Search
Generic filters
Search
Generic filters

সুজিত বসুর দুটি কবিতা

স্মৃতিতে সুজাতা

সুজাতা তোমার পায়ে
আগুনের গোলা ধরে উত্তাপে পুড়েছে আমার হাত
তুষারে গিয়েছি জুড়োতে সে জ্বালা, সেই হাত জমে শীতে
বাগান করার স্বপ্নে কেটেছে কত বিনিদ্র রাত
সুজাতা আমার ঘর আজ ভরা কাঁটালতা উদ্ভিদে

বলোনি মাটিতে কী রত্ন ছিল, বহুদিন ধরে খুঁড়ছি
পাতালে নামার গর্ত গভীর, হঠাৎ বেরোয় সিন্দুক
ভিতরে রয়েছে ছলনায় ক্রূর সাপিনীর প্রতিমূর্তি
ভালবাসা যদি বলো একে তুমি বিশ্বের সেরা মিথ্যুক

আমার চোখের মণি নয় প্রেম প্রতীকের নীল পদ্ম
অনেক সয়েছে ঘৃণা বিদ্যুৎ, আজ দিতে পারি উপড়ে
কলঙ্কী শিরা উপশিরাগুলো অভিমান মদে মত্ত
অনেক হয়েছে, আমি মরে গেলে জমা করে দিয়ো লুভরে

তুবড়ির খোলে আগুনের কত স্ফুলিঙ্গ কণা বিন্দু
নিভৃতে ছিল, কত মিলিয়ন মেগাওয়াটের শক্তি
দেহের প্রতিটি রক্তকণায় তোমার জন্য, কিন্তু
তুমি তা নিলে না, পরমাণু ফেটে শরীরে রক্তারক্তি

শতচ্ছিন্ন শরীর নিয়েও বেঁচে আজও কেন আছি
অগ্নিকুণ্ড সমুখে আমার, তাতে শুধু ঘৃতাহুতি
দিলেই শান্তি জ্বালা বেদনার, কেউ নেই কাছাকাছি
দূর থেকে শুধু অপমান ধুলো ছুড়ে দিয়ো এক মুঠি

গোধূলির এই অবেলায় আমি জীবনকে বহুবার
বলেছি তাসের ঘর ভেঙে গেছে, তোমার এ হরতন
রাজা বিকোবে না এই দুর্দিনে, সুজাতা তবু তোমার
পায়ে নতজানু হয়ে বসে আছে অবাধ্য এ জীবন।

ব্যারিকেড থেকে সুজাতাকে
না না যাচ্ছি না বলে ধূপজ্বালা ঘরে
বেশ তো ছিলাম, পরে
কী হল সে এক অদ্ভুত ইতিহাস
রাস্তায় কত বুলেট বারুদ, পড়ে গেল কত লাশ

আমার ভায়েরা নিহত সুজাতা, বোনগুলো ধর্ষিতা
তোমার টিভিতে পড়েনি প্রতিচ্ছবি
ভিডিও ক্যামেরা কোথায় যখন গাঁথে ওরা বঁড়শিটা
আমাদের বুকে, সিডিতে বাজেনি যুদ্ধের ভৈরবী

সুজাতা তোমার কোনো প্রশ্নের আজ কোনো উত্তর
দিতে পারব না, তরুণের জ্বলে চিতা
এখনও আমার দেওয়া হয়নি তো আবদুলকেও গোর
টমাস কফিনে, এসির আরামে তুমি জমে থাকো সীতা

ক্র্যাকারের বুম, মেশিনগানের একটানা কটকট
ধূপ নিভে গেছে ঝড়ে
সুজাতা আমার বড় দুর্দিন, নিদারুণ সংকট
বন্দুক থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে, বারুদ গন্ধ ঘরে

না না আজ কোনো অহিংসা নয়, গান্ধী বুদ্ধ যিশু
মাথায় থাকুন, বন্ধুরা পাতে বুলেটের মুখে বুক
অকালবোধনে চোখে যেন থাকে বহ্নির বন্দুক
টিভিতে দেখোনি ফুটপাথে শুয়ে নিষ্পাপ মৃত শিশু!

রাস্তার মোডে ব্যারিকেড, তার ওদিকে ধনের রাশি
পাউন্ড ডলার ইউরো টাকার স্তূপ
এদিকে আমরা অনেক বন্ধু দাঁড়িয়েছি পাশাপাশি
হাতের আড়ালে জ্বালাই নিভানো ধূপ

দু-পা ভেঙে গেছে, চলতে পারে না, বাঁহাতেও ফ্র্যাকচার
যোদ্ধার ডান হাতে রাইফেল ধরা কোনোমতে, তবু
সুজাতা তুমি তো প্রতিবাদে নও কেন যেন সোচ্চার
তুমি ক্রীতদাসী, স্টিরিও ভিডিও ফ্রিজই তোমার প্রভু

বেয়নেটগুলো ঝলসে উঠছে ভাড়া করা কালো হাতে
ব্যারিকেডে আরো লোক চাই, আরো অন্ন বস্ত্র জল
ঝলমলে সোনা অনেক পরেছ, অনেক উঠেছ জাতে
প্রতীকচিহ্ন আজ হোক শুধু ঝকঝকে পিস্তল

আকাশ ভরেছে ভস্মে ধোঁয়ায়, দেবতারা অভিমানে
কেঁদে অস্থির, ধরা পড়ে গেছে ভণ্ডামি জোচ্চুরি
পুরোহিত আর মৌলবিদের, তুমি আসবে না মানে!
এসো না সুজাতা গুলি না হলেও একরাশ ঘৃণা ছুড়ি

ব্যারিকেডে বসে প্রেমের কবিতা কী করে যে লিখি বলো
জ্যোৎস্নারা সব নিভে গেছে আজ, নিষ্প্রাণ বনবীথি
বুলেট শব্দে বারুদ ছন্দে কবিতার মতো জ্বলো
সিঁদুরে অনেক রাঙিয়েছ, আজ রক্তে রাঙাও সিঁথি।

*

ঘরের দ্বীপে

তারার আলো লাগে না ভাল, বিজলীবাতি ঘরে
জ্বালাই তাই অন্তহীন, একলা দিন কাটে
চেতনা সব হয় নীরব, বেদনা ঝরে পড়ে
যজ্ঞবেদী সাজানো থাকে, জ্বলে না তাতে ধূপ
রাখে না পদচিহ্ন কেউ ঘরের চৌকাঠে
শরীরে ভয়, নারীরা নয় এখন অপরূপ
তারারা সব নিঝুম ঘুমে, চাঁদের নেই দেখা
অর্ধমৃত, কাটাই শীত ও গ্রীষ্ম একা একা
যুবতী তার খোঁপায় আর রাখে না ফুলমালা
ওষ্ঠাধরে নখরে তার রক্তলিপি লেখা
পক্ষীরাজ ওড়ে না আর, কাটা গিয়েছে ডানা
ময়ূর একা বাজায় সুর আর্তনাদে কেকা
নারীকে মনে আলিঙ্গনে হয় না কাছে টানা
ঘরের দ্বীপে মলিন ক্ষীণ আশার দীপ জ্বালা।

4 Responses

  1. অনেক দিন পর সুজিত বসু্র দুটি কবিতা ভালভাষায় পেলাম। দীর্ঘ কবিতা “স্মৃতিতে সুজাতা” যেন দীর্ঘ পরিক্রমণ। এই ভাঙাচোরা সময়ে ‘সিঁদুরে অনেক রাঙিয়েছ, আজ রক্তে রাঙাও সিঁথি’ এমন পংক্তি অন্য মাত্রা এনে দেয়। “ঘরের দ্বীপে” চতুর্দশপদী।‌ অসাধারণ এক ছন্দের চলন পাঠককে কেমন দ্রুত পদচারণায় এগিয়ে নিয়ে যায় কোন এক নিঃসঙ্গতায়।

  2. বেশ কিছুদিন পরে শ্রী সুজিত বসু র নতুন দুটি কবিতা “স্মৃতিতে সুজাতা ” এবং ” ঘরের দ্বীপে ” কবিতা গুলো পড়ে খুব ভালো লাগলো আপনার ” ভালো ভাষা” ডিজিটাল পত্রিকা তে. আশা করব এরকম আরও ওনার কবিতা আপনাদের মাধ্যমে দেখতে পারবো. আপনাদের মাধ্যমে কবি শ্রী সুজিত বসু কে ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা জানাই. নমস্কার. Amitava Bhattacharya. কলকাতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 2 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »