Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

মঈনুল হাসানের ছোটগল্প

তালাশ

ম ঈ নু ল  হা সা ন

হাতের লাঠিতে ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে নিত্যদিনের মতো ঝাঁকড়া হিজল গাছটার নীচে এসে দাঁড়াল হারাধন পাল। বেলা এখনও তেতে ওঠেনি। কালিন্দীর বুকের ওপর দিয়ে আশ্বিনের গা-সওয়া তপ্ত হাওয়া বইছে। সুরেশ পাটনির নাও ঘাটের কাছেই বাঁধা। অন্যান্য ঘাটজীবীদের আনাগোনা শুরু হলেও সরব হয়নি নদীপাড়। তাই নদী পারাপারের কোলাহলও অনেকটা কম।
হারাধন পাল হিজল গাছের ধুপছায়ার নীচে বাঁশের পাটাতনের ওপর গা এলিয়ে বসল। কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক তাকিয়ে আধবোজা চোখে নিমগ্ন হল তার আপন অভ্যাসের জগতে। অন্যদিন ঘাট পার হতে আসা পরিচিত জনার সাথে নিচু স্বরে দু’একটা কথা বললেও আজ একেবারে ঝিম মেরে বসে থাকল সে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে গাঁয়ের মানুষের সমাগম বেড়ে গেল সেখানে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও সুরেশ পাটনিকে দেখতে না পেয়ে ভেতরে ভেতরে একটু যেন অস্থিরই হল। বিড় বিড় করে নিজের মনেই প্রশ্ন করে, এত দেরি করছে ক্যান সে? শরীর খারাপ করল নাকি?
নদীর ক্ষীণমধ্যে বুকসমান জল থইথই করে। যদিও চৈত্র-বৈশাখে শুকিয়ে একেবারে হাঁটুর নীচে নেমে আসে জল। মাটির রসে তখন ফিরে আসে লুক্কায়িত যৌবন। কোথাও কোথাও নদীর উদাম বুক সবুজ ফসলের সমারোহে আদিগন্ত হেসে ওঠে। ধূসর জলের কালিন্দী তখন হয় সবুজের সর্পিল মাঠ।
অধীর অপেক্ষায় হারাধনের গলা শুকিয়ে চৈত্রের সেই রুক্ষ মাটির মতোই চৌচির হয়ে যায়। একসময় সুরেশকে ঘাটের দিকে আসতে দেখেই সে ব্যস্তসমস্ত হয়ে হাত ইশারা করে ডাকল। ঘাটের দিকে না গিয়ে সুরেশ পাটনি হারাধনের কাছেই এসে দাঁড়াল চুপচাপ। মুখে খানিকটা বিরক্তি। উন্মুখ হয়ে হারাধন কিছু একটা জিজ্ঞাসার আগে কী যেন ভেবে নিল খানিক। কিন্তু তার আগেই সুরেশ বলল, তুমি আইজও আবার আসছ?
হোসেনের কোনও খবর আছে? তার খবর কিছু জানো? হারাধন আকুল হয়ে প্রশ্ন করল।
আমি তো কইলাম, কোনও খবর পাইলেই তোমারে জানামু। তুমি আর কত তালাশ করবা? আর কত অপেক্ষা করবা? এইবার তুমি বাড়িত যাও।
তুমি তো অনেকদিন আমাগো বাড়ির পর যাও না। আমাগো বাড়ির পথ একেবারে ভুইলা গেছ।
ঠিক আছে, যামুনে।
কত লোক গাঁও থিকা নিত্য গঞ্জের দিকে সাত সদাই নিয়া যায়। কত কামে এদিক-ওদিক যায়। আবার তারা তোমার নাওয়ে পার হইয়া গাঁয়ে ফিরাও আসে। কত মানুষের খোঁজখবর লইয়া তুমি আসো। তাগোরে হোসেনের কথা একটু জিগাও।
তুমি বাড়ি যাও হারাধন। আমি খবর লইয়া একদিন আসমুনে।
দুই আশ্বিন গত হইছে। আইজ দুই বছর ধইরা তুমি একই কথা খালি কও।
হারাধন অবুঝের মতো অবিশ্বাসী দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইল সুরেশের দিকে। তার এই সকরুণ চাহনি সুরেশের বুকে বঁড়শির মতো গিয়ে বিঁধে।
তুমি বাড়ি যাও এইবার। কামের আইজ ম্যালা দেরি হইছে। আমার শরীরের হাল বেশি ভালা না। সাঁঝের আগেই বাড়িত ফিরা যামু।
কথা আর না বাড়িয়ে সুরেশ পাটনি ঘাটের দিকে এগিয়ে যায়। হারাধন তারপরও পাটাতনে বিছানো হোগলার চাটাইয়ে বসে গাঁয়ের লোকের আনাগোনা দেখে, ব্যস্ত নাও পারাপার দেখে। ঝাপসা চোখ কী যেন খুঁজে বেড়ায় শুধু। সবার মধ্যে সে নমিতা আর হোসেনের ছায়াই খুঁজে বেড়ায় বারবার। বুকের মাঝের কষ্টের কথাগুলো শুধুই আড়মোড়া ভেঙে তল খোঁজার বৃথা চেষ্টা করে। কোনওটা আবার কূলের কাছে আছড়ে পড়ে অবহেলায় হারিয়েও যায়। শেষে কোনও কথাই আর ঠাঁই খুঁজে পায় না।
ঘাটলা-ঘেঁষে মান্দার, করচ আর হিজলের গাছগুলো নুয়ে থাকে জলের বুক ছুঁয়ে। মান্দারের লাল লাল ফুলগুলো ভেসে যায় নদীর হালকা স্রোতের সাথে। বাতাসে দোল খাওয়া হিজলের লাল-সাদা পুষ্পমঞ্জরিতে অব্যক্ত কথার মালা স্তব্ধ হয়ে থাকে সারাদিন। ওদিকে লাল ঠ্যাঙা একটা মাছরাঙা টুপ করে জলে ডুব দিয়ে ঠোঁটে মাছ নিয়ে আবার এসে বসে করচের নিচু ডালে। হারাধন দূর থেকে এসব দেখে শৈশবের ভাবনায় হারিয়ে যায় কেবল।
ছোটবেলার কথা মনে পড়লে দারুণ পুলকিত হয় হারাধন। তেমন কোলাহল ছিল না কোথাও। ঘাটের দু’পাশে ছিল শুধু বুনো জংলার ঝাড়। বড় বড় গাছের জমাট ছায়ার নীচে শান্তির সুনসান নিস্তব্ধতা। ঘাট থেকে জল নিতে এসে মা সুর করে বলতেন; সুন্দর মান্দার ফুল জলের গায়ে ভাসে, কালো তোকমার ফুল সবাই ভালবাসে।
আজ তোকমার সেই ঝাড়গুলো নেই। তবে বুড়ো মান্দার গাছটা এখনও আছে। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে কাঁটার ডালে লাল পাপড়ির আড়ালে কেশর দোলানো ফুলগুলো কেমন আরক্ত হয়ে থাকে। ফুলের অমন নয়ন মনোহরকান্তির সাথে কেবল স্বর্গীয় কোনও ফুলের রূপেরই উপমা চলে।
মা আরও বলতেন, অমৃতের সন্ধানে দেবতা ও অসুরকুল যখন সমুদ্রমন্থন করছিলেন তখন দেবী লক্ষ্মীর সাথে উদ্ভাসিত হয়েছিল স্বর্গের এই কল্পতরু। রূপের শোভায় সবার নজর কাড়লেও গন্ধহীন এ ফুলের ভেসে চলাই যেন জীবন। এ যেন তার নমিতার মতো। অন্তহীন স্রোতে তার নমিতাও যে ওই মান্দার ফুলের মতো কোথায় যেন ভেসে গিয়েছে ঠিকানাহীন। গভীর বিস্ময়ে রক্তিম এ ফুলের স্বর্গীয় রূপচ্ছটা দেখে হারাধন। আর মনে মনে এর সাথে তার দেবীর মতো মেয়ে নমিতার গভীর সম্পর্কের একটা নিরর্থক অর্থ খুঁজে বেড়ায়।
হারাধন পাল একলা বসে বেদ-পুরাণের এসব আকাশপাতাল ভাবনা নিয়ে সুরেশ পাটনির কর্মব্যস্ত দিন দেখে। আর ভাবে মানুষটা তার কতকালের চেনা! কতজনের সঙ্গে তার আলাপ-পরিচয়! সে কি চাইলে একটা খোঁজ এনে দিতে পারে না! হারাধন পাল দূর থেকে তাকিয়ে দেখল, সে বিরামহীনভাবে নাও নিয়ে কয়েকবার নদীর এ-ফোঁড় ও-ফোঁড় হয়ে পারাপার করছে মানুষ। তারপর পারানি নিয়ে সাবধানে গুঁজে রাখছে ধুতির খোঁটে।
ঘাট থেকেই দু’একবার তাকিয়ে দেখল ওপরে গাছতলায় বসা হারাধন পালকে। একসময় খানিক সুযোগ পেয়ে ধুতির কাছা খুলে কপালের ঘাম মুছে নিল আলগোছে। কোমরে গোঁজা নেতানো বিড়িটা নিয়ে হাতের তালুতে ঘষে গরম করে নিল একবার। তারপর দেশলাইর কাঠি মেরে বিড়িতে আগুন ধরিয়ে একটা সুখটান দিল সুরেশ। দৈত্যের মতো প্রকাণ্ড মান্দার গাছটার দিকে তাকিয়ে গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কী যেন ভাবল বুঝি! ফাল্গুনে গাছের শাখে শাখে আগুনের ফুলকি হয়ে গোছা গোছা মান্দার ফুল ফোটে। আগুনের এই রং কল্পনা করে বড়ই ভাল লাগে তার।

দুই

হারাধন পাল সাতপুরুষের মাটির কারিগর। ভগবান মাটিতে জীবন দিয়ে তাকে বানিয়েছেন, সেই মাটিকে আঁকড়ে ধরেই এখন তার জীবন। হাতের কারসাজিতে মাটি নিয়ে খেলা তাই জনমভর। সে খেলায় মাঝে মাঝে ছেদ পড়ে ঠিক, তবে এ এক অচ্ছেদ্য জীবনচক্র।
সাতপুরুষের নেশা ও পেশা দুইই ছিল সারাবছর ধরে ঘর-গেরস্থালির মাটির নানাবিধ তৈজসপত্র বানানো। মাটির হাঁড়ি-কলস, পিঠার খোলা, শানকি, সরাই, বাসন আরও কতকিছুই না বানাত তারা। তার নিপুণ হাতে গড়া মাটির টেপা পুতুল পাইকাররা বাড়ি বয়ে এসে নিয়ে যেত হাটে বিকাবে বলে। বিশেষ করে পূজার সময়ে তার বাবা-ঠাকুরদাদের বানানো দেবী-প্রতিমাগুলো শোভা পেত মণ্ডপে মণ্ডপে। চৌধুরিবাড়ির বারোয়ারি দুর্গামন্দির হতে শুরু করে দাসপাড়ার হরিজন মঙ্গল চৌকিদারের সৌখিন পূজামণ্ডপেও যেত তার পিতৃপুরুষের গড়া দেবমূর্তিগুলো। আসলে, বারো মাসের সব পার্বণ জুড়েই ছিল সীমাহীন কাজের অমন একরোখা ব্যস্ততা।
কয়েক বছর আগের কথা মনে পড়ে গেল হারাধনের। কুমোরশালায় বিরাম ছিল না কাজের। চাকতি ঘুরত অবিরাম। নদীর বুক থেকে নিখাদ কালো মাটি ছেনে নিয়ে ঢিবি দিয়ে রাখত বাহির বাড়ির অঙ্গনে। চাকা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেই মাটির দলা থেকে তৈরি হত এ-সব তৈজসের আদল। আর অন্য দিকে, হাতের পরম ছোঁয়ায় একটু একটু করে প্রাণ পেত প্রতিমার দেহগুলো।
হারাধন তার ঠাকুরদা হরিদাস পালের হাতযশ পেয়েছিল। তাই পূজা-পার্বণের সময়ে একাই সে তৈরি করত পাঁচ গাঁয়ের সকল দেবী-প্রতিমা। সে-সময় তার নাওয়া-খাওয়ার কোনও হিসাব থাকত না। শুধু নন্দীগ্রামই নয়, আশপাশের চৌগাছি, দেবীনগর আর রাইপুরের বেশিরভাগ প্রতিমা তৈরির বায়না নিত হারাধন নিজেই।
প্রতিমার সত্যিকার আদল হারাধনের হাত দিয়েই সব সময় তৈরি হত। তবে নমিতা তুলির আঁচড়ে রং লাগিয়ে অলংকারের নকশা গড়ে দিত মাঝে মাঝে। সে তার বাবা হারাধনকে দেখে দেখে নিজের মতো করে শিখে নিয়েছিল সব। ঘরকন্নার কাজ সামলে নিয়ে সে-ও বাবার কাজে অবিরাম সাহায্য করে যেত পূজার আগাম সময়গুলোতে। নমিতার হাত দিয়ে প্রতিমার চোখ আঁকা শেষ হলে মনে হত, অকালবোধন নয় যেন দেবীর পূর্ণাঙ্গ বোধন ঘটেছে।
হারাধনের কুমারশালা ধীরে ধীরে তখন দেবলোক হয়ে উঠত। আগাম টাকা দিয়ে বায়না করা দেবী-প্রতিমাগুলো পূজার আগেই বুঝে নিয়ে চলে যেত সবাই। মর্ত্যলোকের ঘরগুলোতে আশ্রয় নিতে শুরু করত তারা। হারাধন আর নমিতার হাতে প্রাণ পাওয়া ভক্তির প্রতিমাগুলো পুনরায় অধিষ্ঠিত হত মানুষগুলোর মনে, সেখান থেকে মনের মন্দিরে, তারপর মন্দিরের বেদিতে। দশচক্রে ভগবানও নাকি ভূত হয়; কিন্তু কুমারশালার এই চক্র চৌদ্দপুরুষ ধরে হারাধন পালদের যে ভূত বানিয়ে রেখেছে, তা থেকে মুক্তির উপায় কেবল ভগবানই জানেন।
হারাধনের শক্তি ফুরিয়ে আসে একদিন। এদিকে নমিতা তার মর্ত্যলোকের দেবীর মতোই বেড়ে উঠছিল দিনের পর দিন। সেই ভাবনায় মনের জোর ফিকে হয়ে আসে একটু একটু করে। তাই দেবমূর্তি তৈরিতে তেমন ভক্তি ও মন কোনওটাই আসে না তার। চোখের জ্যোতি কমে যাওয়ায় মায়াবী মুখের প্রতিমাগুলোতে এখন আর আগের মতো নিখুঁত আদলও দিতে পারে না সে।
পূজা-পার্বণের ধুম লাগলে উৎফুল্ল উচ্ছ্বসিত হয় হারাধন। সে সময় মূর্তি গড়ার পাশাপাশি বাড়তি কাজের চাপ বলতে হাঁড়ি-কলস বানানো আর হাটে বিক্রি করে সংসারের চাকাটুকু সচল রাখা। জীবনের অনিবার্য অনুষঙ্গকে তো আর উপেক্ষা করা যায় না। তাই আটপৌরে জীবনকে আঁকড়ে ধরে অতিক্রমের সংগ্রামী চেষ্টাই চলে নিরন্তর। সেই ভাবনাও ভাবতে হয় হারাধন পালের।

তফজেল মুন্সির ছেলে হোসেন সে-সময় কাজে লেগেছিল হারাধন পালের সঙ্গে। সুঠাম দেহ আর চওড়া বুকের ছাতিতে বেজায় দম। হারাধনের হাঁপিয়ে ওঠা মন ও দৈহিক কষ্ট দেখে কুমোরশালার বড় চাকতিটা সেই ঘুরাত অনবরত।
শনি-মঙ্গলে দুইদিন হাট বসত। পোড়ামাটির হাঁড়ি-কলসগুলো সুরেশ পাটনির নাওয়ে করে হাটে নিয়ে বিক্রি করার প্রাণান্ত চেষ্টাও ছিল তখন। নমিতা মাঝে মাঝে সঙ্গ দেয় হোসেনের। তফজেল মুন্সির বড় মুদিখানায় বিক্রি হবে এইসব। এই সুযোগে নমিতা আর হোসেনের ঠুনকো কিছু রঙিন স্বপ্নের এলোমেলো বিস্তারও ঘটে যেত নন্দীগ্রামের হাটে। দেবী লক্ষ্মীর নারায়ণ ভেবে হারাধন সব বুঝেও যেন নিশ্চুপ থাকার ব্রত নিয়েছিল তখন।
হোসেন বড় বিশ্বাসী আর কর্মঠ ছেলে। হারাধনের দারুণ পছন্দ তাকে। নমিতার সঙ্গে কথাবার্তায় বেশ ভাব-ভালবাসা দেখা যায় হোসেনের। ক্রমাগত এই সখ্য বাড়তে থাকে যা মাঝে মাঝে হারাধনকেও বিচলিত ও উৎকণ্ঠিত করে তুলত।
নমিতা আর হোসেনের এ সম্পর্কের মাঝে কোনও কলুষতা খুঁজে পায়নি হারাধন পাল। অবারিত ও অবুঝ প্রণয়ের অঙ্কুরিত বীজ বেশ পবিত্র ও স্বাভাবিকই মনে হয়েছিল তার কাছে। সকলের অগোচরে অনেক অজানা শঙ্কা বুকে ভর করে একদিন নীরবে ছোবল দিয়ে যায় তাদের সংসারে। তারপরও যাপিত জীবনের মগ্নতায় দিন-রাত্রির যূথবদ্ধ মিলনের কোনও হেরফের ঘটে না। কালের নিয়মে মাটির চক্রের মতোই কোনওরকমে ঘুরছিল হোসেন, নমিতা আর হারাধন পালের নিস্তরঙ্গ দিনগুলো।

তিন

হিজল গাছটার নীচে বসে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে হারাধন কল্পনার জগৎ থেকে আবার তার বাস্তবতার দিনগুলোতে ফিরে এল। নমিতা নেই, এটা সে বিশ্বাস করতে চায় না কোনওমতে। তার অবুঝ মন মোটেই মেনে নিতে চায় না ঘটে যাওয়া কঠিন সত্যটাকে। সারাক্ষণ এক আচ্ছন্নতার মধ্যে বসত করেই যেন তার সুখ। তাই তো যে জগতে তার ইন্দ্রপুরীর সকল দেবতার অধিষ্ঠান সেই জগতের খোঁজে খুব ব্যাকুল হয়ে ওঠে আজকাল।
আশ্বিনের এই অবেলায় তার স্পষ্ট মনে পড়ে যায় সেই পুরনো দিনের কথাগুলো। উথলে ওঠা শোকের মতো পুরনো ঘটনার দৃশ্যপট মুহূর্তেই চোখের সামনে ভেসে উঠল একটু একটু করে। জীবনে সুরের বিনাশ ঘটে অসুরের এই হঠাৎ আবির্ভাবে ভীষণ বিচলিত বোধ করে হারাধন পাল। দুঃখ ভারানত স্মৃতি মনের মধ্যে অতীত ও বর্তমানের যে সাঁকো বেঁধে দিয়েছে সেখানেই সে যেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। দাঁড়িয়ে থেকে নিরুপায় সবকিছু প্রত্যক্ষ করে।
উদ্দাম হাওয়ার তোড়জোড় ছিল সেদিন চারদিকে। শরতের আকাশে সাদা অলক মেঘের ছড়াছড়ি। আশ্বিন মাস হলেও কালিন্দীর বুক ছিল জলে টইটম্বুর। শারদীয় পূজা আসন্ন হওয়ায় কী ভীষণ কর্মযজ্ঞ ছিল তার। দিনভর অন্তহীন ব্যস্ততার মধ্যে নিশ্বাস নেওয়ার সময়টুকু পর্যন্ত ছিল না।
চৌগাছির চৌধুরিবাবুদের নায়েব জোর করেই বায়নার টাকা গুঁজে দিয়েছিল তার হাতে একটা বিশাল দুর্গা প্রতিমা গড়ে দেবার জন্যে। সাথে নিয়মমতো অমরলোকের অন্যান্য দেবতা-সহ অসুরের প্রতিমূর্তি তো ছিলই। সময় কম হওয়ায় সেই কর্মব্যস্ততার সীমা-পরিসীমা ছিল না মোটে। আগের রাতে ঠাকুরঘরের সামনের উঠোনে খড়, মাটি আর তারের বুননে ছাঁচ বানিয়ে রেখেছিল সাধ্যমতো। মধ্যরাত পর্যন্ত জেগে থাকায় ক্লান্তি আর অবসন্নতায় চোখদুটো বুজে এসেছিল ভোরের কিছুক্ষণ আগে। অনেক বেলা করে তাই ঘুম থেকে ওঠে সে।
আগের রাতে নমিতাকে বলে রেখেছিল যেন হোসেনকে নিয়ে হাটের দিকে যায়। রোদে তাতা মাটির হাঁড়িগুলো উঠোনে গাদি করা ছিল আগেই। ওগুলো বেচে ঘরখরচ মেটাতে হবে তো সংসারের! আকাশের হালও মাঝে মাঝে বেগতিক হয়ে ওঠে। কেমন থেকে থেকে আশ্বিনের দমকা হাওয়া ঢুঁ মারে গর্জন তুলে। যেকোনও সময় আঁধি নেমে লণ্ডভণ্ড করে দিতে পারে সব। আর বৃষ্টিতে একবার ভিজলে সব কষ্টই পণ্ড।
ঘুম থেকে উঠে নমিতাকে খোঁজে হারাধন। কোনও সাড়া শব্দ না পেয়ে উচ্চকণ্ঠেই ডাকে। নমিতা… কই গেলি রে মা? আকাশটা কেমুন থম ধইরা আছে। আইজ তাড়াতাড়ি যাইতে হইব। সুরেশ মাঝিরে কইয়া রাখছি। আঁধি নামার আগেই ফিরা আসতে হইব রে মা।
নমিতার জবাব শুনতে না পেয়ে তার ঘরের দিকে এগিয়ে যায় হারাধন। দরজা ঠেলে ভেতরেও তাকে খুঁজে পায় না। পরক্ষণেই বুঝতে পেরে খুশি মনে বের হয়ে দাওয়ায় গিয়ে বসে। কিন্তু সহসা ঈশানকোণের জমাট মেঘের কালো পাহাড় দেখে বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। টালমাটাল হাওয়া বইছে নদীর ওপর। বাতাসের আচমকা ধাক্কায় ঘরের চালে চড়চড় করে শব্দ হতে থাকে। মুহূর্তেই ঘোর আঁধি নেমে কালো হয়ে যায় চারদিকে।
কী মনে হতে ঘরের কোল থেকে লাফ দিয়ে নামে হারাধন। শরীরের ক্লান্তিবোধ এক ঝটকায় উবে যায় হঠাৎ। উত্তেজনায় হাত-পা কাঁপতে থাকে। মাটির দাওয়ার ওপর বাঁশের খুঁটি ধরে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে সে। আর্তনাদের শক্তি নেই, মুখ থেকে মৃদু গোঙানির মতো শব্দ হতে থাকে শুধু।
সব কিছু শূন্য হয়ে গলা শুকিয়ে আসে তার। হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেতেই ভূতের মতন চমকে ওঠে। তফজেল মুন্সি, সফদার ইমাম, গঞ্জের তারা মিয়া-সহ কয়েকজন তার উঠোনের দিকেই এগিয়ে আসছিল তখন। হারাধনকে উদ্দেশ করে তফজেল মুন্সির দরাজ গলাই সবার আগে শোনা যায়।
হারাধন, তোমার মাইয়া কই? হোসেনের লগে মনে হয় তারে আইজও দেখলাম। আমার ছেলেরে ফুঁসলাইয়া কই নিয়া গেছে? আকাশের এই হালে সুরেশ মাঝির নাওয়ে কইরা কই যায় তারা?
হারাধন জবাব দেয় না অথবা আগপাছ ভেবে কোনওই উত্তর খুঁজে পায় না। তবে তার বিড়বিড়ানিও তফজেল মুন্সি শুনতে পায় না। সফদার ইমাম অকস্মাৎ খেঁকিয়ে ওঠে।
কথা কও না ক্যানে? তোমার বড় সাহস বাড়ছে। তোমারে একঘরে করা দরকার। তোমার মাইয়ার হোসেনের লগে কীসের এত ভাব? তোমার জাত কী? আর আমাগো কী জাত? আমাগো ধর্ম মিলে? তুমি কুমার হইয়া তফজেল মুন্সির ছেলেরে কোন মন্ত্র দিয়া হাত করলা?
আহ, তুমি থামো। বড়ই অবান্তর কথা কইতাছ। সফদার ইমামের কথা শুনে তফজেল মুন্সি ভীষণ বিরক্ত হয়। হারাধনরে কথা কইবার দাও। সে-ই নিজমুখে বলুক ঘটনা কী?
একসাথে এত প্রশ্নের চাপে হারাধন কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। উত্তর হাতড়ে না পেয়ে ঘামে নেয়ে ওঠে শরীর। ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ চমক ও বাজের তীব্র আওয়াজের মধ্যে হারাধনের উঠোনের এ বাগবিতণ্ডা চাপা পড়ে যায়।
হঠাৎ একটা শোরগোল আসে ঘাটের কাছ থেকে। তারা মিয়া সেই শোরগোলের আওয়াজ পেয়ে তৎক্ষণাৎ অনুগামী হয় সেদিকে। হারাধনের মনেও আসে কুডাক। খানিক বাদে বিরাট হইচই বাঁধিয়ে তারা মিয়া আবার এক ছুটেই চলে আসে হারাধনের উঠোনে। এসেই আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে।
আমাগো সব শ্যাষ চাচা। বিরাট সর্বনাশ হইছে। মাঝ-নদীতে সুরেশ পাটনির নাও ডুবছে।
জাত-ধর্মের হিসাব নিকাশ নিয়ে ব্যস্ত হওয়া মানুষগুলো হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যায় ঘাটের দিকে। দমকা ঝোড়ো হাওয়া ও ফুঁসে ওঠা ঢেউয়ের আঘাতে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে ততক্ষণে আছড়ে পড়ে সুরেশ পাটনির নাও। রাক্ষুসে কালিন্দীর টলমল বুকে খড়কুটোর মতো ভেসে যেতে থাকে নগণ্য মানুষগুলো। প্রবল ঢেউয়ের আছড়ানিতে আস্তে আস্তে ডুবে যায় নাওসহ হাঁড়ি-কুঁড়ির ভাঙা চিহ্ন।
নদীর তীরে কান্নার রোল ওঠে প্রচণ্ড। সেই সাথে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় নদীতীরে উপস্থিত হওয়া মানুষগুলোর পাঁজরভাঙা বুকের দুর্নিবার আকুতি। সুরেশ মাঝি ততক্ষণে সাঁতরে নদী পার হয়ে বেঁচে যায় কোনওরকম। কিন্তু মানুষগুলোর চোখের সামনে কোনও এক অজানার পারে ভেসে যায় হোসেন ও নমিতা। তাদের সঙ্গে মুহূর্তে ভেসে যায় হারাধনের সকল স্বপ্ন-সাধ ও বেঁচে থাকার ক্ষীণ এক রত্তি আশা।

চার

কালিন্দীর শান্ত বুকে এখন আর ঢেউ দুলে ওঠে না। জায়গায় জায়গায় ধূলির চাঁদোয়া জমে রাক্ষুসে নদীটার গভীর উচ্ছ্বাসও নেই আগের মতো। নিশিদিনের ছলছল রাগের সেই ঢেউয়ের খেলা হারিয়ে কেমন যেন ধীর, নিথর-নীরব। কোলাহল কমে শান্ত হয়েছে নদীর তীর আর নদী পারাপারের সেই পরিচিত খেয়াঘাট।
নদীর মতোই এতদিনে যৌবনের বল হারিয়েছে হারাধন পাল। আসলে নমিতা যে নেই, এটা বিশ্বাসই হতে চায় না তার। নমিতা মিশে গিয়েছিল কালিন্দীর কালো জলের অতল গহ্বরে আর শেষমেশ হোসেনের যে কোনও খোঁজই মেলেনি।
গাঁয়ের লোকে আজও বলাবলি করে, নমিতার জলে ডোবা লাশটায় পচন ধরলেও মুখটা নাকি লক্ষ্মীর মুখের মতোই মায়াবী ছিল অনেক। উদভ্রান্ত মনে হারাধন সেসব শোনে আর হাসে। সকলের অগোচরে তাই নমিতার গলিত নিথর দেহটিকে শ্মশানে না নিয়ে জলেই ভাসিয়ে দিয়েছিল একদিন। নমিতার প্রাণভোমরা যে লুকিয়ে রয়েছে সেখানে! হারাধন কারণে-অকারণে নিত্যদিন সেই প্রাণের খোঁজ করে চলে।
দুই আশ্বিন গত হলেও প্রবল এ শোক ভুলতে কষ্ট হয় হারাধন পালের। বিধাতা তাকে এই শোক-দুঃখ-কষ্ট বইবার শক্তি দিয়েই বুঝি বাঁচিয়ে রেখেছে এতদিন। সামনে শারদীয় দুর্গোৎসব। আবারও কদর বেড়ে গেছে তার। সকলের জোরাজুরিতে অনেকদিন পর আবারও সে প্রতিমা গড়তে বসবে। মূর্তি গড়ার ছলে নমিতা ও হোসেনকে খুঁজে বেড়াবে প্রাণহীন প্রাণে এক অপার ভক্তিতে। দেবতার অবয়বে এক পবিত্র প্রেমের আরাধনায়। তার এই আনন্দ নিছক সুখ-কল্পনা নয়। এটা যুগ যুগ ধরে তার পূর্বপুরুষের হাতে গড়ে ওঠা প্রতিটি দেবতার মতোই নিষ্পাপ ও পবিত্র। প্রেম ও ভালবাসাময় পরম আরাধ্য এক কৃত্য।
বাহির বাড়ির চওড়া উঠোনটায় প্রতিমা গড়ার উপযুক্ত মাটি রাখা নেই। মাটি আনবে বলে সে একাই চলে যায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কালিন্দীর তীরে। সে আজ তার সকল মেধা, পরিশ্রম আর কল্পনা দিয়ে গড়ে তুলবে মনের মতো দেবী-প্রতিমা। যেখানে মিশে থাকবে মমতা ও প্রেমের এক ভক্তিময় আশীর্বাদ। যে প্রাণের মায়া সে খুঁজে বেড়াচ্ছে বহুদিন ধরে, সেই মায়ার খেলায় সে থাকে বিহ্বল ও অবিচল।
মর্ত্যলোকের কোনও দেবতা নয় হারাধন; নদীমন্থনের কোনও শক্তিও নেই তার। তারপরও চেতনার লুপ্ত কণায় কী যেন তালাশ করে ব্রতী হয়ে ওঠে সে অমৃত-সুধার খোঁজে। জীবনের গরল বুকে নিয়ে দেবী লক্ষ্মীর মতো মনের বেদিতে যদি একবার নমিতাকে আবাহন করা যায়, তবে আর ক্ষতি কী? এ আশাতেই নতুন করে বুক বাঁধে মানুষটা।
কত কাল ধরে হারাধন দেবমূর্তি তৈরি করে না। আজকাল ঠিকমতো দেবীর আদল দিতে পারে না, সেই ধৈর্যও তার হয় না। শরীর যেন হঠাৎ করেই আগের চেয়ে অনেক ভেঙে গেছে। যে মাটি আজ নিয়ে এসেছে নদীর বুক থেকে সেখানেই তো প্রাণটা গেছে নমিতার। আজ তার অন্তিম সেই বাসনা নিশ্চয়ই পূর্ণ হবে।
হোগলার চাটাইঘেরা খেজুরপাতার দরমার ছোট্ট কুঁড়ের ছিমছাম গৃহকোণটাই প্রতিমা তৈরির ঘর। এটাই কুমারপাড়ায় হারাধনের দেবালয় যেখানে দেবতাগণের অধিষ্ঠান হয়। বাঁশের ঝাঁপি ঠেলে চারদিকে ভাল করে একবার দেখে নিল হারাধন। তার বাবা-ঠাকুরদারা এখানে বসেই ক্লান্তিহীন দেবীপ্রতিমা তৈরি করতেন।
উঠোনের মাটির তাল থেকে পরম মমতায় মাটি ছেনে নিয়ে তার সাথে খড়ের বজ্র আঁটুনি দেয় হারাধন। খড়ের অবয়বের ওপর ভাল করে আঠালো মাটি লেপে দিয়ে গভীর মনোযোগে তৈরি করতে শুরু করে দেবতাদের গড়ন। কুমোরপাড়ার কয়েক ঘর বসতির মধ্যে একমাত্র হারাধন পালই দেবীপ্রতিমা তৈরির জাত কারিগর। তাই অন্য কুমোররাও আসে তার এই কর্মযজ্ঞ দেখতে। নলেন, দেবেশ, পরিতোষ-সহ অনেকেই এসেছে আজ সেই খবর শুনে। অনেকদিন পর হারাধন পালের এই প্রতিকৃতি তৈরির কাজ তাদেরকে দারুণভাবে উৎসুক করে।
দেবীধামের ঝাঁপি ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে তারা দেখল হারাধন গভীর নিমগ্ন তার কাজে। কী নিখুঁতভাবে মানুষের গড়নে তৈরি হচ্ছে সব। খড়ের দেহের ওপর মাটির পাতলা প্রলেপ বসছে। হারাধন পরম যত্নে মাটি মেখে দিয়ে সস্নেহে টিপে দিচ্ছে সেগুলো। একে একে আদল নিচ্ছে পা, হাত, শরীর, গলা আর সবশেষে দেবীর মুখখানা। প্রতিটি অঙ্গের কী বিচিত্র মনোহর শোভা— শেষে একসাথে জুড়ে গিয়ে অদ্ভুতভাবে প্রাণ পেয়ে জেগে উঠছে মাটির শরীরগুলো।
এই বেলা কাজ শেষ হলে মধ্যাহ্নের পর শুকাতে দেবে তপ্ত রোদের আগুনে। হারাধন এক বসায় তাই দেবীর গড়ন ঠিক করে উঠোনের এক কোণে রেখে দিল বেশ যত্ন করে। প্রতিমার দেহ ঠিকমতো না শুকালে রঙের আঁচড়ও যে ঠিকমতো পড়বে না, এটা সবাই জানে। আজ বাদে তিনদিন পর ভালমতো শুকিয়ে গেলে তবেই তুলির আঁচড় পড়বে প্রতিমার গায়ে। হারাধন অধীর হয়ে সেই দিনটার জন্যে অপেক্ষা করে।

মঙ্গলবার দিনটা অন্যভাবে শুরু হল হারাধনের। কোথা থেকে যেন শরীরে বলও ফিরে আচানক। আসলে মনের জোরটাই ফিরে এসেছে তার। নিজে নিজেই ঠাকুরের ঘর ঝাঁট দিয়ে দেবতা বিষ্ণুর পূজা দিল মনোযোগ সহকারে। উঠোনকোণের জবা গাছটা থেকে রক্তজবা, টগর আর সিঁদুরে কলমি সাজিয়ে নিল কাঁসার বাসনে। মাটির পিলসুজে প্রদীপ জ্বালিয়ে ধূপদানিটার পাশে সাবধানে রাখল। ঘরময় পবিত্র একটা গন্ধ ছড়িয়ে গেল সাথে সাথে। কয়েকটা সবরি কলা, ধান, দূর্বা আর মুড়ির মোয়া দিয়ে সাজিয়ে নিল ভোগ, পূজার নৈবেদ্য। নিজের মনমতো সবকিছু সাজিয়েগুছিয়ে নিয়ে গভীর এক প্রশান্তি পেল যেন অনেকদিন বাদে।
মহালয়ার পর অন্তহীন কাজের চাপে বিশ্রামের একটুও ফুরসত পায়নি হারাধন। সন্ধ্যায় দেবীর বোধন হয়ে গেলে নৈবেদ্যের থালা দিয়ে পূজা সেরে কিছুটা বিরাম নেবার ইচ্ছের কথাই ভাবল মনে মনে। ভাঙা দরমার ফাঁক গলে একটুকরো রোদ এসে হামাগুড়ি দিয়ে পড়ল ঘরের ভেতরে। সকালবেলা পূজার সময় নয় তারপরও কেমন যেন আরতি শুরুর মোহনীয় পরিবেশ তৈরি হল দেবীঘরে। পাটভাঙা নূতন ধুতি গায়ে চাপিয়ে হারাধন রঙের আখর নিয়ে বসল আবার। ক্লান্তিহীন তার উৎসাহ। বাহারি অলংকারে সাজিয়ে তুলল দেবীর পা, হাত, গলা আর মায়াবী মুখাবয়ব। সবকিছুই রঙের তুলির আঁচড়ে। দেবীর পটলচেরা চোখ এঁকে একসময় যেন ক্ষান্ত হল হারাধন।
হারাধনের ধ্যান ভাঙল হঠাৎ। এ কী? তার সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রতিমা কার? বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে উঠল তার মন। এ যে দেবীর রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে তারই লক্ষ্মী মেয়ে নমিতা। যাকে সে এতকাল ধরে খুঁজে বেড়িয়েছে অন্তরের গহীন কোনও কোণে। মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠল নিমেষে। টাল সামলে উঠতেই ধুতি-কোর্তায় রং এসে আছড়ে পড়ল, কিছু পড়ল মাটিতে। ভোগ দেওয়ার থালা হাতে নেওয়ার আগেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল হারাধন পাল। অন্তরে লালিত তার আরাধনার দেবী আজ হঠাৎ করেই আবির্ভূত হল চোখের সামনে— যাকে সে তালাশ করে মরছিল কুমোরপাড়ার এই দেবলোকের মধ্যাহ্নে।

°°°

চিত্রণ: দেবাশিস সাহা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine + 6 =

Recent Posts

অরিজিৎ চক্রবর্তী

অরিজিৎ চক্রবর্তীর ছোটগল্প

ট্রমা-চিহ্নিত সেলফিগুলি অ রি জি ৎ  চ ক্র ব র্তী অজ্ঞাত পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধারকৃত দু’টি টীকা (লেখকের নাম অনুপস্থিত। পাণ্ডুলিপির শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা বহু আগেই

Read More »
পিয়াস মজিদ

পিয়াস মজিদের কবিতা

পি য়া স  ম জি দ অনিমিখ তোমার ভেতর যত ময়ূরতা, কেকা; আমি বন থেকে তার দিকে লক্ষ করে আছি। আমার চোখের সবুজ লোকালয়ের বাকি

Read More »
স্বপনকুমার মণ্ডল

স্বপনকুমার মণ্ডলের ছোটগল্প

জিতকা স্ব প ন কু মা র  ম ণ্ড ল ১ হাটবারে বিদ্যাখাড়ির পাড়ে রাস্তা জুড়ে জমাটি ভিড়। মোরগ লড়াই চলছে। কাঁতিদার লড়াইয়ের তাগদ দেখে

Read More »
সুদীপ্ত মাজি

সুদীপ্ত মাজির কবিতা

সু দী প্ত  মা জি মেঘ জংলা হাওয়ার গন্ধে জাগা নেশার মতো উড়িয়ে দিচ্ছ ওড়না তোমার, দিদিমণি এখন কি আর তেমন সবুজ বয়স আছে কুড়িয়ে

Read More »
চম্পা রায়

চম্পা রায়ের ছোটগল্প

ডিঙি চ ম্পা  রা য় ‘ও যদু… জাল নিয়া এগাও।’ মাঝ-নদীতে কারেন্ট জাল পাতছিল কালিচরণ। যদুকে ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাঁক দিল। যদিও কালিচরণ জানে,

Read More »
হৈমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়

হৈমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতাগুচ্ছ

হৈ ম ন্তী  ব ন্দ্যো পা ধ্যা য় মোহনার দিকে লুম্পেন হয়েছে রাত, রাহাজানি করে নিয়ে গেছে মন জ্যোৎস্নার গভীরদেশে ঘরবাড়ি তার গাঢ় হলুদের মতো

Read More »