Search
Generic filters
Search
Generic filters

স্মৃতি-বিস্মৃতির অন্দরমহলে: কবিতার সঙ্গে গেরস্থালি

বিস্মৃতির ভারে নুয়ে পড়ছে পৃথিবী,
ফুরসৎ উড়ে গেছে ফুরুৎ করে।
রাত্রির গহ্বর গিলে খেয়েছে ছোট ছোট আলোকণা।
আগুনের ভেতরে প্রেম, আজ অশ্রুতে বোনা।

ব্যস্ত রাজপথের অনেক দূরে নিঃসঙ্গতা ছেয়ে আছে, গলিপথ অন্ধকার।
একদিন এখানে নরম রুমাল হাতে রেখেও তারা জন্ম দিয়েছিল, বড় আদরের বাংলা কবিতার।

বিস্মৃতির অতলে প্রায় তলিয়ে যাওয়া এমন কয়েকজন মহিলা কবির কথা আলোচনা করব, যাঁরা তাঁদের কাব্যপ্রতিভার দ্যুতিতে বাংলা কাব্যের ধারাকে উজ্জ্বল ও বেগবান করে তুলেছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কৃষ্ণকামিনী দাসী,
মোক্ষদায়িনী দেবী, প্রসন্নময়ী দেবী, লজ্জাবতী বসু, জগন্মোহিনী দেবী, গিরিন্দ্রমোহিনী দাসী, হিরণ্ময়ী দেবী, অম্বুজাসুন্দরী দাশগুপ্ত, সুরবালা ঘোষ প্রমুখ।

কৃষ্ণকামিনী দাসী।।

বাংলা ভাষায় সম্ভবত তিনিই প্রথম কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ‘চিত্তবিলাসিনী’ নামে বাহাত্তর পৃষ্ঠার সেই গ্রন্থটি ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ কৃষ্ণকামিনী দাসীর এই কাব্যগ্রন্থটি সম্পর্কে লিখেছিলেন: ‘‘আমরা পরমানন্দ সাগরসলিলে নিমগ্ন হইয়া প্রকাশ করিতেছি যে এই অভিনব গ্রন্থ পাঠানন্তর চিত্তানন্দে আনন্দিত হইয়াছি, অবলাগণ বিদ্যানুশীলন পূর্বক অবনীমণ্ডলে প্রতিষ্ঠিতা হয়েন ইহাই আমারদিগের প্রার্থনা।’’

‘চিত্তবিলাসিনী’ কাব্যগ্রন্থের আরম্ভে পয়ার ছন্দে মঙ্গলকাব্যের আদলে ‘ব্রহ্মবন্দনা’ করে লেখিকা নিজের আত্মপরিচয় দিয়েছেন। হুগলী জেলার সুখরিয়া গ্রামের শ্রী শান্তিভূষণ মুস্তাফি হলেন তাঁর স্বামী। কাব্যগ্রন্থটি সেসময় নারীমুক্তি আন্দোলনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। কৃষ্ণকামিনী ‘চিত্তবিলাসিনী’-তে নারী সংলাপ রচনায় বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ‘দয়া ছাড়া ধর্ম নাই’ কবিতায় তাঁর স্বাধীন, মুক্তমনের পরিচয় পাওয়া যায়।

পুরুষের উক্তি :
ঘোর রজনীতে তুমি কাহার কামিনী।
কিসের লাগিয়ে ভ্রমিতেছ একাকিনী।।
বয়সে নবীন অতি রূপ মনোহর।
আছ রঙ্গে নাহি সঙ্গে সঙ্গিনী অপর।।

কামিনীর উক্তি:
আমি হে রমণী, আছি একাকিনী
কুলের কামিনী তায়
তুমি হে এখানে, কিসের কারণে, বল ওহে যুবরায়।।
একি তব রীত, হেরি বিপরীত
নাহি চিতে কিছু ভয়।
রমণীর পাশে, এলে অনায়াসে
কিরূপেতে মহাশয়।

সেই যুগে রাত্রে একাকী ভ্রমণরতা এক নারীর কতটা স্বাধীনচেতা মানসিকতা থাকলে এই উক্তি করা যায়, তা নিশ্চয়ই আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

কৃষ্ণকামিনী ছিলেন একজন অন্তঃপুরবাসিনী গৃহবধূ। তাই দেখার চোখ থাকলেও প্রচলিত ‘অবরোধ প্রথা’-র কারণে তাঁর পরিচিতির জগৎ সীমাবদ্ধ ছিল। তবুও ‘চিত্তবিলাসিনী’-র বিষয়বস্তুর গৌরবে ও রচনার আঙ্গিকের বৈচিত্রে অসাধারণ। তিনি নারী-স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হলেও পুরুষ-বিরোধী ছিলেন না। তাই গ্রন্থরচনার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে ‘আমার প্রাণবল্লভ যথেষ্ট সাহায্য করিয়াছেন এবং তিনি এ-বিষয়ে মনোযোগী না হইলে কেবল আমা হইতে ইহা সম্পন্ন হইবার কোন প্রকার সম্ভাবনা ছিল না’ বলতেও কোনওরকম দ্বিধাবোধ করেননি, যা প্রকৃত আধুনিকমনস্কতার প্রোজ্বল উদাহরণ বলা যায়।

শিক্ষায় তো বটেই নারীরা গ্রন্থরচনাতেও এগিয়ে আসবে এই বিষয়ে উৎসাহিত করার জন্য তিনি ভূমিকায় বলেন, ‘অদ্যাপি অস্মদেশীয় মহিলাগণের কোন পুস্তকই প্রচারিত হয় নাই, সুতরাং প্রথম এ বিষয়ে হস্তার্পণ করা কেবল লোকের হাস্যাস্পদ হওয়া মাত্র, কিন্তু আমার অন্তঃকরণে যথেষ্ট সাহস জন্মিতেছে আর আমার পুস্তক রচনা করিবার এক প্রধান উদ্দেশ্য এই যে উৎকৃষ্ট হউক বা অপকৃষ্ট একটা দৃষ্টান্ত পাইলে স্ত্রীলোক মাত্রেই বিদ্যানুশীলনে অনুরাগী হইবে, তাহা হইলেই এ দেশের গৌরবের আর পরিসীমা থাকিবেক না…।

মোক্ষদায়িনী দেবী।।

স্বনামধন্য ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের অগ্রজা ছিলেন তিনি, কিন্তু এটাই তাঁর পরিচয় নয়। ছোট থেকেই মোক্ষদায়িনী দেবী ছিলেন শিক্ষানুরাগিনী। তিনি নারীজাতির মানকে রূপ-যৌবনের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ‘প্রোষিতভর্তৃকা’ কবিতায় বলেছেন:

যার লাগি দুখ, সেই জন মুখপানে যদি নাহি চায়,
তবে কেন বল, উন্মত্ত বিকল,
হ’য়ে মন তাঁরে চায়?
আমার বিরহে, কাতর সে নহে,
মনে জ্ঞান হয় হেন।
তাঁহার বিচ্ছেদ, হৃদি করে ভেদ,জ্বালা আর সহি কেন?

১লা বৈশাখ ১৩৬৬ (১৫ই এপ্রিল ১৯৫৯)-এ প্রকাশিত ‘মিলনে’ কবিতার চতুর্থ স্তবকে তিনি লিখেছেন এক স্বামীর জবানিতে:

কেন সখি, মনোমত
হয়েছিলে মম এত
বলনা; নহিলে চিত
কভু এত ভাবিত না;
একাধারে এত গুণ ধরে কত ললনা?

এই কবিতার অন্য স্তবকে স্বামী আবার বলেন:

গৃহলক্ষ্মী পূর্ণশশী,
প্রকৃত বন্ধু প্রেয়সী
হও হে তুমি আমার,
পরামর্শে মন্ত্রী তুমি,
জীবনের আধার।
তোমারে ছাড়িয়া যাই,
এমন বাসনা নাই,
কি করি, যাইতে চাই
সংসার-তীব্র তাড়নে,
শ্রম দুঃখ বিনা অর্থ, নাহি মিলে ভুবনে।
সখি! করমের তরে,
ছাড়ি যবে যাই দূরে,
রহ তুমি এ অন্তরে,
তব বাক্যর শুনি হে স্বপনে।

এইভাবে যুগের থেকে মানসিকতায় এগিয়ে থাকা কবি মোক্ষদায়িনী দেবী। পুরুষের থেকে অনাদর পেলে মেয়েদের জীবনের কোনও দাম নেই, এই ধারণার বিরোধিতা করেছেন, আবার স্ত্রীর প্রাপ্য সম্মান প্রদানে কুণ্ঠিত নয় যে পুরুষ, তার জীবনে ‘জ্যোতি’ হয়ে উঠতে স্ত্রীজাতিকে প্রেরণা যুগিয়েছেন। নরনারীর এই সুষমাময় পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভাষ্য আধুনিক মননসমৃদ্ধ।

প্রসন্নময়ী দেবী।।

কবিতার সাথে সাথে গল্প, উপন্যাসও লিখতেন প্রসন্নময়ী দেবী। তাঁর একটি তৎকালীন নামী উপন্যাস ‘অশোক’। তাঁর পিতা দুর্গাদাস চৌধুরী ছিলেন একজন ব্রাহ্ম এবং বদলিযোগ্য চাকরি সহ একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। তাঁর এক ভাই আশুতোষ চৌধুরী এবং আরেক ভাই প্রমথ চৌধুরী ছিলেন সাহিত্যিক। তাঁদের পরিবার স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাঁদের বাড়িতে সেই সময়ের অনেক জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ঘন ঘন আসাযাওয়া ছিল। প্রসন্নময়ী ‘মাতৃ মন্দির’ এবং ‘ভারতবর্ষ’-এর মতো মর্যাদাপূর্ণ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। তিনি ‘বনলতা’ এবং ‘নীহারিকা’ নামে দুটি কবিতার সংকলন এবং ‘পূর্বকথা’ নামে একটি স্মৃতিকথা প্রকাশ করেন।

‘মানসী’ ও ‘মর্মবাণী’ মাসিক পত্রিকাতেও তিনি লিখতেন। ১৮৭০-এ মাত্র ১২ বছর মতান্তরে ১৩ বছর বয়সে সতেরোটি ছোট ছোট কবিতা সম্বলিত বারো পৃষ্ঠার ‘আধ-আধ ভাসিনী’ নামে তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়। তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বনলতা’ ২৫টি খণ্ড-কবিতার সংকলন।

প্রসন্নময়ীর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘নীহারিকা’। এই গ্রন্থের প্রথমভাগে একুশটি আর দ্বিতীয় ভাগে সতেরোটি; মোট আটত্রিশটি কবিতা রয়েছে। ‘নীহারিকা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্লীন সুর বিষাদ। কবির অনুভব এই দুঃখময় পৃথিবীতে সুখ, আনন্দ ক্ষণকালের, তাই এত মূল্যবান।

আকাশে নক্ষত্র আছে
বারি-কোলে ঊর্ম্মি নাচে,
কুসুম সুরভিময়, শশধরে হাসি,
প্রদীপ্ত অরুণে সদা তীব্র কর-রাশি
দামিনী বারিদ-কোলে,
তরুকণ্ঠে লতা দোলে,
ছায়া শীতলতা পূর্ণ, সমীরে জীবন,
তেমনি এ ভালবাসা-আত্মার মিলন!

কিন্তু এ মিলন তো চিরস্থায়ী হয় না, কারণ–
সকলি স্বার্থের দাস, স্বার্থের ধরণী–
নিজ সুখে মুগ্ধ নর দিবস রজনী।

নারীশিক্ষা প্রচলনের জন্য সেই সময়ের একাধিক মহিলা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত এবং দীর্ঘকাল ভারত-স্ত্রী-মহামণ্ডলের কর্মাধ্যক্ষা, ব্রাহ্মবালিকা শিক্ষালয়ের শিক্ষিকা, কবি প্রিয়ম্বদা দেবী ছিলেন প্রসন্নময়ী দেবীর গুণী সন্তান। শোনা যায়, স্বামী কৃষ্ণকুমার বাগচি উন্মাদ হয়ে গেলে মেয়েকে তিনি নিজহাতে মানুষ করেন। অসাধারণ ব্যক্তিত্বময়ী প্রসন্নময়ী দেবীর লেখা ‘সেই চন্দ্রালোক’ কবিতায় যেন নিজের গুণের বর্ণনার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।

নীলিমার শশধর/ পরের কিরণে
সাজিয়া, সুদূর হতে
দেয় কর অবনীতে
গৌরবের কিছু নাই আপন জীবনে

আমার জীবন শশী/ নিজের বিভায়
নিরন্তর সমুদিত,
প্রীতিকর বিমণ্ডিত,
দিবা নিশি মুগ্ধকর অতুল শোভায়।

লজ্জাবতী বসু।।

উনিশ শতকের অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক, অনুবাদক, শিক্ষক লজ্জাবতী বসু। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ রাজনারায়ণ বসুর কনিষ্ঠা কন্যা তিনি। ইয়ং বেঙ্গলের সক্রিয় সদস্য রাজনারায়ণ বসুর কন্যা লজ্জাবতী মুক্তচিন্তায় যুগের থেকে মানসিকতায় এগিয়ে দিয়েছিল। পিতার নারীশিক্ষার প্রচার ও প্রসারকার্যে তিনি আজীবন ব্রতী ছিলেন।

তিনি সাহিত্য রচনা, সঙ্গীতচর্চা, ব্রাহ্মধর্মের উপাসনা এইসব কর্মে নিজেকে নিযুক্ত করে রেখেছিলেন সারাজীবন অবিবাহিত থেকে। তাঁর রচিত কবিতা সেই সময়ে ‘প্রদীপ’, ‘সাহিত্য’, ‘প্রবাসী’, ‘নব্যভারত’ প্রভৃতি পত্রপত্রিকায় প্রায় নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হত। কুমারী লজ্জাবতী বসুর ‘যাচনা’ নামে একটি কবিতার অংশ দেখে নেওয়া যাক।

দেবী!/ চির অসম্পূর্ণ কাহিনীর মত
ব্যাকুল রাখিও পরাণি;
অকূল নদীর তীর-রেখা মত
থেকো,/ আবেগে বহিব যখনি।
থেকো,/ দীপ্ত যৌবনের রহস্যের মত,
মোর দুকূল ভরিয়া থমকি;
ফুটো,/ ধরণী যেমন জাগে গো বসন্তে
নিজ পূর্ণতায় চমকি;
জেগো,/ চির অনুদ্দেশ পথ-রেখা মত
মোর দূর দূরান্তর ভরিয়া;
এসো,/ নিজ মহিমায়, চির নীরব
আকাশের মত নামিয়া।
দাঁড়ায়ো,/ প্রথম জাগ্রত সৌন্দর্যের মত,
আপন প্রকাশে বিস্মিত;
বীণার প্রথম সুরটির মত
মধুর মরমে জড়িত।

জগন্মোহিনী দেবী।।

ব্ৰহ্মানন্দ কেশবচন্দ্ৰ সেনের সর্বার্থেই সহধর্মিণী ছিলেন জগন্মোহিনী দেবী। তাঁর আরেকটা পরিচয় হল, তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় দেশীয় রাজ্য কোচবিহারের মহারানি, ১৯৩৩ সালে অল বেঙ্গল মহিলা ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপতি, সিআইই পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম ভারতীয় মহিলা, নারীশিক্ষার পৃষ্ঠপোষক সুনীতিদেবীর মা। কিন্তু শুধু বিখ্যাত ব্যক্তির স্ত্রী বা মায়ের পরিচয়েই তাঁর পরিচয় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি নিজেও ছিলেন একজন গীতিকার ও কবি। তাঁর রচিত ‘জগৎহার’ সঙ্গীত-গ্রন্থটিতে মোট ১১৪টি গান আছে। পূর্ণিমার চাঁদ দেখে তাঁর একটি লিরিক্যাল ব্যালাডধর্মী লেখা হল ‘পূর্ণিমার চন্দ্রর্শন’।

মন হাসিতে চাও, কর শিক্ষা সুধাংশুর কাছে।
কেমন সুন্দর হাসি শিখিয়াছ মার কাছে।
এমন মধুর হাসি চারিদিকে প্রকাশি,
করিছ বিস্তার জগৎ মাঝে।
এমন হাসি হায়, দেখি নাই আর কোথায়,
আপনি হাসি জগৎ হাসায় কি অপরূপ সাজে।
ইহা হতে সুন্দর, ভক্ত মুখচন্দ্র, আহা কেমন
মধুর হাসি সাজে সে মুখ মাঝে।

[চলবে]

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 + fifteen =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »