মায়ের নাম
শ তা ব্দী দা শ
সুহাসিনী ভারি অপ্রস্তুতে পড়লেন। দুই ছেলে আপিসে বেরিয়েছে। কর্তা দুপুরের ঘুম দিচ্ছেন। এ ব্যাপারটা কীভাবে যে একা সামলাবেন, বুঝে উঠতে পারলেন না৷ সমুখে তাঁর মেয়েটিও হতবাক। ঘেমেনেয়ে একসা হয়ে আছে সে। কাঠফাটা গরমে মেয়েমানুষের বেরোনো ঠিক নয় মোটে— একথা সুহাসিনী তাঁর বড় নাতনিকে বলতেন। রোদে রং জ্বলে যায়। দুধরঙা সে নাতনির এখন বিয়ে হয়ে গেছে। মেয়েমানুষের রং জ্বলে যাওয়া মোটে ভাল কথা নয়, বিশেষত বিয়ের আগে। এ-মেয়েটির বিয়ে হয়েছে কি না কে জানে! বিয়ের বয়স যে হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। দু’পাড়া পরে ওর বাড়ি। সিঁথি দেখে আজকাল আর বোঝার উপায় নেই। বাড়িতে কে কে আছে, জিজ্ঞাসা করতে মন চায় সুহাসিনীর। মেয়েটা সুহাসিনীর বড় নাতনির বয়সি শুধু নয়, নাতনির চেনাও বটে। মেয়ে ইস্কুলে নাতনি ইপ্সিতার চেয়ে দু’বছরের সিনিয়র ছিল৷ ইপ্সিতা এখন বরের সঙ্গে দিল্লিতে থাকে৷ সে-ই খবর দিয়েছিল, ‘ঊর্মিদির তোমাদের ওখানে ডিউটি পড়েছে। আমার চেনাশোনা৷ আমি বলে দেব। কোনও অসুবিধে হবে না।’ অসুবিধে হয়নি আর কারও। শুধু সুহাসিনী আটকে গেলেন।
আটকে গেলেন মায়ের নামে। মায়ের নাম মানে, ওদের চাই গোটাগুটি একটা নাম। কখনও যে তা কাজে লাগবে, এ ভাবা যায়নি৷ যে ইস্কুলে ফোর ক্লাস পর্যন্ত পড়েছিলেন সুহাসিনী, সেখানেও লাগেনি সম্ভবত। শুধু বাবার নামেই কাজ চলে যায়নি কি? অন্তত সুহাসিনীর তো মনে হয়, গিয়েছিল। কিংবা বাবা হয়তো লিখেছিলেন মায়ের নাম। কে জানে! কী ছিল সেই গোটা নামখানি, যা লিখেছিলেন বাবা, যদি লিখে থাকেন, সে তো আর বাবাকে জিজ্ঞেস করার উপায় নেই! সুহাসিনী সত্তরে পড়লেন। তাঁর বাবা গত হয়েছেন চৌত্রিশ বছর আগে।
এদের আক্কেল বলিহারি! অ্যাদ্দিন ধরে বলা হল— আজ তো নয়, সেই ছোটবেলা থেকেই সুহাসিনী শুনছেন— নাম বদলে, ধাম বদলে, পদবি বদলে শ্বশুরবাড়ির পরিবারটির সঙ্গে একাত্ম হতে হবে তোমায়। সুহাসিনী তেমনটাই করেছেন। উনিশ বছর বয়সে এ-বাড়ি আসা। কালনায় বাপের বাড়িতে কম করে গত পনেরো বছর আর যাওয়া-আসা নেই। বাবার মৃত্যুর পর থেকে কমে আসছিল যাতায়াত। আর মা তো সেই কবেই গত হয়েছেন! সুহাসিনীর তখন দশ বছর বয়স। একান্নবর্তীতে জ্যাঠাইমা-কাকিমাদের কোলেপিঠে ন’টি বছর বেড়েছেন তিনি। মেয়েমানুষের বাড় কলাগাছের মতো। ষোলো থেকেই দেখাদেখি শুরু হয়েছিল। গায়ের রং, উচ্চতা, বংশ, ঠিকুজি-কুষ্টি, যৌতুক— ঝক্কি তো কম নয়! সব খাপে খাপ মিলতে মিলতে তিনি উনিশ হলেন। সেই যে এ-বাড়িতে এলেন, এ-বাড়িকেই আপন বলে জেনেছেন৷ একটিই দাদা তাঁর, মায়ের পেটের। খুড়তুতো-জেঠতুতো দাদা-দিদি সব মিলে বারোজনা অবশ্য। তা সেই মায়ের পেটের দাদাও আজ বছর দুই স্বর্গে গেছেন। দাদার মেয়ের বিয়েতেই শেষবার ও-বাড়ি যাওয়া।
শ্বশুরমশাইয়ের এই পুরনো আমলের ভিটেবাড়িটি মানিকতলায়। এ-বাড়ির কড়িবরগা মুখস্থ হয়ে গেছে ঝুল ঝাড়তে ঝাড়তে। এ বাড়ির চারপাশে ঘুরে বেড়ায় যে কাক আর চড়ুই, তারা সুহাসিনীর ছড়ানো দানাতেই নিত্য পেট ভরায়। ঠাকুরের জীব। সুহাসিনীর পুজোর সময় হয়ে এল। হাতে তাঁর বাতাসার কৌটো। আজ হঠাৎ ফর্মটিতে মরতে মায়ের নামের খোঁজ পড়ল কেন, এ-কথা ভাবতে ভাবতে সুহাসিনী কৌটোটা ঘোরান দুই হাতে৷ পারকাশনের মতো ছন্দময় ধ্বনি।
‘তুমি বসবে একটু মা? ঘেমেনেয়ে এলে, একটু জল খাও। দু’টি বাতাসা দিই? পাখা ছেড়ে দিই? আমি এক্ষুনি পুজো সেরে আসছি। আমার গোপাল আবার না খেয়ে আছে গো।’
মেয়েটি ভ্রু কুঁচকায়। বিরক্ত যে হয়, তা লুকোয় না৷ বলে, ‘আপনি এর গুরুত্ব বুঝতে পারছেন না? নথি না পেলে আপনার ফর্ম জমা পড়বে না৷ আপনি একটা ডেট মিস করেছেন। আর মাত্র দু’দিন পর পরের ডেটটা। এই কাজটা তো করতেই হবে! আপনারই ভালর জন্য। সবার ভালর জন্য। আপনাদের গোটা বাড়িটার ফর্ম জমা পড়েনি। পেন্ডিং রেখেছি শুধু আপনার এই মায়ের নাম কলামটার জন্য। প্লিজ!’
বিষয়টা যে জরুরি, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই সুহাসিনীর। বড়খোকা আর ছোটখোকার আলোচনা শুনেছেন তিনি। ভোটার তালিকা নিবিড়ভাবে ঝাড়াইবাছাই হচ্ছে। তা হোক না! সুহাসিনী আর কবে বাধ সেধেছেন? এ অঞ্চলের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম ছিল চিরকাল। আগে কবে যেন ঝাড়াইবাছাই হয়েছিল, সে তালিকা থেকেও তিনি বাদ যাননি। চিরকাল বরের নামের তলাতেই তাঁর নামটি জ্বলজ্বল করে৷ শুভেন্দুশেখর দত্ত। সুহাসিনী দত্ত। তারপর ছেলেদের নাম। তাদের বৌবাচ্চাদের নাম। বাড়ির মেয়েরা এক-এক করে কাটা পড়ে বিয়ের পর। নতুন জায়গায় তাদের নাম ওঠে। এ তো চিরকালই হয়ে এসেছে। কখনও তাঁর মায়ের নাম তো চাওয়া হয়নি! ভোটার কার্ডে তো বাবার নামও নেই৷ তিনি ‘ওয়াইফ অফ শুভেন্দুশেখর দত্ত।’ এই তো পরিচয়। সে-পরিচয় নিয়ে বিন্দুমাত্র আক্ষেপ তাঁর নেই। গর্ব আছে। কর্তা তাঁর চেয়ে নয় বছরের বড়। এখনও সেবাশুশ্রূষায় দিব্য আছেন। শাঁখাসিঁদুর-সহ চলে যেতে পারলেই…
‘শুনছেন? ও দিদা?’
‘তুমি বসো মা! ঠাকুরের দিব্যি, আমার দশটা মিনিট লাগবে। এই এলুম৷’ সুহাসিনী তার চিবুক ছোঁন।
অগত্যা বসে মেয়েটি সোফার ওপর। ধপ করে বসে৷ বেচারি হা-ক্লান্ত৷ শীলা সরবত দিয়ে যায়। শীলা বা ঝুমির মা— এ বাড়ির কাজের লোক৷ সুহাসিনী বলে পাঠিয়েছিলেন শরবতের কথা। নাতনি বলেছে, বিএলও তার সিনিয়র-বন্ধু। তার অযত্ন না হয়৷ শুধু সে-কারণেও নয়। সংসারের টুকিটাকি ছলাকলা সত্তর বছর বয়সে তিনি বেশ জানেন। এ-মেয়েকে হাতে রাখতে হবে। কোনওভাবে পার করালে করাতে পারবে এই মেয়েই।
মেয়েটি ভিজে এসেছে। চোখদুটো নরম হয়েছে তার। বলে, ‘আসলে ঊর্মির দিদা, তাই দিদা ডাকলাম। কিছু মনে করেননি তো?’
সুহাসিনী হেসে বলেন, ‘ধুর! আমি এক্ষুনি আসছি।’
গোপালের স্নান সকালেই সারা হয়ে থাকে। স্নানসেবা আজকাল বড়বৌ করে। তারপর দু’খানি বিস্কুট খান গোপাল। দুপুরে ভোগ দেওয়ার ভারটি সুহাসিনী নিজের হাতে রেখেছেন। এ-কাজ করে বড় তৃপ্তি পান। গোপাল তাঁর ঠিক যেন সদ্যোজাত খোকাটি। পুত্রপ্রসবিনী তিনি৷ যতবার গর্ভ ধরেছেন, ছেলেসন্তানই বিইয়েছেন। সে-নিয়ে প্রচ্ছন্ন অহংকার তাঁর আছে। বড়বৌ, ছোটবৌ— দু’জনেরই একটি করে মেয়ে। ছোটনাতনি নার্সারি ইস্কুলে পড়ে। ছোটবৌকে এখনও বাগে আনতে পারেননি সুহাসিনী। কিন্তু বড়বৌকে চল্লিশ পেরোনোর আগে অবধি নিত্য সাধাসাধি করেছেন। নাতির মুখ দেখাতেই হবে। ছোটবৌয়ের এখনও আশা আছে। কিন্তু সে ট্যারাব্যাঁকা যুক্তি শুনিয়ে দেয় বলতে গেলে৷ বড়বৌয়ের নাম ছন্দা, সে নাম ধরে ডাকে না কেউ। শুধু ভোটের তালিকায়, ব্যাংকের বা ইনসিওরেন্সের কাগজপত্রে সে-নাম পাওয়া যায়৷ ডাকনাম তার মিতিন, সেটাই এ-বাড়িতে চলে। ছোটবৌয়ের একখানা কেতাদুরস্ত নাম আছে। স্রোতস্বিনী। সে চাকরি করা মেয়েমানুষ, বাইরে-ঘাটে ঘোরাফেরা। তার নাম মরে যায়নি, কারণ সে-নামে তাকে বাইরে পাঁচজনায় চেনে৷
মেয়েদের নাম অব্যবহারে হারিয়ে যায়। এই যেমন সুহাসিনী নিজে। বাবা নাম দিয়েছিলেন হাসি। চার ক্লাস পর্যন্ত ইস্কুলে সেই নামই ছিল। উনিশ বছর বয়সে পাকাদেখার দিন স্বর্গত শ্বশুরমশাই বললেন, ‘হাসি নামে সেই ভার নেই৷ তুমি এখন আর ছোট মেয়ে নও, হতে চলেছ দত্তবাড়ির বৌ। তোমার নাম দিলাম সুহাসিনী।’ বালিকাসুলভ হাসি মরে গিয়ে এক বিবাহযোগ্যা সুহাসিনী এইভাবে জন্ম নিলেন৷ তা নিয়েও আক্ষেপ নেই সুহাসিনীর৷ এ-বাড়িতেই প্রথম ভোটার তালিকায় নামই উঠেছিল। নতুন নামেই। ভাগ্যিস, ওই শেষ নিবিড় ঝাড়াইবাছাই পর্বে নামখানি পাওয়া গেছে তাঁর। না হলে এই নামবদল নিয়ে আরেক কেচ্ছা হত। কড়াকড়ি বেড়েছে আজকাল। গোপালের ভোগ লাগিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন সুহাসিনী।
‘ভয়ের কিছু নেই’, আগের বার এসে ঊর্মি বলে গিয়েছিল। ‘বিশ-পঁচিশ বছর আগের এসআইআরটায় নাম আছে যখন, তখন আপনি নিরাপদ। শুধু ফর্মটা ফিল আপ করার জন্য মায়ের নাম চাই-ই চাই৷ বাবা আর মায়ের নাম।’
কর্তা সেদিন খানিক উত্তপ্ত হয়েছিলেন সে-কথা শুনে৷ ঊর্মিকে বলেছিলেন, ‘তুমি মনে হয় নিয়মকানুন ঠিকমতো জানো না৷ একটু ভাল করে খোঁজ নাও দিকি!’ মেয়েমানুষের বুদ্ধির ওপর কর্তার ভরসা নেই কোনওকালে। সুহাসিনীরও যে খুব আছে, তা নয়৷ তাছাড়া কর্তার ব্যাপারখানা তিনি বোঝেন। কম দিন তো সংসার হল না! ও-লোকের হাঁচিকাশি পর্যন্ত মুখস্থ হয়ে গেছে। আজীবন তিনিই অভিভাবক; হাসপাতাল, ইনসিওরেন্স সব জায়গায় তিনি৷ মা কোন ছার, বাবার নামেরও দরকার পড়েনি। এখন এ হুজ্জুত তাঁর অবিশ্বাস্য ঠেকছে। আঁতেও লাগছে৷ সে-রাগ গিয়ে পড়ছিল মেয়েটার ওপর। কিন্তু খামোখা মেয়েটাকে চটিয়ে আরও বিপদে পড়তে চাননি সুহাসিনী৷
বলেছিলেন, ‘বাবার নাম তো বলে দেব বাপু। কিন্তু মায়ের পুরো নাম তো মনে নেই!’
‘মনে নেই! মায়ের নাম মনে নেই?’ মেয়ে তো আকাশ থেকে পড়ল।
‘আহা মনে থাকবে না কেন? যে নামে সবাই ডাকত, সে নামটি জানি। মিনু। কিন্তু পুরো নাম তো জানি না।’
মেয়েটি এ-কালের, ও কী করে বুঝবে সে-কালের রকমসকম! বিস্ময়টা সামলে উঠে সে বলে, ‘তা হলে বাপের বাড়িতে খোঁজ নিন।’
‘সে-সময়ের লোকেরা সব মরেহেজে গেছে। কে খোঁজ দেবে? ‘মিনু’ লিখে যদি বাবার পদবি দিই, হবে না?’
মেয়েটি ঘাড় নাড়ে। ‘ডেটা যত নিখুঁত হয় তত ভাল। আপনি খোঁজ নিন না! আমি আবার আসব।’
সে-বারের মতো সে চলে গেল। যাওয়ার আগে এমনভাবে বার-দুই ফিরে তাকিয়েছিল সে, যে, সুহাসিনীর কেমন একটা অপরাধবোধ হল। মাকে কি ভুলে গেছেন তিনি?
দশটি বছরের স্মৃতি। সব মুছে যায়নি। পুকুর থেকে নেয়ে আসার পর মায়ের গায়ের গন্ধ বেশ মনে আছে। গামছা দিয়ে দীর্ঘ চুলের জল ঝাড়া মনে আছে। জলের ছাঁটে চোখ বুজতেন সুহাসিনী। থুড়ি, হাসি। মনে আছে, দুগ্গাপুজোয় মা ঠাকুরদালানে আল্পনা দিতেন। বাগানের দোলনায় হাসি বসলে হাসির মা পুকুরে সবজি ধুতে যেতে-আসতে একবার করে দোল দিয়ে যেতেন, এও মনে আছে। যাকে ঘিরে এইসব স্মৃতি, তার নাম মিনু। সে হাসি আর খোকনের মা। তার আর কোনও পরিচয়, আর কোনও বৃহত্তর নাম জানার প্রয়োজন হয়নি কখনও।
বসার ঘরের ঘড়ি জানান দিল, দশ মিনিট বলে পাক্কা সতের মিনিট পরে ফিরলেন সুহাসিনী৷ মেয়েটি উসখুস করছে। ভারি পায়ের তলায় সর্ষে বাপু এ মেয়ের!
‘ইস, একটু দেরি হয়ে গেল গো!’
‘পেলেন মায়ের নাম?’
‘ওই পেলুম একরকম৷ তুমি দুটো ভোগের সন্দেশ খাও বাছা।’
মেয়েটার নির্ঘাত খিদে পেয়েছে৷ সে আর না করে না। বাতাসার পর গপাগপ দুটো সন্দেশও পেটে চালান করে দেয়। ঢকঢকিয়ে জল খায়৷ সুহাসিনীদের সময়ে বলত, মেয়েমানুষ খাবে ধীরে৷ নিঃসাড়ে। অমন আওয়াজ করে খাওয়া বড় বিশ্রী৷
‘আমি কালনায় ফোন করেছিলুম। বুঝলে?’
‘বেশ বেশ।’
‘তা যে দাদারা বেঁচে আছেন, তাঁরা বললেন, মিনু বলেই ডাকত সকলে কাকিকে, মানে আমার মাকে। সেই মিনু যে মিনতি না মীনা না মীনাক্ষী, তা তারা জানে না।’
‘তা হলে?’
‘তাঁরা আরও বললেন, গীতুদিদি জানতে পারে।’
‘গীতুদিদি আবার কে?’
‘ওর নাম গায়ত্রী৷ আমার জ্যেঠতুতো দিদি। বাগবাজারের দিকটায় থাকে৷ থাকে মানে, শয্যাশায়ী। বেডপ্যান দেয় ওর বড়বৌ। ভারি করিৎকর্মা মেয়ে সে।’
এরপর গায়ত্রীর বৌমা-ভাগ্য নিয়ে দু’চার কথা বলে, আর তার সঙ্গে নিজের বৌমাদের হতচ্ছাড়া দশার কথা জুড়ে, খানিক হালকা হতে চাইছিলেন সুহাসিনী। ঊর্মি বাধা দিল।
‘তা তিনি কী বললেন? গীতুদিদি?’
সুহাসিনী খানিক আহত হলেন৷ বললেন, ‘তোমার বুঝি খুব তাড়া?’
‘তা একটু আছে বইকি দিদা। অনেকটা ফিরতে হবে।’
‘সে কী! যার যেখানে বাড়ি, তার কাছাকাছি অঞ্চলেই তো সে বিএলও ডিউটি পেয়েছে! এরকমই তো শুনছিলুম! তাছাড়া ইপ্সিতাও বলল, তোমার বাড়ি দু’পাড়া ছেড়ে!’
মেয়েটি ম্লান হাসে৷ বলে, ‘আমার বাড়ি তো এখানেই দিদা। তাই তো বিয়ের পরেও আমি ভোটার লিস্ট থেকে নাম বাদ দিতে দিইনি। ও-বাড়িতে নামও তুলিনি৷ প্রতি বছর এখানেই এসে ভোট দিই। তাই এখানেই ডিউটিটা পড়ল।’
বিয়ের পর শ্বশুররবাড়ির লোকজনের সঙ্গে একলপ্তে নাম না তুলে এ-মেয়ে এখনও এখানকার লিস্টে নাম রেখে দিয়েছে? এ ঠিক পছন্দ হল না সুহাসিনীর। কিন্তু বিয়ে যে অন্তত করেছে সে, তাতে তিনি তুষ্ট হলেন। সিঁথি দেখে বড়ই চিন্তায় পড়েছিলেন।
‘তা কোথায় তোমার শ্বশুরবাড়ি?’
‘হাজরায়। তবে আমি তো ওখানেও থাকি না। আমি যাদবপুরে থাকি!’
‘অ্যাঁ! শাশুড়ির সঙ্গে বনেনি?’
‘বরের সঙ্গে বনেনি৷ আপাতত আলাদা আছি। ডিভোর্স হয়নি৷ হয়তো পরে হবে। আমাকে সেই যাদবপুরে ফিরতে হবে।’ মেয়েটি একই সঙ্গে উদাস ও চিন্তিত হয়ে পড়ে৷
ভরদুপুরে এসব অলুক্ষুণে কথা একদম ভাল লাগে না সুহাসিনীর। তাঁদের সাতকুলে একজনও ডিভোর্সি নেই। তিনি নাকটি না গলিয়ে পারেন না।
‘তোমার বাবা-মা কিছু বললেন না?’
‘বললেন তো! মানিয়ে-গুছিয়ে নিতে বললেন। সহ্য করতে বললেন৷ আর বললেন, ফিরে এলে এ-বাড়িতে জায়গা হবে না। অথচ এটা আমারও বাড়ি। আমিই একমাত্র মেয়ে।’
‘কী কাণ্ড! নিজের বাড়িতেও ফর্ম ফিলাপ করিয়ে এলে নাকি!’
‘হ্যাঁ! আমিই গিয়েছিলাম তো৷ ওদেরও আমিই বিএলও। মা কাঁদলেন। কিন্তু থেকে যেতে বললেন না।’
এই পরিস্থিতিতে কী বলতে হয়, তা আদৌ জানেন না সুহাসিনী৷ তিনি গুম হয়ে রইলেন। ঊর্মিই গলাঝাড়া দিয়ে কথা বলল অগত্যা।
‘হ্যাঁ, তা হলে ওই গীতুদিদির কথা হচ্ছিল৷ তিনি জানবেন, এমনটা কেন মনে হল দাদাদের?’
‘আমার মা নাকি মেয়ে বড় ভালবাসতেন। দাদা— আমার নিজের দাদা, মারা গেলেন দু’বছর হল— তিনি তাঁর প্রথম সন্তান। দাদার পিঠোপিঠি ছিল এই দিদি। দাদার চেয়ে আমি আট বছরের ছোট। এই আট বছর মেয়ের অভাব নাকি মা ওই দিদিকে দিয়ে মেটাতেন। দিদিও খুব ন্যাওটা ছিল তার কাকির। তারপর আমি জন্মালাম। তাতেও যে দিদির আদর কমেছিল, তা নয়।’
‘তা গীতুদিদি বলতে পারলেন মায়ের নাম?’
‘এখন সব কিছুই তার ধোঁয়া হয়ে আসছে। তবু যদ্দুর তার মনে পড়ল, সে বলল, মীনাক্ষী নামটাই রেখেছিলেন ঠাকুমা, মা ও-বাড়ির বৌ হয়ে আসার পর।’
‘সে কী! মীনাক্ষীও আসল নাম নয়?’
এ-মেয়ে চোখ কপালে তুলল দেখে সুহাসিনী আর ভাঙলেন না যে হাসিও এভাবেই সুহাসিনী হয়েছিলেন। কিন্তু মনের মধ্যে একটা খচখচ ঢুকিয়ে দিল মেয়েটি। বিয়ের আগে তাঁর নাম যে হাসি ছিল, সে তিনি জানেন। মীনাক্ষী বা মিনুর আসল নাম কী ছিল?
মেয়েটি রগদু’টি ধরে বসে আছে দেখে সুহাসিনী বললেন, ‘অত চাপ আর নিতে পারিনে বাপু এ বয়সে। ওই মীনাক্ষীটুকু পেলুম। এর বেশি আর পিছোনো সম্ভব নয়।’
ঊর্মি চোখ তুলে তাকায়৷ খানিক ভাবে। তারপর বলে, ‘যেহেতু মিনু গত এসআইআরের আগেই মারা গেছেন, তাই গত এসআইআরে তাঁর নাম থাকার কথা নয়৷ নাম থাকলে গরমিল হতে পারত। আর আপনার নাম তো ছিলই গত এসআইআরে। তাই আপনি মোটামুটি নিরাপদ। ডিসক্রিপেন্সির সম্ভাবনা কম। আপনি মিনু, মীনাক্ষী— যা ভাল বোঝেন দিন। বাকি— আমার উপরে যিনি, আর.ও.— তিনি বুঝবেন।’
‘তা হলে আমায় এত খাটালে কেন বাপু?’ সুহাসিনী ঝাঁঝিয়ে ওঠেন।
‘আপনার জানতে ইচ্ছে করেনি? মায়ের নাম? পদবি তো কেড়েই নেয়। নামটাও জানা যাবে না? জানা উচিত নয় আমাদের? বলুন?’
থমকে যান সুহাসিনী৷ এ-মেয়ে তো ভারি ইয়ে! ‘ইয়ে’টা যে কী, তা তখনই ঠাউরে উঠতে পারেন না তিনি৷ বলা যায়, বলিয়ে-কইয়ে। কিংবা জ্যাঠা মেয়ে। এমনিতে ভেজা-বেড়াল মুখ করে থাকে অথচ! প্রথমে মেয়েটির ওপর রাগ হয়। তারপর কেমন যেন লজ্জা করে তাঁর। তারপর ঝুপ করে মায়ের জন্য মনখারাপ করে। সেই যে পুকুর থেকে আনাজ ধুয়ে ফিরতিপথে হাসির দোলনায় মিনু মায়ের দোল দিয়ে যাওয়া! কাটা আনাজের ঝুড়ি থেকে পুকুরের জল ঝরত। সে জল মায়ের পায়ে পড়ত। কী করুণ, ধবধবে দু’টি পা! শ্রান্ত দুই পায়ে জল কি আরাম বুলিয়ে দিত?
মেয়েটি ব্যাগ গুছোচ্ছে। সুহাসিনীর ফর্মটি সে ব্যাগে ভরল। গর্ভবতী ব্যাগের পেটে দিস্তে দিস্তে ফর্ম। কত চরিত্র। তাদের নাম। বাবার নাম। মায়ের নাম। মানে আরও, আরও চরিত্র। সেই তথ্যসমুদ্রে মিনু মা হারিয়ে গেল ফের।
‘আসি দিদা। একটা ব্যাপার আমার ভাল লেগেছে।’
অবাক হয়ে তাকান সুহাসিনী।
‘ওই যে, আপনার মা মেয়ের মা হতে চেয়েছিলেন৷’
সুহাসিনীর স্থিতি কেঁপে ওঠে ক্ষণিকের জন্য। মেয়েটির যা আছে— যার জন্য জুতসই কথা পাচ্ছিলেন না তিনি— তা হল মতামত। আর তা বলে ফেলার সারল্য।
ঊর্মি চলে গেল৷ আবছা মাতৃনামের দ্বিধাখানি জড়িয়ে নির্জন দুপুরে একলা বসে রইলেন সুহাসিনী।
°°°
চিত্রণ: মৃণাল শীল






