Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার: ললিতা আইয়ালাসোমাইয়াজুলা

‘আমার জন্ম যদি আজ থেকে ১৫০ বছর আগে হত, তাহলে আমাকে আমার স্বামীর মৃতদেহের সঙ্গে একই চিতার আগুনে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলা হত হয়তো।’ কী সাংঘাতিক আর গা শিউরে ওঠার মত কথা! ১৯৬৪ সালের কথা। আমেরিকার নিউ ইয়র্কে একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে এমন কথা যিনি বলছেন, তিনি যে একজন ভারতীয় মহিলা তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। মাত্র পনেরো বছর বয়সে বিয়ে এবং মাত্র আঠেরো বছর বয়সে বিধবা হয়েছেন।

মেয়েটির নাম ললিতা। ললিতা আইয়ালাসোমাইয়াজুলা (Ayyalasomayajula Lalitha)। ১৯১৯-এ জন্ম। সাধারণ মধ্যবিত্ত রক্ষণশীল একটি তেলুগু পরিবারে চেন্নাইয়ে (তখন ম্যাড্রাস) জন্ম মেয়েটির। সাত ভাইবোনের মধ্যে ললিতা পঞ্চম সন্তান। বাবা ছিলেন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। যে সময়ের কথা, তখন উচ্চশিক্ষার দরজা শুধু ছেলেদের জন্যে উন্মুক্ত ছিল। ললিতাদের বাড়িতেও একই নিয়ম। বাড়ির মেয়েরা প্রাথমিক স্কুল অবধি পড়বে। তারপর বর খুঁজে বিয়ে। খুব কম বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হত মেয়েদের। তবে ললিতার মিলেছিল আর একটু বেশি পড়ার সুযোগ। ক্লাস টেন-এ ওঠা অবধি। ১৯৩৪ সালে পনেরো বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে গেল। ললিতার চেয়ে বর বয়সে বেশ অনেকটা বড়। ললিতার স্বামী ছিলেন বাবা মায়ের ষোলোতম সন্তান।

স্কুলের পড়া শেষ হয়নি বলে বিয়ের পরে ক্লাস টেন পাশ করার সুযোগটুকু মেলে ললিতার। বছর খানেকের মধ্যেই ক্লাস টেন (SSLC) পাশ করে শেষ হয়ে গেল পড়াশোনার পাট। বিয়ের বছর তিনেকের মাথায় একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দিলেন ললিতা। নবজাত মেয়ের নাম দেওয়া হল শ্যামলা। মেয়ের তখন মাত্র চার মাস বয়স হয়েছে। সেই সময় ললিতার জীবনে নেমে এল চরম সংকট। স্বামী মারা গেলেন। ললিতার বয়স তখন আঠারো বছর। ওখানেই শেষ হয়ে গেল ললিতার দাম্পত্যজীবন। তখন থেকেই শুরু হল ‘সিঙ্গল মাদার’-এর ভূমিকা। একা হাতে ছোট্ট শিশুকে প্রতিপালন করা, অন্য দিকে নিজের ভবিষ্যৎ ভাবনা। এর পর কী করবেন ললিতা? পড়াশোনা করার ইচ্ছে তো ছোটবেলা থেকেই। দাদাদের মত তিনিও উচ্চশিক্ষিত হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সব স্বপ্ন শেষ হয়ে হয়ে গিয়েছিল বিয়ের সঙ্গে সঙ্গেই। শুরু হল ললিতার দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই। এক দিকে বৈধব্য জীবনে সামাজিক অনুশাসন, অন্যদিকে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন।

ললিতা আইয়ালাসোমাইয়াজুলা। ডান দিক থেকে প্রথম।

বাবা পাশে দাঁড়ালেন। প্রথমে ম্যাড্রাসের ক্যুইনস মেরি কলেজ থেকে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করলেন ললিতা। এখানেই থেমে থাকবেন না ললিতা। বাবাকে জানালেন, উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হতে চান। অর্থনৈতিকভাবে নিজেকে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে চান। ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন ললিতা। মেয়েরা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে! তখনও ভারতবর্ষে এমন কথা কেউ ভাবতে পারত না। ইঞ্জিনিয়ারিং মানেই ছেলেদের ক্ষেত্র। সেসময় যদিও মেয়েদের ডাক্তারি পড়ার প্রচলন হয়ে গিয়েছিল ভারতবর্ষে। কিন্তু মেয়েদের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শুরু হয়নি তখনও। কিন্তু ললিতা ডাক্তারি পড়তে চান না। বাবা ও দাদাদের মত তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং-ই পড়বেন।

মেয়ের অদম্য ইচ্ছে দেখে নিজে যে কলেজে অধ্যাপনা করতেন, সেই কলেজের প্রিন্সিপালকে অনুরোধ করলেন মেয়ের ভর্তি হওয়ার বিষয়ে। প্রিন্সিপাল ড. কে. সি. চাকো মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় সুযোগ পাওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট উদার ছিলেন। তাই তিনি তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকারের পাবলিক ইন্সট্রাকশনের ডিরেক্টর স্যার আর. এম. স্ট্যাথামের কাছ থেকে এ বিষয়ে অনুমোদন চাইলেন। এ ক্ষেত্রেও অনুমোদন পেতে কোনও অসুবিধা হল না।

ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে ভর্তি হয়ে গেলেন ললিতা। ম্যাড্রাসের The College of Engineering, Guindy (CEG)-এ। এই পাবলিক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজটি দুশো আঠাশ বছর আগে ১৭৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত। ইউরোপের বাইরে এটিই ছিল প্রথম স্থাপিত ‘টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠান’।

কলেজে একশো জন পড়ুয়ার মধ্যে ললিতাই একমাত্র মেয়ে। ললিতা ভর্তি হওয়ায়, কলেজে প্রথম তৈরি হল মেয়েদের হোস্টেল। ভারতে এমনিতেই তখন মেয়েদের উচ্চশিক্ষার দরজা খোলেনি, তারপর তিনি আবার বিধবা মহিলা এবং সিঙ্গল মাদার। তাই অনুমান করতে অসুবিধা হয় না, ললিতার লড়াই কতখানি চ্যালেঞ্জিং ছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় শিশুকন্যাকে আত্মীয়ার বাড়িতে রেখে নিজে থাকতেন হস্টেলে। এইভাবে ললিতাকে কলেজে পড়া চালিয়ে যেতে হয়েছে, ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। পাঁচ বছর পরে মাদ্রাজের কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে পাশ করলেন ললিতা। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয় নিয়ে। ললিতাই হলেন ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার।

১৯৪৩ সালে জামালপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপে হাতেকলমে শিক্ষালাভের জন্যে ট্রেনিংয়ে সুযোগ পেলেন। ১৯৪৪ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েট হলেন। গ্রাজুয়েশন সার্টিফিকেটে সেই প্রথম ‘He’-এর জায়গায় ‘She’ লিখতে হল ললিতার ক্ষেত্রে। কিন্তু মহিলা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি পাওয়া তো কঠিন। চলল চাকরির খোঁজ। কয়েক বছর সিমলায় সেন্ট্রাল স্ট্যান্ডার্ড অর্গানাইজেশনে কাজ করলেন। তারপর কয়েকবছর বাবার সহকারী হয়ে গবেষণার কাজে যোগ দেন। জেলেকটোনিয়াম নামের একধরনের ইলেকট্রিক্যাল মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টের পেটেন্ট করেন। এছাড়াও, ‘ধোঁয়াবিহীন ওভেন’ এবং ‘ইলেকট্রিক ফ্লেম-প্রডিউসার’ নির্মাণ করে বাবার সঙ্গে পেটেন্ট করলেন।

১৯৬৪ সালে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক মহিলা ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞানীদের অধিবেশনে ভারত থেকে প্রথম এবং একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। বাম দিক থেকে প্রথম।

কিন্তু ললিতা চাইছিলেন নিজের মত করে কাজ করার। তখন দেশ স্বাধীন হয়েছে। ললিতা চলে এলেন কলকাতায়, ‘অ্যাসোসিয়েটেড ইলেকট্রিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ’ (AEL) নামের একটি ব্রিটিশ সংস্থায় যোগ দিলেন। এই সংস্থায় তিনি বহু সাব-স্টেশনের লে-আউট করেছেন এবং ট্রান্সমিশন লাইনের ডিজাইন করেছেন। হিমাচল প্রদেশের বিলাসপুরে শতদ্রু নদীর ওপর ভাকরা নাঙাল ড্যাম বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা তৈরি করায় তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। তিরিশ বছর AEL-এ কর্মরত ছিলেন। এই AEL সংস্থাটি পরবর্তী সময়ে জেনারেল ইলেকট্রিক (GE) অধিগ্রহণ করে। ওখান থেকেই ললিতা অবসর নেন ষাট বছর বয়সে। ১৯৬৪ সালে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক মহিলা ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞানীদের অধিবেশনে ভারত থেকে প্রথম এবং একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালে কেমব্রিজে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক মহিলা ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞানীদের অধিবেশনে যোগ দেন।

তিনি একবার বলেছিলেন, ‘ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং আমার শরীরের রক্তে বইছে, আমার বাবা, আমার চার ভাই, ভাইয়ের ছেলে এবং ভাইয়ের স্ত্রী সকলেই ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার।’ ললিতাই CEG-তে মহিলাদের প্রযুক্তিবিদ্যা পড়ার দরজা খুলেছিলেন প্রথম। ললিতা ভর্তি হওয়ার পরের বছর লিলাম্মা জর্জ (Leelamma George) এবং পি. কে. টেরেসা (P. K. Teresa) নামে দুজন তরুণী ওই কলেজে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান।

আর বিয়ে করেননি। আজীবন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যা পড়ার জন্যে মেয়েদের উৎসাহ জুগিয়েছেন তিনি। ৬০ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর জন্মের শতবর্ষ পেরিয়ে এসেছি। আমরা কি তাঁকে মনে রেখেছি? একদিন আগে ২৭ আগস্ট ললিতা আইয়ালাসোমাইয়াজুলার (১৯১৯–১৯৭৯) জন্মদিন পেরিয়ে এলাম। তাঁকে নিয়ে কোথাও কি কোনও লেখা চোখে পড়েছে?

চিত্র: গুগল

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × one =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »