খেলার পুতুল
সু ত প ন চ ট্টো পা ধ্যা য়
শেষবিকেলে আবির নিজের সেক্রেটারিকে ডেকে বলল, তিনদিনের জন্য কলকাতা যেতে চাই। ট্র্যাভেল এজেন্সিকে মেল লিখে দাও। শোভনা বলল, হোটেল বুকিং? তাজ বেঙ্গল না গ্র্যান্ড?
তাজ। বলে রিসিভারটা নামিয়ে রাখল আবির। কলকাতা শহরটা তার চেনা, হাতের তালুর মতো। স্বচ্ছ, যদিও তাঁর শৈশব, কৈশোর, কলেজ দিল্লিতে। চাকরির সূত্রে কলকাতার একটি বিদেশি রঙের কোম্পানিতে ম্যানেজমেন্ট ট্রেনি থেকে প্রোডাক্ট ম্যানেজার হয়েছিল আবির। নিজেদের বাড়ি ডিফেন্স কলোনি। প্রথম থেকেই সে কলকাতাকে শহর হিসেবে পছন্দ করেনি। কিন্তু কলকাতার বান্ধবীরা তাকে বুঁদ করে রাখত। প্রায় প্রতিটি সপ্তাহান্তে সে কাউকে না কাউকে নিয়ে চলে যেত দিঘা, মন্দারমণি, বসিরহাট। তিন-চারদিন ছুটি থাকলে সোজা দার্জিলিং। নিজের গাড়ি, দক্ষ ড্রাইভার, প্রকৃতিপ্রেমিক আবিরের কলকাতার দম আটকানো জীবনে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসত। মেজাজি ও শৌখিন ছিল আবির। গলফ ক্লাব ছিল আবির কৌশিকের বিনোদনের একটি প্রিয় জায়গা। গলফ তাঁর প্রিয় খেলা। সে গলফকে ঠিক খেলা হিসেবে নেয়নি, সোসাল স্ট্যাটাস হিসেবে নিয়েছিল। পুরস্কার তাঁর ভাগ্যে জোটনি বটে কিন্তু এই গলফের দৌলতে তার দিল্লির এই উচ্চপদের চাকরি।
বাবা নীরজ কৌশিক ছিলেন ফৌজি, ভাই বিশাল সেবার দেরাদুনে সিভিল সার্ভিসে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। বড় আবির দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সোজা চলে এসেছিল কলকাতায়। কলকাতা দিল্লির থেকে অনেক আলাদা, সে টের পেয়েছিল প্রথমেই। মাঝারি উচ্চতা, মুখে একমুখ নিখুঁত ট্রিম দাড়ি, ফর্সা আবির খুব আকর্ষণীয়, কলিগরা বলত রমণীমোহন। বাংলা খুব একটা জানত না আবির, থাকতে থাকতে সে অনেকটাই বুঝতে পারে, বাকিটা বুঝে নেয়। সে খুব সতর্ক এবং উচ্চাভিলাষী।
টালিগঞ্জের গলফ ক্লাবে এক সকালে গরম কফি নিয়ে বসে ছিল আবির। এখানটা যেমন খেলার জায়গা, তেমনি যোগাযোগের বৃন্দাবন। আবির সেই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চাইছিল অনেক দিন ধরে। সেটা যে সহজ নয়, তা সে খুব অল্প দিনেই বুঝে ছিল। কিন্তু উপায় ছিল না। বাইরে ঝিরঝির করে বৃষ্টি নেমেছে, বাতাসে হালকা ঠান্ডা স্রোত। সবুজ কার্পেট বিছানো মাঠে কেউ নেই। বৃষ্টির জলরেণু ঘাসের শীর্ষে হিরের টুকরোর মতো ছেয়ে আছে মাঠময়। একটু দূরে দু’জন মানুষ কথা বলছে এক টেবিলে। আবির ভাবছিল, আজ না এলেই ভাল ছিল। সকালে আকাশের মুখ ঝকঝকে তকতকে উজ্জ্বল আলোয় ঝলমলে ছিল না। ঠিক এমনি সময় শ্যাম মেহেরা এসে তার টেবিলে বসে আলাপ করেছিলেন। শ্যাম দিল্লির একটি বিশাল কোম্পানির চেয়ারম্যান। কোলকাতায় তাঁদের পৈত্রিক বাড়ি, আলিপুরে। মাঝে মাঝে আসেন, দু’চারদিন কাটিয়ে যান। তাঁর কলেজ ও ইস্কুল কলকাতায়। এলেই গলফ ক্লাব তাঁর বাঁধা।
শ্যাম আলাপ করলেন, জিজ্ঞেস করেছিলেন, কী করেন?
আবির বলল, তার কোম্পানির কথা, তার দায়িত্বের কথা।
শ্যাম বললেন, দিল্লি যেতে চান?
আবির যেন এই একটি মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিল। শ্যাম বললেন, আমার একটা ডিভিশনের প্রেসিডেন্ট পদের জন্য আমি খুঁজছিলাম। আপনাকে দেখে আমার মনে হয়েছে আপনি পারবেন। আমার কোম্পানিতে দশজন প্রেসিডেন্ট আছেন, আপনাকে নিয়ে এগারোজন হবেন। তবে আপনাকে দিল্লি ইন্টারভিউ ফেস করতে হবে।
আবির আর না করেনি। ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরিটা হাতের মুঠোয় নিয়ে এগারো বছরের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে সেই যে দিল্লি চলে এসেছে, তারপর তার চাকরিজীবন কলকাতার এক ক্ষীণ বলয় থেকে বিশাল এক বলয়ের মধ্যে এসে পড়েছে।।
শোভনা বলল, টিকিট ও হোটেল বুকিং কনফার্মড।
২
অনেক দিন থেকে শ্যাম মেহেরা একটা টাট্টু ঘোড়া খুঁজছিলেন। তাঁর এই ডিভিশনটিতে যিনি আছেন তাঁর বয়স সাতচল্লিশ। এই পদে প্রায় পাঁচ বছর তাঁর। শ্যামের ধারণা, শুধু অল্প বয়সের টাট্টু হলেই হবে না, বলিয়ে-কইয়ে হতে হবে। আর মাসের পর মাস টো টো করে ঘুরে বেড়াতে হবে। অন্তত মাসের কুড়ি দিন। সে এ দেশেই হোক আর বিদেশেই হোক। যোগদানের কিছুদিনের মধ্যে আবির একটা ট্যুর প্ল্যান করে শ্যামকে পাঠিয়েছিল। এই তিন বছরে সে যতবার ট্যুর প্ল্যান পাঠিয়েছে, অনুমোদন নিয়ে ফিরে এসেছে পরের দিনই। শ্যাম না থাকলে ফোনেই তাঁর সচিবকে অনুমোদনের কথা বলে দিয়েছেন। এবার পড়ে আছে শ্যামের টেবিলে। আবির শোভনাকে বলল, কী ব্যাপার, স্যর অনুমোদন দিচ্ছেন না কেন?
শোভনা খোঁজ নিয়ে বলল, স্যর এখনও হ্যাঁ বলেননি। তাঁকে জানানো হয়েছে। তবু কোনও উত্তর দেননি। তাই আটকে আছে।
আবির একটু চিন্তিত হল। মনে মনে ভাবল, লাস্ট বার বিদেশে একদিন ওভার-স্টে করেছিল বলে কি শ্যাম চটে আছেন ভিতরে ভিতরে?
প্রথম দু’বছর আবিরের দ্বার ছিল অবারিত। যখন যেখানে যেতে চেয়েছে, ব্যবসার লোভ দেখিয়ে পরিকল্পনা করেছে, তাতে সই করেছেন শ্যাম। প্রথমবার আমেরিকার একটি কোম্পানির সঙ্গে কোলাবোরেশন করার জন্য পনেরো দিন ছিল সে বোস্টনে। অনেকটাই এগিয়ে ছিল, যৌথ স্বাক্ষরের সব প্রস্তুতি তৈরি ছিল, শেষ মুহূর্তে তাদের একটি সূত্র যোগ হওয়ায় শ্যাম রাজি হননি। দিল্লি থেকে মেলে অসম্মতি জানিয়ে দিয়েছিলেন। হতাশ হয়ে ফিরে এসেছিল আবির। লোক জেনেছিল আবির কোলাবোরেশনটা করতে পারেনি। বেকার কোম্পানির অনেক টাকা উড়িয়ে আমেরিকা ঘুরে এসেছে। দু’-একজন তো আনাচেকানাচে বলেই বসেছিল, গরুর বদলে হাতি পুষেছেন শ্যাম সাব। এ সবই কানে এসেছিল আবিরের। কিন্তু উপায় ছিল না। দ্বিতীয়বার ঘটনাটার ছিল অন্য প্রেক্ষাপট। কিছুদিনের মধ্যেই আবির বুঝতে পারছিল, যে ক’টি প্রোডাক্ট নিয়ে তাঁর বিভাগের ব্যবসা, তাতে শ্যামের ব্যবসা বৃদ্ধির টার্গেট ছুঁয়ে ফেলা অসম্ভব। এখন সে বুঝতে পারছে, কেন শ্যাম তাকে কলকাতা থেকে নিয়ে এসে বসিয়েছেন। এই ব্যবসার প্রাথমিক অবস্থা থেকে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছতে দশ বছর লেগেছে। শ্যাম চান সেই লেভেল থেকে তিন বছরের মধ্যে ব্যবসা টগবগ করে বৃদ্ধি হোক তিন গুণ। সেইভাবেই শ্যাম তার সামনে বাৎসরিক লক্ষ্যমাত্রা রেখেছেন। আবির প্রথম বাৎসরিক মিটিং তাই প্রস্তাব করেছিল, আরও নতুন প্রোডাক্ট যোগ করতে হবে। আর তার জন্য বিদেশের কোম্পানির সঙ্গে কোলাবোরেশন জরুরি। শ্যাম আপত্তি করেননি। তিনি বলেছিলেন, প্রথমবার হয়নি, অন্য কোথাও চেষ্টা করতে। নতুন টেকনোলজি তাঁর চাই।
সেবার ইংল্যান্ডের ম্যঞ্চেস্টারের একটি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ হল আবিরের। সে এই বিদেশভ্রমণের সুযোগ বুঝে দু’তিনদিন বেশি থাকার ছল খুঁজে বের করল। সেই সঙ্গে নাইট ক্লাব, বার হপিং, অস্থায়ী বান্ধবী নিয়ে ঘোরাঘুরি তার নিত্য অভ্যাস হতে লাগল। আবিরের মনে হতে লাগল, এই সবই তার বিদেশভ্রমণের একাংশ হিস্যা। ম্যাঞ্চেস্টারের কোম্পানিটি বেশ বড়। সারা ইউরোপে তাদের ব্যবসা ছড়ানো। সিঙ্গাপুরের, হংকং ও জাপানে তাদের প্রোডাক্ট এক্সপোর্ট হয়। আবিরের হাত দিয়ে ভারতে তাদের পদার্পণ একটি বিশাল ঘটনা হতে চলেছে বলেই সেই কোম্পানির পরিচালকদের আশা। এভাবেই আলোচনা শুরু হল। আবিরের কোম্পানির প্রোফাইল তাদের জানা, তারই ভিত্তিতে আবিরকে তারা অনেক খাতির করে আলোচনায় বসাল। কিছুক্ষণ সাধারণ আলাপ, ভারতের বাজার, কীভাবে আবিরের কোম্পানি কাজ করে সারা ভারতে, তার বিবরণ নিয়েই আলোচনা হল। তারা তাদের ব্যবসার উদ্দেশ্য কী, তাও বিস্তারিতভাবে বললেন এমডি মি. লায়ান। তার পর একদিন তাদের ল্যাব, কারখানা, কাঁচামালের গুদাম, ডেসপ্যাচ ডেস্কে সবই ঘুরে ঘুরে দেখল আবির। ছবির মতো কেমিক্যাল কারখানা। না দেখলে বিশ্বাসই হয় না, কোথাও কোনও নোংরা নেই, প্রায় শব্দহীন, পরিচ্ছন্ন কারখানা। লায়ান বললেন, আমাদের কাছে মানুষের হাইজিনই বিশেষ বিষয়। আমাদের কারখানা পরিবেশ দূষণমুক্ত। আইএসও সার্টিফায়েড। আবির মনে মনে ভাবল, ভাগ্যিস এরা তাদের কারখানা দেখতে যায়নি। তাদের আইএসও আছে, তবে পরিচ্ছন্নতা নেই। মনে মনে আবির বুঝেছিল এই কোম্পানির সঙ্গে গাঁটছড়া একবার করতে পারলে তার ডিভিশনের উন্নতি অনিবার্য। শ্যাম যাবার আগে বলে দিয়েছিলেন, তিনি একলপ্তে থোক টাকা দেবেন প্রযুক্তি বিনিময় বাবদ আর প্রোডাক্ট বিক্রির শতকরা দশ ভাগ দেবেন রয়ালটি। তাতেই রাজি হয়ে গেল কোম্পানিটি। শ্যাম আরও বলে দিয়েছিলেন, ওদের প্রোডাক্টের ফর্মুলা এবং কাঁচামালের সব খবর নিয়ে যেন আবির ফিরে আসে। তাতে তার দু’চারদিন বেশি লাগলেও শ্যাম কিছু মনে করবেন না। তার পর ফিরে এসে সেই কাঁচামালের ভারতীয় সাপ্লাইয়ার খোঁজ করতে হবে। আর যদি কিছু ইমপোর্ট করতে হয়, তবে তাদের সোর্সগুলো যেন নিয়ে আসে আবির। সবই ঠিকঠাক চলছিল। শেষদিন, যেদিন সব কথার, আলোচনার শেষ হবে, সেদিন মি. লায়ান বললেন, তিন মাসের মধ্যে তারা একবার ভারতে আসতে চান। দেখতে চান আবিরদের অফিস, কারখানা ও ল্যাবরেটরি। কথাটা যুক্তিসঙ্গত। বিয়ের আগে দু’পক্ষ যেমন পরস্পরকে দেখে নেয়, এটাও সেই। আর এই সময়ের মধ্যে আবিরদের সঙ্গে তারা একটু প্রাথমিক ব্যবসা করেতে চায়। শ্যামকে জানাল আবির। সেইমতো প্রাথমিক কিছু প্রোডাক্টের অর্ডার দিয়ে ফিরে এসেছিল আবির। তারপর একবছর কেটে গেছে, আর সেই কোম্পানি থেকে কেউ আসেনি। অনেক চিঠি, ফোন কল ব্যর্থ হয়েছে। শ্যাম বিরক্ত হয়ে আবিরকে আবার নতুন কোনও দেশের সন্ধান করতে বলেছিলেন শেষ মিটিংয়ে। এদিকে তার বিভাগ খারাপ করছিল সকলের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও। বদনাম হচ্ছিল আবিরের, প্রধান বলেই। শ্যামের মনে হয়েছিল, তাঁর ব্যবসার কাজে গিয়ে সে বিদেশি কোম্পানির ব্যবসা করে এসেছে। কোনও দিন সেই কোম্পানিতে চলে যাবে না তো?
৩
এই ঘটনা ঘটার আগে থেকেই শ্যাম গোপনে লক্ষ্য রাখছিলেন আবিরের। দেশে ও বিদেশে। এটা অনেকটাই লুকোচুরি খেলা। আবির জানতেই পারত না যে, তার পিছনে ঘুরে বেড়াচ্ছে শ্যামের ছায়া। তার সব কিছুর ওপর চোখ ছিল শ্যামের। আবার আবির খুঁজে পেল অস্ট্রেলিয়ার একটি কোম্পানির। এবার শ্যাম বললেন, জয়ন্ত সিনহাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে। ব্যাপারটা পচ্ছন্দ হল না আবিরের। উপায় নেই। চেয়ারম্যান চাইছেন! আবির তার সহকারী জয়ন্তকে নিয়ে পশ্চিম অস্টেলিয়ার পার্থ শহরে উপস্থিত হল এক বিকেলে। ছবির মতো শহর, পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট, মানুষের উষ্ণ অভ্যর্থনা আর দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ। পার্থ শহর থেকে কিছুটা দূরে কোম্পানির অফিস ও কারখানা। পাশেই ল্যাব। এবার যদি চুক্তি করতে পারে, আবির নিশ্চিত জানে, তার একটা প্রমোশন বাঁধা আছে শ্যাম মেহেরার কাছে। সে হয়ে উঠবে তরুণতম প্রেসিডেন্ট, ন্যানো অরগানিক কোম্পানির ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কোনও দিন ঘটেনি। আর বছর দু-এক পরেই অন্য কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদের জন্য লড়াই করতে নামবে। তার হাতের মধ্যে থাকবে তিনটি তির। বয়স, সাফল্য আর উদ্যম। প্রথমদিন একপ্রস্থ আলোচনার পর আবির জয়ন্তর ওপর ল্যাবের ব্যাপারে আলোচনার ভার দিয়ে বেরিয়ে গেল। কোথায় গেল কেউ জানে না। জয়ন্ত প্রতি প্রোডাক্টের নানা খুঁটিনাটি টেকনিক্যাল হেড পিটারের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করল, কোন কোন প্রোডাক্টের জন্য কোলাবোরেশন করবে। সব ঠিক হল কিন্তু এক লপ্তে যে টাকা চাইল, সে টাকা দিতে রাজি হলেন না শ্যাম। পিটার বলল, তার যে টাকা এই প্রোডাক্টের রিসার্চ ও ডেভেলপমেন্টের জন্য খরচ করেছে, তার তুলনায় তাদের দাবি খুবই সামান্য। আলোচনা অসমাপ্ত রেখে ফিরে এল আবির। অনেকটাই হতাশ হয়ে ফিরে সে শ্যামকে আপডেট করার সময় বলল, এই প্রস্তাবটা হাতছাড়া হলে আর কোনও সম্ভাবনা নেই। শ্যাম মৃদু হাসলেন। বললেন, আপনার কোনও উপায় না থাকলে, আমার আছে। আমি একটা ব্যবসার লস অন্য ব্যবসা দিয়ে উসুল করতে পারি। আপনি কি সেটা জানেন? বলে চোয়ালটা শক্ত করেছিলেন শ্যাম। খুব শান্ত মিষ্টভাষী শ্যাম, জোরে কথা বলেন না।
জানি। বলে চলে এসেছিল আবির।
৪
কলকাতা থেকে ফিরে এসেছে আবির। শোভনা বলল, স্যর, ভাউচারগুলো দিন, এক্সপেন্স স্টেটমেন্টটা পাঠিয়ে দিই। ট্যুরের দশদিনের মধ্যে স্টেটমেন্ট জমা দিতে হয় চেয়ারম্যানের অফিসে। দেরি হয়ে যাচ্ছে। আবির বলল, দিচ্ছি।
এর মধ্যে শ্যাম জেনে গেছেন চারদিন কলকাতায় কাটিয়েছে আবির। দু’দিন অফিসে এসেছে। একদিন সে কলকাতার বাইরে গেছে, অফিসের ভাড়া করা গাড়িতে। সঙ্গে ব্রাঞ্চের কেউ ছিল না। ছিল এক বান্ধবী। গাড়িটি গিয়েছিল একটি পাঁচতারা হোটেলে। একরাতের বুকিং ছিল। পরে ফিরে এসেছিল কলকাতায়। রাতের ফ্ল্যাইট ধরে দিল্লি।
দশদিন পেরিয়ে যাবার পর একদিন ভাউচারগুলো শোভনার হাতে দিয়ে একটা মিটিংয়ে যাচ্ছিল আবির। মাঝপথে একটা ফোন এল শ্যামের সেক্রেটারির। স্যর এখুনি ডাকছেন। যেখানেই থাকুন, চলে আসুন। আর্জেন্ট।
মিটিংয়ে যাবার মধ্যপথ থেকে আবির ফিরে এসে শ্যামের অফিসে এসে পৌঁছল। তখন ঘড়িতে তিনটে। শ্যামের ঘরে তখন কেউ নেই। আবিরকে দেখেই তাকে অন্য দিনের মতো বসতে বলার প্রয়োজন বোধ করলেন না শ্যাম। বললেন, আপনার সার্ভিস আর আমাদের দরকার নেই। আজ চারটের মধ্যে অফিস থেকে বেরিয়ে যাবেন। আমার অ্যাকাউন্টসকে বলা আছে, সাতদিনের মধ্যে আপনার হিসেব বুঝিয়ে দেবে। আর তিনদিনের মাথায় আপনার ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহরকে দায়িত্ব হস্তান্তর করে দেবেন। আর সেদিনই আপনার গাড়িও ফেরত দিয়ে দেবেন। হকচকিত হয়ে আবির বলল, স্যর, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
আবিরের কথাটা শেষ হল না। বেল বাজিয়ে পরের ভিজিটারকে ডেকে নিলেন শ্যাম মেহেরা।
আবির ফিরে এল নিজের চেম্বারের। বিভাগের পদস্থ কলিগদের ডাকল। বলল, আমি আর কাল থেকে আসছি না। আমার সময় শেষ। মি. জোহর তখন অফিসে নেই। তাকে ফোনে কথাটা বলতেই অন্য দিক থেকে জোহর বলল, তাকে চেয়ারম্যানের অফিস থেকে জানানোও হয়েছে।
চেম্বারে সব কিছু পড়ে রইল। হ্যাঙ্গারে কোর্টটা ঝুলছিল, সেটি গায়ে চড়িয়ে নিল আবির। ঠিক কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। বাড়িতে খবরটা দিতে ইচ্ছে করল না। খালি ছোট মেয়েটার মুখটা মনে পড়ল। শেষে ল্যাপটপটা ব্যাগে রেখে চেম্বার থেকে ধীরে বেরিয়ে পড়ল আবির। রিসেপশনের সামনে দিয়ে বাইরে যাবার রাস্তা। আবির বেরিয়ে যাবে, উর্দিপরা সিকিউরিটির লোকটা মাথা নামিয়ে বলল, স্যর, কাঁধের ব্যাগে ল্যাপটপটা রেখে যান।
অবাক হয়ে তাকাল আবির। তাঁর চোখের ভাষাটি সিকিউরিটি বুঝেতে পেরেই বলল, সরি স্যর, আদেশ আছে আপনাকে বলতে, ওটা এখানে রেখে যাবার। বলে দিয়েছেন স্যর। আমি এক্ষুনি বড় সাহেবের অফিসে পাঠিয়ে দেব।
আবিরের বুঝতে আর বাকি রইল না। ব্যাগটি রিসেপশনে নামিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে গেল সে।
চিত্রণ: সৌজন্য চক্রবর্তী






