‘গ্রেট মাইন্ডস থিঙ্ক অ্যালাইক’
ডারউইন ও ওয়ালেসের বিস্ময়কর কাহিনি
সি দ্ধা র্থ ম জু ম দা র
সকালের ডাকেই এসে পৌঁছেছে একটি চিঠি। চিঠিটি পড়ে মাঝবয়সি, কাঁচাপাকা চুলের মানুষটি যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। মুখে স্পষ্ট উদ্বেগ ও হতাশার ছায়া। কিছুক্ষণ পর চিঠিটি হাতে নিয়ে তিনি অস্থির পায়ে ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পায়চারি করতে শুরু করলেন।
সময়টা ১৮৫৮ সাল। চিঠির প্রাপক তখনকার খ্যাতনামা প্রকৃতিবিদ চার্লস ডারউইন (১৮০৯–১৮৮২)। আর চিঠির প্রেরক অ্যালফ্রেড রাসেল ওয়ালেস (১৮২৩–১৯১৩), একজন প্রকৃতিবিদ। ডারউইনের নাম আজ সর্বজনবিদিত, কিন্তু ওয়ালেসের নাম অনেকের কাছেই প্রায় অচেনা। অথচ জীবজগতের বিবর্তন-ইতিহাসে তাঁর অবদান কোনও অংশে কম নয়।
ডারউইনের মতো ওয়ালেসও দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় বেরিয়েছিলেন। ১৮৫৪ থেকে ১৮৬২— টানা আট বছর তিনি সিঙ্গাপুর, মালয় দ্বীপপুঞ্জ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অরণ্য ও অসংখ্য দ্বীপ ঘুরে বেড়িয়েছেন। তবে তাঁর অভিযানের উদ্দেশ্য ডারউইনের থেকে ভিন্ন ছিল। ওয়ালেসের প্রধান লক্ষ্য ছিল— দুর্লভ প্রাণী, উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক নমুনা সংগ্রহ করা। সেই সংগ্রহের একটি অংশ তিনি নিজের গবেষণার জন্য রাখতেন, আর ডুপ্লিকেট নমুনাগুলি বিক্রি করতেন যাদুঘর ও ব্যক্তিগত সংগ্রাহকদের কাছে। এইভাবেই চলত তাঁর গবেষণার অর্থসংস্থান।
চিঠিটি লেখা হয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার এক প্রত্যন্ত দ্বীপ থেকে। সেই চিঠির বিষয়বস্তুই ডারউইনকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল এবং বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মোড় এনে দিয়েছিল। ওয়ালেসের পরিচয়ে আমরা অবশ্যই ফিরব, তবে তার আগে জানা দরকার চার্লস ডারউইনের সেই দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক পরিক্রমার কাহিনি, যার পরিণতিতে জন্ম নিয়েছিল বিবর্তনবাদের অন্যতম যুগান্তকারী ধারণা।
‘এইচএমএস বিগ্ল’ নামের তিন মাস্তুলের পালতোলা বিখ্যাত দোতলা জাহাজে চেপে মাত্র বাইশ বছর বয়সে সাত সমুদ্র ও বারো দ্বীপ পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়েন তরুণ ডারউইন। জাহাজের অধিকর্তা ও সুদক্ষ ক্যাপ্টেন ফিটজ্বয়, আবহাওয়ার পূর্বাভাস নির্ধারণের পথিকৃৎ। তারিখটি ছিল ২৭ ডিসেম্বর, ১৮৩১ সাল। টানা প্রায় পাঁচ বছর তাঁরা দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল, গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ, অস্ট্রেলিয়া, তাহিতি, আফ্রিকা ঘুরে আবার দক্ষিণ আমেরিকা ছুঁয়ে ফিরে আসেন ১৮৩৬ সালে। এই ভ্রমণপথে নানা দ্বীপ, অরণ্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করেন। পাঁচ বছর ধরে এই অভিযানে তিনি সংগ্রহ করেন অসংখ্য উদ্ভিদ, প্রাণী, বিভিন্ন ধরনের পাথর, পোকামাকড়, জীবাশ্ম ইত্যাদি। কিন্তু তাঁর প্রকৃত অর্জন ছিল শুধু নমুনার সংগ্রহ নয়; ছিল প্রকৃতিকে নতুন চোখে দেখা। বিভিন্ন অঞ্চলে একই ধরনের প্রাণীর সূক্ষ্ম পার্থক্য, দ্বীপভেদে প্রজাতির বৈচিত্র, জীবাশ্ম ও বর্তমান প্রাণীর আশ্চর্য মিল— এ-সবই তাঁর মনে একের পর এক প্রশ্নের জন্ম দেয়। পৃথিবীতে এত বিচিত্র জীবের উদ্ভব কীভাবে? তারা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকে থাকে কোন প্রক্রিয়ায়? প্রজাতি কি অপরিবর্তনীয়, নাকি সময়ের সঙ্গে বদলে যায়? এইসব প্রশ্নই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে তাঁর একমাত্র ধ্যানজ্ঞান।
ইংল্যান্ডে যখন ফিরে আসেন ডারউইনের বয়স তখন সাতাশ। সঙ্গে বিপুল নমুনা সম্পদের ভাণ্ডার, অমূল্য পর্যবেক্ষণ এবং অসংখ্য প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা। পরবর্তী কয়েক বছর ধরে সংগৃহীত নমুনা ও তথ্যের বিশ্লেষণ করার কাজে ডুবে থাকেন তিনি। ১৮৩৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ভ্রমণ বিবরণ ‘এ ন্যাচারালিস্ট’স ভয়েজ’, যা পরে দ্য ভয়েজ অব বিগ্ল নামে খ্যাতি লাভ করে। কিন্তু সেই সময়েও তিনি প্রকাশ্যে বিবর্তন সম্পর্কে নিজের ধারণা ঘোষণা বা প্রকাশ করেননি। তবে ১৮৪২ সালে একটি সংক্ষিপ্ত খসড়া এবং ১৮৪৪ সালে তারই বিস্তৃত রূপ লেখেন এবং এই বিষয়টি গোপনই রেখেছিলেন। সেই পাণ্ডুলিপিই ছিল পরবর্তী সময়ে প্রকাশিতব্য যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘অন দ্য অরিজিন অফ স্পিসিস’-এর বীজ।
তবে সেই বই প্রকাশ পেতে তখনও বাকি আরও পনেরো বছর। ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত সেই গ্রন্থই জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক অধ্যায়ের সূচনা করবে।
কিন্তু এতদিন ধরে যত্নে লালিত সেই তত্ত্ব প্রকাশের আগেই ১৮৫৮ সালের এক সকাল ডারউইনের জীবনে নিয়ে এল এক অপ্রত্যাশিত ঝড়। ইন্দোনেশিয়ার টারনেট দ্বীপ থেকে অ্যালফ্রেড রাসেল ওয়ালেসের পাঠানো একটি চিঠি যেন মুহূর্তে ওলটপালট করে দিল তাঁর দীর্ঘ কুড়ি বছরের সাধনা।
এবার প্রশ্ন, ওয়ালেসের সেই চিঠি ডারউইনকে এতটা বিচলিত করেছিল কেন? এমন কী লেখা ছিল সেখানে, যা পড়ে দীর্ঘদিনের আত্মবিশ্বাসী বিজ্ঞানীও মুহূর্তের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন?
আগেই বলেছি, চিঠিটি এসেছিল ইন্দোনেশিয়ার মালয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে, যেখানে তখন সমুদ্র অভিযানে ব্যস্ত ছিলেন অ্যালফ্রেড রাসেল ওয়ালেস। দীর্ঘদিন ধরে দ্বীপে দ্বীপে ঘুরে তিনি অসংখ্য উদ্ভিদ, প্রাণী ও পোকামাকড় সংগ্রহ করেছিলেন। সেই বিপুল পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ থেকে তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এমন এক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, যা ডারউইন গত প্রায় দুই দশক ধরে নিজের গবেষণায় গোপনে লালন করে আসছিলেন— প্রজাতির বিবর্তন এবং তার চালিকাশক্তি ‘ন্যাচারাল সিলেকশন’ তথা ‘সারভাইবেল অফ দ্য ফিটেস্ট’।
ওয়ালেস তাঁর এই ধারণাগুলি একটি গবেষণাপত্রে সংক্ষেপে লিখে ডারউইনের কাছে পাঠান। শুধু মতামত জানার জন্যই নয়, তিনি অনুরোধ করেন, লেখাটি পড়ে যদি ডারউইনের উপযুক্ত মনে হয়, তবে সেটি যেন তিনি প্রখ্যাত ভূতাত্ত্বিক স্যার চার্লস লায়েলের হাতে পৌঁছে দেন।
কিন্তু কে এই চার্লস লায়েল? উনিশ শতকের ভূবিজ্ঞানে লায়েল ছিলেন এক যুগান্তকারী ব্যক্তিত্ব। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘প্রিন্সিপলস অফ জিয়োলজি’ পৃথিবীকে দেখার ক্ষেত্রে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দেয়। তাঁর আগে অনেকেই মনে করতেন, পৃথিবীর ইতিহাস মাত্র কয়েক হাজার বছরের। লায়েল যুক্তি ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে দেখান, পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন হয়ে চলেছে অত্যন্ত ধীরগতিতে, বিপুল দীর্ঘ সময় ধরে। সময়ের এই ধারণাই পরবর্তীকালে বিবর্তনবাদের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। কারণ, জীবজগতের অতীব ধীর পরিবর্তনের জন্যও প্রয়োজন ছিল বিপুল সময়ের বিস্তার।
ডারউইন ১৮৩১ সালে এইচএমএস বিগ্ল-এ যাত্রা শুরুর আগেই ‘প্রিন্সিপলস অফ জিয়োলজি’-এর প্রথম খণ্ড হাতে পান। বইটি তাঁকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে সমুদ্রযাত্রার সময় পরবর্তী খণ্ডগুলিও সংগ্রহ করে পড়েন। বলা যায়, বিগ্লের ডেকে দাঁড়িয়ে যে তরুণ প্রকৃতিবিদ প্রকৃতিকে নতুন চোখে দেখতে শিখেছিলেন, সেই দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে লায়েলের বইয়ের ভূমিকা ছিল অসামান্য।
এই অনুচ্ছেদের শেষে পাঠক স্বাভাবিকভাবেই বুঝতে পারেন— ডারউইনের উদ্বেগের কারণ কেবল একটি চিঠি নয়; বরং সেই চিঠিতে তিনি যেন নিজেরই বহু বছরের অপ্রকাশিত চিন্তার প্রতিধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন। এ কারণেই ইতিহাস এই ঘটনাকে প্রায়ই একটি প্রবাদে সংক্ষেপে প্রকাশ করে— ‘গ্রেট মাইন্ডস থিংক অ্যালাইক’।
লায়েলের ‘প্রিন্সিপেলস অব জিয়োলজি’ বই পড়ে ডারউইনের বৈজ্ঞানিক ভাবনা পুষ্ট ও ভীষণ প্রভাবিত হয়েছিল এবং প্রাণীদের বিবর্তনের ইতিহাস সম্পর্কিত ব্যাখ্যা দেওয়া সহজ হয়ে যায় ডারউইনের কাছে। এটা ঠিক যে, ওয়ালেস জানতেন না যে বরিষ্ঠ প্রকৃতিবিদ ডারউইনও ওয়ালেসের মতন একই রকম ভেবেছেন এবং অনুরূপ তত্ত্বের উপস্থাপনা করার ব্যাপারে। আসলে, ওয়ালেস বা ডারউইন দু’জনের কেউই কারও কাজ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন না।
ওয়ালেসের চিঠি পাওয়ার পরে প্রথম ধাক্কা সামলে নিয়ে, এতবছর ধরে তাঁর সমুদ্র অভিযানের সিদ্ধান্ত, তা ফেলে রাখা মারাত্মক ভুল হয়েছে। আর ফেলে রাখা যাবে না, কেন না ওয়ালেসের যে ভাবনা আর সিদ্ধান্ত নিয়ে এই গবেষণাপত্র লিখেছেন, ডারউইনও তো একই পথে ভেবেছেন। ওয়ালেম যদি আগে গবেষণাপত্র প্রকাশ করে দেন, তা হলে তাঁর এত বছরের ভাবনা, বিশ্লেষণ, গবেষণা সব কিছু বিফলে যাবে। পরের দিন থেকেই তাঁর খসড়া গবেষণাপত্র চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার কাজে নেমে পড়লেন। গবেষণাপত্র পাণ্ডুলিপি তৈরি হলে পরের বছরেই (১৮৫৯ সালে) ‘অরিজিন অব স্পিসিস’ প্রকাশ করেন ডারউইন, তাড়াহুড়ো করে। বলা ভাল যে, প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছেন ওয়ালেসের পাঠানো গবেষণাপত্রটি পড়ে। সাম্প্রতিককালে ডারউইন এবং ওয়ালেসের সমস্ত চিঠিপত্র ইত্যাদি খুঁটিয়ে পড়ে প্রকাশিত হয়েছে একাধিক রচনা। সে-সব থেকে উঠে এসেছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রশ্ন উঠেছে নৈতিকতারও।
লায়েলের প্রিন্সিপেলস অব জিয়োলজি ডারউইনের বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পৃথিবীর ইতিহাস যে অপরিসীম দীর্ঘ, সেই উপলব্ধি তাঁকে জীবজগতের ধীর, ক্রমবিবর্তিত পরিবর্তনের ব্যাখ্যা খুঁজে পেতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। পরে বিবর্তন-তত্ত্ব নির্মাণে এই ভাবনাই তাঁর অন্যতম বৌদ্ধিক ভিত্তি হয়ে ওঠে।
অন্য দিকে, ওয়ালেসের কোনও ধারণাই ছিল না যে, ইংল্যান্ডে বসে ডারউইনও বহু বছর ধরে প্রায় একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তেমনই ডারউইনও জানতেন না, মালয় দ্বীপপুঞ্জের জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো এক তরুণ প্রকৃতিবিদ স্বাধীনভাবে তাঁরই মতো একটি তত্ত্ব নির্মাণ করে ফেলেছেন। দু’জনের গবেষণার পথ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা, কিন্তু গন্তব্য আশ্চর্যজনকভাবে এক। বিজ্ঞান-ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল— দুই গবেষক, পরস্পরের কাজ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকে, একই সময়ে একই মৌলিক ধারণায় পৌঁছে গিয়েছেন।
ওয়ালেসের চিঠি পড়ে প্রথম ধাক্কা সামলে ডারউইন বুঝতে পারলেন, এত বছর ধরে নিজের তত্ত্ব প্রকাশ না করে অপেক্ষা করাটা হয়তো তাঁর বড় ভুল ছিল। প্রায় দুই দশকের অক্লান্ত পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ ও চিন্তার ফল যদি অন্য কারও নামে প্রথম প্রকাশিত হয়, তবে তাঁর দীর্ঘ সাধনার স্বীকৃতি প্রশ্নের মুখে পড়বে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এটাও জানতেন, ওয়ালেসের ভাবনা ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং তার সমান মর্যাদা প্রাপ্য। এখানেই ডারউইনের সামনে উপস্থিত হয় এক কঠিন বৈজ্ঞানিক ও নৈতিক সংকট।
শেষ পর্যন্ত চার্লস লায়েল এবং উদ্ভিদবিদ জোসেফ ডালটন হুকারের উদ্যোগে ১৮৫৮ সালের ১ জুলাই লন্ডনের লিনিয়ান সোসাইটিতে ডারউইন ও ওয়ালেসের গবেষণালব্ধ ধারণা যৌথভাবে উপস্থাপিত হয়। এই ঘটনার পর ডারউইন আর দেরি করেননি। বহুদিনের অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপিকে সংক্ষিপ্ত করে দ্রুত শেষ করেন এবং পরের বছর, ১৮৫৯ সালের নভেম্বরে প্রকাশ করেন ‘অন দ্য অরিজিন অব স্পিসিস’— যে গ্রন্থ আধুনিক জীববিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে ওঠে।
ডারউইন ও ওয়ালেসের পারস্পরিক চিঠিপত্র, দিনলিপি এবং সমকালীন দলিলপত্রের নিবিড় বিশ্লেষণ থেকে ইতিহাসের এই অধ্যায়কে নতুন করে দেখা হচ্ছে আজ। তাঁদের সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অগ্রাধিকারের প্রশ্ন এবং বৈজ্ঞানিক নৈতিকতা নিয়ে এখনও গবেষকদের মধ্যে আলোচনা ও বিতর্ক চলছে। এই কারণেই ডারউইন–ওয়ালেস পর্ব কেবল একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ইতিহাস নয়; এটি একই সঙ্গে মানবিক সততা, সহমর্যাদা এবং বিজ্ঞানের নৈতিকতার এক অনন্য দলিল।
তা হলে প্রশ্ন থেকেই যায়— বিবর্তনবাদের প্রকৃত জনক কে? চার্লস ডারউইন, না অ্যালফ্রেড রাসেল ওয়ালেস? নাকি এই আবিষ্কারের ইতিহাস আমাদের ‘একক নায়ক’-এর ধারণাটিকেই নতুন করে ভাবতে শেখায়?
ধরা যাক, ওয়ালেস যদি তাঁর গবেষণাপত্রটি ডারউইনের কাছে না পাঠিয়ে সরাসরি কোনও বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশের জন্য পাঠাতেন? তা হলে সম্ভবত বিবর্তনের তত্ত্বের প্রথম প্রকাশক হিসেবে ইতিহাসে তাঁরই নাম লেখা থাকত। সেক্ষেত্রে আজ হয়তো ‘বিবর্তনবাদের জনক’ অভিধাটিও ওয়ালেসের সঙ্গেই জুড়ে যেত।
অন্য দিকে প্রশ্ন ওঠে, ডারউইন কেন তাঁর যুগান্তকারী ধারণাটি প্রায় কুড়ি বছর ধরে প্রকাশ না করে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিলেন? এর কারণ কি ছিল চার্চের রক্ষণশীল ধর্মগুরুদের সম্ভাব্য বিরোধিতা? নাকি তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছাড়া তাঁর তত্ত্ব দুর্বল বলে বিবেচিত হবে? সম্ভবত দু’টিরই কিছুটা সত্যতা ছিল। ডারউইনের স্বভাবই ছিল অত্যন্ত সতর্ক; তিনি কোনও সিদ্ধান্ত প্রকাশ করার আগে তার পক্ষে যত বেশি সম্ভব প্রমাণ সংগ্রহ করতে চাইতেন। তাই তাঁর দীর্ঘ নীরবতার পেছনে ব্যক্তিগত দ্বিধা, বৈজ্ঞানিক সতর্কতা এবং সামাজিক বাস্তবতা— সবই কমবেশি কাজ করেছিল।
তবে এই ঘটনাকে ঘিরে বিতর্ক আজও শেষ হয়নি। ইতিহাসবিদদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, ওয়ালেসের চিঠি হাতে পাওয়ার পর ডারউইন কেন সেটি সঙ্গে সঙ্গে চার্লস লায়েলের কাছে পাঠালেন না? কেন কয়েক দিন অপেক্ষা করেছিলেন? এই সামান্য সময়ের ব্যবধান কি নিছক ঘটনাচক্র, নাকি তার অন্য কোনও তাৎপর্য ছিল? এর কোনও চূড়ান্ত উত্তর আজও মেলেনি। তবে ডারউইন, ওয়ালেস, লায়েল এবং জোসেফ ডালটন হুকারের পারস্পরিক চিঠিপত্র ও দলিলপত্র নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফলে দেড়শো বছরেরও বেশি সময় পরে এসেও ইতিহাসের এই অধ্যায় গবেষকদের কাছে সমান আকর্ষণীয় ও আলোচনাযোগ্য রয়ে গেছে।
১৮৫৯ সালের ২৪ নভেম্বর প্রকাশিত হল ‘অন দ্য অরিজিন অব স্পিসিস বাই মিন্স অফ ন্যাচারাল সিলেকশন’। এই বই শুধু জীববিজ্ঞানের ইতিহাসেই নয়, মানুষের নিজের সম্পর্কে ধারণাকেও আমূল বদলে দেয়। ডারউইন এই বইয়ে ব্যাখ্যা দিলেন, জীবজগতের বৈচিত্রকে বোঝার জন্য অলৌকিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই; কোটি কোটি বছরের ক্রমবিবর্তন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের মধ্য দিয়েই তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সম্ভব। প্রকাশের প্রথম দিনেই বইটির প্রথম সংস্করণের সব কপি বিক্রি হয়ে যায়।
কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও প্রশ্নটি থেকেই যায়— ওয়ালেস কোথায়? যাঁর গবেষণাপত্র ডারউইনকে আর দেরি না করে নিজের বহু বছরের গবেষণা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল, ইতিহাসে তাঁর স্থান কী?
ডারউইন এবং ওয়ালেস আমাদের শুধু বিবর্তনের তত্ত্ব দেননি। তাঁরা শিখিয়েছেন বিজ্ঞানের এক মৌলিক শিক্ষা— বিজ্ঞানে ব্যক্তির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে প্রমাণ, আর কৃতিত্বের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে সত্যের অনুসন্ধান। সত্য কোনও একজন ব্যক্তির সম্পত্তি নয়; ভিন্ন ভিন্ন পথে চলেও একাধিক মানুষ তার কাছে পৌঁছতে পারেন। তাই ডারউইন ও ওয়ালেসের কাহিনি কেবল দুই বিজ্ঞানীর গল্প নয়; এটি বৈজ্ঞানিক সততা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং মানবজিজ্ঞাসার এক অসাধারণ ইতিহাস।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস ডারউইনকেই বেশি মনে রেখেছে। কিন্তু সেই ইতিহাসের প্রান্তে অ্যালফ্রেড রাসেল ওয়ালেসের নামও সমান শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হওয়া উচিত। কারণ বিবর্তনের ধারণাটি কোনও একক প্রতিভার আকস্মিক আবিষ্কার ছিল না; সময়ের পরিপক্বতা, দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা— এই তিনের সম্মিলিত ফসল ছিল বিবর্তন-তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক রূপায়ণ। পৃথিবীর দুই প্রান্তে, পরস্পরের কাজ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকে, দুই প্রকৃতিবিদ একই সত্যের কাছে পৌঁছেছিলেন। বিজ্ঞানে ব্যক্তির চেয়েও বড় হয়ে ওঠে সত্য, আর প্রতিযোগিতার চেয়েও মূল্যবান হয়ে ওঠে জ্ঞানের অগ্রযাত্রা। সেই কারণেই ডারউইন ও ওয়ালেসের কাহিনি আজও বিজ্ঞানের ইতিহাসে শুধু একটি আবিষ্কারের গল্প নয়; এটি বৌদ্ধিক সততা, সৌজন্য এবং মানবসভ্যতার যৌথ প্রজ্ঞার এক অনন্য দলিল।
ডারউইনের মৃত্যুর পর এক বক্তৃতায় ওয়ালেসের বক্তব্যের সারমর্ম ছিল— ডারউইনের তুলনায় তাঁর নিজের অবদান অনেক কম। অন্য দিকে, ডারউইন তাঁর আত্মজীবনীতে ও বিভিন্ন চিঠিতে ওয়ালেসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন। এই পারস্পরিক উদারতা বিজ্ঞান-ইতিহাসের এক বিরল দৃষ্টান্ত। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, তাঁদের মধ্যে কোনও তিক্ত ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব গড়ে ওঠেনি। বরং পরস্পরের অবদানের প্রতি দু’জনেই শেষ পর্যন্ত অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা বজায় রেখেছিলেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন উদারতার নজির বিরল।
এই কারণেই ডারউইন ও ওয়ালেসের কাহিনি শুধু একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ইতিহাস নয়; এটি এমন এক বিরল মুহূর্তের ইতিহাস, যখন পৃথিবীর দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে দুই অনুসন্ধিৎসু মন একই সত্যের কাছে পৌঁছেছিল। সম্ভবত এ কারণেই প্রবাদটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ‘গ্রেট মাইন্ডস থিঙ্ক অ্যালাইক’।
তথ্যসূত্র
১. Darwin, Charles R. & Wallace, Alfred Russel (1858).
“On the Tendency of Species to form Varieties; and on the Perpetuation of Varieties and Species by Natural Means of Selection.” Journal of the Proceedings of the Linnean Society of London, Zoology, 3, pp. 45–62.
২. Darwin Correspondence Project, University of Cambridge.
Darwin and Wallace Correspondence, 1857–1858.
বিশেষত Charles Darwin-এর Charles Lyell-কে লেখা 18 June 1858-এর চিঠি এবং Alfred Russel Wallace-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পত্রাবলি।
৩. Wallace, Alfred Russel (1903).
“The Dawn of a Great Discovery: My Relations with Darwin in Reference to the Theory of Natural Selection.”
৪. Brooks, John Langdon (1984).
Just Before the Origin: Alfred Russel Wallace’s Theory of Evolution. New York: Columbia University Press.
৫. Smith, Charles H. & Beccaloni, George (eds.) (2008).
Natural Selection and Beyond: The Intellectual Legacy of Alfred Russel Wallace. Oxford: Oxford University Press.
৬. Davies, Roy (2013).
“1 July 1858: What Wallace Knew; What Lyell Thought He Knew; What Both He and Hooker Took on Trust; and What Charles Darwin Never Told Them.” Biological Journal of the Linnean Society, 109(3), pp. 725–736. doi:10.1111/bij.12081.
৭. Darwin, Charles R. (1859).
On the Origin of Species by Means of Natural Selection, or the Preservation of Favoured Races in the Struggle for Life. London: John Murray. First edition, first issue.
চিত্র: গুগল






