Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ভ্রমণ লেখার অ-শরীরী সারজল

ভ্রমণ সম্পর্কে সবচেয়ে রোমান্টিক ও সংক্ষিপ্ত সংলাপটি শতবর্ষ পেরিয়ে গড়িয়ে গেল আরও দুটো বছর।
‘‘বিকজ ইট’স দেয়ার।’’— তিনটি শব্দের সমাহারে গড়ে ওঠা আপাতনিরীহ বাক্যটি তার অতলান্তিক রোমান্টিকতার ধার ও ভার উত্তরোত্তর বাড়িয়েই চলেছে।
১৯২৩-এর মার্চ মাসের এক সাংবাদিক সম্মেলনে ব্রিটিশ পর্বতারোহী জর্জ ম্যালোরিকে প্রশ্ন করেছিলেন নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সাংবাদিক— ‘‘কী জন্য হিমালয়ে উঠবেন?’’ এর আগে তো তিনবার এভারেস্টে পা রেখেছেন তিনি। চূড়ায় হয়তো পৌঁছননি, কিন্তু ইস্ট রংবুক হিমবাহ, নর্থ কল হয়ে নতুন রাস্তা আবিষ্কার ইত্যাদির সুবাদে অনেকটা সু আর অল্প কিছু দুর্নাম অর্জন করে ম্যালোরি তো পর্বতারোহণের ইতিহাসে ততদিনে খ্যাতকীর্তি পুরুষ। নতুন আর কী পাবার আছে হিমালয়ের কাছে? সে প্রশ্নের উত্তরে ম্যালোরি ওই তিনটি শব্দের বাক্যটি উচ্চারণ করলেন, সময়ের সঙ্গে যার উচ্চতা ছাড়িয়ে গেল ম্যালোরিকেও।
কারণ এই সাংবাদিক সম্মেলনের এক বছর তিনমাস পরে জুন মাসে তিনি এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার চেষ্টা করবেন বন্ধু আরভিনকে সঙ্গে নিয়ে। সামিট থেকে কমবেশি আটশো ফুট নিচে তাঁদের শেষ দেখা যাবে, যেহেতু এরপর তাঁরা মিশে যাবেন, মিলে যাবেন হিমালয়ের শরীরে। ঠিক যেমন নীলাচলে বিলীন হয়েছিলেন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য। বাকি পৃথিবী একজন মানুষের কিংবদন্তি হয়ে যাবার গল্পের সাক্ষী হয়ে অপেক্ষা করবে পঁচাত্তর বছর। কারণ ঠিক এই ক’বছর পর তাঁর দেহ উদ্ধার করবেন এক দল অভিযাত্রী— দিনটা ১৯৯৯-এর পয়লা মে। হয়তো ক্লান্ত ছিলেন, তাই পঁচাত্তর বছর বরফের বিছানায় টানা ঘুমিয়ে থাকা তাঁর দেহটা যখন প্রায় অবিকৃত অবস্থায় উদ্ধার হবে, তখন মনে হবে এক শিশু যেন মায়ের কোলে গুটিসুটি শুয়ে।
কী জানি, ওই সাংবাদিক সম্মেলনে হিমালয় স্বয়ং উপস্থিত ছিল কি না!

*

‘‘এখন দেখি, এ বেগ আমার একার নহে। যে সময়ে উঠোনে ছায়া পড়ে, নিত্য সে সময়ে কুলবধূর মন মাতিয়া উঠে, জল আনিতে যাইবে; জলে যে যাইতে পারিল না, সে অভাগিনী। সে গৃহে বসিয়া দেখে উঠানে ছায়া পড়িতেছে, আকাশে ছায়া পড়িতেছে, পৃথিবীর রং ফিরিতেছে, বাহির হইয়া সে তাহা দেখিতে পাইল না, তাহার কত দুঃখ। বোধ হয়, আমিও পৃথিবীর রং ফেরা দেখিতে যাইতাম।’’
‘পালামৌ’ ভ্রমণবৃত্তান্তে লাতেহার পাহাড়ের বর্ণনা প্রসঙ্গে সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখছেন, বিকেল চারটে বাজলেই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে ওই পাহাড়ের কাছে যাওয়ার এক অমোঘ আকর্ষণ অনুভব করতেন তিনি। কোনও অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সম্পদ যে ছিল সে পাহাড়ের, তা নয়। কিন্তু সেই সাধারণ-দর্শন পাহাড়ের রূপ বৈকালিক রোদের তেরছা আভায় এক মাতাল করা উচ্চতায় পৌঁছে যেত। আর সেই হাতছানিতে তার কাছে ছুটে যাওয়ার পাগলামোয় পেত তাঁকে। পাহাড় তো এক মৃত ফসিলমাত্র। মাঝেমধ্যে তার গা ফুঁড়ে বেরোনো গাছের ফাঁকে বয়ে চলা বাতাসের শিস্‌ডাক কানে আসে, কখনও তার মাথায় জমা মেঘের গুমগুম বুকে বাজে। পাখির ডাক, উড়তে থাকা মৌমাছির ডানার বোঁ-ও-ও আওয়াজ, শুকনো পাতায় কাঠবিড়ালির দৌড়ে যাবার খস্‌খস্‌ মাঝেমধ্যে তার বুকচাপা নৈঃশব্দ্যের নিস্তরঙ্গ জলস্তরে স্বল্পস্থায়ী ঢেউ তোলে। তবে এরা তো পার্শ্বচরিত্র। নায়কের শরীরে প্রাণের কোনও আপাতলক্ষণ তো মেলে না সেখানে। তবু তার সেই সাদামাটা নিষ্প্রাণ সৌন্দর্য বিকেলের আলোয় এক অন্য মাত্রায় জেগে উঠত। আর তার অবলম্বনেই সঞ্জীবচন্দ্রের জীবনবোধ এক নতুন মাত্রা পেত, লাতেহারের ধূসর ক্যানভাসে পৃথিবীর রং ফেরার সন্ধান পেতেন তিনি। আকর্ষণের এই বলবিদ্যার রহস্যের অনেকটাই থেকে যেত লেখকের জানাশোনার গণ্ডির বাইরে। তাঁর ভাষায়, ‘‘পাহাড়ে কিছুই নতুন নাই; কাহার সহিত সাক্ষাৎ হইবে না, কোন গল্প হইবে না, তথাপি কেন আমায় সেখানে যাইতে হইত জানি না।’’ রোমান্সের রসায়ন কে কবেই বা বুঝেছে!
আর শুধু কি তিনি? পাহাড় সংলগ্ন গ্রামের মেয়েবউরাও যে সে ডাকে সাড়া দিতে উদগ্রীব হয়ে উঠত, শুরুর কথাগুলো তারই সাক্ষী। লেখকের শিক্ষিত পরিশীলিত মনের তারের যে পর্দায় ঘাই মারত সে ডাক, তা হয়তো ওই মেয়েবউদের তুলনায় ভিন্ন। সে আহ্বানের উত্তরে পাওয়া সুরের পর্দারা লেখকের মনে যদি তুলত দরবারি কানাড়ার গভীর ঘন বোধ, গৃহবধূদের মনে তা হয়তো চলত পাহাড়ি ধুনের হালকা চলনে। কিন্তু উত্তর দিতে হত দুজনকেই, নিজের মতো করে।
রোমাঞ্চ যে নিত্যকর্মেরও সাথি।

*

১৭২৪ সাল। রাশিয়ায় এবছরের ডিসেম্বরের শুরুর দিনগুলো যেন অসম্ভব ঠান্ডায় মোড়া। সেন্ট পিটার্সবার্গের রাজপ্রাসাদেও সিঁদ কেটেছে শীত। প্রায় সন্ত্রাসবাদীর কুশলতায় ছড়িয়ে পড়েছে ঘর দুয়ারের আনাচেকানাচে। ফায়ারপ্লেসের মোটা লগে আগুন জ্বলছে বটে, কিন্তু তার তাপ দু’ফুটের বেশি দূরে পৌঁছচ্ছে না। পাশের জানালায় কাচের পাল্লার শার্শির মধ্যে দিয়ে বাইরে রাস্তার ওপর আকাশ থেকে পড়া তুলোর মতো বরফকুচির শব্দহীন অবতরণ দেখছেন বিছানায় শুয়ে থাকা সম্রাট পিটার দ্য গ্রেট। ঝাউ গাছগুলোর দুলতে থাকা মাথারা বয়ে চলা ঝোড়ো হাওয়ার অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে, তবে ঘরের ভেতরে তাকে অনুভব করা যাচ্ছে না। শরীরটা আজকাল ভাল যাচ্ছে না সম্রাটের। রাশিয়ার আমূল পরিবর্তনে যে ভূমিকা তাঁকে পালন করতে হয়েছে, তাতে মনের সঙ্গে শরীরেও চাপ কম পড়েনি। মাত্র পঁচিশ বছরেই তাঁর হাত ধরে রাশিয়া মধ্যযুগীয় বর্বরতার দিনগুলো অতিক্রম করে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের সমকক্ষ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেই সাফল্যের মূল্য চোকাতেই যেন এই বাহান্ন বছর বয়সেই শরীরে বাসা বেঁধেছে কঠিন অসুখ। শরীর অশক্ত, কিন্তু মনে যৌবনের প্রবল উপস্থিতি। রোগশয্যায় শুয়েই পাল্টে যাওয়া রাশিয়ার কথা ভাবতে ভাবতে তাঁর মনে হল রাশিয়ার পরে কী? ইতিহাসচর্চায় উৎসাহী সম্রাট শুনেছিলেন সিমিওন দেজনেভের কথা, যিনি দুবার চেষ্টা করেছিলেন রাশিয়ার পূর্বপারে এক স্বপ্নের ভূমিতে পৌঁছোতে। তাঁর মন চাইল সেই পথে যেতে। শেষে ডিসেম্বরের ২৯ তারিখ তাঁর নৌবাহিনীর কমান্ডার ভিটাস জোনাসেন বেরিং-কে ডেকে আদেশ দিলেন এক অভিযান সংগঠনের, যা খুঁজে দেখবে রাশিয়ার পূর্বপারে কী আছে!
এর ফলশ্রুতিতে জন্ম নিয়েছিল দুটি দুনিয়াকাঁপানো অভিযান। দ্বিতীয়টি পরিচিত হয়েছিল ‘দ্য গ্রেট নরডিক এক্সপেডিসন’ নামে, আর আলাস্কা নামের ভূভাগ মুখ দেখেছিল বাকি পৃথিবীর।
অভিযানের শুরু বা শেষ কোনওটাই দেখে যেতে পারেননি পিটার দ্য গ্রেট। ফলাফল বিচার তো অনেক পরের ব্যাপার। মাত্র দেড় মাস পরে কিডনির অসুখ কেড়ে নেয় পিটারের জীবন। ১৭২৫-এর ৮ ফেব্রুয়ারি ইউরিমিয়ায় আক্রান্ত পিটার মৃত্যুর আগে শেষ উচ্চারণ করেছিলেন একটি অসম্পূর্ণ সংলাপ— ‘Give everything…’। অসম্পূর্ণ বাক্যটি তার শেষ কথাগুলো খুঁজে পেলে কোন সম্পদ কার কাছে যাবার নির্দেশ থাকত, তা এখন একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। কিন্তু রোমান্টিক সম্রাট তাঁর জীবনের শেষ ইচ্ছাকে এক রোমান্টিক ভ্রমণের গর্ভেই সঁপে দিয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন— এর থেকে আর বেশি ঘন রোমান্সের গল্প একজন ভ্রামণিক কীই বা ভাবতে পারেন।

*

ভ্রমণের গল্পের শরীরকে রোমান্টিকতার মলাট পরিয়ে পুজোর ঘটের তিরকাঠিতে সুতো বাঁধার কাজটি করেন লেখক। আদালতের বিচারে তাতে মিথ্যের মিশেল থাকে অনেক। কল্পনা শব্দের আড়ালে দাঁড়িয়ে কিছুটা ছাড় হয়তো আদায় করা যায়। যুক্তিবাদীর আক্রমণ তাতে কমে না। মিথ্যে আদতে নিশ্চয়ই মিথ্যে। কিন্তু ওই মিথ্যে প্রতিমার পুজোতেই তো গড়ে ওঠে আচার, বিশ্বাস, পরম্পরা— এককথায় জীবন। তার মাটির চিবুকেই গচ্ছিত থাকে আমাদের অনন্ত আদর, সোহাগ।
ম্যালোরি কি সত্যিই ওই তিনটি শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন? নীরস তথ্য বলছে, তার অকাট্য প্রমাণ নেই। সবটাই নাকি সাংবাদিকের কল্পনাপ্রসূত। কিন্তু এই ‘নেই’-এর ভজনায় যদি মাতি, জীবন থেকে নাটক চলে গেল অনেকটাই। জীবন যেন ডিজাইনার পোশাক ছেড়ে গাছের ছাল পড়ে ফেলল। তাতে লজ্জানিবারণ হল বটে, কিন্তু স্টাইল স্টেটমেন্টটা হারিয়ে গেল। ছবির ভাষায়, পোরট্রেট হল না, পাসপোর্ট ফটোতে আটকে গেল ছবিটা।
লাতেহার পাহাড়ের সানুদেশের গ্রামের মেয়েবউরা নিছক জল আনার মতো প্রাত্যহিক কাজের প্রয়োজনেই যেত পাহাড়ের খাঁজে বয়ে চলা ঝর্নার জলে। বেলা গড়িয়ে রং পাল্টানো সূর্যের প্ররোচনায় পাহাড়ের প্রহরে প্রহরে পাল্টে যাওয়া রূপ দেখার সময় বা মানসিকতা তাদের ছিল কি না সেটা যথেষ্টই সন্দেহের বিষয়। বরং ব্যস্ত গৃহস্থালির কাজের ফাঁকে এই যাওয়াটুকু ইস্কুলের পড়ার পিরিয়ডের মাঝখানে গুঁজে দেওয়া টিফিন পিরিয়ডের অবকাশের মতো স্বস্তি বয়ে নিয়ে আসত, এটাই মনে করা স্বাভাবিক। সেখানে পতিনিন্দা, পাশের বাড়ির উদ্ভিন্নযৌবনা মেয়েটির গোপন প্রণয়ের চর্চা, কিংবা সংসার প্রতিপালনের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ভার লাঘবের কৌশল নিয়ে আলোচনা সূচিপত্রের সবটুকুর দখল নেবে, তার সম্ভাবনাই প্রবল। যে ছবি তাদের নিয়ে আঁকলেন সঞ্জীবচন্দ্র, তাকে এক আটপৌরে সংসারসংবাদের রোমান্টিক ভার্সান বললে ভুল হবে না। ঘটনার ঘনঘটা এখানে যতটা, লেখকের ইচ্ছাপূরণ তার থেকে অনেক বেশি। কিন্তু সাদামাটা ক্যানভাসের গায়ে রঙের পোঁচ পড়লে তবেই না ছবির শুরু!
অশক্ত শরীরে শয্যার আরামে ফায়ারপ্লেসের আগুনের ওম নিতে নিতে যে অভিযানের কল্পনায় মশগুল পিটার, তাতে নিত্যসঙ্গী অনিশ্চয়তা, নিদারুণ শারীরিক কষ্ট, এমনকি জীবনহানির আশংকা। কিন্তু তাতে কী? ওই যে রহস্যময়তার হাতছানি, তাকে উপেক্ষা কি সম্ভব? তাই মনে মনেই তিনি বেরিং-এর সঙ্গে ভেসে গেছেন কূলহীন সাগরের বুকে এমন এক অনির্দেশ্য গন্তব্যের উদ্দেশে, যা আছে কী নেই তাই-ই অনিশ্চিত। নিশ্চিত শুধু যাত্রার কষ্ট। তবু মন যে ওই কাঁটাবিছানো রাস্তাতেই হাঁটতে চায়। আত্মনিপীড়ন— সেও যে রোমাঞ্চের রকমফের মাত্র!

Advertisement

*

রোমান্টিক ভ্রমণ আলেখ্য, এই নিয়ে একটু উল্টোতে পাল্টাতে গিয়ে জানতে পারছি যে, পণ্ডিতদের মতে, এটি নাকি সাহিত্যের এক বিশেষ ‘জঁর’। তার নাকি পাঁচটি চরিত্রলক্ষণ।
১। প্রকৃতির শক্তি ও মাহাত্ম্যের অনুভব
২। সে বিশালত্বের প্রেক্ষিতে নিজের ক্ষুদ্রতার উপলব্ধি, ফলশ্রুতিতে মানুষের অন্তর্নিহিত সন্ন্যাসের উদ্বোধন
৩। জীবনে পবিত্রতা ও মূল্যবোধের শিক্ষাকে বহন
৪। অজানাকে জানার প্রচেষ্টায়, প্রয়োজনে আত্মপীড়নের বিনিময়েও অপরিচিত রাস্তায় যাত্রার সঙ্কল্প
৫। কোনও জায়গার ইতিহাস বর্ণনার প্রয়োজনে সেই সময়ের চরিত্র, সংলাপ ও ঘটনার কাল্পনিক কিন্তু বাস্তবানুগ বর্ণনার মাধ্যমে সেই সময়ের চিত্রটি বিনির্মাণ।
পড়তে পড়তে আমার অপণ্ডিত মন কেন জানি কেঁদে উঠল— হায়রে! রোমান্টিক লেখাকেও এমন অ-রোমান্টিক ‘কব, কিউ, কাঁহা’-র প্রশ্নমালায় যারা বেঁধে ফেলতে চায়, তারা পণ্ডিত বটে, কিন্তু অ-রসিক। জীবনের ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’ চেহারাটাকে যারা তালিকার খাঁচায় আটকে ফেলে, তাদের গলায় নিশ্চয়ই আটকে গেছে পুথির খসখসে পাতা। মনে পড়ল, কোথাও না গিয়ে ভ্রমণের অনন্ত রোমান্সে ডুবে গিয়ে যে কবি লিখলেন—
“চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর
হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,’’— তাঁর কথা।
আর মনে হল সবার জন্য ছুড়ে দিই একটা প্রশ্ন— ‘ও মশাই, একটাও ভ্রমণের লেখা দেখান তো যাতে রোমান্স নেই!’

চিত্র: বিজন সাহা, রাশিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 − four =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »