Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

অনুপম ঘোষালের গুচ্ছকবিতা

উষ্ণতা

সারা রাত ধরে কোনও দিন ভিজেছ?
হ্যাঁ, জ্যোৎস্না রাতের কথা বলছি, আমার সাথে ভিজলে একটা আস্ত পূর্ণিমার চাঁদ দেব তোমায়।

একটা গোটা দিন ঢেউয়ের সঙ্গে খেলা করো! আমার সঙ্গে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে ভিজলে একটা গোটা সমুদ্র উপহার দেব তোমায়!

গ্রীষ্মের প্রখর রোদে যদি হাঁটো, তোমার শরীরের ঘাম থেকে সব পাপ বেরিয়ে আসবে সোনা! আর তারপরেই ভর শ্রাবণের ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি তোমাকে নির্মল করে দেবে!
ভিজবে আমার সঙ্গে?

প্রচণ্ড শীতে আমরা একই লেপের তলায় থাকব—
দুজনের শরীরের উষ্ণতা ঘন ঘন নিশ্বাস হয়ে মাতাল করে দেবে আমাদের!
এসো আমরা একটা দিন ও রাতের জন্য পাখি হই।
বিশ্বাস করো তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে একটা চুমুও খাব না, তোমার ঠোঁটে!

*

রংহীন বসন্তে

বসন্তের চাঁদ তোমার বন্ধু!
অকালে কৃষ্ণচূড়া হয়ে ঝরে যেতে বসেছে।

বাসন্তী পূর্ণিমার সন্ধ্যায়
সে আর আদিবাসীদের সঙ্গে গানের তালে
গলা পর্যন্ত হাঁড়িয়া খেয়ে পা মেলাতে পারে না।

রংবাহারি আবির তার শরীরে লাগলে, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায় দেহ!
মনের ভিতরের আবিরে কেউ যেন এক বালতি
জল ঢেলে দেয়!

জেনারেশন এর পর জেনারেশন গ্যাপ হয়েছে! বাসন্তী পূর্ণিমায় দাগ লেগেছে! নতুন প্রজন্ম এখন উদ্দাম নাচে, আবীর খেলে—
ভাঙা রেকর্ড বড় বক্সে,
এক ফাঁকে পোলাও— ফ্রায়েড রাইস—

তবু হাতের লাঠিকে ফেলে দিয়ে কোমর দোলাতে ইচ্ছে করে!
ঠিক তক্ষুনি শরীরের কোমর থেকে নীচ পর্যন্ত শক্ত হয়ে ওঠে, কোনও সাড় নেই! ঠিক তক্ষুনি ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি থেকে লাভা বের হয়—

‘দোলযাত্রার একশো আটাশবার শালা’।

*

ঝর্নার গল্প

তন্বী হল সেই মেয়েটি
ঝর্না থেকে নেমে—
এ দুটো চোখ ধরা দিল
হঠাৎ করে থেমে।

বলল আমায় কী চাইছ?
ভালবাসার ‘ভাল’—
দিতেই পারি সাধ্যমত
তাতে কী আটকাল!

জানার কোনও অবকাশ নেই,
আমার বুকে বালি—
ঝর্না এসে ভাসিয়ে দেবে
জমাট বালি ‘খালি’।

শরীর থেকে আব্রু আমার খুলতে থাকি ধীরে
ঝর্না এখন আমার সাথে
দুষ্টু খেলা করে!

একদিন আমি পোশাকআশাক শুকাতে গিয়ে দেখি
ঝর্না সেদিন রাজপুত্রের প্রেমে পাগল এ কী!

হঠাৎ দেখি, ঝর্না আমার শুকিয়ে গেল বুকে—
তন্বী মেয়ে, তন্বী মেয়ে
তুমি কী আছ সুখে!

*

জীবনের বাঁকে

আমার প্রিয় চাঁদ কেড়ে নাও
অমাবস্যাই ভাল—
নিকষ কালো রাতে
কতদিন হাঁটিনি একা—

আলোর মাঝেই জগৎ আছে অন্ধকারের
অন্ধকার গলি আছে
অথচ নামগোত্রহীন,
আলোর রোশনাই
মলিন করেছে সব!

কেন যে কানা ছেলের নাম রেখেছ
পদ্মলোচন!
তাই বুঝি অন্ধকার জগতে
ঝকঝকে পৃথিবী
ঝলমলে আলো—
ডান দিকে সরস্বতী
বাঁ দিকে লক্ষ্মী
সরস্বতীর সঙ্গে শুয়ে
সুপারি কিনে লক্ষ্মীকে ঘরে আনে যারা
তাদের জন্য এই পূর্ণিমার চাঁদ

আমরা সব এলেবেলে ভাই
দিন আনি, দিন খাই
কোজাগরীর দিনে খেতে পাব কি না
হিসাব কষি—
বাড়িতে রুগণ বউ, অসুস্থ ছেলে!
বেতনটা পাওয়া যেত অফিসটা গেলে।
আমারও যে ক্ষয়রোগ
ক্ষয়ে যায় দিন,
অনেক হয়েছে ঋণ, চাঁদ দেখে—
আর নয়, চাঁদটাকে কেড়ে নাও!

ঘুটঘুটে অন্ধকারে হেঁটে যাব
শাল অথবা পাইন বনের ভিতর দিয়ে,
তারারা অসহনীয় হলে
হাত দিয়ে ঢেকে নেব চোখ—
বলো যদি পাগলাটে লোক
ক্ষতি নেই—

সরীসৃপ ও শ্বাপদের ভিড়ে মিশে যাব!
খুঁজে নেব, ডেকে নেব, ডাক দেব
আয় আয় ডানপিটে ছেলে—

ফিরে যদি না আসি!
নির্জীব দেহ ফিরে পাবে ঠিকই!
আর যদি ছেলেটার দেখা হয়ে যায় আমারই সাথে!
পৃথিবীতে আমি শুধু রাজা
তোমরা সবাই প্রজা
মেনে নেবে আমাকে!

রাত যদি কেটে যায়
ভোরের সূর্য প্রথম কুর্নিশ করবে আমায়।

*

জাল

মানুষের জঙ্গলে মানুষ খুঁজি,
মানুষ পাওয়া কঠিন একথা বুঝি!
তোমাকে পাব বলে দুপা বাড়াই—
চোখের সামনে দেখি তোমাকে হারাই।
তবু হাঁটি দিশাহীন
অজানা এ পথে
উড়ে যাও দেখি আমি
তার সাথে রথে—
ফিরে যেতে গিয়ে দেখি
অজানা জঙ্গলে—
জড়িয়ে পড়েছি আমি
মাকড়সার জালে।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four + three =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »