ডুলুংমারির জঙ্গলে
স ঞ্জ য় চ ট্টো পা ধ্যা য়
এবারের গন্তব্যস্থল পুরুলিয়ার বাগমুন্ডি পাহাড়ের অদূরে কলাইকুস্মান্ডি নামের এক ছোট পাহাড়। পাহাড়ের একেবারে গা-ঘেঁষে ছোট গ্রাম কলাইকুস্মান্ডি। পাহাড়ের নামানুসারেই গ্রামের এমন নাম। প্রতিবছর পৌষ সংক্রান্তিতে পাহাড়ের উপর ওখানকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের এক দেবীর আরাধনায় মোষ বলি দেয়। বলির পর মোষের রক্ত একটি পাত্রে ধরে দেবীর সামনে নামিয়ে রাখে। লোকমুখে কথিত আছে যে, দেবী স্বয়ং সেই রক্ত পান করে।
আজকের দিনে লোকমুখে এমন ঘটনার কথা শুনে বিশ্বাস করা হয়তো বোকামির পরিচয়, তবুও যেন মন মানছিল না। একজন পুরুলিয়াবাসীর মুখে ঘটনাটা শোনামাত্র পৌষ সংক্রান্তির অপেক্ষায় দিন গোনা শুরু করেছিল কাকাই। কাকাই ওরফে অনিকেত চট্টোপাধ্যায়। গোয়েন্দা হওয়ার ভূতটা খুব অল্প বয়স থেকেই তার মাথায় চেপে বসেছিল। সাধ্যমতো চেষ্টাও করেছিল, কিন্তু না সেভাবে তার গোয়েন্দা হয়ে ওঠা হয়নি।
তবে এর বাইরেও তার একটা পরিচিতি আছে। বর্তমান সময়ের সে একজন স্বনামধন্য লেখক। তার লেখা গল্প বা উপন্যাস আজ বাংলা সাহিত্যে স্বমহিমায় বিরাজমান। তার লেখা বেশ কয়েকটা বই বহুচর্চিত। বিভিন্ন বাণিজ্যিক পত্রপত্রিকায় নিয়মিত তার লেখা থাকে। সেদিক দিয়ে দেখলে খুবই ব্যস্ত মানুষ ত্রিশ-বত্রিশের কাকাই।
জেলায় জেলায় বিভিন্ন প্রান্তিক গ্রামে বহু জানা অজানা ঘটনা এদিক-সেদিক ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে থাকে। লোকমুখ নিঃসৃত সেইসব ঘটনা সংগ্রহ করে কাকাই নিজেই সশরীরে পৌঁছে যায় সেইসব স্থানে। সেখানের সমস্ত ঘটনা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সংগ্রহ করার পর কলমের ডগা দিয়ে সাদা কাগজের ওপর লিপিবদ্ধ করে। এ ব্যাপারে তার একজন সঙ্গীও আছে। বড়দাদার একমাত্র ছেলে নটু। এ নামটা অবশ্য কাকাইয়েরই দেওয়া। নটুর একটা ভাল নামও আছে, স্নেহাশিস চট্টোপাধ্যায়।
সূর্যটা পুব আকাশ থেকে ঘুরতে ঘুরতে পশ্চিম আকাশে মিলিয়ে যেতেই তোড়জোড় শুরু করেছে কাকাই ও নটু। একটা ব্যাগে ছুরি, কাঁচি, ব্লেড, দেশলাই, মোমবাতি, দড়ি, টর্চ, চশমা, ঘড়ি-সহ নানা ধরনের প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে নেয়। অন্য একটা ব্যাগে বেশ কিছু শুকনো খাবার। আর একটা ব্যাগে দু’জনের প্যান্টজামা, শীতের পোশাক ছাড়াও বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। বলা যায় না অচেনা জায়গায় কোথায় কী মিলবে না মিলবে, তার চেয়ে নিজেদের জন্য সামান্য ব্যবস্থাটুকু সঙ্গে রাখা ভাল। ঘড়ির কাঁটায় আটটা বাজার আগেই খাওয়াদাওয়া সারা। সাড়ে দশটায় ট্রেন, হাওড়া থেকে।
কাকাই বলে ফেলল, ‘আর দেরি করা ঠিক হবে না, আমরা তা হলে আসছি বৌদি!’
বৌদি উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ এসো, তবে সাবধান, গতবারের মতো যেন কোনও অঘটন ঘটিয়ো না।’
‘তুমি শুধু শুধু চিন্তা করো না তো মা’, বলল নটু।
ছেলের কথার উত্তরে মা বলল, ‘কাকাইয়ের সাথে থেকে থেকে তুমিও বড় বীরপুরুষ হয়ে গেছ। কাকাই গোয়েন্দার নটু অ্যাসিস্ট্যান্ট।’ মায়ের মুখে কথাটা শুনে নটুর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। নটুকে রাগাতে তার মা মাঝে মাঝেই কথাটা বলে।
কথা-কথান্তরের মাঝেই কাকাই দেওয়ালে টাঙানো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘না বৌদি আর দেরি করা ঠিক হবে না, আমরা এলাম। ব্যাগপত্তর কাঁধে ঝুলিয়ে কাকাই ও নটু বেরিয়ে পড়ল।
দোতলা বাড়ির একটার পর একটা সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে আসে ওরা। বাড়ির বাইরে বেরিয়ে, কয়েক পা হাঁটা দিতেই পাড়ার গলি ছেড়ে ওরা চৌরাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়াল। সামনেই কালিকা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। অনেক পুরনো মিষ্টির দোকান। নটু সেখানে গিয়ে কিছু পছন্দমতো শুকনো মিষ্টি কিনে ব্যাগে ঢোকাল। মিষ্টির ব্যাপারে অবশ্য নটুর একটু দুর্বলতা আছে।
কাকাই হাত দেখিয়ে অটো থামাল।
ওরা এখন অটোয় চড়ে যাবে সিঁথির মোড়, সেখান থেকে বাস ধরে হাওড়া স্টেশনে। বর্ধমান, দুর্গাপুর, আসানসোল হয়ে পুরুলিয়া। এক ট্রেনে যাওয়া, তাই খুব বেশি চাপ নেই। শুধু একবার ট্রেনে উঠে পড়ার পালা।
ঘড়ির কাঁটায় এখন সাড়ে ন’টা। টিকিট কাটা হয়ে গেছে। ট্রেন ছাড়তে এখনও এক ঘণ্টা দেরি। প্ল্যাটফর্মে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। সেইমতো কাকাই আর নটু একটা বেঞ্চে বসে ব্যাগ থেকে বই বের করে পড়া শুরু করল।
নটু সবে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা পাশ করে কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে। পল সায়েন্স নিয়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি ফটোগ্রাফিতে তার ভীষণ শখ, ব্যাগের মধ্যে সব সময় দামি ক্যামেরাটা থাকে। ক্যামেরার কথা মনে পড়তেই ব্যাগ খুলে একবার দেখে নিল সে। না সব ঠিকই আছে।
পৌষের শীতের রাত বাড়ার সাথে সাথে ব্যস্ত হাওড়া স্টেশনের ভিড়টা কিছুটা পাতলা। ঘড়ির কাঁটায় দশটা বেজে দশ। প্ল্যাটফর্মের জায়ান্ট স্কিনে পুরুলিয়াগামী ট্রেনের নাম ভেসে উঠেছে। ট্রেনটা সাত নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসছে। আর দেরি না করে সাত নাম্বার প্ল্যাটফর্মে গিয়ে ওরা ট্রেনে উঠে পড়ে। ব্যাঙ্কারে ব্যাগপত্তর তুলে সিটে বসে পড়ে। কামরায় লোকজন খুব বেশি নেই, বেশ ফাঁকা ফাঁকা। ভালই হয়েছে, লোকজন বেশি না থাকায় সিটে শুয়ে শুয়ে যাওয়া যাবে। ট্রেন ছাড়তেই কাকাই গোয়েন্দার বইয়ে মুখ গুঁজল, আর নটু মোবাইলে।
ট্রেনটা চিতাবাঘের মতো দূরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে। মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে নটু এখন ঘুমের দেশে। কাকাই বইয়ের খোলা পাতা বন্ধ করে সবে শুতে যাবে, এমন সময় একটা মানুষের বিচ্ছিরি কর্কশ কণ্ঠস্বর ভেসে এল কাকাইয়ের কানে, ‘তা বাবু, আপনেরে কুথায় যাবেন?’ লোকটার কণ্ঠস্বর কানে আসা মাত্রই কাকাই তার দিকে তাকিয়ে দেখল। লোকটার পরনে একটা ছেঁড়া জিনস, কোমরে গামছা দিয়ে বাঁধা। পরনের শার্টটা ছেঁড়া তো বটেই, তার সঙ্গে ভীষণ ময়লা। গলায় বেশ কিছু মালা ঝুলছে। মাথার চুলগুলো জটা বাঁধা। দেখেই বোঝা যায়, বেশ কিছুকাল যাবৎ তার স্নান করা হয়নি। একমুখ দাড়িতে মুখ ঢাকা। আর চোখগুলো নীল। শরীরে মাংস নেই বললেই চলে। যাকে বলে হাড়-জিরজিরে শরীর। একঝটকায় লোকটার দিকে তাকিয়ে কেউ যদি মনে করে লোকটা আদৌও মানুষ নয়, সদ্য কবর থেকে উঠে আসা কোনও নরকঙ্কাল, তা হলে খুব একটা ভুল ভাবা হবে না।
পৌষ শেষ হতে আর একটি মাত্র দিন বাকি। ভরা শীতের এই কনকনে ঠান্ডায় লোকটার পরনে শুধুমাত্র একটা ফিনফিনে পাতলা জামা। ইতিমধ্যে নটু ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। লোকটা আবার বলল, ‘বাবু, বললেন না যে কুথায় যাবেন?’
‘আমরা কোথায় যাব তা জেনে আপনার কী হবে?’
‘আসলে বাবু, আমি হলেম গিয়ে গাঁয়ের মানুষ, জঙ্গলের মানুষ। ট্রেনে ঘুমাতে পারিনে। তা দেখলেম আপনি জেগে আছেন, তাই দুটো কুথা বলার জন্যি। আসলে, অনেকক্ষণ হল কারুর সাথে কুথা বলা হয় নাই।’
‘ও আচ্ছা, তা বেশ। তা আপনার কোথায় যাওয়া হবে?’
‘অনেকদিন পর আজ গাঁয়ের দিকে যাব।’
‘তা আপনার গাঁয়ের নাম কী শুনি!’
‘হাড়মাসড়া।’
নামটা শোনার সাথে সাথেই নটু বলে উঠল, ‘বাব্বা, ভীষণ রকম নাম তো আপনার গাঁয়ের। তা সেটা কোথায় শুনি?’
লোকটি বলল, ‘দক্ষিণ বাঁকুড়ার একেবারে শেষ প্রান্তে, গভীর জঙ্গলের ভেতর। আপনেরে ডুলুংমারির জঙ্গলের নাম কি শুনেছেন?’
‘ডুলুংমারির জঙ্গল!’ একসাথে বলে উঠল কাকাই ও নটু।
‘হ্যাঁ বাবু, সে এক ভয়ানক গভীর জঙ্গল। বুনোহাতির জঙ্গল, হায়নার জঙ্গল, হেঁড়লের জঙ্গল। আর সাপের কথা কী বলব চোখে না দেখলি কেউ বিশ্বাস করবেকনি।’
লোকটার কথাগুলো গোগ্রাসে গিলছিল কাকাই আর নটু। তারই মাঝে একটা-দুটো প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছিল তার দিকে। কাকাই বলে উঠল, ‘তা এত ভয়ানক গভীর জঙ্গল, তার উপর বুনোহাতি, হায়না, হেঁড়ল, আবার সাপের কথাও বলছেন। তা আপনারা ওখানে কী করে বাস করেন, ভয় করে না?’
‘ভয়!’ মৃদু হাসল লোকটা। তারপর আবার বলতে শুরু করল, ‘আমাদের মতো আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষেরা চিরকাল ভয়কে জয় করে জঙ্গলেই তো বাস করে আসছে বাবুরা। আর তাছাড়া ডুলুং হাঁসদার মতো যুবক ছেলে যে গ্রামে বাস করত, তাদের আবার ভয় কীসের।’
লোকটার মুখে ডুলুং হাঁসদা নামটা শোনার সাথে সাথেই নটু বলে উঠল, ‘একটু আগে জঙ্গলের নাম বললেন ডুলুংমারি, তা এমন নামকরণের পিছনে এই ডুলুং হাঁসদার কোনও গল্প আছে না কি?’
নটুর মুখের কথা শুনে তার দিকে তাকাল কাকাই। মনে মনে ভাবল, বাঃ, নটু দিনের পর দিন বেশ পটু হয়ে উঠছে।
নটুর কথা শুনে লোকটা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘গল্প নয় বাবু, গল্প নয়, সে এক বাস্তব কাহিনি।’
কাহিনি শব্দটা শোনামাত্র নটু ও কাকাই এক সঙ্গে বলে উঠল, কাহিনি! ক্ষুধার্ত মানুষ যেমন সামনে খাবার দেখলে আনন্দে আত্মহারা হয়, চোখেমুখে ফুটে ওঠে খুশির আদল, ঠিক তেমনি অবস্থা নটু ও কাকাইয়ের।
লোকটা অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘তা বাবুরা শুনবেন নাকি ডুলুং হাঁসদার কাহিনি?’
কাকাই বলল, ‘শুধু শুনব নয়, সে রকম হলে লিখতেও পারি।’
‘তা আপনেরে বুঝি নেকানেখি করেন।’
‘হ্যাঁ, তবে ঘটনার সত্যতা যাচাই করার পর।’
‘তা বাবু, আপনেরে কি যাবেন আমাদের গাঁয়ে, ডুলুংমারির জঙ্গলে?’
‘সেটা নির্ভর করছে আপনার কাহিনি শোনার পর।’
ট্রেনটা তীব্র গতিতে ছুটতে ছুটতে মাঝে মাঝে যেন হাঁপিয়ে উঠছে। চিতাবাঘ থেকে কচ্ছপ হয়ে ধীর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
মুখোমুখি দুটো সিটে জানালার ধারে বসেছিল কাকাই ও নটু। লোকটা এগিয়ে আসতেই নটু উঠে গিয়ে কাকাইয়ের পাশে বসল। এখন লোকটা কাকাই ও নটুর একেবারে সামনাসামনি গিয়ে সিটে বসে পড়ল। নটু ভাল করে তাকিয়ে দেখল লোকটার মুখের দিকে। বড় বড় চুল, দাড়িতে ভর্তি মুখটা দেখে কোনও মানুষের অবয়ব ফুটে উঠছে না। নটু তার ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে লোকটার ছবি তুলতে গেলে লোকটা বাধা দিল। মুখে মুচকি হাসি নিয়ে লোকটা বলল, ‘আমার আবার ছবি তোলা কেন বাবু?’
অনেকক্ষণ চুপ থেকে নটুর ব্যাপারস্যাপার লক্ষ্য করছিল কাকাই। চোখের ইশারায় নটুকে ছবি তুলতে নিষেধ করল। নটু কাকাইয়ের ইশারা বুঝতে পেরে ক্যামেরাখানি ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল। লোকটার দিকে তাকিয়ে কাকাই বুঝতে পারল শীতের ঠান্ডা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। এবং লোকটা যথারীতি থরথর করে কাঁপছে। কাকাই ব্যাগ থেকে একটা চাদর বের করে লোকটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘নিন এটা গায়ে জড়িয়ে নিন।’ লোকটা প্রথমে একটু ইতস্তত করলেও পরে কাকাইয়ের হাত থেকে চাদরখানি নিয়ে গায়ে জড়িয়ে বেশ আঁটোসাঁটো হয়ে বসল। এবার কাকাই লোকটার উদ্দেশ্যে বলল, ‘নিন শুরু করুন ডুলুং হাঁসদার কাহিনি।’
লোকটা বলতে শুরু করল:
সে আজ অনেক বছর আগের কথা, সবেমাত্র ইংরেজরা এ দেশের শাসনভার নিজেদের হাতে নিয়েছে। গভীর জঙ্গলের ভেতর দশ-বারোটা পরিবার নিয়ে আদিবাসী সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ বসবাস করতে শুরু করল। যাদের জীবনে ছিল প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ভয়। কখনও বুনোহাতির আক্রমণ, তো কখনও বাঘের হানা, আবার কখনও কখনও জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসত বিশাল আকারের সাপ। সমস্থ বাধাবিপত্তিকে দূরে সরিয়ে মৃত্যুকে জয় করে দশ বারো থেকে বেড়ে ধীরে ধীরে একটা আদিবাসী গ্রাম কখন জানি গড়ে উঠল গভীর জঙ্গলের ভেতর। যার নাম হল হাড়মাসড়া। জঙ্গলের ভেতর বেশ কিছুটা ফাঁকা ডাঙা পড়ে ছিল। দিনরাত এক করে সেই ডাঙাকে জমিতে পরিণত করে ফসল ফলাল তারা।
নগরজীবন থেকে বহু দূরে জঙ্গলের ওপর নির্ভর করে কিছু মানুষ স্বয়ম্ভর হয়ে উঠেছিল। জঙ্গলের কাঠ, মধু, মোল, ধুনো, বিড়ির পাতা, নানা রকম জঙ্গলের ফলমূল সংগ্রহ করে তারা শহুরে মানুষের কাছে রপ্তানি করে নিজেদের প্রয়োজন মেটাত। কিন্তু সেই সুখ বেশি দিন স্থায়ী হল না। একদিন সকালে সবুজ সুন্দর শান্ত হাড়মাসড়ার জঙ্গলে শোনা গেল ইংরেজদের ভারী বুটের শব্দ। এই জঙ্গলে প্রচুর দামি দামি গাছ ছিল, যার লোভে ইংরেজদের হঠাৎ আগমন। তারা কল্পনা করতে পারেনি এত গভীর জঙ্গলের মাঝে মানুষ বসবাস করতে পারে। হাড়মাসড়া গ্রামের কিছুটা দূরেই জঙ্গলের গাছ কেটে পরিষ্কার করে ইংরেজরা তাঁবু ফেলল। শুরু হল আদিবাসী গ্রামবাসীদের দিয়ে জোর করে গাছ কাটানো। প্রথমে কেউ রাজি হয়নি, শেষমেশ ইংরেজদের অত্যাচারে মাথা নোয়াতে বাধ্য হল। ইতিমধ্যে ইংরেজ মেমসাহেব ড্যানিয়েল ম্যারি জঙ্গলভ্রমণের অভিলাষে এসে উঠলেন হাড়মাসড়া গ্রামের অদূরে ইংরেজ তাঁবুতে। সবুজ সুন্দর শান্ত হাড়মাসড়ার জঙ্গলের প্রেমে পড়ে গেলেন তিনি। সিদ্ধান্ত নিলেন এখানে একখানা কটেজ বানাবেন। মাঝে মাঝে এখানে বেড়াতে আসা হবে, আবার নিজের দেশ থেকে আসা আত্মীয়-পরিজনদেরও নিয়ে আসা যাবে। আর জঙ্গলের পশুশিকার, সে তো বাড়তি পাওনা। সেইমতো সব কিছুর দায়িত্ব এসে পড়ল ইংরেজ সেনাপতি লর্ড গেটিংয়ের ওপর।
জঙ্গল থেকে ধুনো, মধু ছাড়াও আরও কিছু জংলি ফলমূল সংগ্রহ করে ডুলুং গিয়েছিল নগরে। সেখান থেকে ফিরে গ্রামে ঢোকার মুখেই গাছ কাটার শব্দ তার বুকে যেন আঘাত করল। সেই শব্দ অনুসরণ করে সে এগিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে সে যা দেখল তাতে করে সে তার নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারে না। তার নিজের গাঁয়ের মানুষ যারা এতদিন জঙ্গলকে ভালবেসে এসেছে, গাছকে ভালবেসে এসেছে, তারাই কি না আজ নির্বিচারে গাছ কাটছে। রাগে তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। কিন্তু সে লক্ষ্যই করেনি কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইংরেজ সাহেব গেটিং ও তার সেনাবাহিনীর দিকে। সে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘বন্ধ কর, ইসব তুরা কী করছিস?’
ডুলুংকে দেখে গাঁয়ের মানুষ যেন বুকে বল পেল। তারা গাছ কাটা বন্ধ করল। এসব দেখে গেটিং সাহেব তো রেগে আগুন। তিনি তার সেনাবাহিনী নিয়ে এগিয়ে গেলেন। গেটিং সাহেবকে দেখে ডুলুংয়ের পুরো ঘটনা বুঝতে অসুবিধা হল না। সে সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে গাছ কাটার বিরোধিতা করে রুখে দাঁড়াল। সাহেব ডুলুংকে বন্দি করার হুকুম দিলেন, ছাড়ার পাত্র নয় ডুলুংও। সে একটা গাছের ডালকে হাতিয়ার করে ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল। ডুলুংয়ের বীরত্বের কাছে ইংরেজ বাহিনীকে পিছু হটতে দেখে গেটিং সাহেব তাকে লক্ষ্য করে বন্দুক তাক করল। যা দেখে শেষ মুহূর্তে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মেমসাহেব ম্যারি গেটিংয়ের বন্দুকের নল অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিলেন, নইলে ডুলুং হয়তো এতক্ষণ মাটিতে লুটিয়ে পড়ত। নিজের হাতে থাকা লাঠি ছুড়ে ডুলুং গেটিং সাহেবকে আঘাত করল। গেটিং সাহেবের হাত থেকে বন্দুক খসে পড়তেই সে এগিয়ে গিয়ে সাহেবকে মাটিতে ফেলে তার বুকে চেপে বসল। গাঁয়ের মুরুব্বিরা ক’জন এগিয়ে এসে ডুলুংকে না ধরলে সে হয়তো গেটিং সাহেবকে মেরেই ফেলত। এমত অবস্থায় ইংরেজ সেনারা ডুলুংকে বন্দি করল। ড্যানিয়েল ম্যারি চেষ্টা করেও গেটিং সাহেবের হাত থেকে ডুলুংকে ছাড়াতে ব্যর্থ হলেন। ডুলুংকে বন্দি করে ইংরেজ সেনারা নিয়ে গেল তাঁবুতে। গেটিংয়ের নির্দেশে শুরু হল তার ওপর অমানবিক অত্যাচার। গেটিং সাহেব ঠিক করলেন, পরদিন সকালে ডুলুংকে শহরে চালান করা হবে। সমস্ত ঘটনা জানার পর ম্যারির মনে ডুলুংয়ের প্রতি মায়া জন্মাল। তিনি রাতের অন্ধকারে নিজের বিশস্ত লোক দিয়ে ডুলুংকে মুক্ত করলেন। ইংরেজ মেমসাহেব ড্যানিয়েল ম্যারির উদারতা দেখে ডুলুং তাঁর প্রতি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ল। সে চিন্তা করল সমস্ত ঘটনা জানাজানি হবার পর গেটিং সাহেব নিশ্চয় মেমসাহেবকে ছেড়ে দেবে না। এইমত অবস্থায় মেমসাহেবকে বিপদে ফেলে নিজের জীবন বাঁচাতে স্বার্থপরের মতো পালিয়ে যেতে ডুলুংয়ের বিবেকে বাধল। সে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। ডুলুংকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ম্যারি বার বার তাকে পালিয়ে যেতে অনুরোধ করলেন। কিন্তু ডুলুংয়ের সাফ কথা, একজন মহিলাকে বিপদে ফেলে সে কাপুরুষের মতো নিজের জীবন বাঁচাতে পালিয়ে যেতে শেখেনি। ইতিমধ্যে গেটিং সাহেব জনা পনেরো সেনা নিয়ে এসে হাজির। শুরু হল যুদ্ধ, ভীষণ যুদ্ধ। এক জনের বিপক্ষে পনের জন। ডুলুংয়ের বীরত্ব দেখে ম্যারি যেন তার প্রেমে পড়ে গেলেন। সে বুঝতে পারল, আজ ডুলুং পরাজিত হওয়া মানে তার জীবন চলে যাবে। তাই ম্যারি গোপনে লুকিয়ে রাখা পিস্তল বের করে গেটিং সাহেবের দিকে তাক করল। মুহূর্তেই সবাই থমকে গেল। ম্যারি বলে উঠল, কেউ এক পা নড়লে গেটিং সাহেবের মাথার খুলি উড়িয়ে দেবেন। গেটিং সাহেবের হুকুমে সেনারা হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়ল। ম্যারি দেরি না করে ডুলুংয়ের হাত ধরে তাকে নিয়ে ইংরেজ তাঁবু থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে পড়লেন। রাতের অন্ধকারে জঙ্গল ভেদ করে এগিয়ে যেতে লাগল ডুলুং ও ম্যারি। হাড়মাসড়ার এই ঘন জঙ্গলের ভেতর একটা প্রাচীন গুহার কথা জানত ডুলুং। জীবনমরণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ভয়কে জয় করে ডুলুং ম্যারিকে নিয়ে সেখানে আশ্রয় নিল।
গভীর রাতের অন্ধকারে ডুলুং ও ম্যারির খোঁজে গেটিং সাহেব তার দলবল নিয়ে হাজির হলেন হাড়মাসড়া গ্রামে। সারা রাত ধরে গ্রামবাসীদের ওপর চলল নারকীয় অত্যাচার। কারও বাড়িতে আগুন ধরানো হল, কারও বাড়িতে লুট করা হল সর্বস্ব। কিন্তু তাতে করেও গেটিং সাহেব ডুলুংয়ের কোনও খবর সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলেন। আর সেই রাগেই পরদিন সকাল থেকেই গ্রামবাসীদের পিঠে চাবুকের দাগ পড়ল। ছেলেমেয়ে কাউকে এক ফোঁটা জল পর্যন্ত না দিয়ে সারাদিন জঙ্গলের গাছ কাটাতে লাগলেন গেটিং সাহেব। এই খবর জানতে পেরে ডুলুং আর চুপ করে লুকিয়ে বসে থাকতে চায় না। কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত ম্যারির পরামর্শে রাতের অন্ধকারে গ্রামে এসে সকল গ্রামবাসীদের নিয়ে হাড়মাসড়া ছেড়ে জঙ্গলের গুহায় আশ্রয় নিল ডুলুং। এদিকে গেটিং সাহেব গ্রামে গিয়ে কাউকে না পেয়ে রাগে ঘরে ঘরে আগুন ধরিয়ে দিলেন। কয়েক মুহূর্তের আগুনের গ্রাসে জঙ্গলের ভেতর কতিপয় আদিবাসী সাঁওতালদের বহু পরিশ্রমে গড়ে তোলা হাড়মাসড়া গ্রাম শ্মশানে পরিণত হল। ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয় ডুলুংও, সে আড়াল থেকে তিরধনুকের সাহায্যে লড়াই চালিয়ে যেতে লাগল। ডুলুংয়ের তিরের ফলায় বিদ্ধ হয়ে এক এক করে ইংরেজ সেনারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। দিনের দিন গেটিং সাহেবের সেনার সংখ্যা কমতে রইল। গেটিং সাহেব একদিন নিজেই মৃত্যুর সম্মুখীন হয়ে, ভয়ে হাড়মাসড়ার জঙ্গল ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলেন।
বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। হাড়মাসড়ার আদিবাসী সাঁওতালরা আবার একটু একটু করে নিজেদের ঘরবাড়ি নতুন করে সাজিয়ে আগের মতোই শান্তিতে বসবাস করতে শুরু করল। ম্যারি মেমসাহেব আর ফিরে যাননি ইংরেজ মহলে। জঙ্গলকে ভালোবেসে, ডুলুংকে ভালবেসে রয়ে গেছেন হাড়মাসড়ায়। সাঁওতালি রীতি মেনে বিয়েও হয়ে গেছে ডুলুং ও ম্যারি মেমসাহেবের। বেশ সুখেই কাটছিল দিনগুলো, কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হল না। গেটিং সাহেব হাড়মাসড়ার জঙ্গল থেকে পরাজিত হয়ে পালিয়ে গিয়ে চুপটি করে বসে ছিলেন না। নিজের মতো করে ঘুঁটি সাজিয়ে তৈরি হচ্ছিলেন প্রতিশোধ নেওয়ার আশায়। একজন গুপ্তচর মারফত তিনি হাড়মাসড়ার যাবতীয় খবর রাখছিলেন। আর তক্কে তক্কে ছিলেন সুযোগের। আর সেই সুযোগ আসতে খুব বেশি সময় লাগেনি।
সেদিন ঘোর অমাবস্যার রাত। তার ওপর জঙ্গলের ভেতর। তাই রাতটা অন্য রাতের চেয়ে একটু বেশিই যেন ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল। বছরের এই এক অমাবস্যা রাতে ডুলুংরা তাদের দেবদেবীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে উৎসবে মেতে ওঠে। সকাল থেকেই একটা সাজো সাজো রব প্রত্যেকের বাড়িতে। আর সন্ধ্যা নামতেই শুরু হয় তাদের পরব। মেয়েমরদরা সকলে সুন্দর করে সেজে মেতে ওঠে নাচে। মহুয়ার নেশার সাথে সাথে ধামসা-মাদলের বোলে এমনিতেই কোমর দুলে ওঠে সবার। ম্যারি মেমসাহেবকে আজ নিজের হাতে সাঁওতালি পোশাকে সাজিয়ে দিয়েছে ডুলুং। ম্যারিও খুশিতে সবার সাথে নাচের তালে তালে পা মিলিয়েছিল। ডুলুংয়ের মাদলের তালে তালে ম্যারি কোমর দুলিয়ে নাচতে নাচতে কখনও কখনও লজ্জায় যেন লজ্জাবতী লতার মতো গুটিয়ে পড়ছিলেন। মহুয়ার নেশায় মাতাল ডুলুং, ম্যারির লাজুক মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে যেন হারিয়ে ফেলছিল। এক সময় সে আর নিজেকে আটকে রাখতে না পেরে মাদলখানি নামিয়ে রেখে ছুটে গিয়ে ম্যারিকে কোলে তুলে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল। আর তাই দেখে মেয়েমরদদের হাসি আর থামে না। ঘরের ভেতর ঢুকে ম্যারিকে কোল থেকে নামিয়ে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো আদর করতে লাগল। এতদিন ডুলুং ম্যারিকে মেমসাহেব বলেই ডেকে আসছিল, আজ সে বলে উঠল, ‘মেমসাহেব, আজ আর তুকে মেমসাহেব লাগে নাইরে, আমার বউ লাগছে।’ ম্যারি এই ক’দিন ডুলুংয়ের সাথে থাকতে থাকতে তাদের ভাষা অনেকখানি রপ্ত করে ফেলেছিলেন। তিনিও আধো আধো ভাষায় ডুলুংকে বললেন, ‘আমি তো তুর বউ বুটি, আর তুই আমার মরদ আছিস।’ ডুলুংয়ের নেশাতুর চোখে ম্যারি যেন আজ ভালবাসার নদীর খোঁজ পেল। নিজেকে ডুলুংয়ের ভালবাসার নদীতে ভাসিয়ে দিলেন। পুরুষ আর নারীর দুটি শরীর প্রকৃতির সহজাত নিয়মে মিশে যেতে যেতে ঘরের মেঝেই মাটির মধ্যে গড়াগড়ি খাচ্ছে, ঠিক এমন সময় বাইরে থেকে ভেসে আসতে লাগল বন্দুকের আওয়াজ, তার সঙ্গে মেয়েমরদের আর্তনাদ।
তিরধনুক নিয়ে ডুলুং যেই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে গেটিং সাহেবের বন্দুক থেকে ছুটে আসা গুলি তার বুকে এসে আঘাত করে। মুহূর্তেই ডুলুং মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ডুলুংকে লুটিয়ে পড়তে দেখে ম্যারির দু’চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরতে লাগল। ডুলুংয়ের হাত থেকে তিরধনুক নিয়ে সে যেন এক বীরাঙ্গনার রূপে প্রতিরোধ গড়ে তুললেন। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া ডুলুংয়ের স্থির দু’টি চোখ এক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখছে তার ম্যারি মেমসাহেবকে। কিন্তু না, গেটিং সাহেবের বন্দুকের নলের সামনে ম্যারিও বেশিক্ষণ টিকতে পারলেন না। ইংরেজ সেনাবাহিনীর ছোড়া গুলিতে আহত হয়ে ডুলুংয়ের পাশেই লুটিয়ে পড়লেন।
চারিদিক এখন শান্ত, বন্দুকের আওয়াজ থেমেছে অনেকক্ষণ আগে। গভীর রাতের অন্ধকারে গেটিং সাহেবের মুখে চওড়া হাসি। গেটিং সাহেব ডুলুং হাঁসদার সমস্ত রকম খোঁজ রাখবার জন্যে যে গুপ্তচর নিয়োগ করেছিলেন সে আর কেউ না, ডুলুং হাঁসদার আপন খুড়তুতো ভাই বীরেন। সে এতক্ষণ জঙ্গলের ভেতর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিল গেটিং সাহেবের নারকীয় হত্যালীলা। যা সে নিজেও কল্পনা করতে পারেনি। সে গেটিং সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘সাহেব, তুই তো বুলেছিলিস ডুলুংকে বন্দি করে নিয়ে যাবি। কিন্তু এ কী করলি, ডুলুংয়ের সাথে সাথে গোটা গাঁটাকে এক্কেবারে শ্মশান করে দিলি। তোর এই নারকীয় হত্যার কুথা মানুষ যেদিন জানবেক, তোকে ঘৃণা করবেক।’
বীরেনের কথা শুনে গেটিং সাহেব মুচকি হেসে বললেন, ‘কিন্তু মানুষ এই ঘটনার কথা তো কোনও দিন জানতেই পারবে না। কেই বা জানাবে, কেউ তো আর বেঁচে নেই!’
বুক উঁচিয়ে একবুক সাহস নিয়ে বীরেন বলে উঠল, ‘আমি জানাব।’
বীরেনের কথা শুনে গেটিং সাহেব বুঝলেন একে বাঁচিয়ে রাখলে এই নারকীয় হত্যালীলার কথা একদিন এদেশের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়বে। যা থেকে ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে এদেশের মানুষ গর্জে উঠতে পারে। তাই তিনি আর দেরি না করে বন্দুক উঁচিয়ে তাক করলেন বীরেনের দিকে। ঠিক এমন সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে ডুলুংয়ের তিরের ফলা বিদ্ধ করল গেটিং সাহেবকে। মুহূর্তেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। বীরেন ছুটে গেল ডুলুংয়ের কাছে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। পঁচিশ-ত্রিশটা মানুষের মৃতদেহের মাঝে একা দাঁড়িয়ে হাহাকার করে কেঁদে উঠল বীরেন। তার কান্নার শব্দ হাড়মাসড়ার জঙ্গলে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। যে কান্না শোনার জন্য কেউ আর বেঁচে নেই।
হাড়মাসড়ার জঙ্গলের ভেতর যে গুহাটা ছিল তার সামনে গর্ত করে ডুলুং ও ম্যারির মৃতদেহ সমাধিস্থ করল বীরেন। এবং সেখানে একটা সমাধি বানিয়ে তার ওপর বড় বড় করে লিখে দিল, ডুলুংমারির জঙ্গল। হাড়মাসড়া নামটা পরিবর্তন হয়ে ডুলুংমারির জঙ্গল হল, তবে সে কথা শুধু বীরেনই জানে। সে ছাড়া আর কেউই বা জানবে।
একটা জোর ব্রেক কষে ট্রেনটা হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। জোর ঝাঁকুনিতে এতক্ষণ ঘোরে থাকা কাকাই ও নটুর সম্বিত ফিরে এল। একনাগাড়ে গল্পটা বলে গেল লোকটা। এখন সে একেবারে চুপটি করে বসে আছে কাকাই ও নটুর সামনে। কিন্তু হঠাৎ করে ট্রেনটা কেন দাঁড়িয়ে পড়ল? প্রশ্নটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতেই কাকাই জানালা খুলে তাকিয়ে দেখল বাইরে, বেশ কিছু প্যাসেঞ্জার ট্রেন থেকে নেমে নীচে দাঁড়িয়ে আছে। কৌতূহলের সঙ্গে কাকাই ও নটু দরজার সামনে গিয়ে একজন যাত্রীকে জিজ্ঞাসা করল, ‘এই যে দাদা, শুনছেন, বলি হলটা কী?’ কথা ভেসে এল, ‘আর কী হল দাদা, বড় রক্ষা পেলাম সব। ট্রেন তো লাইনচ্যুত, একটু এদিক-ওদিক হলেই…।’ কথাটা শোনামাত্র নটুর বুকটা ছ্যাঁক করে উঠল। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘এখন তা হলে কী হবে?’ নটুর কথা শুনে কে একজন বলে উঠল, ‘কী আর হবে, ট্রেনের ভেতরেই শুয়েবসে রাত কাটাতে হবে।’ কাকাই একজনকে জিজ্ঞাসা করল, ‘এটা কোন জায়গা?’ উত্তর এল, ‘এখান থেকে দুর্গাপুর বেশি দূরে নয়!’
নটু ও কাকাই ফিরে এসে নিজেদের সিটে বসল। কিন্তু এদিক-সেদিক তাকিয়ে কোথাও আর সেই লোকটির দেখা পেল না। নটু উদ্বেগের সাথে জিজ্ঞাসা করল, ‘কাকাই, লোকটা কোথায় গেল?’
‘কোথায় আর যাবে, আর-পাঁচজনের মতো ট্রেন থেকে নীচে নেমেছে।’ বলল কাকাই।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, রাতের অন্ধকারকে দূরে সরিয়ে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। এখনও ট্রেন ছাড়ার কোনও খবর নেই। অদ্ভুতভাবে কাল রাতের লোকটা বেপাত্তা। তার আর দেখা মেলেনি।
সিদ্ধান্তটা রাতেই নিয়ে ফেলেছিল কাকাই, নাকি অন্য কেউ? ঠিক বোঝা গেল না। কাকাইয়ের সিদ্ধান্তে বেশ অবাক হল নটু, কাকাই তো সচরাচর এমনটা করে না। তা হলে? নটুর মাথার মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল।
এবারের মতো কুলাকুস্মান্ডির প্রোগ্রাম বাতিল। পরিবর্তে তারা যাবে ডুলুংমারির জঙ্গলের খোঁজে। সেইমতো ভোরের আলো ফুটতেই তারা ট্রেন থেকে নেমে দুর্গাপুরের উদ্দেশে বাসে রওনা দিয়েছে।
দুর্গাপুর পৌঁছতে খুব বেশি সময় লাগেনি, ঘড়ির কাঁটায় সকাল আটটা। বাস থেকে নেমে বাসস্টপেজের কাছেই কাকাই ও নটু কিছু সময়ের জন্য একটা হোটেলে উঠল। স্নানটান সেরে কিছুক্ষণের বিশ্রাম। তারপর হোটেল থেকে বেরিয়ে হাড়মাসড়া যাওয়ার বাস খুঁজতে লাগল। এদিক-সেদিক খোঁজ করেও হাড়মাসড়া যাওয়ার বাস তো দূর-অস্ত, কেউ এই নামের কোনও জায়গার সন্ধানই দিতে পারল না। যা দেখে নটু কাকাইকে বলল, ‘কাকাই, আমার মনে হচ্ছে লোকটা সারা রাত ধরে বানিয়ে বানিয়ে একটা আজগুবি গল্প শুনিয়েছে। যার সত্যতা খুঁজতে যাওয়া আমাদের আর এক বোকামির পরিচয়।’
কাকাই নটুর কথার কোনও উত্তর না দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে একমনে কী যেন চিন্তা করতে লাগল। ঠিক এমন সময় পিছন থেকে একটা লোক বলে উঠল, ‘আপনারা হাড়মাসড়া যাবেন তাই তো, ওই যে সামনের বাসটা দেখছেন, ওটায় উঠে বসুন। আর কনডাক্টরকে বলে হাতিরামপুরের একটা টিকিট কেটে নেবেন। হাতিরামপুরে নেমে বাঁদিকে একটা রাস্তা পাবেন, সেটা ধরে সোজা এগিয়ে যাবেন। তা হলেই গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন।’ নটু খেয়াল না করলেও কাকাই লক্ষ্য করল, কাল রাত্রে ট্রেনের লোকটাকে যে চাদরখানি সে দিয়েছিল, সেই চাদর এই লোকটার গায়ে জড়ানো।
লোকটার কথামতো কাকাই ও নটু বাসটার কাছে এগিয়ে গেল। এই একটামাত্র বাসের খোঁজ মিলল, যে বাসটায় হাড়মাসড়া যাওয়া যাবে। তাও আবার ছাড়তে অনেক দেরি, বারোটা পঁয়তাল্লিশে। অপেক্ষা ছাড়া কোনও গতি নেই। কাকাই ও নটু একটা হোটেলে খাওয়াদাওয়া সেরে একেবারে টিকিট কেটে বাসে উঠে পড়ল। বাসের কনডাক্টরের সাথে কথা বলে কাকাই জানতে পারল, দুর্গাপুর থেকে হাতিরামপুরে পৌঁছতে বিকেল চারটে হয়ে যাবে। রাতে ভাল ঘুম হয়নি, তাই বাসের সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজল কাকাই ও নটু।
কাকাই ও নটু যখন বাস থেকে নামল, তখনও মাথার উপর গনগনে সূর্যের তাপ ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। বাস থেকে নেমে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল ওরা। না কোনও মানুষজন তো দূর-অস্ত একটা গরুছাগলেরও দেখা নেই। পিচ রাস্তার গায়ে একটা বকুল গাছ। গাছটার ঠিক নীচেই একটা ছোটমতো প্রতীক্ষালয়। যার গা-ঘেঁষে একটা পিচ রাস্তা চলে গেছে বাঁদিক বরাবর। সবকিছু দেখে নটু বলে উঠল, ‘আমরা কি কোনও ভুল সিদ্ধান্ত নিলাম কাকাই। আদৌও কি লোকটা ঠিক বলল? ডুলুংমারির জঙ্গলের সত্যিই কি কোনও বাস্তবতা আছে? লোকটা আমাদের যে কাহিনি শোনাল, তাতে করে তো হাড়মাসড়া গ্রামের নামই কারও জানার কথা নয়?’ একসাথে অনেকগুলো প্রশ্ন নটুর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। নটুর প্রশ্ন শুনে কাকাই বলে উঠল, ‘এত অল্পে সিদ্ধান্তে পৌঁছলে হবে? চল, এই রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে যাই।’
কাকাই ও নটু পিচ রাস্তা ধরে এগোতে থাকল। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর একটা রেললাইন, রেললাইন পার হতেই সামনে তাকিয়ে দেখল ওরা, পিচ রাস্তাটা কুমারী মেয়ের সিঁথির মতো জঙ্গলকে দু’ভাগে ভাগ করে এঁকেবেঁকে চলে গেছে জঙ্গলের ভেতর। ওরা এগিয়ে যেতে থাকল। জঙ্গলের ভেতর কিছুটা এগিয়ে যেতেই ওরা একটা গ্রাম দেখতে পেল। যা দেখে নটু যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। নটু বলে উঠল, ‘কাকাই চলো, গ্রামের ভেতর ঢুকে কাউকে স্ববিস্তার জিজ্ঞাসা করা যাক।’
কাকাই চুপ। সে যেন কোনও ভাবনায় ডুব দিয়েছে। ভাল করে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল, পিচ রাস্তাটা গ্রামটাকে পাশে রেখে আরও জঙ্গলের গভীরে চলে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে কাকাই বলল, ‘চল, আরও কিছুটা এগিয়ে যাই।’ গ্রাম থেকে একটু এগিয়ে যেতেই পিচ রাস্তাটা শেষ, শুরু হয়েছে লাল মোরামের রাস্তা। ওরা দু’জন এগিয়ে যেতে থাকল জঙ্গলের ভেতর।
হঠাৎ করেই নটু রাস্তার বাঁপাশে একটা ঝোপের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ‘কাকাই, কাকাই’ বলে ঝোপের দিকে আঙুল বাড়াল। তাকিয়ে দেখল কাকাই, ততক্ষণে ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসেছে কোটা কোটা খান চার মোষ, তার পিছু পিছু আরও। সঙ্গে গরুর পাল। কাকাই বলে উঠল, ‘ভয় পেয়ে গেলি নাকি! গ্রামের মানুষ তাদের গৃহপালিত গবাদি পশুদের নিয়ে জঙ্গলে চরাতে গিয়েছিল। অবেলা হতেই তারা বাড়ির পথে।’
গরু, মোষের পালের অনেকটা পিছনে জনা চারেক মানুষ। তাদের কাছাকাছি আসতেই লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখল নটু। সে লক্ষ্য করল, লোকগুলো তাদের সাথে কথা না বললেও কেমন অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখছে। ওদের চোখের চাহনি বলে দিচ্ছিল ওদের চোখে হাজারো প্রশ্ন। ধীরে ধীরে কাকাই ও নটু আরও বেশ কিছুটা এগিয়ে গেল। ওরা যত এগিয়ে চলল রাস্তার দু’পাশের জঙ্গল ততই গাঢ় হতে লাগল। এতক্ষণ গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে সূর্যের আলো উঁকি দিচ্ছিল। সময় যত গড়াতে লাগল সূর্যের আলো কমতে লাগল। সবকিছু দেখে নটু বলল, ‘কাকাই, আর এগোনো কি ঠিক হবে? সন্ধে হয়ে এল যে।’ কাকাইয়ের মুখে মুচকি হাসি। সে বলল, ‘তুই কি ভয় পাচ্ছিস?’ কাকাইয়ের কথার জবাবে নটু বলল, ‘ভয় পাব কেন, তুমি তো আছ। তবে কি না অচেনা জায়গা তার ওপর জঙ্গল, অন্ধকার নামলে…।’ নটু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই কে একজন বলে উঠল, ‘বাবুরা কোথায় যাবেন?’ নটু ও কাকাই ভাল করে তাকিয়ে দেখল লোকটার দিকে। লোকটার পরনে একটা লুঙ্গি, গায়ে সাদা গেঞ্জি, ডান দিকের কাঁধে একটা চাদর ভাঁজ করে রাখা। হাতে একখান লাঠি। কাকাই বলে উঠল, ‘না, মানে আমরা…।’ আরও কিছু বলার আগেই লোকটা বলে উঠল, ‘ডুলুংমারির জঙ্গলে যাবেন তো।’
লোকটার মুখের কথা শুনে কাকাই ও নটু চমকে গেল। অবাক হয়ে একে অপরের মুখপানে চাওয়াচাওয়ি করতে থাকল। এবার কাকাই জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কী করে জানলেন, আমরা ডুলুংমারির জঙ্গলে যাব?’
‘না, মানে এর আগেও আপনাদের মতো দু’একজন ভদ্রলোক এসেছিলেন ওই জঙ্গলের খোঁজে। তাই ভাবলাম আপনারাও…।’
‘ও তাই। তা ডুলুংমারির জঙ্গল এখান থেকে কতটা?’
‘খুব দূরে নয় বাবু। আর একটু এগিয়ে গেলেই এই বড় রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে একটা সরু রাস্তা জঙ্গলের ভেতরে চলে গেছে। সেটা ধরে খানিক এগিয়ে যাবেন, তা হলেই…। কিন্তু বাবুরা, সেখানে পোঁছতে তো আপনাদের রাত হয়ে যাবে। এই গভীর জঙ্গলের ভেতর, তার ওপর রাতের বেলা, সেখানে যাওয়া কি আপনাদের ঠিক হবে? তার চেয়ে চলুন না আমাদের গাঁয়ে রাত বাস করে, সকালে যাবেন।’
মুখে না বললেও নটুর মনের ভেতর একটা ভয় কাজ করছিল। তাই লোকটার কথা শোনামাত্র সে বলে উঠল, ‘লোকটা মন্দ বলেনি কাকাই।’
কাকাই লোকটাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘এ জঙ্গলে এখন ভয়ের কি কিছু আছে? মানে কোনও জংলি পশু, এই ধরুন বাঘ, হায়না, হাতি?’
‘না বাবু, বাঘ-হায়নার কোনও ব্যাপার নেই। তবে এ জঙ্গলে বুনোহাতি প্রায়ই দল বেঁধে আসে। তাদেরই একজন দলছুট হয়ে এ জঙ্গলে রয়ে গেছে। গরু, মোষ চরাতে যাওয়া বাগালেরা হামেশাই তার দেখা পাই। ভীষণ বদমেজাজি। এখনও পর্যন্ত আমাদের এলাকার পাঁচজনকে খুন করেছে। আর মাঝে মাঝেই দু’একটা বিশাল আকারের সাপ দেখা যায়।’
লোকটার মুখে বুনোহাতি আর সাপের কথা শুনে আবারও নটুর বুকটা ছ্যাঁক করে উঠল।
কাকাই লোকটাকে বলল, ‘আসলে, কালই আমাদের কলকাতা ফিরতে হবে। তাই জঙ্গলটা একবার দেখে যেতে চাই। এমনিতেই রাতে চাঁদ উঠবে, আর তাছাড়া আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আছে।’
নটু লোকটার দিকে চেয়ে দেখল কাকাইয়ের কথা শুনে তার মুখে একটা মুচকি হাসি। কাকাই লোকটাকে তাদের সঙ্গ দেওয়ার জন্য বলল। কাকাইয়ের কথার উত্তরে সে জানাল, ‘ভয়ের তেমন কিছু নেই, আপনারা এগিয়ে যান। আমি আপনাদের সাথে না গেলেও জানবেন আছি।’ একথা বলেই লোকটা চোখের নিমেষে জঙ্গলের মধ্যেই যেন মিলিয়ে গেল।
নটু ও কাকাই ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে রইল জঙ্গলের ভেতর। বড় রাস্তা ছেড়ে ওরা যখন জঙ্গলের সরু রাস্তা ধরল, তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। সন্ধ্যা হলেও যেহেতু জঙ্গল, তাই চাপ চাপ অন্ধকার ইতিমধ্যে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। আর অদ্ভুত রকম ভাবেই আকাশে এখনও চাঁদের দেখা মেলেনি। কাকাই ব্যাগের ভেতর থেকে টর্চ বের করে, সেই আলোয় ভরসা করে এগিয়ে যেতে লাগল। ইতিমধ্যে ঝিঁঝি পোকার ডাকের সাথে জঙ্গলের যত শেয়াল তাদের চিরাচরিত শব্দ হুক্কি হুয়া ছেড়ে বিভিন্ন সুরে ডেকে উঠল। কখনও কখনও শেয়ালের ডাক বাচ্চাছেলের কান্নার সুরে ভেসে বেড়াতে লাগল সারা জঙ্গলময়। এবার সত্যি সত্যি নটু ভয় পেয়ে গেল। তার শরীরের প্রত্যেকটি রোম খাড়া, হাড়কাঁপানি ভরা শীতেও তার সারা শরীর বেয়ে অনর্গল ঘাম ঝরতে শুরু করেছে। কাকাই ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সাহস জুগিয়ে নটুকে বলল, ‘আর কিছুক্ষণ, তা হলেই আকাশে চাঁদ উঠবে। এতক্ষণ মেঘে সে ঢাকা পড়েছিল।’
শেয়ালের ডাকের সাথে সাথে এবার জঙ্গলের কত জানা অজানা পাখি কর্কশ স্বরে ডাকতে শুরু করেছে। তবে এত সবের মাঝেও হাসনুহানার একটা মিষ্টি গন্ধ মন ভরিয়ে দিচ্ছে। আর সেই মিষ্টি গন্ধের সঙ্গে হঠাৎ করেই একটা বোটকা বোটকা গন্ধ নাকে লাগতে শুরু করেছে। নটু বুঝতে না পারলেও কাকাই বুঝতে পারল, এই গন্ধটা আর কিছুর নয়, সেই খুনে দাঁতাল হাতিটার গায়ের গন্ধ। তাই কাকাই নটুকে নিয়ে এক জায়গায় চুপিসারে দাঁড়িয়ে রইল। নটু ও কাকাই পরিষ্কার বুঝতে পারছে, তাদের অদূরেই বড় কোনও জন্তু জঙ্গলের ঝোপঝাড় ঠেলে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। নটু আর একটু হলেই ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিল, কিন্তু কাকাই তার মুখটা চেপে ধরে ইশারায় বুঝিয়ে দিল এখন কোনও রকম শব্দ করা মানে একেবারে মৃত্যর সম্মুখীন হওয়া।
বেশ কিছুটা সময় অতিক্রান্ত, ইতিমধ্যে আকাশের মেঘ সরে গিয়ে একটা ফুটফুটে চাঁদ উঠেছে। সেই চাঁদের আলোর জোৎস্না ছড়িয়ে পড়ছে গোটা জঙ্গলের ভেতর। এ যেন ঠিক ম্যাজিকের মতো, হঠাৎ করেই জঙ্গলের ভেতর চাপ চাপ অন্ধকার কেটে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। আর সেই আলোতেই কাকাই ও নটু দেখতে পেল, তাদের একেবারে গা-ঘেঁষে দাঁতাল খুনে হাতিটা সরসর করে পেরিয়ে গেল। আর দেরি না করে ওরা আবার এগোতে শুরু করল।
খানিকটা যাওয়ার পরই কাকাইরা দেখতে পেল গুহাটা। কাছাকাছি যেতেই তারা লক্ষ্য করল, গুহার সামনে একটা উঁচুমতো ঢিবি। কাকাইয়ের মনে আর কোনও সন্দেহ নেই, ট্রেনের লোকটা যে মিথ্যা বলেনি তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সে বুঝতে পেরেছে এটাই সেই গুহা, যেখানে একদিন ইংরেজদের হাত থেকে রক্ষা পেতে ডুলুং ম্যারিকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল।
একমনে কাকাই জায়গাটা পর্যবেক্ষণ করছিল। হঠাৎ করেই গুহার ভেতর থেকে একটা সড়সড় শব্দ কানে এল। কাকাই ও নটু বুঝতে পারল, গুহাটার ভেতর থেকে বড় কোনও জন্তু কিংবা সাপ তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। কাকাই নটুকে নিয়ে গুহার মুখ থেকে বেশ কিছুটা দূরে সরে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই গুহার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল বিশাল আকারের একটা পাইথন। তারপর ধীরে ধীরে পাইথনটা গুহার উপর দিকের জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। হাফ ছেড়ে বাঁচল কাকাই ও নটু। কাকাই বলে উঠল, ‘বুঝলি নটু, এখানে না এলে জানতেও পারতাম না যে, আমাদের দেশেও এতবড় পাইথন এখনও আছে।’ কাকাইয়ের কথার উত্তরে নটু শুধু জোরে একটা আওয়াজ করল, ‘হুঁ।’
আকাশে এখন গোটা রুটি চাঁদ, তার জোৎস্না ছড়িয়ে পড়ছে জঙ্গলের ভেতর। চারিদিক দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। কাকাই একটু এগিয়ে গিয়ে একটা ঝোপ থেকে কয়েকটা অজানা সুগন্ধি বন ফুলের ডাল ভেঙে নিয়ে এসে সেই ঢিপির মধ্যে দিয়ে বলতে লাগল, ‘হে বীর, তোমাদের অজানা প্রেমের মধুর কাহিনি আমাকে বিস্মৃত করেছে। আর শুধু প্রেমের কাহিনি নয়, তুমিই হয়তো পরাধীন দেশের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামী। তুমিই প্রথম শহিদ। তোমাদের প্রেম, বীরত্ব, আত্মত্যাগের কাহিনি এদেশের মানুষ না জানলেও এই গভীর জঙ্গলে তা অমর গাঁথা হয়ে আছে। আমি তোমাদের এই কাহিনি জনমানসে ছড়িয়ে দিতে অনুমতি নিয়ে গেলাম, আর এই সামান্য বনফুল তোমাদের সমাধিতে দিয়ে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়ে গেলাম।
নটু এতক্ষণ কাকাইয়ের কাণ্ডকারখানা দেখে কিছুই বুঝতে পারছিল না। এখন তার কাছেও পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার।
জোৎস্নালোকিত সে এক মায়াবী রাত, সময় যত গড়াতে থাকল, জঙ্গল যেন তত শান্ত হতে লাগল। অদ্ভুতভাবে এখন আর শেয়ালের ডাক শোনা যায়নি। জঙ্গলের অজানা পাখির কর্কশ শব্দও বন্ধ। সবুজ শান্ত সুন্দর জঙ্গলের সে এক মায়াবী রূপ। যা দেখে নটু ও কাকাই যেন সব কিছু ভুলে উপভোগ করতে লাগল। ঠিক এমন সময় বাতাসে ভেসে আসতে লাগল সেই বোটকা বোটকা গন্ধ। নটু ও কাকাই তাকিয়ে দেখল তাদের সামনে স্বয়ং যমরাজ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই খুনে দাঁতাল হাতিটা। মৃত্যু নিশ্চিত, পালাবার কোনও পথ নেই। কাকাই ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা বের করার চেষ্টা করার আগেই হাতিটা শুঁড় উঁচিয়ে বিশাল বৃংহণ তুলে তাদের দিকে ছুটে আসছে।
কিন্তু তারপর যা ঘটল তা যেন কিছুতেই বিশ্বাস করে উঠতে পারছিল না কাকাই ও নটু। হাতিটা আর তাদের মাঝখানে হঠাৎ এসে দেবদূতের মতো হাজির হল একটা মাঝবয়সি লোক। তাকে দেখামাত্রই খুনে দাঁতাল হাতিটা জঙ্গলের ভেতর কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল। তারপর লোকটা নটু ও কাকাইকে উদ্দেশ করে বলে উঠল, ‘বাবুরা আমার পিছন পিছন আসেন, একদম ভয় পাবেন না।’
লোকটার কণ্ঠস্বর নটু ও কাকাইয়ের ভীষণ চেনা চেনা লাগল। তারা ভাল করে লোকটার দিকে তাকিয়ে দেখল ট্রেনে ডুলুংমারির গল্প বলা সেই লোকটা, দুর্গাপুর বাস স্টপেজে হাড়মাসড়ার ঠিকানা বলে দেওয়া লোকটা, এ জঙ্গলে ঢোকার মুখে রাস্তা বলে দেওয়া সেই লোকটার সঙ্গে এই লোকটার কী অদ্ভুত মুখের মিল। যেন একটাই লোক বারবার রূপ বদলে তাদের কাছে এসেছে।
নটু কিছু বলতে যাচ্ছিল, কাকাইয়ের ইশারায় সে চুপ করে গেল। ওরা লোকটার পিছন পিছন হাঁটতে লাগল। একটা সময় ওরা এমন একটা জায়গায় পৌঁছল, যা দেখে সহজেই অনুমান করা যায় এখানে কোনও কালে বসতি ছিল। কাকাইয়ের বুঝতে অসুবিধা হল না এটাই হয়তো সেই হাড়মাসড়া গ্রামের কঙ্কাল শব। যা কতিপয় আদিবাসী সাঁওতাল মানুষদের রক্ত, ঘাম ঝরিয়ে বহু কষ্টে গড়ে তোলা গাঁয়ের অস্তিত্বের প্রমাণস্বরূপ সাক্ষী হয়ে পড়ে আছে।
কাকাই ও নটু যেন একটা ঘোরের মধ্য দিয়ে লোকটার পিছু পিছু হাঁটছিল। হঠাৎ লোকটার কর্কশ কণ্ঠস্বরে সম্বিৎ ফিরে পেল। লোকটা বলল, ‘বাবুরা ওই যে দূরে একটা বকুল গাছ দেখছেন, সকালে ওখান দিয়ে শহরে বাস যায়। আপনেরে নিশ্চিন্ত হয়ে এগিয়ে যান, আর কোনও ভয় নাই।’
নটু বলে উঠল, ‘এতদূর যখন এলেন, আর একটু না হয় এগিয়ে দিলেন।’ লোকটা মৃদুস্বরে বলে উঠল, ‘ইচ্ছে থাকলেও আমার উপায় নাই, রাতের অন্ধকার কেটে গেছে বাবু, ওই দেখো ভোরের আলো ফুটে উঠছে। আমাকে তাড়াতাড়ি জঙ্গলে ফিরতে হবেক।’
কাকাই কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই লোকটা হঠাৎ করেই কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। আর সেখানে পড়ে আছে একটা চাদর। যা দেখে নটু ও কাকাই একে অপরের মুখের দিকে হাঁ হয়ে চেয়ে রইল। দু’টি মানুষের স্থির চোখে যেন কত অজানা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে।
°°°
চিত্রণ: মৃণাল শীল






