Search
Generic filters
Search
Generic filters

সুজিত বসুর কবিতাগুচ্ছ

স্থিরচিত্র

গোধূলির ম্লান রোদ ছবি আঁকে তোমাদের মুখে
পথের পাঁচালি যেন, সাদা কালো দুঃখী সুখী ছবি
যেরকম এঁকেছেন সত্যজিৎ রুপোলি পর্দায়
আলো আর অন্ধকার মিশে যায়, মিশে মিশে যায়
ডুবন্ত সূর্যের তেজে জ্বলে ওঠা বিষণ্ণ অসুখে
সন্ধ্যা নামে মন্দিরের বিরহী ঘণ্টার শব্দে, জলে
আবিরের ছড়াছড়ি, ঘাটে বসে একাকী মানবী
আলো আর ছায়াদের লুকোচুরি খেলা মুখে চলে
সারাদিন ঘোরাঘুরি, বাড়িতে অফিসে কত রূপ
দেখানো পোশাকে সাজে, কতশত মনোহারী কথা
বলে যাওয়া, জ্বেলে যাওয়া একগোছা গন্ধহীন ধূপ
শুধু এই গোধূলির কয়েক মিনিট নীরবতা
কেবল এটুকু প্রাপ্তি, জীবনের ধূ ধূ বালিয়াড়ি
এটুকু জলের জন্য প্রতীক্ষায়, মানুষের এই ঘরবাড়ি।

*

জোয়ার ভাটা

কবিতা আর লিখি না আমি, কবিতা আমি আর
সকাল কাটে বিকেল কাটে, রাত্রি নিঝুম ঝুম
অন্ধকারের সমুদ্রে দিই গভীর ডুবসাঁতার
এবার বোধহয় ঘুমিয়ে পড়া, এবার বোধহয় ঘুম

বান্ধবীদের শাড়ির ভাঁজে তখন আলোর ভেলা
সেই ভেলাতেই চড়ে করা জগৎ পারাপার
পদ্য নিয়ে খেলা তখন, শব্দ নিয়ে খেলা
কবিতা আর লিখি না আমি, কবিতা আমি আর

মৃগনাভির গন্ধে মাতাল সোনার হরিণ মন
সিগারেটের মাদক ধোঁয়ায় ঝাপসা নারীমুখ
অথচ সেই মুখেই তখন চুম্বক টান, সুখ
কবিতারই নেশায় মদির প্রথম সে চুম্বন

জীবন তখন শুধুই জোয়ার, ফসফরাসের জ্যোতি
আলোর স্রোতে ভাসত তখন এ বিশ্বসংসার
ভাটার টানে ভাসেন এখন আমার সরস্বতী
কবিতা আর লিখি না আমি, কবিতা আমি আর

*

অসংলগ্ন

কখনও
জিনিস কিনতে ছুটছি শপিং মলে
কখনও
উল্টোপাল্টা পদ্য লেখা চলে
কখনও
নদীর বুকে নৌকো দেখে আনন্দ লাভ
কখনও
অসংলগ্ন কথাবার্তা, মিথ্যে প্রলাপ
যখনই
ঘুমোই আমি, ঘুমিয়ে থাকে পাড়া
স্বপ্নে
মাতাল করেন ফিলমি নায়িকারা
কখনও
ঘুমের মধ্যে কাঁপতে থাকা, বরফজমা শীত
তখনই
স্বপ্নে করেন কটাক্ষপাত মাধুরী দীক্ষিত
কখনও
বুক কাঁপানো বিসর্জনে মায়ের ভাসান
পলকে
ট্রেনের উপর নাচতে থাকেন মালাইকা খান
সিনেমা
নিম্ন মধ্য উচ্চ মানের অনেক হল দেখা
আসলে
যতই দেখি, মূল কথাটা আমরা সবাই একা
তাহলে
কী আর হবে এসব দেখে, অবসাদেই থাকি
অধরাই
থাকবে জানি আকাঙ্ক্ষিত নীলকণ্ঠ পাখি
কেন যে
অর্থহীন এই জীবনটাকে জড়িয়ে থাকা স্নেহে
প্রতিদিন
বয়েস বাড়ছে, শিথিল স্নায়ু, জরার ছায়া দেহে
আজকাল
জীবন ভোগে স্বাদহীনতায়, ইচ্ছে করে মরি
বাঁচাতে
আসেন তখন অতীত এবং বর্তমানের পরী
হতাশা
নিয়েই বাঁচা, ব্যর্থতা আর পরাজয়ের গ্লানি
ভোলাতে
আসেন তখন কোয়েল পায়েল মিমি বা কৌশানী।

*

তৃষ্ণা

নদীর কাছে এলেই বুকে তৃষ্ণা সীমাহীন
নদী শুকোয় আগুনপারা রোদে
ঘরের জলে কঠিন তুষার, বরফজমা হিম
তৃষ্ণা বাড়ায় অতৃপ্তির শীতল জলস্রোতে

ছেলেবেলায় নদীর কাছে যেতাম প্রতিদিন
নদী বলে আর কেন আসিস না
তোমার কাছে নদী আমার অনেক হল ঋণ
শোধ না করার জন্য বুকে সারা জীবন তৃষ্ণা।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

3 Responses

  1. কবি সুজিত বসু তাঁর কবিতা থেকে পাঠককূলকে প্রায় তিন দশক দূরে রেখেছিলেন। কয়েক বছর হলো আমরা আবার তাঁর কবিতা পড়ছি নিয়মিত, নানান পত্র-পত্রিকায়। উনি ক্রমাগত কবিতার গড়ন নিয়ে, শব্দ ব্যবহার দিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে থাকেন। এই কবিতাগুচ্ছেও তেমন নাড়াচাড়া স্পষ্ট। কখনো কোনো মোনোটনি ঢুকতে দেননা তাঁর কবিতার শরীরী ভঙ্গিতে। তাই নিত্য নতুন কুহকের মধ্যে থেকে কবিকে, কবির সময়কে, ভাবনাকে খুঁজতে ভালবাসি আমরা, পাঠককূল।

    1. Amitava Bhattacharya Kolkata Amar priyo kobi Sri Sujit Basur notun kobitaguchcho Trishna, Osoglogno, Stirchitro ebong Jowar Bhata pore khub valo legeche. Enar notun kobita gulor praksh korar jonyo VALAVASHHA ke ebong Kobike osongkho donyobad roilo. Kobir notun aro kobita r jonyo opekhshai thaklam.

      1. আমার প্রিয় কবি সুজিত বসুর কবিতাগুচ্ছের ছন্দে আবেগে পরিপূর্ণ প্রতিটি কবিতা পড়ে খুবই আনন্দ পেলাম। কবির এই সুন্দর সুন্দর কবিতা পড়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য আবারও bhalobhashake অনেক অনেক ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 + eight =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »