বিদায়ের সংকলন
পা র্থ জি ৎ মি শ্র
ভোর তখনও পুরোপুরি ফোটেনি, যখন হরিশ মুখার্জি কাশীপুর হল্টে এসে পৌঁছলেন।
স্টেশনে যাওয়ার পথটা তখনও রাতেরই দখলে। পাতলা কুয়াশার এক মিহি চাদরে চারদিক ঢাকা। পায়ের নীচের বুনো ঘাসে জমে থাকা শিশিরে মৃদু আলো চিকচিক করছিল।
ফিকে নীল রঙের সাইনবোর্ডটার সামনে এসে তিনি থমকে দাঁড়ালেন।
কাশীপুর হল্ট।
বয়সের ছাপে সাদা রং চৌচির হয়ে ফেটে গেছে। এক কোণ আলগা হয়ে ঝুলছে, হালকা বাতাসে দুলে দুলে মৃদু কড়মড় শব্দ তুলছে।
হরিশ অনেকক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন বোর্ডটার দিকে।
‘আর মাত্র এক মাস…।’
কথাটা তিনি নিজেকে বললেন না।
বললেন স্টেশনটাকে।
পুরনো পিতলের চাবিটা তালার ভেতর ঢুকে প্রথমে একটু আটকে গেল। কয়েকবার ঘষা খাওয়ার পর অবশেষে ঘুরল। ওয়েটিং রুমের কাঠের দরজাটা যেন এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুলে গেল।
এক চেনা গন্ধ তাঁকে স্বাগত জানাল— ধুলো, পুরোনো কাগজ আর স্যাঁতসেঁতে কাঠের গন্ধ।
হাঁটার লাঠিটা দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে রেখে তিনি কোনায় বহু বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁশের ঝাঁটাটা তুলে নিলেন।
অন্ধকারের বুক চিরে প্ল্যাটফর্মটা দূরে চলে গেছে— যেন এক অসমাপ্ত বাক্য।
হরিশ ঝাঁট দিতে শুরু করলেন।
ধীরে।
নিয়মিত ছন্দে।
নিঃশব্দ নিষ্ঠায়।
ধুলো।
শুকনো পাতা।
পাখির ঝরে-পড়া পালক।
এদিক-ওদিক ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট বিষ্ঠা।
আর রেললাইনের ওপারের গাছ থেকে উড়ে আসা হলুদ ফুল।
১৯৮১ সালে যখন হরিশ প্রথম এখানে এসেছিলেন, তখন এই স্টেশন ছিল প্রাণে ভরা।
হকারদের হাঁকডাক কানে বাজত। বাচ্চারা পায়রার পেছনে ছুটে বেড়াত। কুলিরা মাথায় বা কাঁধে এমন সব বোঝা বয়ে নিয়ে যেত, যেন তা মানুষের পক্ষে বহন করাই অসম্ভব।
প্রতিটি ট্রেন যেন সঙ্গে করে নিয়ে আসত হাসি, তর্ক, আশা আর দুঃখের অজস্র গল্প।
এখন দিনে মাত্র চারটে যাত্রীবাহী ট্রেন এখানে দাঁড়ায়।
আগামী মাস থেকে…
একটাও আর দাঁড়াবে না।
রেল বোর্ড শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তটাই নিল, যেটা সবাই অনেক দিন ধরেই জানত।
যে স্টেশনে আর যাত্রী আসে না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে আর স্টেশন থাকে না— দেওয়াল-ঘেরা একটা স্মৃতিতে পরিণত হয়।
প্ল্যাটফর্ম পরিষ্কার হয়ে গেলে হরিশ একটা ছোট কাঠের মই তুলে নিয়ে স্টেশনের ঘড়িটার নীচে গিয়ে রাখলেন।
সাবধানে মইয়ে উঠে পিতলের চাবিটা তালায় ঢুকিয়ে ঘোরাতে শুরু করলেন।
ছত্রিশ বার।
একেবারে নিখুঁত ছত্রিশ পাক।
ঘড়ির ভেতরের গিয়ারগুলো যেন ক্লান্ত ধাতব হৃৎস্পন্দনের মতো সাড়া দিল।
টিক।
টিক।
টিক।
‘এই তো… এবার ঠিক হল’, হরিশ মুচকি হেসে বললেন। ‘ডিউটিতে কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ো না।’
সূর্য ওঠার ঠিক আগেই তাঁর পরের অতিথিরা এসে হাজির হল।
তিনটে ভবঘুরে কুকুর।
সবচেয়ে বয়স্ক বুড়ো।
লালি, যার কান দুটো যেন কখনও স্থির হয়ে থাকতে জানত না।
আর সবচেয়ে ছোট টিকিট— যেদিন হরিশ ওকে প্রথম দেখেছিলেন, সেদিন একটা ফেলে দেওয়া রেলের টিকিট চিবোচ্ছিল। সেই থেকেই নাম হয়ে গেছে টিকিট।
‘সুপ্রভাত। তোমরা তো দেখছি একেবারে সময় মেনে হাজির হও’, হরিশ হেসে বললেন। ‘আফসোস, ট্রেনগুলো যদি তোমাদের কাছ থেকে একটু সময়নিষ্ঠা শিখত!’
পুরনো স্টিলের টিফিন কৌটো থেকে ভাত আর খাবারের উচ্ছিষ্ট মিশিয়ে তিনি তিনটে দাগ-ধরা টিনের বাটিতে ঢেলে দিলেন।
কুকুরগুলো খেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
আর হরিশ ধীরে ধীরে হেঁটে গেলেন ছাউনির নীচে ঝুলে থাকা পিতলের স্টেশন-ঘণ্টাটার দিকে।
ঘণ্টার গা থেকে ধুলো যত্ন করে মুছে দিলেন তিনি। ধাতব পিতলটা তখনই ভোরের প্রথম আলোয় মৃদু ঝলমল করে উঠল।
তারপর ঘণ্টাটা একবার বাজালেন।
স্বচ্ছ, টনটনে সেই ধ্বনি ফাঁকা রেললাইন বেয়ে অনেক দূর ভেসে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে সকালের নিস্তব্ধতায় মিলিয়ে গেল।
কোনও ট্রেন তার জবাব দিল না।
পূর্ব দিগন্ত ধীরে ধীরে আলোয় ভরে উঠতে লাগল।
হরিশ হেঁটে এসে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের একেবারে কিনারায় দাঁড়ালেন।
দিনের এই সময়টুকুই ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয়।
শুধু সূর্য ওঠে বলে নয়।
সূর্য তো সর্বত্রই ওঠে।
কিন্তু এখানে, সূর্যটা যেন ঠিক দুটো রেললাইনের মাঝখান থেকেই উঠে আসে— যেন প্রতিটি ভোর একটা টিকিট কেটে, সময়মতো এসে পৌঁছয়।
আলো ধীরে ধীরে রেললাইনের ওপর ছড়িয়ে পড়ল।
মুহূর্তের মধ্যেই ইস্পাতের দুটো রেখা যেন রুপোলি ফিতের মতো ঝলমল করতে করতে দূরের দিগন্তের দিকে হারিয়ে গেল।
অনেকেই তাঁকে জিজ্ঞেস করেছে, এই একাকিত্বে তাঁর ভয় করে না?
তাদের চোখে ভেসে উঠত এক বৃদ্ধ মানুষের ছবি— যিনি এক পরিত্যক্ত, জনশূন্য স্টেশনের দেখভাল করে চলেছেন।
তারা শূন্যতাকে নিস্তব্ধতা ভেবে ভুল করত।
কিন্তু হরিশ এমন এক সত্য জেনে গিয়েছিলেন, যা পৃথিবীর খুব কম মানুষই বোঝে।
স্টেশন কখনও সত্যিই ফাঁকা হয় না।
সে বহন করে নিয়ে বেড়াত প্রতিধ্বনি।
ছেলে ট্রেনে উঠে পড়ার পরও প্ল্যাটফর্ম থেকে ভেসে আসা মায়ের শেষ ডাক।
একজন মানুষের তাড়াহুড়ো করে বলা সেই ‘ক্ষমা করো’— যে জানত, আর কোনও দিন সে ফিরে আসবে না।
ছুটে চলা ট্রেনের জানলা দিয়ে ছুড়ে দেওয়া এক প্রতিশ্রুতি, যা সময় নিঃশব্দে ভেঙে দিয়েছিল।
কিন্তু সেইসব কণ্ঠস্বর কখনও হারিয়ে যায় না।
তারা থেকে যায়।
স্টেশনের ইটের গায়ে, বেঞ্চের কাঠে, এমনকী রেললাইনের ইস্পাতের শরীরেও।
অনেকেরই ধারণা ছিল, তাঁর কাজ ছিল ট্রেনের দেখাশোনা করা।
আসলে, তিনি কখনও ইঞ্জিনের দিকে তাকাতেন না।
তাঁর চোখ খুঁজে ফিরত জানলাগুলোকে।
ট্রেন ছিল শুধু বাহন।
আসল যাত্রাগুলো লেখা থাকত অন্য কোথাও।
পঁয়তাল্লিশ বছরের অসংখ্য ভোর আর সন্ধ্যা তাঁকে একটা কথাই শিখিয়েছিল—
প্রতিটি প্ল্যাটফর্ম, প্রতিটি দিন, নীরবে জমা করে মানুষের অসংখ্য গল্প।
স্তব্ধতারও নিজস্ব যাত্রী থাকে।
হরিশ দেখেছেন, এই গ্রামেরই নবজাতক শিশুরা একদিন বড় হয়ে শহুরে টানে কথা বলা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ফিরে এসেছে।
দেখেছেন, লাজুক হাসি আর কাঁপা চোখে বিদায় নেওয়া নববধূকে— বহু বছর পরে সেই একই মানুষ নাতি-নাতনির হাত ধরে আবার এই স্টেশনে নেমেছেন।
দেখেছেন, সেনাবাহিনীর পোশাক পরে কত তরুণ ট্রেনে চেপে চলে গেছে, আর ট্রেন চোখের আড়াল হয়ে যাওয়ার অনেকক্ষণ পর পর্যন্ত তাদের মায়েরা স্থির দৃষ্টিতে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছেন।
কেউ ফিরেছে বুকভরা পদক নিয়ে।
কেউ আর কোনও দিনই ফেরেনি।
হরিশ শিখেছিলেন, আনন্দের মানুষ ট্রেন থামার আগেই একটু সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
দুঃখ একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
আশা সবচেয়ে ভারী সুটকেসকেও হালকা করে দেয়।
আর অনুতাপ…
খালি ব্যাগকেও অসহনীয় ভারী করে তুলতে পারে।
প্রথমবার ট্রেনে চড়া মানুষদের তিনি চিনে ফেলতেন তাদের টিকিট আঁকড়ে ধরে রাখার ভঙ্গি দেখে।
প্রেমিক-প্রেমিকারা শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত একে অপরের চোখের দিকেই তাকিয়ে থাকত।
বাবারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উপদেশ দিয়ে যেতেন।
আর মায়েরা, ‘আর কিছু দেব না’ বলেও শেষমেশ ব্যাগের ভেতর একটু খাবার গুঁজে দিতেন।
আসলে বিদায়গুলো কোনও দিনই শুধু ট্রেনকে ঘিরে ছিল না।
ওগুলো ছিল জীবনের সেই সব বিদায়ের মহড়া, যেগুলো একদিন না একদিন প্রত্যেক মানুষকেই দিতে হয়।
তাই কেউ যখন স্টেশনটাকে সচল রাখার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাত, হরিশ শুধু মৃদু হেসে দিতেন।
তিনি জানতেন—
নিজের দায়িত্ব পালন করতে করতেই তিনি পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে বিদায় জমিয়ে চলেছেন।
হাজার হাজার মানুষের জীবনকে তিনি দেখেছেন মাত্র কয়েকটি ক্ষণিক মুহূর্তের জন্য একে অপরকে ছুঁয়ে যেতে।
প্রতিদিন সন্ধ্যায়, শেষ ঘোষণার শব্দ মিলিয়ে গেলে আর স্টেশন ধীরে ধীরে তার অস্বস্তিকর নীরবতায় ডুবে গেলে, হরিশ একই কাজ করতেন।
টিকিট কাউন্টারের নীচের ড্রয়ার খুলে তিনি বের করতেন ছোট্ট একটা চামড়ার বাঁধানো খাতা।
বয়সের ছাপে তার মলাট ফেটে গেছে, বছরের পর বছর যত্নে হাতে নেওয়ার ফলে প্রান্তগুলো মসৃণ হয়ে উঠেছে।
খাতার ভেতরে কোনও নাম নেই।
কোনও ট্রেন নম্বর নেই।
এমনকী কাউকে শনাক্ত করা যায়, এমন কোনও তারিখও নেই।
আছে শুধু কিছু মুহূর্ত।
তিনি সেগুলো লিখে রাখতেন ছোট ছোট, অলংকারহীন বাক্যে।
যেন ঘটনাগুলোর শরীর থেকে সব অপ্রয়োজনীয় অংশ সরিয়ে দিয়ে শুধু সত্যিটুকু রেখে দিচ্ছেন।
তিন নম্বর প্ল্যাটফর্ম।
আট বছরের এক ছেলে বাবার হাত কিছুতেই ছাড়তে চাইছিল না।
বাবা হেসেছিলেন।
মা কেঁদেছিলেন।
ট্রেনটা চোখের আড়াল হওয়ার পরেই ছেলেটা প্রথম হাসল।
কিছু সাহস আসে, ট্রেন চলে যাওয়ার পর।
আরও কয়েক পাতা পরে—
এক বৃদ্ধা।
লাল শাল।
যে ছেলে আর কোনও দিন ট্রেন থেকে নামেনি, তার জন্য প্রায় এক বছর ধরে রোজ অপেক্ষা করেছেন।
আশা, আত্মসম্মানের চেয়েও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে।
হরিশের মনে ছিল প্রতিটি মুখ।
বিদায়ের আগে প্রতিটি থমকে যাওয়া মুহূর্ত।
প্রতিটি পুনর্মিলন, যেখানে একটিমাত্র আলিঙ্গন বছরের পর বছর জমে থাকা দূরত্বকে মুছে দিয়েছে।
আর প্রতিটি নীরব বেদনা, যা ভদ্র একটুখানি হাসির আড়ালে লুকিয়ে থেকেছে।
বেশিরভাগ যাত্রী ট্রেন ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্টেশনকে ভুলে যায়।
হরিশ কোনও দিন ভুলতেন না।
তারা যে মুহূর্তগুলো ফেলে রেখে যেত, তিনি সেগুলো যত্ন করে তুলে রাখতেন।
আগমন আর প্রস্থানের মাঝখানের সেই অল্প সময়টুকুতেই মানুষের মুখোশ সবচেয়ে সহজে খুলে যায়।
আনন্দ তখন আর আটকে রাখা যায় না।
ভয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সময় ফুরিয়ে আসছে বলেই ভালবাসার কথাগুলোও বিনা সংকোচে মুখ থেকে বেরিয়ে আসে।
হরিশ যেন সারা জীবন কাটিয়েছেন সেইসব গল্পের নীরব রক্ষক হয়ে— যে গল্পগুলো বাঁচতে বাঁচতেই মানুষ এত ব্যস্ত থাকে যে, নিজেরাও সেগুলো টের পায় না।
তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি অচেনা মানুষ এমন এক গল্প বয়ে বেড়ায়, যা কোনও একটিমাত্র যাত্রার মধ্যে ধরে না।
একটা কাঁপা হাত।
একটা অসমাপ্ত বিদায়।
অথবা অচেনা কারও নিঃস্বার্থ দয়ার ছোট্ট একটি মুহূর্ত—
এগুলোই অনেক সময় একজন মানুষের জীবন সম্পর্কে বছরের পর বছর কথোপকথনের চেয়েও বেশি সত্য বলে দেয়।
তাঁর খাতাগুলো ডায়েরি ছিল না।
সেগুলো ছিল সাধারণ মানুষের অসাধারণ মানবিকতার এক নীরব সংরক্ষণাগার।
সাংবাদিক
‘আপনার সম্বন্ধে কিছু লিখতে হবে। পাঠকরা জানতে চাইবে এত বছর এত ছোট স্টেশনে কী করে জীবনযাপন করলেন… কী অনুভূতি…’। মায়া সেন খালি প্ল্যাটফর্মটির একটি ছবি তুললেন। ম্লান বিকেলের কোমল রোদে একা দাঁড়িয়ে থাকা হরিশের অবয়বটিকে তিনি ক্যামেরার ফ্রেমে ধরে রাখলেন।
হরিশ এক গাল হাসি দিলেন। চোখের অভিব্যক্তি তা একটা ছোট বাচ্চাদের মতো, মায়ার মনে হল।
‘আমার ব্যাপারে কিছু লেখার মতন পাবেন না… কোনও হারানো গল্প নেই।’
সময়টা ছিল সেই ধরনের শান্ত নভেম্বরের বিকেল— যখন সূর্যের আলোয় পৃথিবীর কঠিনতম জিনিসও যেন একটু নরম, একটু বিষণ্ণ সুন্দর হয়ে ওঠে।
দেশের অন্যতম প্রধান জাতীয় পত্রিকার একজন বিশিষ্ট কলাম-লেখক হিসেবে মায়া পরিচিত ছিলেন সাধারণের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অসাধারণ গল্প খুঁজে বের করার জন্য। বিস্মৃতপ্রায় শহর, হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য, বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠান— এসব নিয়ে তাঁর লেখা প্রতিবেদনগুলি শুধু পুরস্কৃতই হয়নি, তৈরি করেছিল এক গভীর অনুরাগী পাঠকমহল।
তবুও, কাশীপুর রেলস্টেশনের সেই নির্জন প্ল্যাটফর্মে পা রাখার সময় তাঁর মনে হয়েছিল, এই নির্ধারিত কাজটিও হয়তো আর-পাঁচটা নস্টালজিক লেখার মতোই হবে।
তাঁর সম্পাদক শিরোনাম দিয়েছিলেন—
‘কাশীপুর হল্ট স্টেশনের শেষ দিনগুলি।’
স্টেশনটি যেন তার নীরবতাকেও এক ধরনের শান্ত মর্যাদার সঙ্গে বহন করছিল। মায়া অপেক্ষাকক্ষের দিকে এগিয়ে গেলেন— যেটি একইসঙ্গে স্টেশন অফিস হিসেবেও ব্যবহৃত হত। তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো সেখানে পুরনো দিনের ব্যস্ত প্ল্যাটফর্ম, ছুটে চলা ট্রেন আর হারিয়ে যাওয়া সময়ের কিছু ছবি দেখতে পাবেন।
কিন্তু তার বদলে তিনি দেখলেন, তিনটি অলস চারপেয়ে বাসিন্দা মেঝের ওপর আরামে শুয়ে আছে। তাঁর আগমনে তাদের চোখ পর্যন্ত খুলল না।
দূরের দেওয়ালের পাশে রাখা ছিল তিনটি কাঠের তাক। সেগুলিতে যত্ন করে সাজানো ছিল পুরনো, সময়ের ছাপ পড়া কয়েকটি ডায়েরি।
মায়া বিস্মিত হয়ে তাকালেন।
‘এগুলো কি স্টেশনের পুরনো রেকর্ড?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
হরিশ মৃদু হাসলেন। তাঁর মুখের ক্লান্তির রেখাগুলির মধ্যে হঠাৎ যেন এক কোমল স্নেহের ছায়া ফুটে উঠল।
‘না।’
‘তা হলে এগুলো কী?’
হরিশ ধীরে তাঁর টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি পুরনো নোটবুক বের করলেন।
‘যে গল্পগুলো রেল কোনওদিন লিখে রাখে না।’
কৌতূহলী হয়ে মায়া নোটবুকটি খুললেন।
সেখানে ছিল না কোনও ট্রেনের নম্বর, সময়সূচি কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের হিসাব। প্রতিটি পাতায় লেখা ছিল স্টেশন দিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত— যেগুলো সাধারণত সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়, কিন্তু হরিশ যত্ন করে ধরে রেখেছিলেন।
পাতার পর পাতা জুড়ে ফুটে উঠেছিল সাধারণ মানুষের অসাধারণ কিছু মুহূর্ত। নোটবুকটি যেন কোনও ডায়েরি নয়— বরং মানুষের অনুভূতি, অপেক্ষা আর বিচ্ছেদের এক ছোট্ট সংগ্রহশালা।
মায়া যে প্রশ্নগুলির তালিকা তৈরি করে এনেছিলেন, হঠাৎ সেগুলো তাঁর কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হল।
‘আপনি এগুলো সব লিখেছেন?’ তিনি ধীরে জিজ্ঞেস করলেন।
হরিশ মৃদু হাসলেন এবং মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
‘মানুষ… আমরা আসার মুহূর্তগুলো মনে রাখি’, তিনি বললেন। ‘উত্তেজনা। অপেক্ষা… আর প্ল্যাটফর্মে প্রিয় কাউকে প্রথম দেখতে পাওয়ার সেই মুহূর্ত।’
জানালার বাইরে ফাঁকা রেললাইনের দিকে তাঁর দৃষ্টি চলে গেল।
‘কিন্তু বিদায়গুলো…।’
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
‘সেগুলো হারিয়ে যায়।’
একটু থেমে তিনি ধীরে মাথা নাড়লেন।
‘কেউ কখনও সেগুলো মনে রাখার কথা ভাবে না।’
ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।
মায়া তাঁর হাতে ধরা নোটবুকটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি এসেছিলেন একটি পুরনো রেলস্টেশনের গল্প লিখতে। অথচ খুঁজে পেলেন এমন একজন মানুষকে, যিনি মানুষের জীবনের হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলোর নীরব রক্ষক হয়ে আছেন।
হরিশ ধীরে নোটবুকটি বন্ধ করলেন। তাঁর আঙুল স্নেহভরে ছুঁয়ে গেল তার পুরনো মলাট।
‘একটি বিদায়’, তিনি প্রায় নিজের সঙ্গেই কথা বলার মতো করে বললেন, ‘সবচেয়ে ছোট কথোপকথন… অথচ সবচেয়ে দীর্ঘ স্মৃতি।’
তারপর একটু থেমে বললেন,
‘তবে একটি বিদায় আছে… যেটা আমি আজও লিখে উঠতে পারিনি।’
হরিশ ধীরে ঘুরে মায়ার দিকে তাকালেন।
মায়ার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।
‘আমি শুনছি’, তিনি বললেন।
হরিশ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন, আবার যেন তাঁর দৃষ্টির ওপারে বহু দূরে হারিয়ে গেলেন। মায়ার মনে হল, সেই চোখের গভীরে কোনও পুরনো অনুতাপ জমে আছে।
‘ত্রিশ বছর আগে, মীরা নামে এক তরুণী প্রতি রবিবার এই স্টেশনে আসত। সবসময় ওই একই পুরনো, রোদ-বৃষ্টিতে ক্ষয়ে যাওয়া বেঞ্চটির পাশে দাঁড়িয়ে থাকত। প্রতিটি ট্রেন আসার সময় তার চোখ থাকত দরজার দিকে। সে অপেক্ষা করত এক তরুণের জন্য— আরাভের জন্য।’
‘কিন্তু…?’ মায়া আস্তে করে বললেন।
হরিশ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
‘আরাভ কোনওদিন আসেনি। রবিবারগুলো মাসে বদলে গেল। তারপর একদিন মীরা আসা বন্ধ করে দিল। আমি ভেবেছিলাম গল্পটা সেখানেই শেষ— যেমন আরও অনেক গল্প শেষ হয়; একটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি আর অপেক্ষায় ক্লান্ত একটি হৃদয় নিয়ে।’
তিনি থামলেন। মায়া অনুভব করলেন, ঘরের নীরবতার মধ্যেও তাঁর নিজের হৃৎস্পন্দন যেন শোনা যাচ্ছে।
‘বছর কেটে গেল’, হরিশ ধীরে ধীরে বলতে থাকলেন। ‘কয়েক সপ্তাহ আগে, স্টেশনের শেষ হিসাবের সময়, কর্মীরা পুরনো হারানো জিনিসের বাক্স খুলেছিল। কয়েক দশকের ধুলো, ভুলে যাওয়া পার্সেল আর দাবি না করা জিনিসের নীচে চাপা পড়ে ছিল একটি পুরনো চামড়ার ব্রিফকেস।’
‘তার ভিতরে ছিল তিনটি জিনিস— একটি রেলের টিকিট, একটি শুকিয়ে যাওয়া জুঁই ফুল, আর মীরার নামে লেখা একটি সিল করা চিঠি।’
মায়ার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
‘চিঠিটা অন্য এক গল্প বলেছিল। আরাভ বিদেশে চাকরি পেয়েছিল। ভারত ছাড়ার আগে সে মীরাকে লিখেছিল— শেষবারের মতো যেন তারা এই স্টেশনেই দেখা করে। তার শেষ ট্রেনে ওঠার আগে, তারা যেন একে অপরকে বিদায় জানাতে পারে।’
‘কিন্তু ভাগ্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। চিঠি রাখা সুটকেসটি ভুল করে অন্য এক যাত্রীর লাগেজের সঙ্গে চলে যায়। তারপর সেটি হারানো জিনিসের ঘরে তালাবন্দি হয়ে পড়ে থাকে— ধীরে ধীরে ধুলো আর বিস্মৃতির নীচে চাপা পড়ে যায়।’
অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর মায়া ফিসফিস করে বললেন,
‘চিঠিটা কোনওদিন মীরার কাছে পৌঁছয়নি।’
হরিশ ধীরে মাথা নাড়লেন।
‘আমি ওটা ফেলে দিতে পারিনি। তাই ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলাম…।’
তাঁর কণ্ঠ মিলিয়ে গেল।
ঠিক তখনই বাইরে দিনের শেষ ট্রেনটি হুইসেল বাজিয়ে ধীরে ধীরে স্টেশন ছেড়ে চলে গেল।
হরিশ তাকিয়ে রইলেন খালি প্ল্যাটফর্মের দিকে। মায়াও চলে যাওয়া ট্রেনটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন, কিন্তু তাঁর চোখ যেন আর কিছু দেখছিল না। তাঁর মন তখন বহু দূরে, এক অসমাপ্ত গল্পের মধ্যে হারিয়ে গেছে।
হরিশের ডেস্কের ড্রয়ারে পড়ে ছিল একটি বিদায়— যে বিদায় ত্রিশ বছর ধরে অপেক্ষা করছিল, শুধু একবার শোনা হওয়ার জন্য।
পরের মাসেই স্টেশনটি নিজেই চিরতরে নীরব হয়ে যাবে।
অনুসন্ধান
অনুসন্ধানটা চলেছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে— পুরনো ভোটার তালিকা, কলেজের নথিপত্র, অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী এবং বহুদিনের বিস্মৃত পরিচিতদের খুঁজে বের করা।
প্রথমদিকে মায়া একজন সাংবাদিকের মতোই এগিয়েছিলেন। তিনি সময়ের হিসাব তৈরি করেছিলেন, তারিখ মিলিয়ে দেখেছিলেন, প্রতিটি ছোট সূত্রের পেছনে ছুটেছিলেন এবং অস্পষ্ট বা অসম্পূর্ণ উত্তরে থেমে যেতে রাজি হননি।
কিন্তু দিন যত এগোতে লাগল, এই অনুসন্ধান ধীরে ধীরে অন্য এক অর্থ নিতে শুরু করল।
চিঠিটা আর শুধুমাত্র তাঁর খুঁজে পাওয়া একটি পুরনো নথি ছিল না; সেটি হয়ে উঠেছিল অন্য কারও অসমাপ্ত জীবনের এক ভঙ্গুর অংশ— যা এখন তাঁর হাতে এসে পড়েছে।
ধুলো জমা পুরনো অফিসে বসে তিনি সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা বিবর্ণ হয়ে যাওয়া রেকর্ড ঘেঁটেছেন। এমন সব নামের সূত্র খুঁজেছেন, যাদের মধ্যে ব্যবধান পেরিয়ে গেছে কয়েক দশক। চেষ্টা করেছেন এমন মানুষদের আবার এক সুতোয় বাঁধতে, যারা নিজেদের জীবনে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছেন, আর এমন স্মৃতিগুলিকে ফিরিয়ে আনতে, যেগুলো প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল।
অনেক দরজা খুলেছিল, কিন্তু তার ওপারে অপেক্ষা করছিল আরেকটি বন্ধ পথ।
কিছু পুরনো পরিচিত মানুষ মনে করতে পেরেছিলেন টুকরো টুকরো কিছু কথা— কলেজের বন্ধুত্ব, একটি রেলযাত্রা, কিংবা এমন এক তরুণের কথা, যে একসময় অবিরাম বলত এমন এক মেয়ের কথা, যার সঙ্গে সে আবার দেখা করার স্বপ্ন দেখত।
আবার কেউ কেউ শুধু অবাক হয়ে মাথা নাড়তেন। এত বছর আগের চাপা পড়ে যাওয়া একটি গল্পের জন্য এখনও কেউ এতটা চেষ্টা করছে— এই ভাবনাই যেন তাঁদের বিস্মিত করত।
কখনও কখনও মায়ার মনে প্রশ্ন জাগত— নীরবতার মধ্যে থিতু হয়ে যাওয়া কিছু মানুষের জীবনে তাঁর কি আবার ঢুকে পড়ার অধিকার আছে?
হয়তো অতীতকে পিছনে ফেলে আসারও কোনও কারণ থাকে।
হয়তো কিছু প্রশ্নের উত্তর না পাওয়াই নিয়তি।
কিন্তু প্রতিবার যখন তিনি সেই না-খোলা খামটির দিকে তাকাতেন, তাঁর মনে পড়ে যেত হরিশের কথা—
‘তাদের কী অনুভব করা উচিত, সেটা তুমি বলবে না। শুধু তাদের হাতে তুলে দেবে সেই জিনিসটা, যা ত্রিশ বছর আগে তাদের কাছে পৌঁছনো উচিত ছিল।’
এই কথাটিই তাঁর উদ্দেশ্য হয়ে উঠেছিল।
তিনি অতীতকে নতুন করে সাজাতে চাইছিলেন না। কোনও পুরনো প্রেমকাহিনিকে জোর করে আবার জীবিত করাও তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না।
তিনি শুধু ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন একটি সত্য— যে সত্যটি অকারণে অনেক বেশি দেরি করে ফেলেছিল।
অবশেষে তিনি মীরাকে খুঁজে পেলেন।
সে তখন শান্তভাবে থাকত শান্তিনিকেতনে। দীর্ঘদিন স্কুলশিক্ষিকা হিসেবে কাজ করার পর অবসর নিয়ে এখন সঙ্গীত শেখাত।
মায়া যখন তার হাতে সেই না-খোলা খামটি তুলে দিলেন, মীরা কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল।
‘এই হাতের লেখা…।’
সে ফিসফিস করে বলল।
চিঠিটি খোলার আগে সে সেটিকে কিছুক্ষণ নিজের বুকের কাছে চেপে ধরে রাখল।
এক সপ্তাহ পরে মায়া আরাভকে খুঁজে পেলেন।
জীবনের বেশিরভাগ সময় বিদেশে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাটানোর পর, সে ভারতে ফিরে এসেছিল এবং অবসর জীবন কাটাচ্ছিল।
মায়া যখন কাশীপুর হল্টের কথা তুললেন, আরাভ অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
‘ট্রেন ছাড়ার সময় প্রায় হয়ে যাওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করেছিলাম’, সে ধীরে বলল। ‘যখন ও এল না… আমি ভেবেছিলাম, ও নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে।’
তাদের কেউই বিয়ে করেনি।
তবে এমন নয় যে, তারা কয়েক দশক ধরে একে অপরের অপেক্ষায় জীবন থামিয়ে রেখেছিল।
জীবন শুধু অন্য পথে বয়ে গিয়েছিল।
ছিল পেশা, দায়িত্ব, বন্ধুত্ব— আর কিছু অনুত্তরিত প্রশ্ন।
মায়া শুধু একটি কথাই জিজ্ঞেস করেছিলেন—
‘আপনারা কি আর একবার কাশীপুরে ফিরবেন?’
কেউই সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়নি।
তবে কেউই না-ও বলেনি।
সাক্ষাৎ
পরের রবিবার, ফ্যাকাশে শীতের আকাশের নীচে, মায়ার সঙ্গে মীরা প্রথমে এসে পৌঁছল।
‘স্টেশনটা এখনও প্রায় তেমনই আছে, যেমনটা আমার মনে ছিল’, মীরা ধীরে বলল।
মায়া কিছু বললেন না।
কয়েক মিনিট পর আরাভ প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াল।
মায়া নিঃশব্দে সরে গিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা হরিশের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। দু’জনেই একে অপরের দিকে তাকালেন। তাঁদের ভেতর দিয়ে যেন একসঙ্গে বয়ে গেল অগণিত অনুভূতির ঢেউ। সেই মুহূর্তে তাঁরা নিজেরাও বুঝে উঠতে পারছিলেন না ঠিক কী অনুভব করছেন। তাঁদের চোখ তখন কয়েক পা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দু’জন মানুষের দিকে স্থির হয়ে ছিল।
দীর্ঘ এক মুহূর্ত ধরে আরাভ আর মীরা শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
কেউই তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে গেল না।
ধীরে ধীরে তারা গিয়ে বসল সেই পুরনো বেঞ্চগুলোর একটিতে— যেখানে একসময় অসংখ্য যাত্রী ট্রেনের অপেক্ষায় বসে থেকেছে।
দূরে দাঁড়িয়ে রইলেন হরিশ আর মায়া। তাঁরা মুখ ফিরিয়ে নিলেন, দৃষ্টি মেলে দিলেন দিগন্তের দিকে।
কিছু কথোপকথন শুধু তাদেরই প্রাপ্য, যারা সেই জীবন নিজেরা বয়ে নিয়ে এসেছে।
অবশেষে আরাভ কথা বলল।
‘আমি ভেবেছিলাম, তুমি আসতে চাওনি।’
মীরা বিষণ্ণ এক হাসি হাসল।
‘আমি ভেবেছিলাম, তুমি অপেক্ষা করতে চাওনি।’
সে দু’জনের মাঝখানে সেই না-খোলা খামটি রেখে দিল।
‘তোমার চিঠিটা আমি গত সপ্তাহে পেয়েছি।’
আরাভ কিছুক্ষণের জন্য চোখ বন্ধ করল।
তারপর খুব শান্তভাবে তারা দু’জনেই হেসে উঠল— কোনও কিছু মজার ছিল বলে নয়, বরং ত্রিশ বছর পর সত্যিটা এতটাই সহজ মনে হচ্ছিল যে, বিশ্বাস করাই কঠিন ছিল।
তারা কথা বলল যতক্ষণ না বিকেলের ছায়া ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম জুড়ে লম্বা হয়ে ছড়িয়ে পড়ল।
তারা কথা বলেনি হারিয়ে যাওয়া বছরগুলোর জন্য। বরং কথা বলেছে সেই জীবনগুলোর কথা, যেগুলো তারা আলাদাভাবে বেঁচে নিয়েছে। আর কথা বলেছে ভাগ্যের সেই অদ্ভুত মমতার কথা— যা তাদের জীবনে শেষবারের মতো একটি কথোপকথনের সুযোগ এনে দিয়েছিল।
যখন তারা উঠে চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হল, তখন কোনও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হল না।
কিছু যাত্রা আবার শুরু হয় না।
তারা শুধু খুঁজে পায় সেই সমাপ্তি— যেটা এতদিন প্রাপ্য ছিল।
শেষ ঘণ্টাধ্বনি
কাশীপুর হল্টের শেষ দিনটি এসেছিল এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা নিয়ে। খবর ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে, আর বহু বছর পরে সেই ছোট্ট স্টেশনটিতে যেন আবার প্রাণ ফিরে এসেছিল।
পুরনো দিনের রেলকর্মীরা ফিরে এসেছিলেন— কারও হাতে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সাদা-কালো ছবি, কারও চোখে জমে থাকা কত বছরের স্মৃতি। গ্রামের মানুষ এসেছিল ফুল নিয়ে। শিশুরা ছুটে বেড়াচ্ছিল প্ল্যাটফর্মের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। এমনকী স্টেশনের তিনটি ভবঘুরে কুকুরও যেন আজকের দিনের ব্যতিক্রমী অর্থটা বুঝে গিয়েছিল।
বিকেলের যাত্রীবাহী ট্রেনটি যখন ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াল, জানালার পাশে দাঁড়ানো যাত্রীরা মাথা বাড়িয়ে হাত নাড়লেন। যেন একটি স্টেশনকে নয়, একটি পুরনো সম্পর্ককে বিদায় জানাচ্ছেন।
হুইসেলের দীর্ঘ শব্দ ভেসে উঠল।
এক এক করে দরজাগুলো বন্ধ হয়ে গেল।
ইঞ্জিনে প্রাণের সঞ্চার হল। চাকা ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করল।
হরিশ তখন দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই পিতলের ঘণ্টাটির নীচে।
পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে তাঁর হাত এই ছোট্ট অথচ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে এসেছে। কত ট্রেন এসেছে, কত ট্রেন চলে গেছে— প্রতিটি আগমন আর প্রস্থানের সাক্ষী ছিল তাঁর সেই হাত।
আজও তিনি ঘণ্টার দড়ি টানলেন।
স্বচ্ছ, ধাতব সেই শব্দ প্ল্যাটফর্মের ওপর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ বাতাসে ভেসে থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল সন্ধ্যার ম্লান আলোয়।
ট্রেনটি এগিয়ে গেল। তারপর বাঁকের আড়ালে মিলিয়ে গেল।
স্টেশনে নেমে এল নীরবতা।
কিন্তু এ সেই চেনা নীরবতা নয়— যে নীরবতা পরের ট্রেন আসার অপেক্ষায় কিছুক্ষণ থেমে থাকে।
এ ছিল শেষের নীরবতা।
পঁয়তাল্লিশ বছরের মধ্যে এই প্রথম, আর কোনও পরবর্তী ট্রেনের জন্য তাঁকে প্রস্তুত হতে হবে না।
হরিশ ধীরে ধীরে তাঁর ছোট্ট অফিসঘরে ফিরে এলেন। টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো চামড়ার মলাটের খাতাটি খুললেন। বহু বছরের অসংখ্য নথির শেষে লিখলেন তাঁর শেষ লাইন—
শেষ ট্রেনটি রওনা দিল।
এই স্টেশন ধরে রেখেছে অগণিত বিদায়ের স্মৃতি।
আজ সেই বিদায়েরই একটি হয়ে গেল সে।
তিনি খুব যত্ন করে খাতাটি বন্ধ করলেন।
বাইরে তখনও স্টেশনের ঘড়িটি টিকটিক করে চলেছে— যেন সময়কে জানিয়ে দিচ্ছে, সব যাত্রা শেষ হলেও কিছু অপেক্ষা থেকে যায়।
উপসংহার
কয়েক মাস পরে, কাশীপুর হল্ট আবার খুলে গেল। তবে এবার আর ট্রেনের স্টেশন হিসেবে নয়— একটি ছোট্ট ঐতিহ্যবাহী জাদুঘর হিসেবে, যেখানে সংরক্ষিত ছিল ট্রেন নয়, বরং সেই সাধারণ মানুষদের জীবনকথা, যারা একদিন এই প্ল্যাটফর্ম দিয়ে হেঁটে গিয়েছিল।
মায়া সেনের বেস্টসেলার বই ‘দ্য ম্যান হু কালেক্টেড গুডবাইস’ পড়ে দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আসতে শুরু করল।
কাচের বাক্সের ভিতর যত্ন করে রাখা ছিল হরিশের পুরনো নোটবুকগুলো। ছাউনির নীচে এখনও ঝুলে ছিল সেই পিতলের ঘণ্টা, আর স্টেশনের ঘড়িটাও আগের মতোই সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
মানুষ এখানে এসে যতক্ষণ থাকার কথা ভাবত, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় কাটিয়ে দিত।
কেউ হাসত।
কেউ চোখের জল লুকোত।
কেউ বাইরে বেরিয়ে বহুদিনের বুড়ো হয়ে যাওয়া বাবা-মাকে ফোন করত।
আবার কেউ এমন বন্ধুদের বার্তা পাঠাত, যাদের সঙ্গে বছরের পর বছর কথা হয়নি।
একদিন বিকেলে, একটি ছোট্ট মেয়ে তার দাদুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘উনি এগুলো সব লিখেছিলেন কেন?’
বৃদ্ধ মানুষটি মৃদু হেসে বললেন,
‘যাতে মানুষ কখনও ভুলে না যায় যে সাধারণ মানুষের জীবনও খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
হরিশের শেষ নোটবুকটি খোলা ছিল তার শেষ পাতায়।
‘মানুষ ভাবে ট্রেন শুধু মানুষকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যায়।
সেটা সত্যি।
কিন্তু ট্রেন সঙ্গে করে নিয়ে যায় প্রতিশ্রুতি, আক্ষেপ, আশা, ক্ষমা চাওয়া, স্বপ্ন— আর কখনও কখনও এমন কিছু শেষ কথা, যা দু’জন মানুষ একে অপরকে জীবনে শেষবারের মতো বলে যায়।
আমি কখনও ট্রেনের চলে যাওয়া আটকাতে পারিনি।
তাই আমি শিখেছিলাম, বিদায়গুলোকে ধরে রাখতে।’
বেরোনোর পথের পাশে রাখা ছিল একটি খালি নোটবুক। তার উপরে লেখা ছিল একটি ছোট্ট আমন্ত্রণ—
‘এমন একটি স্মৃতি রেখে যান, যেটি আপনি কখনও হারাতে চান না।’
প্রতিদিন সেই পাতাগুলো ভরে উঠত বিদায়ের গল্পে, আবার ফিরে পাওয়ার মুহূর্তে, ক্ষমা চাওয়ার কথায় আর কৃতজ্ঞতায়।
সন্ধ্যা যখন ধীরে ধীরে কাশীপুরের আকাশে নেমে আসত, তখন তত্ত্বাবধায়ক নোটবুকটি বন্ধ করতেন এবং নিভিয়ে দিতেন সব আলো।
হরিশের সংগ্রহ শেষ হয়ে যায়নি।
তা শুধু নতুন নতুন হাতে পৌঁছে গিয়েছিল।
°°°
চিত্রণ: মৃণাল শীল






