Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

শ্যামলেশ ঘোষের ছোটগল্প

ইলিশের আলো

শ্যা ম লে শ  ঘো ষ

শিশির গলায় সুতুলি। সুতলি বাঁধা ঘুনসিতে। ঘুনসিতে ধরা হাফপ্যান্ট। কোমরে খানিক গোঁজা। প্যান্টের সামনেটা ফাঁকা। বোতাম নেই। প্যান্টের ফাঁক গলে দেকুর সিসি দর্শন দেয়। হিসি করার প্রত্যঙ্গটাকে ওই নামে সে চেনে। শিশির মতো সেও কোমরে ঝুলছে। হাতের মুঠোয় এতক্ষণ প্রাণ ছিল। তিনটে কাঁচাটাকা। ঘরের খুঁটির পেট থেকে বেরিয়েছে। মুঠো খুলতেই নেই। গেল কোথায়?

নদীর পাড় ধরে এলে প্রথমে ঢিবি, গোস্বামীদের ছেড়ে যাওয়া বাগান, দালান। ঝুলছে। অপেক্ষা করছে রসাতলে যাওয়ার। তারপর সাদাবালির রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে এলে বাঁদিকে বাঁধে যাওয়া যায়। সোজা এলে থানার মোড়। ঠাকুরের থান। সেখান থেকে পাকারাস্তা বাসরাস্তায় যায়। শুনেছে সে। থানা পেরলেই বাঁদিকে খেলার মাঠ। গান হয় প্রতিবছর। মাঠের উল্টোদিকে মুদি দোকান অবধি চেনে সে। সদাই নিতে আসে। তারপর পথ গিয়েছে কোথায়? বাবা জানে। পথের ধুলোবালি তন্নতন্ন ছোট্ট ছোট্ট পায়ে। চকচক করলেই হাতড়ায়। জনবিরল পথে অখাদ্য বুনোফল পড়ে থাকে। দেকুর শুধু হিসি পায়।

ঘরের খুঁটি পড়েছে গতকাল। গেল সনে পাল্টানো খুঁটি। ফুলো বাঁশের। একবর্ষায় জল ধরে গোড়া পচে উঠেছে। মা ছিল না বাড়ি। দেকু একহাতে দাওয়ার বাঁশের খুঁটি ধরে চক্কর দিচ্ছিল। হঠাৎ মট করে খসে পড়েছিল সেটা। বাঁশের পেট ঝনঝন করে উঠেছিল। ছড়িয়ে পড়েছিল নানা আকারের কাঁচাটাকা। কাঁচাটাকা মানে কয়েন। বিস্ময় জেগেছিল দেকুর গোলপানা চোখে। বাঁশের পেটে টাকা হয়? বছর-চারেকের দেকুর পিঠটা টনটন করে উঠেছিল, মায়ের হাতের থাপ্পড় পড়বে মনে করে। দ্রুত কাঁচাটাকাগুলো খুঁটিটার কোঠরে ভরে সস্থানে রেখে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। অতিকষ্টে। পারেনি। বারকয়েক চেষ্টা করে ছোট উঠোন ছেড়ে পালিয়েছিল গোস্বামীদের বাগানে।

বাগানে আর কেউ আসে না। সকালে তারা মায়েপোয়ে আসে। কলাগাছের আড়ালে বসে দু’জনে। সে আসে হাগু করতে। মা কেন আসে জানে না সে। তারা বাগান বরাবর নেমে আসে নদীতে। ইছামতীতে। উঁচু পাড় ধরে ধাপে ধাপে। মা গলা-সমান জলে নেমে যায়। ডুব দিয়ে উঠে আসে। পিছু পিছু উঠে আসে দেকু। পোঁদে ইছামতির ঘোলাজলের বালি চিকচিক করে।

এই বিকেলে বাগানে কেউ নেই। একটা বেজি ছানা নিয়ে ত্রস্তভাবে নেমে যায় নদীর দিকে। পাড়ের গায়ে গর্ত। সেখানে মাছরাঙা পাখির বাসা। জোয়ার এলে বিকট আওয়াজ করে সেই পাড় ভাঙে। তখন ওরা যায় কোথায়? দু’চারটে গাঙশালিক চেঁচামেচি জুড়ে দেয়। শজনে গাছে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় বকবকানির দল। ছাতারে পাখি। ছাতারে পাখির বাড়ি কোথায়? বাবা যেখানে থাকে, সেদিকে? ওদের পেছন পেছন যাবে যে, উপায় নেই। ওরা তো হাঁটে না। লাফায়। তার উপর উড়তে পারে। দেকু চুপচাপ বসে থাকে গাঙের পাড়ে। স্রোতের দিকে স্থির তাকিয়ে থাকলে পাড় উল্টোদিকে রওনা দেয়। তবু মা বাড়ি না-ফেরা পর্যন্ত দেকুর কোথাও যাওয়া হয় না।

মা না ফিরলে সেও আজ ফিরবে না। তার দোষেই তো খুঁটি পড়ে গিয়েছে। দেখেই মায়ের রাগ হবে। খুঁজবে। ডাকবে। খোকা…। টেমি জ্বেলে খুঁজতে বেরবে পাড়ায়। না-পেয়ে পেয়ে চিন্তা হবে। মায়ের রাগ পড়ে যাবে। তখন সে ঘুরপথে ঘরে গিয়ে উঠবে। বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে কাদা হবে মিছিমিছি। যেন সে ঘরেই ছিল। বাইরে সন্ধের অন্ধকারে তাদের তালগাছের পাতা সড়সড় করে ডেকে আনবে মাকে। মা এসে দেখবে ঘরের টাটি হাট করে খোলা। টেমির আলোয় ঘুমন্ত খোকাকে দেখে প্রাণ ফিরে পাবে। তড়িঘড়ি অভুক্ত ছেলেকে খাওয়ানোর তাগিদে মা উনুন জ্বালাবে। গুটিগুটি মায়ের পাশে এসে বসবে দেকু। মায়েপোয়ে উনুনের আলোর দিকে চেয়ে থাকবে। অনেকক্ষণ।

বাঁশের খুঁটিটাকে চলা করে ফেলেছে সকালে। উনুনে ঢুকে সে রাগে ফাটছে পটপট করে। বুনোকচু দিয়ে ফ্যানাভাত। ‘পরশু বাবা আসবে।’ কতদিনে পরশু আসে? বাবা ফিরলেই পরশু। বাবা ফিরলেই মাছ। জল নেমে গিয়ে ইছামতীর চরা জেগে ওঠে। জেগে ওঠে কাঁকড়া, গুলে মাছের গর্ত। বাবার সঙ্গে লেগে থাকে সে। গর্তে যেমন গুলে মাছ। গর্তের পাশে আঙুল দিয়ে চাপলেই বেরিয়ে আসে ফিনফিনে গুলে মাছ। ক’মাস ফেরেনি বাবা। খেলার সঙ্গী ছাগলটা ডগডগে হয়ে উঠেছিল। বেচে দিয়েছে মা। কাঁসার বাসন বন্ধকে গিয়েছে। ভাল করে খাওয়া জোটে না তাদের। খুঁটির পেটের টাকা ক’দিনে ফুরোবে। ফুরোক। পেটের ছেলেটার মুখে আজ মাছ তুলে দেবে।

দেকুকে তেলের শিশি ধরিয়ে মা মালঙ্গপাড়ার হাটে। খোকাইলিশ উঠেছে। রমজানের দোকানে ধাড়ি মাছের মেলা দাম। একটা বড় ইলিশের লেজ খসে গেছে। একটা চোখ নেই। আলাদা করে রাখা। তিরিশ টাকা দাম হয়, কুড়ি টাকা দিয়ো। পনেরো টাকায় গছিয়ে দিয়েছে দেকুর মাকে।
আজ মাছ রান্না হবে। মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে বাবা। তবু ঘরের কোণে উঁকি দিচ্ছে না কেউ!

মায়ের শরীর ভাল না। বামুনবাড়ি মুড়ি ভাজতে যায়। কোচড়ে করে মুড়ি নিয়ে আসে। গরম গরম। এ সপ্তায় কন্ট্রোলের তেল দেয়নি। পলতে পুড়িয়ে জ্বলছে টেমি। গলগল ধোঁয়া উঠছে। কালো কালো দানা জমছে টেমির মুখে। মায়ের মুখে যেমন ঘাম জমে। সেই কালো দানা আঙুলে খসিয়ে মাটির দাওয়ায় আঁক কষে দেকুর মা। টেমি নিভছে। খোকা কোথায়? কোথায় তেল? অধীর হয়ে ওঠে দেকুর মা।

পাড়া শুনশান। নদীপারের বসতিতে তাদের মন্দভালর খোঁজ করবার কেউ নেই। যে যেখানে পারে, গিয়ে উঠেছে। তাদের কোথাও যাওয়ার নেই। তারা নিজের দেশে উদ্বাস্তুর মতো জীবন কাটায়। হ্যাঁ গো, আমাদের খোকারে দেখেছ? কার কাছে শুধোবে? বাড়ি থেকে বাসরাস্তা পর্যন্ত ছোটাছুটি করে দেকুর মা। আজ আসুক বাড়ি। কষিয়ে দোবখন। মারখাওয়া অসহায় কচিমুখ মনে পড়ে। ব্যথা জাগে। মানত করে।

থানায় ডুম জ্বলে। লোকগুলোকে দেখলে বুকে তরাস জাগে। সেখানে যাবে একবার? তারা নামধাম শুধোয়। স্বামীর নাম মুখে আনতে নেই। যেমন মায়ের নাম বলে না দেকু। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে, মার নাম বলতি নেই। ধমকে কেঁপে ওঠে দেকুর মা। নাম বলে। কেঁদে পড়ে। বলে, আরেক জায়গায় সে সংসার পেতেছে। সংসার কলাগাছের মতো। একবার চারা পুঁতলে আপনি বংশবৃদ্ধি হয়। দেকুর বাবা তার সংসার গোস্বামীদের কলাবাগানের মতো ফেলে রেখে গেছে।

শুকনো কলাপাতার খচমচ শব্দে দেকুর ঘুম ভাঙে। কারও বাগান পেরোনোর শব্দ। আঁধার। আঁধারকে ভয় নেই। ভয় লতাদের। অন্ধকারে লতারা বেরয়। চোখ কচলে ঠাহর করে। অস্পষ্ট দুটো মানুষ তাদের বাড়ির দিকে চলেছে। উঠে বসে। বাবা ফিরেছে? বাবা! আহা। আহ্লাদে ভুলে যায় সাপের ভয়, তেলের শিশি, কাঁচাটাকার কথা। বাগান হাতড়ে বাড়ি ফেরে। দাওয়ায় উঠে আসে।
ঘরের ভেতর থেকে হিসহিসে আওয়াজ ভেসে আসছে। সাপটা তাদের মাছ খেয়ে ফেলছে না তো?
দোর ঠেলে। খোলে না। মাকে ডাকে। সাড়া নেই। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ঘরের মধ্যে ইলিশের টুকরোগুলো আলো হয়ে জ্বলে।

°°°

চিত্রণ: সৌজন্য চক্রবর্তী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × three =

Recent Posts

শ্যামলেশ ঘোষ

শ্যামলেশ ঘোষের ছোটগল্প

ইলিশের আলো শ্যা ম লে শ  ঘো ষ শিশির গলায় সুতুলি। সুতলি বাঁধা ঘুনসিতে। ঘুনসিতে ধরা হাফপ্যান্ট। কোমরে খানিক গোঁজা। প্যান্টের সামনেটা ফাঁকা। বোতাম নেই।

Read More »
শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

শু ভ্র  ব ন্দ্যো পা ধ্যা য় কেন্দ্র হারানো বৃত্ত ১ বিকেল ঘষটানো সন্ধের কমলা আমি মেলে রাখি প্রত্যক্ষতায় জিভের মাংসের শুদ্ধতম লালটুকু সাজানো টুকরো

Read More »
মণিশংকর বিশ্বাস

মণিশংকর বিশ্বাসের কবিতাগুচ্ছ

কবিতাগুচ্ছ ম ণি শং ক র  বি শ্বা স কুদৃষ্টি রাস্তার চোখগুলি মনে পড়ে স্নানঘরেও মেয়েটি ভয় পাচ্ছে নগ্ন হতে °°° ক্ল্যাইম্যাক্স মুনমুনকে খুঁজছি সকাল

Read More »
নুশান জান্নাত চৌধুরী

নুশান জান্নাত চৌধুরীর ছোটগল্প

রাত-জ্বলা পোকা নু শা ন  জা ন্না ত  চৌ ধু রী ।। ১ ।। দক্ষিণে, শিরাজের তখত নিয়ে জান্দ আমিরদের নিজেদের ভেতর কামড়াকামড়ি। উত্তর থেকে

Read More »
শুভদীপ রায়চৌধুরী

শুভদীপ রায়চৌধুরীর কবিতাগুচ্ছ

কবিতাগুচ্ছ শু ভ দী প  রা য় চৌ ধু রী দৃষ্টি অন্ধের যষ্টির মতো ধরতে চেয়েছি অন্ধ আসলে কী ধরে? প্রতিবিম্ব? ছায়া? নাকি শান্ত অন্ধকারে

Read More »
দত্তাত্রেয় দত্ত

দত্তাত্রেয় দত্তর প্রবন্ধ

অজস্র ত্রুটি ও অপব্যাখ্যায় পরিকীর্ণ ব্রুকের এই ফাঁপা মহাভারত-নাট্য সম্বন্ধে সংক্ষেপে কিছু বলতে গেলে বলতে হয়, ওটা হলো মহাভারতের মলাট অবলম্বনে ব্রুকের বানানো একটা গপ্পো মাত্র: মহাভারতের নাম-না-শোনা পশ্চিমা দর্শকমণ্ডলীকে ঘেবড়ে দেবার জন্য তৈরি। তাই আমাদের দেশেও চট্ করে পশ্চিমা হয়ে যাবার লোভে অনেকেই ব্রুকের মহাভারতের স্তুতি গেয়ে থাকেন— বিশেষত তাঁরাই, যাঁরা মহাভারত পড়েননি।

Read More »