক্রি করে, কখনও বাজারে বসে।

‘এইরকম একখান রাইতের জন্য সারাডা জীবন দুই চোখের পাতা এক হয়নায়।’

ধরা গলায় বলল মহিলা।

যদুর আবার মনে হল, কথাগুলো যেন অনেক দূর থেকে হাওয়ার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে তার কাছে পৌঁছল।

অষ্টমীর স্বর শুনেছে পঁচিশ, নাকি ছাব্বিশ বছর আগে— মনে নেই ঠিকমতো। এতগুলো বছরে শরীরের মতোই গলার স্বরেরও পরিবর্তন হয়েছে। তারপরও যদু বুঝতে পেরেছে অষ্টমীর গলা।

কিন্তু এতগুলো বছর পর হঠাৎ এভাবে?

অনেক প্রশ্নে যদুর মাথা ভারী হয়ে আসছে।

‘মনে পড়ে? তুমি কইতা, একটা গোটা চাঁদ আকাশে থাকবে আর একটা গোটা নদী আমাগো। তুমি জাল পাতবা, আমি ডিঙায় বসে দেখব।’

যদু আর অষ্টমী সমবয়সি। নদীতে একসঙ্গে কাটিয়েছে হিসাবছাড়া কত সময়। তখন গ্রামের ছেলে-মেয়েরা নদীতে স্নানে আসত। একসঙ্গে সাঁতরাত নদীর এ-মাথা থেকে ও-মাথা।

সাঁতারে যদুকে কেউ হারাতে পারত না। জলে নামলে যদুর যেন মাছেদের মতো পাখনা গজিয়ে যেত।

ছোট থেকেই নদীর ওপর একরকম টান অনুভব করে যদু। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে স্কুলে গিয়েছে কিছুদিন। কিন্তু স্কুলে মনে হত দম বন্ধ হয়ে যাবে।

নদী, ডিঙি, জাল ছাড়া যদি অন্য কিছু ভেবে থাকে, তা হল অষ্টমীর সঙ্গে সংসার বাঁধা।

‘সে-সব এই জন্মের কথা না।’

হাসল যদু।

‘জানি। কিন্তু জীবন তো একটাই।’

‘এক জীবনে মানুষের অনেক জন্ম হয়। সব জন্মের কথা মনে রাখতে নাই। তাইলে জীবনখান ভারী হইয়া যায়। আর এত ভার এক জীবনে বইবা কেমনে?’

কথাগুলো শেষ করে উঠে দাঁড়াল যদু। জালের শেষ প্রান্তের দড়িটা অন্য একটা খুঁটিতে বেঁধে দিল।

‘আমার উপর রাগ নাই তোমার?’

জিজ্ঞেস করল অষ্টমী।

যদুর মনে হল, অষ্টমীর গলার স্বর ভীষণ স্থির, শান্ত।

‘চাঁদটা লাল থেকে কেমন হলদে হইয়া গেছে। কী আশ্চর্য না? উঠল লাল, হইল হলুদ। আবার শ্যাষ রাইতে ক্যামন ফ্যাকাসে সাদা হবে।’

আকাশের দিকে তাকাল অষ্টমী। চাঁদটা মাঝ-আকাশে পৌঁছেছে।

‘আইজ কি চাঁদের গতি বাড়ছে? একটু আগেই তো পুব আকাশে ছিল।’

অবাক হয়ে বলল অষ্টমী।

‘সময়ের বাইরে কেউ নিজের গতি কমা-বাড়ানো পারে না।’

‘তুমার কি সত্যিই আমার উপর রাগ নাই?’

কেঁদে ফেলল অষ্টমী।

নিরুত্তাপ হাসল যদু।

‘রাগ, দুঃখ, ক্ষোভ, না-পাওয়া— এগুলা সব মোমের মতো। তাপ পাইলেই গইলা যায়। জীবন চলে তাপের উপর, অষ্টমী।’

সন্ধ্যার দিকে ঝিঁঝি পোকাদের শব্দ ভেসে আসছিল। এখন আর কোনও শব্দ নেই। সকল চরাচর ঘুমিয়ে পড়েছে বোধহয়।

‘আর কতকাল বাইব তরী এই মরা গাঙে।’

গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল যদু।

‘আস্তে গাও। কে শুইনা ফ্যালবে।’

সতর্কভাবে বলল অষ্টমী।

হাসল যদু।

অষ্টমী কথা বললেই সাধনা-র রোদে পোড়া তামাটে মুখখানা চোখের সামনে ভেসে উঠছে কেন?

কখনও সাধনার সঙ্গে মন খুলে কথা বলেনি। রাতের পর রাত নদীতে কাটিয়েছে। কিন্তু সাধনার প্রতি কোনও টান অনুভব করেনি। সাধনাও অবশ্য এ ব্যাপারে কোনও অভিযোগ করেনি।

মনপ্রাণ দিয়ে আগলাচ্ছে যদুর সংসার।

এক ছেলে যদুর। তার সঙ্গেও কম কথা হয়। তবে ছেলের মাছ ধরা একদম পছন্দ নয় তার। সে চায় ছেলে ইস্কুলে যাক। অনেক পড়ালেখা শিখুক।

‘আমি সেই রাইতে আসতে চাইছিলাম, কিন্তু…’

ফুঁপিয়ে উঠল অষ্টমী।

‘কাইন্দো না অষ্টমী। সে-সব অনেক কাল আগের কথা। মনে হয় আগের জন্মের। আমার মনে নাই।’

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল যদু।

আকাশের দিকে তাকাল। মনে হল, চাঁদটা তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে যেন। সে যদুর মন পড়ে ফেলেছে।

একমাত্র নদী আর চাঁদই যদুর মন পড়তে পারে।

যদুর মনে হয়, নদী তার প্রতিটি কোণে আজও ধরে রেখেছে তাদের গল্প।

একবার অষ্টমী মাঝ-নদীতে ডুবে যাচ্ছিল। নদীর মাঝের চর থেকে নিয়েছিল কলমি আর হেলেঞ্চার বোঝা। ফেরার সময় লতা পেঁচিয়ে জল থেকে উঠতে পারছিল না। ভাসছিল তার চুল।

যদু ছিল পাশেই। জাল পাতছিল।

অষ্টমীর চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলেছিল তার ডিঙিতে।

ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিল অষ্টমীর শরীর।

অষ্টমী নদীতে গরু ছাড়তে এলে যদু ঘাটের কাছে বসে থাকত। বাকিদের নজর এড়িয়ে একবার অষ্টমীর চোখে চোখ রাখতে পারলে মনে হত, সে এই জগতের রাজা।

অষ্টমীও নানা অছিলায় যদুর সঙ্গে কথা বলত।

যদুর কাছ থেকে কত শুনেছে পূর্ণিমা রাতের কথা।

যদু অবাক হয়ে বলত, ‘মনে হয়, এই নদীটা অন্য এক নদী। দিনের সঙ্গে রাইতের কোনও মিল নাই। রাতে চাঁদ আর নদী যেন নিজেদের মধ্যে কথা বলে।’

‘তোমার সঙ্গে আর একবারও কথা হইল না।’

আবার ফুঁপিয়ে উঠল অষ্টমী।

কাঁদলে অষ্টমীর চোখ ফুলে যায়। চোখের চেয়ে নাক দিয়ে জল গড়ায় বেশি। এই নিয়ে অষ্টমীকে কত রাগিয়েছে যদু।

অষ্টমী নাক দিয়ে দেখে, চোখ দিয়ে গন্ধ নেয়।

আজ মুখখানি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। অনুমান করছে, আজও নাক দিয়ে বেশি জল গড়াচ্ছে।

মৃদু হাসল যদু।

‘এই রাইতে তুমি এইখানে, বাড়ির লোক খুঁজবে না?’

‘জানি না।’

‘সেকী কথা, অষ্টমী?’

‘তার মনের খোঁজ আমি কী করে জানব? তার মনের মালিক সে নিজে।’

ডিঙি ভাসতে ভাসতে এখন নদীর মাঝের চরের কাছে চলে এসেছে। আবছা আলোয় চরের ঝোপঝাড়কে মনে হচ্ছে, দলে দলে লোক বসে আছে। আজ এই রাতের গোপন কথা শুনবে বলে।

এই মাঝের চরের পাশ দিয়ে নদীর সরু নালি হয়েছে। এই নালি পেরিয়ে কিছুটা দূর গেলেই শালডাঙার চর। পায়ে হেঁটে চরের বালি পেরোলে পাকা রাস্তা, তারপর পানাগড়।

এখন চরটা অনেক উঁচু হয়ে গেছে। বালিতে ঝোপঝাড় হয়েছে।

এই রাস্তা একসময় স্বপ্ন দেখিয়েছিল যদু আর অষ্টমীকে।

তারা যতই গোপন রাখার চেষ্টা করুক, তাদের সম্পর্কের কথা জেনেছিল গোটা রূপসায়ের গ্রাম।

অষ্টমীকে ঘরে বেঁধে রেখেছিল অষ্টমীর বাবা। বংশের মেয়ে মুখে চুনকালি পরাবে— মানতে পারেনি বংশের বাকিরা।

যদু খবর পাঠিয়েছিল, সামনের চাঁদনি রাতে শালডাঙা হয়ে পানাগড় পৌঁছে যাবে। তারপর তাদের আর কেউ ধরতে পারবে না।

যদু ডিঙি নিয়ে ঘাটে বসেছিল।

সারারাত সজাগ। বুকের ভেতরে ঢিপঢিপ। শুধু মনে হচ্ছিল, এই বুঝি অষ্টমী এল।

একসময় চাঁদটা পুব থেকে মাঝ-আকাশ হয়ে পশ্চিমে মিলিয়ে গেল।

অষ্টমী এল না।

তারপর আর কখনওই অষ্টমী আসেনি।

প্রথম প্রথম ভাবত, অষ্টমীকে সামনে পেলে প্রশ্নের বাণে ফালাফালা করে দেবে। কিছু বছর আগেও মনে হত, একবার যদি শুধু দেখতে পায়!

এখন আর অষ্টমীর জন্য আলাদা করে কোনও ভাবনা তৈরি হয় না।

সে জানে, অষ্টমী স্বামী-সংসার নিয়ে ব্যস্ত। ভাল ঘরে বিয়ে হয়েছে।

তার সঙ্গে বিয়ে হলে কী-ই বা সে দিতে পারত?

সারাদিন গায়ের আঁশটে গন্ধ দিয়ে স্বপ্ন দেখা যায়, কিন্তু বোনা যায় না।

সাধনাকেই বা সে কী দিতে পেরেছে?

সাধনা কি এখন গভীর ঘুমে আছে? নাকি জোর করে চোখ বুজে সেও অপেক্ষা করছে?

যদুর ভেতরটা কেমন অস্থির লাগছে।

‘বাবা মাথায় হাত দিয়া শপথ করাইছিল।’

কাঁপা গলায় বলল অষ্টমী।

অষ্টমী নমঃশূদ্র ঘরের মেয়ে। যদু জেলে পরিবারের। এই সম্পর্ক হলে অষ্টমীর বাবাকে সবাই একঘরে করে দেবে। কাকা-জ্যাঠারাও সম্পর্ক ত্যাগ করবে।

মেয়ে হয়ে বাবার জন্য কিছু করতে পারবে না, সে জানে। বাবাকে এভাবে একঘরে হতেও দিতে পারেনি অষ্টমী।

সেদিনই অষ্টমীকে বর্ধমানের কালনায় নিয়ে যায় বাড়ির লোকজন। আত্মীয়ের বাড়িতেই স্বজাতের ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় অষ্টমীর।

জমিজমা আছে ছেলের। ভাত-কাপড়ের অভাব হবে না।

বিয়ের পর এখানে সে এসেছিল মোটে দু’বার। একদিনের বেশি থাকেনি।

‘তাইলে আইজ শপথ ভাঙলা ক্যান?’

জিজ্ঞেস করল যদু।

হাসল অষ্টমী।

হাসির শব্দ যদুর কানে পৌঁছেছে।

‘যার মঙ্গলের জন্য শপথ নিলাম, সেই তো পৃথিবীতে নাই।’

মানুষ এক আশ্চর্য প্রাণী।

তারা জানে, পৃথিবীতে তারা ক্ষণস্থায়ী। তারপরও মঙ্গল-অমঙ্গল কত চিন্তা! মঙ্গলের জন্য জীবনের কত স্বাদ, গন্ধ, রূপ ত্যাগ করে পুরো জীবন কাটিয়ে দেয়।

‘বাবার শ্রাদ্ধ-শান্তি শ্যাষ। আমি একদিন রইলাম। মেয়েবাড়ি যাব। সবাই জানে, আমি সন্ধ্যায় মেয়েবাড়ি রওনা দিছি।’

অষ্টমীর মেয়ের বিয়ে হয়েছে এক বছর হল। দুর্গাপুরের কাছে দামোদরের চর বড় মানায়।

‘তোমার মেয়ের বিয়া!’

অবাক হল যদু।

‘সময় কি আর কম পার হইল? তুমি ভাবছিলা আমি সব ভুলে গেছি?’

একটু থামল অষ্টমী।

‘মেয়েমানুষেরা কিছু ভুলে না। তাদের নিজের বলতে আছে শুধু একখান মন। এই মনের মইধ্যে সে পরম যত্নে সব গুছিয়ে রাখে।’

‘অষ্টমী।’

‘হুম।’

‘দেখো সামনে।’

‘কী?’

‘শালডাঙার চর।’

মাথা তুলল অষ্টমী।

ডিঙিখানা চরের বালিতে ঠেকেছে।

এক মুহূর্ত বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করে উঠল অষ্টমীর। যদুও শুনতে পেল বুকের কাঁপুনি।

বৈঠা দিয়ে সজোরে মোচড় দিল যদু।

ডিঙি ঘুরে গেল ঘাটের দিকে।

চাঁদটা একেবারে পশ্চিম কোণে ঢলে পড়েছে।

‘একবারে জাল তুইলা নিয়াই ঘাটে চলো।’

অষ্টমী বলল।

বুকের ঢিপঢিপ খানিকটা কমেছে।

জাল তুলে ডিঙির মাঝের পাটাতনে রেখেছে যদু। চাঁদটা আরও পশ্চিমে ঢলে মাহিষ্যপাড়ার তালগাছের পেছনে পৌঁছেছে। আর একটু পর মুছে যাবে।

বৈঠার গতি বাড়িয়ে দিল যদু।

ডিঙি তরতর করে এগিয়ে চলেছে ঘাটের দিকে।

চারিদিক নিস্তব্ধ।

জালে প্যাঁচানো মাছেরা ছটফট করছে শুধু।

ডিঙির দু’প্রান্তে দু’জন যেন দুটো মূর্তি।

ডিঙি ছোট হলেও মূর্তিদুটোর মধ্যে জন্মান্তরের দূরত্ব।

°°°

চিত্রণ: সৌজন্য চক্রবর্তী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − 5 =

Recent Posts

অরিজিৎ চক্রবর্তী

অরিজিৎ চক্রবর্তীর ছোটগল্প

ট্রমা-চিহ্নিত সেলফিগুলি অ রি জি ৎ  চ ক্র ব র্তী অজ্ঞাত পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধারকৃত দু’টি টীকা (লেখকের নাম অনুপস্থিত। পাণ্ডুলিপির শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা বহু আগেই

Read More »
পিয়াস মজিদ

পিয়াস মজিদের কবিতা

পি য়া স  ম জি দ অনিমিখ তোমার ভেতর যত ময়ূরতা, কেকা; আমি বন থেকে তার দিকে লক্ষ করে আছি। আমার চোখের সবুজ লোকালয়ের বাকি

Read More »
স্বপনকুমার মণ্ডল

স্বপনকুমার মণ্ডলের ছোটগল্প

জিতকা স্ব প ন কু মা র  ম ণ্ড ল ১ হাটবারে বিদ্যাখাড়ির পাড়ে রাস্তা জুড়ে জমাটি ভিড়। মোরগ লড়াই চলছে। কাঁতিদার লড়াইয়ের তাগদ দেখে

Read More »
সুদীপ্ত মাজি

সুদীপ্ত মাজির কবিতা

সু দী প্ত  মা জি মেঘ জংলা হাওয়ার গন্ধে জাগা নেশার মতো উড়িয়ে দিচ্ছ ওড়না তোমার, দিদিমণি এখন কি আর তেমন সবুজ বয়স আছে কুড়িয়ে

Read More »
চম্পা রায়

চম্পা রায়ের ছোটগল্প

ডিঙি চ ম্পা  রা য় ‘ও যদু… জাল নিয়া এগাও।’ মাঝ-নদীতে কারেন্ট জাল পাতছিল কালিচরণ। যদুকে ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাঁক দিল। যদিও কালিচরণ জানে,

Read More »
হৈমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়

হৈমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতাগুচ্ছ

হৈ ম ন্তী  ব ন্দ্যো পা ধ্যা য় মোহনার দিকে লুম্পেন হয়েছে রাত, রাহাজানি করে নিয়ে গেছে মন জ্যোৎস্নার গভীরদেশে ঘরবাড়ি তার গাঢ় হলুদের মতো

Read More »