Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বৃক্ষাচার্য দ্বিজেন শর্মা: মধুময় পৃথিবী একবার পেয়েছিল যাঁরে

২০১৮ সালের জুন মাসে পড়েছি বৃক্ষাচার্য শ্রদ্ধেয় দ্বিজেন শর্মার ‘জীবনস্মৃতি মধুময় পৃথিবীর ধূলি’। সুন্দর, সাবলীল আর প্রাঞ্জল বর্ণনা। মুগ্ধ হয়ে পড়েছি পুরো বই। আমার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ধরা দিচ্ছিল শিমুলিয়া, কাঁচলিরপার, সাঝিপাড়া, কাঁঠালিয়া, বামনতকি বাজার, দুরবিন টিলা, পাথারিয়া পাহাড় ইত্যাদি জায়গা। আর দ্বিজেন স্যারের প্রকৃতিবিদ্যার প্রথম শিক্ষাগুরু শোভাবুড়াও আমার চোখের সামনে তিরধনুক নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, যিনি তাঁকে প্রকৃতিকে ভালবাসতে শিখিয়েছিলেন।

২০১৬ সালে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে কর্মরত থাকাকালীন দ্বিজেন স্যার আমাকে একবার মুঠোফোনে কল করেছিলেন। আমি খুশি হয়েছিলাম অনেক। প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের ‘প্রকৃতিবার্তা’-য় বাংলাদেশের লতাগুল্ম নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম। স্যার এটা পড়েই আমাকে ফোন করেছিলেন। কোথায় পড়াশুনা করেছি— তার খোঁজ নিয়েছিলেন এবং কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রকৃতিবার্তা লেখার সঙ্গে উদ্ভিদের ছবি ছাপিয়েছিল কিন্তু ছবির নিচে উদ্ভিদের নাম দেয়নি। বিষয়টি আমি সম্পাদক তুষারকান্তি সরকারকে জানাই। পরবর্তীতে প্রকাশিত প্রতিটি লেখাতেই উদ্ভিদের ছবির সঙ্গে তার নাম ছাপা হয়। আমরা যারা উদ্ভিদ ও প্রকৃতি নিয়ে লিখি, স্যার তাদের সম্পর্কে জানতেন এবং তাদের ভালবাসতেন— এটা পরিষ্কার। স্যারের ফোন করার দিনটি আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

নিকড়ি নদীর তীরে পাথারিয়া পাহাড়ের কোলে বেড়ে উঠেছেন দ্বিজেন শর্মা। বাবা চন্দ্রকান্ত কবিরাজের বাড়িতে ছিল অনেক ফুলগাছ, আম-কাঁঠালের গাছ আর বনৌষধি। ছোটবেলা থেকেই তাঁর উদ্ভিদ ও প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ, যা তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন অনেকের মনে, উদ্বুদ্ধ করেছেন উদ্ভিদ চেনা, গাছ লাগানো ও প্রকৃতি সংরক্ষণে। মানুষ, প্রকৃতি ও ইকোসিস্টেমের মধ্যে আন্তঃসম্পর্কের ওপর খুব জোর দিতেন, গুরুত্ব দিতেন এ সম্পর্করক্ষার ওপর।

বাংলাদেশে প্রকৃতি ও নিসর্গবিষয়ক লেখালেখিরও পথিকৃৎ দ্বিজেন শর্মা। পরবর্তী জীবনে জীবিকার জন্য তিনি যেখানেই গেছেন, নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন প্রাণ ও প্রকৃতির রূপের সন্ধানে। উদ্ভিদ জগৎ, প্রকৃতি বিজ্ঞান আর বিজ্ঞান ভাবনা নিয়ে লিখেছেন।

দ্বিজেন শর্মা বাংলাদেশের রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় নানা প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন, তৈরি করেছেন উদ্যান ও বাগান। গাছের পরিচর্যা ও সংরক্ষণ এবং প্রকৃতিবান্ধব শহর গড়ে তোলায় সবাইকে সম্পৃক্ত করতে আজীবন প্রচার চালিয়ে গেছেন। উদ্ভিদ ও প্রকৃতি নিয়ে লেখা দ্বিজেন শর্মার ‘শ্যামলী নিসর্গ’ প্রকৃতিপ্রেমী ও গবেষকদের কাছে অন্যতম আকরগ্রন্থ। ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমি এর পুনর্মুদ্রণ করে। লেখক এই গ্রন্থে ঢাকার সুদর্শন বৃক্ষরাজির আকার, আয়তন, আকৃতি, বর্ণ এবং এর ভেষজ গুণের বর্ণনা দেন। বইটি ১৯৯৭ সালে আমি কিনেছিলাম। আমি অনার্স শ্রেণিতে ট্যাক্সোনমি পড়াই আর উদ্ভিদ নিয়ে লিখি। খুব কাজে এসেছিল বইটি। তাঁর এই বইয়ে গাছ, ফুল ও ফলের বর্ণনার সঙ্গে উঠে এসেছে ময়মনসিংহ গীতিকা, জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্দীন, সিলেটের লোকগীতি ছাড়াও মধ্যযুগের কাব্যগাথা। তাঁর ‘হিমালয়ের উদ্ভিদরাজ্যে ড্যালটন হুকার’ বইটিও আমি পড়েছি।

যাঁদের লেখা পড়ে আমি উদ্ভিদ বিষয়ক লেখালেখিতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম, তাঁদের মধ্যে দ্বিজেন স্যার অন্যতম। আমার বই ‘বাংলার শত উদ্ভিদ’ আমি নওয়াজেশ আহমেদ এবং দ্বিজেন শর্মাকে উৎসর্গ করেছিলাম।

নগরে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্মকে বৃক্ষ, তরু-লতা আর ফুল-ফলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে মুখ্যভূমিকা পালন করা প্রকৃতিপ্রেমী দ্বিজেন শর্মা অগ্রণী ভূমিকা রেখে গেছেন। তিনি রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় নানা প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন, তৈরি করেছেন উদ্যান ও বাগান। গাছের পরিচর্যা ও সংরক্ষণ এবং প্রকৃতিবান্ধব শহর গড়ে তোলায় সবাইকে আহ্বান জানিয়েছিলেন দ্বিজেন শর্মা।

তিনি ‘তরুপল্লব’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের সভাপতি ও আয়োজক হিসেবে তিনি তরুণ গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবীদের প্রায়ই রমনা পার্ক, বলধা গার্ডেন ও বোটানিক্যাল গার্ডেনে নিয়ে যেতেন। গাছপালা ও বৃক্ষরাজির সঙ্গে তাঁদের পরিচয় করিয়ে দিতেন। শেখাতেন দেশি ফুলের জাতপাত ও রকমফের। শেখাতেন প্রকৃতিকে ভালবাসতে ও শ্রদ্ধা জানাতে। তরুপল্লবের একটি গাছচেনা কর্মসূচিতে আমি গিয়েছিলাম ২৬ এপ্রিল ২০১৯ গাজীপুরের টাঁকশালে ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে। উদ্দেশ্য পারুল সন্দর্শন।

নিসর্গসখা দ্বিজেন শর্মা নেই কিন্তু তাঁর কর্ম ও আদর্শ আমাদের উদ্ভিদ ও প্রকৃতি সংরক্ষণে অনুপ্রেরণা যোগাবে যুগ যুগ ধরে। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 4 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

স্যার রোনাল্ড রস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য

রোনাল্ড রসকে তাঁর গবেষণার সহায়তাকারী এক বিস্মৃত বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯২৯)। তাঁর অবদান কিন্তু খুব কম নয়। তিনি ছিলেন রস-এর অধীনে সহ-গবেষক। রস নোবেল পেলে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর নেতৃত্বে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কিশোরীনাথের ভূমিকার বিষয়টি বড়লাট লর্ড কার্জনকে জানান। কার্জন এ-বিষয়টি ব্রিটিশ সরকারের গোচরে আনেন। এর ফলে ১৯০৩ সালে যখন দিল্লিতে দরবার বসে, তখন ডিউক অফ কনট-এর মাধ্যমে কিশোরীনাথকে ব্রিটিশরাজ সপ্তম এড‌ওয়ার্ড-এর তরফ থেকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। পরে কলকাতা
র সেনেট হলে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সভাপতি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

দুই হুজুরের গপ্পো

১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই, আলবার্ট আইনস্টাইন বার্লিনের উপকণ্ঠে নিজের বাড়িতে স্বাগত জানান ভারতীয় কবি, দার্শনিক ও সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেল বিজয়ী। তাঁদের এই সাক্ষাৎকারটি ইতিহাসের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত ও মননশীল আলাপচারিতায় পরিণত হয়, যেখানে তাঁরা বিজ্ঞান ও ধর্মের চিরন্তন দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেন। “সায়েন্স অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান ট্রাডিশন: হোয়েন আইনস্টাইন মেট টেগোর” গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই বইতে বিশ শতকের শুরুতে ভারতের বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ এবং ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক চিন্তার মেলবন্ধন তুলে ধরা হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আশা ভোসলে ও তাঁর বাংলা গান

সুদীর্ঘ আট দশক ধরে তিনি তাঁর সঙ্গীতের সুধায় ভরিয়ে দিয়েছেন কেবল ভারত বা এই উপমহাদেশকেই নয়, বিশ্বকে। পরিণত বয়সেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর, যেমন কয়েক বছর আগে হয়েছিল তাঁর স্বনামখ্যাত অগ্রজা লতা মঙ্গেশকরের। আশা ভোসলে তাঁর সমগ্র জীবনে বারো হাজার গান গেয়ে গিনেস বুকে স্থান পেয়েছেন। একদিকে ধ্রুপদী সঙ্গীত, অন্যদিকে লঘু, পপ, এমনকী চটুল গানেও তাঁর সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সমসাময়িক কিংবদন্তি শিল্পীদের মধ্যে এজন্য অনায়াসে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

স্প্যানিশ ছোটগল্প: পুতুল রানি

সত্যিকারের আমিলামিয়া আবার আমার স্মৃতিতে ফিরে এসেছে, আর আমি আবার— সম্পূর্ণ সুখী না হলেও সুস্থ বোধ করছি: পার্ক, জীবন্ত সেই শিশুটি, আমার কৈশোরের পঠনকাল— সব মিলিয়ে এক অসুস্থ উপাসনার প্রেতচ্ছায়ার ওপর জয়লাভ করেছে। জীবনের ছবিটাই বেশি শক্তিশালী। আমি নিজেকে বলি, আমি চিরকাল আমার সত্যিকারের আমিলামিয়ার সঙ্গেই বাঁচব, যে মৃত্যুর বিকৃত অনুকরণের ওপর জয়ী হয়েছে। একদিন সাহস করে আবার সেই খাতাটার দিকে তাকাই— গ্রাফ কাগজের খাতা, যেখানে আমি সেই ভুয়ো মূল্যায়নের তথ্য লিখে রেখেছিলাম। আর তার পাতার ভেতর থেকে আবার পড়ে যায় আমিলামিয়ার কার্ডটি— তার ভয়ানক শিশুসুলভ আঁকাবাঁকা লেখা আর পার্ক থেকে তার বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার মানচিত্র। আমি সেটা তুলে নিয়ে হাসি।

Read More »
যদুনাথ মুখোপাধ্যায়

বিজ্ঞানমনস্কতা কারে কয়?

শ্রদ্ধেয় বসুর বইতে হোমিওপ্যাথি সম্পর্কিত অধ্যায়টি তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্কদের, বিশেষ করে মুদ্রা-মূর্ছনায় মজে থাকা, বা রাজনীতিজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতির দাবেদার-ঘনিষ্ঠ চিকিৎসকদের বিরক্তিকর বা অপ্রীতিকরই মনে হবার কথা। কেননা, উল্লিখিত দুটি বিষয় নিয়ে তাদের মনের গহীন কোণে প্রোথিত বিজ্ঞানবাদিতার শেকড় ওপড়ানোর সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হয়। প্রশ্ন হল, তাঁর উপরিউক্ত বইটির কারণে তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্ক বন্ধুদের চোখে ব্রাত্য বলে চিহ্নিত হবেন না তো? হলে আমি অন্তত আশ্চর্যচকিত হব না। দাগিয়ে দেবার পুরনো অভ্যাস বা পেটেন্ট এই মহলের বাসিন্দাদের প্রধান অস্ত্র, তা ভুক্তভোগীরা হাড়ে হাড়ে জানেন।

Read More »
প্রসেনজিৎ চৌধুরী

অগ্নিবীর: বন্দুকের মুখে ঈশ্বর

১৯৫০ দশকে নেপালের রাজতন্ত্র ও রাজার মন্ত্রিগোষ্ঠী রানাশাহী শাসনের বিরুদ্ধে সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। সেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন অনেক ভারতীয়। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাঙালি। নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই প্রথম সংঘর্ষ সে-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত। ভারত ও চীনের মধ্যে একফালি দেশ নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম সশস্ত্র ও নিরস্ত্র দুই পথ ধরে চলেছিল। ডান-বাম-অতিবাম— ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের চূড়ান্ত সফলতা আসে ২০০৮ সালে রাজার শাসনের অবসানে।

Read More »