Search
Generic filters
Search
Generic filters

নুশান জান্নাত চৌধুরীর কবিতাগুচ্ছ

ঘুম হয়ে আধেক বছর

কিছুকাল ঘুমিয়ে, কিছুকাল লুকিয়ে,
কিছু শহর, কিছু মানুষের ভিড়ে হারিয়ে
আমি দেখি—

কোনও এক
পথহারা দেবদূতের বিষণ্ণ ডানার পাশে
আমি বুক পেতে দিয়েছি

চুলের ভেতর জন্ম নিয়েছে
ঘাসফুল থোকা থোকা,
বুকের মাঝখানে একটা প্রাচীন পেরেক,

ঝরাপাতার রাজ্যপাটে
আমার বাম হাঁটুতে গেঁথে আছে—
আগামী বছরের প্রথম সন্ধ্যা;

কিছুকাল পর
ঘুম হয়ে আধেক বছর,
আমার শরীর থেকে ঝরে পড়ে মৃত শীতকাল

***

বৃষ্টির ছায়াপথে নেচে ওঠা এক অবিকল চাঁদ

দেহাতি নদী ঘুম ঘুম,
বৃষ্টির ছায়াপথে নেচে ওঠা
এক অবিকল চাঁদ—
জেগে আছে খড়কুটো ভর্তি মাঠে

আর আছে পুড়ে যাওয়া গ্রীষ্মের
শেষ কবিতাটুকু—
দেহাতি নদী ঘুম ঘুম…

জেগে আছ কি তুমি?

বহুবার বাঁক নিয়ে,
চর ফেলার ছুঁতোয়
মাঝেমধ্যে শুকিয়ে নদীর মতো—

বুকে পুষে দাগ, মলিন ক্ষত
যে তুমি জ্বলছ ঠিক তারাদের মতো

সেই তুমি— জেগে আছ কি?

মৌন গ্রন্থাগারে
বইগুলো জানে
এ শহর জানে
এ সাগর জানে

তুমি ঘুমন্ত জল,
বিস্মৃত কবিতার মতো
‘মধুকূপি ঘাসে অবিরল’

***

কাচের বোতল-রোদ-শুকানো-দুপুরবেলা

বৃষ্টি হোক
আজ নুয়ে-পড়া শহরের গায়ে
আজ হোক হঠাৎ, অকারণ,
ঠিক এখনি
খুব বৃষ্টি

আমার ছিল
একা হয়ে যাবার আগে
তোমাকে ছুঁয়ে দেখার অভ্যেস

খুঁজে নিয়ো
রাতজাগা পথের বাঁকে
পথ চিনে ফেরার এক্সপ্রেস

আমার এক চোখেতে অশ্রু থাকে,
অন্যচোখে রৌদ্রতাপ,
পথের মাঝে রোদ-ছায়া আর
দু’হাত ভরা শূন্যতা

একটা শুকনো গাছে
পাতা এল, জানলা খোলা,
একটা কাচের-বোতল-রোদ-শুকানো-দুপুরবেলা

হাওয়ায় যখন মিলিয়ে যায়
চিঠির ধুলো, এ ডানায় তখন
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল…

অনেক স্বপ্ন ধার করেছি,
দেহ ও ডানা,
এ বৃষ্টি জানে
আমরা কে-কার কত্ত চেনা

একটা শুকনো দুপুর
হঠাৎ করেই বৃষ্টি নামায়,
একটা শূন্য উঠোন
ঠিক যতটা হাতের মুঠোয়

হাওয়ায় যখন মিলিয়ে যায়
চিঠির ধুলো,
এ ডানায় তখন
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল…

বৃষ্টি বলে—
‘‘সবকিছু ঠিকঠাক
না হলেও চলে।’’

***

অপূর্ণ কবিতা

কোনও এক সন্ধ্যায়,
যখন মহাবিশ্ব প্রসারিত হয়
তোমার আমার সম্পর্কের মতো—

বেলজিয়ামের আয়নায়
সাজে না পৃথিবীর কোনও প্রেমিকা,
দোকানীরা সংগ্রহে রাখে না লাল টিপ,

দরজার পাশে মৃত প্রজাপতি—
আলতো হাওয়ায় তিরতির

কোনও এক সন্ধ্যা
শুধু চুপচাপ তাকিয়ে থাকার
কখনও নিজেকে খোঁজার,
কখনও তোমাকে বোঝার

কোনও এক সন্ধ্যায়
দরজার পাশে অপেক্ষারত—
একজোড়া জুতো পায়ে, অকস্মাৎ
তুমি ধূমকেতুর মতো রেখে যাও দীর্ঘ রেখা

আমাদের ভালবাসা,
আমাদের বিদায়,
আমাদের চুপচাপ তাকিয়ে থাকার
এমনই কোনও এক সন্ধ্যায়—

তোমায় দিলাম—
মুখ গুঁজে থাকা এই
অপূর্ণ কবিতা

***

শখ

যদি শখ করে মানুষের থেকে দু-কদম দূরে গিয়ে
মানুষেরে কাছে পাও,
তাহারেই বড় সহজবোধ্য হয়,
তবে শখ করে মানুষের দিকে দু-কদম ছুটে গিয়ে দেখো—
তুমি অত কাছে নও;
সে মানুষ কেন পাখির মতন হয়!

চলে যাও দূরে,
দশদিক ঘুরেঘুরে
খবর এনেছি তোমার তরে—
যে বক্ষ কুরেকুরে গড়েছ অতল,
ওইখানে ওত পাতিয়াছে
বীরের মৃত্যুকামনায় প্রার্থনারত পুষ্পের দল।

উড়ে যাও পাখির মতন,
সাহসের পালক কিছু তুলে নিয়ে হাতে।

শখ করে একদিন
দেখা দিয়ো তবু
নিশীথের বিন্দুঝরা মোতির মতন
নক্ষত্র-চাদর রাতে।

যেইখানে চাপিয়াছে হিমের বস্ত্র,
অগণিত মুখেদের ভাঙাচোরা প্রাচীরের পাশে,
টপ করে সেইখানে নেমে এসো—
নিঝুম ঝিঁঝির কটাক্ষ ইশারাতে।

অন্ধকারের মুখে ওই যে
যুবতীর ভরা যৌবনরসের মতো জমে আছে
তোমারই কি ছায়া! ঈশ্বর!
প্রস্তরযুগের বটশালিকের সাথে বড় বেশি মিল তার,
মানুষের সাথে তার মিল বড় কম।

চিত্রণ: অরুণাভ মজুমদার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 − one =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »