Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ষ্র’ডিঙ্গারের বেড়াল

দত্তাত্রেয় দত্ত

চলে যেতে দেখেছি যে— কাজেই জানি না
কোনো অবস্থানে ছিলে কিনা।
যাওয়া আর পাওয়া
একসঙ্গে কিছুতে ঘটে না।
দুশাঁ-র নগ্নিকা কিন্তু সিঁড়ি ভেঙে আজো নেমে আসে,
রূপরেখা স্মৃতিস্তূপ ধসে ধসে পড়ে,
ল্যাস্‌কোর গুহাগাত্রে ইতিহাস ফ্রেস্কো হয়ে গিয়ে
দশ-আঙুলে টিপে ধ’রে সময়ের অর্গ্যানের চাবি
একাকী কোরাস হয়ে সমস্বরে ডাকে;
শূন্যে প্রতিহত হওয়া প্রতিধ্বনি ভরে সহস্রার।

সমাপতনে কি ঘটে বিরহ-শৃঙ্গার
ষ্র’ডিঙ্গার,
একই সঙ্গে আছে, নেই,
কোথায় সে প্রবাসী বেড়াল?
চাপা হাসি ফেলে গেছে, নিজে সে থাকেনি
ক্যারলের চেশায়ার মেনী।
বস্তুত সে আছে নাকি নেই আমি জানি?

সেই ছবিগুলো বুকে আজও মোচড়ায়, হাতে যে-ফোটো পাইনি।
ফলে সে তো নেই। স্মৃতি পিগ্‌ম্যালিয়ন হয়ে কল্পমূর্তি গড়ে:
মাঙ্গলিকা সে যাচিকা অন্যপূর্বা— একুশে-বাইশে আগমনী
বাজিয়ে হৃদয়ে কাটা রেকর্ডের মতো মন্ত্র বারবার পড়ে।

লগ্নভ্রষ্ট মহালয়া। ‘যা দেবী’ ‘যা দেবী’ শুনে দেবী চলে গেল
ঠিকানাবিহীন দূরে। বাদশাবাগানে গেল দেশি বুলবুলি
নির্লিপ্তিযশিতা কারো ভাদ্রের কুক্কুরী ডাকে কামনা উথলোলো
জুডাস-চুম্বিত কেউ; লা পিয়েতা অন্তিমে সন্তানে কোলে তুলি

শ্মশানে জাগিছে শ্যামা মহানিশা। মা, নিষাদে শাপান্ত করি না—
সে তো ক্রৌঞ্চমিথুনের একটিকেই শায়কে গেঁথেছে ক্রূর ঝোঁকে।
বিউটি পার্লার ঘুরে মানে-র ক্যানভাসে দ্যাখো এ-ধৃষ্টনয়না
লাঞ্চ খায় ঘাসে। কেন উত্তরণ শোক থেকে অনুষ্টুভ শ্লোকে?

কবি, সে সঠিক জানে রমণীয় ধর্মে বাঁধা ক্রৌঞ্চীর স্বভাবে,
অতৃপ্তিতে জ্বলে তাই অগ্নিদাহ স্বদেশে-বিদেশে রামায়ণে:
যাও তুমি, যাও নারী বহুগম্যা, ছলনা কোরো না হাবেভাবে
চৈতন্য-আড়ালে থাকো, সেই ভালো; হোক তা লঙ্কায়, তপোবনে।

শোকসাজে অশোকের বনে আহা বসে ছিল তপঃপ্রভা মেয়ে
তন্নিষ্ঠ বানর তাই ভুলেছিল। কালক্রমে সে কোন্ দুর্ঘটে
জাগে সীতারাবণের অগ্নিফুর্তি, ধর্মধ্বজে আগুন লাগিয়ে
গুজরায় লঙ্কার দাহ। জীবদ্দগ্ধ। সে-অনলে দগ্ধে চিত্তপটে

অন্যকামা চলে গেছে: পুষ্পকে বৈদেহী হয়ে শূন্যে ধাবমান
সমান্তরাল কোনো অন্য বিশ্বে; ঘরভেদী বিভীষণে অথবা সুগ্রীবে
বীর্যবত্তা খুঁজে পেয়ে। তপোবনে গর্ভে এল ও কার সন্তান
তাতে কিবা আসে-যায়! চলে যাও— আগুনে, না মৃৎগর্ভে যাবে?

কোনো শোক অকর্মক জমে হয় ঘৃতাহুতি ক্রোধের অগ্নিতে
কোনো ক্রোধ দিবারাত্র জ্বেলে রাখে দেহেমনে ঘৃণার অঙ্গার
কোনো ঘৃণা পরিত্রাণ খুঁজে চায় মৃত মুগ্ধদেহে ফিরে যেতে
কোনো দেহ বোধোদয়ে ভেঙে পড়ে শান্তি খোঁজে অন্তিম চিতার।

ঘুণধরা সমিধ সে দুখদেহ ইন্ধন এ-কালহুতাশনে
যে-চিতাশরীর জ্বলে অস্থিসুদ্ধ পুড়ে হয় জলেতে বিলীন;
পোড়া কাঠ নাভিকুণ্ড পড়ে থাকে সিক্ত তটে এখানে ওখানে
ওষ্ঠ, উপস্থ, মুষ্ক, আলিঙ্গন, সবই তো তখন অর্থহীন।

তবুও অস্তিত্ব খুঁড়ে তুলে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া যায় না তো তাকে
হারিয়েছে কিনা যেই নাড়িয়ে দেখতে যাই কালের কঙ্কাল
তখনই দেখি সে আছে। স্মৃতি-মর্গে যতক্ষণ দোর দেওয়া থাকে
ততক্ষণ নেই। তাই থেকে-নেই ষ্র’ডিঙ্গারের বেড়াল।

তাহলে চিঠির বাক্সে স্মৃতিগুলো রয়েছে, না নেই?
ছিল পোষা, জানি আমি; কিন্তু আজ নিশ্চিত তো নই
কেমন বেড়াল তারা— পার্শিয়ান, ট্যাবি, সায়ামীজ?
নাকি তারা সব আছে একসঙ্গে নানা চরাচরে
অর্গ্যানেতে শূর্পণখা দশ-আঙুলে কোরাস বাজিয়ে?
তাই তুমি বহু হয়ে পরিবর্ত অগণ্য জগতে
ক্ষণপ্রভ ইলেকট্রন-ঘূর্ণনেতে জ্বলে-নিভে অনন্ত বিপাকে
না-থেকে-রয়েছি হয়ে একই সঙ্গে খেলাও আমাকে
যখন তারারা থাকে দিবসের আলোর গভীরে?

নিভে-যাওয়া নক্ষত্র সে অন্ধ রাতে আলো সেজে আসে।
কতো শত আলোকবর্ষের আগে মরেছে আকাশে
তবুও সে ঝুটো দীপ্তি ক্রমাগত দৃষ্টিকে ঠকায়,
সে আসে— যেন সে আছে। যেন এ-তারার আলো গায়ে
মেখে নিলে ফিরে রোজ অক্ষয় মিলনে যাওয়া যায়,
যেন কোনো সময় কাটেনি। এই এতযুগ পরে
একুশে যদিও তুমি অর্ধশতকের অন্য পারে
এখনও প্রথম দেখা, এখনও বাসেতে আধাআধি
এখনও গালের ডৌল চেয়ে দেখি কেমন শিহরে
এখনই নিভৃত ছোঁয়া, এখনই আগামী প্রতিশ্রুতি
এখনই নিরালা ঘরে মুখোমুখি নিঃস্ব হয়ে কাঁদি।

হাওয়াচঞ্চল বুকের আঁচল এখনও তোমার ওড়ে
ফিরে ভ্রূভঙ্গে চাও অপাঙ্গে চোখ অবিনীত হলে
এখনও নামালে মাথা ওই কোলে, স্ফীত আবেগের ঝড়ে
অসহায় হয়ে নিজেকে হারিয়ে গাল চেপে ধরো গালে।

বক্ষ এলায়, ঠোঁট ছুঁয়ে যায়, বাধা মানে নাকো দেহ
ঘন আশ্লেষে বুকে গিয়ে পিষে হাত টানো পাঁজরাতে
তবু দূর থেকে দূরবীন চোখে উপভোগ করো মোহ
অভিসারস্থলে যেতে ভুল হলে বিনিদ্র হও রাতে।

দোঁহা দেহকথা ছিল না তা বৃথা শরীরী আকর্ষণ
কথকতা দিয়ে কী হবে ঠকিয়ে, কথা যে মিথ্যা গড়ে
দেহকেই ধরি নিবেদন করি দেহো দেহস্পন্দন—
কথা কত মিঠে বুঝেছি তা পিঠে ছুরিকা বেঁধার পরে।

জলসিঞ্চন পেলো যার মন, যে-তরু চিনলো আলো
কার নিড়ানিতে হবে প্রাণ দিতে তখন কি সে তা জানে?
নিষ্ফলা ভুল বিষের এ-মূল উপড়ে ফেলাই ভালো,
আবর্জনার গাদে গতি তার, বিস্মৃতির কোনো ড্রেনে।

শুধু বিষমূল ছিলো না সে-ভুল: আঠা-ঝরা বিষবৃক্ষ
কূট বিষ তার চোঁয়ালো অপার দোয়াতের কালি মিশিয়ে
পড়ি প্রতি রাতে পত্রের পাতে ভণিতার সে-আধিক্য
স্মৃতিসুধাময় নয় সে প্রণয়, অমা রাতে ডাকে নিশি এ।

দোর খুলে যায়, এলোমেলো পায়ে সিগারেট হাতে পথে
ঘোর লাগা চোখে থামে মাথা ঠোকে, মেলে না স্থানে ও কালে
স্মরণে তোমারই যেন অতিমারী হানা দেয় অমরাতে
সে-অকালে তাই তোমারে শুধাই ছিলে কিনা কোনোকালে।

কোন্ কালে? কোন্ বিশ্বে? কত বিশ্ব বিম্বিত দর্পণে
অদৃশ্য ঊর্ণায় গাঁথা বুটস্ট্র্যাপে, চিউয়ের ভিশনে
ইন্দ্রলোকে মুক্তোর চাঁদোয়া:
শুভ্র অমলিন রত্ন ঊর্ণাজালে গাঁথা
এ-ওকে বিম্বিত করে লক্ষকোটি।
কিন্তু প্রতিফলন কে কার? মুখোমুখি দু-আয়নার মতো
চোখে চোখে দেখেছি তো তোমার-আমার
সারি সারি প্রতিচ্ছবি— অম্বুমুখে সদ্যঃপাতী
অম্বুবিম্ব আশার ছলনে: সেই দু’চোখ হারালে
সহস্র আমি-র সারি থাকে না থাকে না
নাকি তারা একই সঙ্গে থেকে-নেই হয়ে
দশ-আঙুলে ত্রিকালের অর্গ্যান বাজায়?
ছবিহীন চোখে সেই চোখদুটো চাওয়া,
সমান্তর যত চরাচরে সবই একাধারে হওয়া—
একই সঙ্গে বৃত, আর তাচ্ছিল্যে আবৃত…

অথচ রয়েছো কিনা তাও বিতর্কিত।

না-থাকলে আমি আছি
এ-কথার কোনো মানে আছে? এইখানে
প্রতি পল নিস্তব্ধ শোষক।
আগামী ও বিগতর ঠিক মাঝখানে
বর্তমান কোনো শব্দ নেই।
অর্থও নেই। কাল
পেরোয় না, আসেও না। মহাকাল থাকে,
আন্‌মনে টেবিলেতে দশ আঙুলে নখর বাজায়,
আড়চোখে আমাদের দেখে।

ঠিক্‌ঠাক্‌ শব্দ করে কাঁটাহীন সালভাদর ঘড়ি,
সে-শব্দে সময় খুঁজি। হকিং-এর কালের ডমরু
বেঁকে যায়, দুজনার মহা জাগতিক আকর্ষণে
সময় তুব্‌ড়ে যায়, অপরাহ্ণে ত্র্যহস্পর্শ ঘটে
ত্রিমাত্রিক রাক্ষসী বেলায়: ফের তুমি-আমি দুচোখে তাকাই,
ফের যত নষ্ট শব্দে প্রেম গোঁজো নিরর্থক তুমি—

যদিও শুনবে না কেউ। কেউ শূন্যে নেই।

Advertisement

হঠাৎ হাওয়া চলে, রহসে যেন বলে, সে আছে কোনোখানে পরবাসী,
জুঁই কি বেলিফুলে এখনো মন ভোলে, এখনো ডান আঁখি অলস হয়
নিভৃত দোর ঠেলে স্মরণে কেউ এলে— সে নয় আর আমার প্রত্যাশী
ঠিকানা অবহেলে কুচিয়ে ছিঁড়ে ফেলে ছুঁড়েছে ডাস্টবিনে যার হৃদয়।

যুগল পদপাতে যখন তার সাথে হেঁটেছি রাজপথে প্রদোষে ম্লান,
তখনই তার মনে ট্র্যাফিক-গর্জনে মুছেছে যত কথা, যত প্রলাপ।
স্মরণে কী মূঢ়তা অতীত কথকতা, কত যে আশ্বাস, কী অভিমান
নিদ্রাহীন রাতে পল্লবিত পাতে চিঠিতে এঁকেছিল কালিমাছাপ!

স্মরণগ্লানিমায় এখন বুঝি, হায়, সে-লেখা বুকে টেনে মাঝরাতে
জীর্ণ মলিদায় শীত কি চাপা যায়? হাড়েতে জমে গেছে নিঠুর হিম
স্মৃতির ধুনি জ্বেলে কি আর ওম মেলে? তুলেছি কোলে কোন্ সন্ধ্যাতে
শরীরে সে-ছোঁয়া কি এখনো আছে বাকি? ছিলো যে বিদায়ের সে অগ্রিম।

তাই সে পত্রর অনৃত অক্ষর গিয়েছে ধুয়ে। দেখি দৃক্‌পাতে
ঝাপসা সে-চিঠিতে পড়েছে যার ছিটে, তা মুখমদ নয়, থুথুর ছাপ।
তবুও তৃষারাতে নেশার ফুটপাথে সপ্তপদী হাঁটি যাত্রাতে
সে-নেশা কী মাতালো, ছন্দায়িত হলো আমার বুকে সেই ত্রিকালপাপ।

সে-যাত্রার পালা শেষ;
এসে গেল যাত্রার নব অধিকারী
যে আনে বিজয়যাত্রাপালা। সে পালায়
কতো দেশে ভ্রমে ভ্রমে কাহিনী সাজায়:
তারপর সুখে-শান্তিতে তারা—

নাকি পালা নির্বাচনে প্রমাদ ঘটেছে?

হু হু করে ইতিবৃত্ত, কী চেয়েছো, কী বেছেছো,
এক দরে পাওয়া যায় পুঁজিবাদ, সাম্যবাদ, স্বৈরাচার আদি
লে লো বাবু ছে-ছে আনা নির্বাচনে— বাবু বেছে নিলে?
আমি সে ও সখা: দাম নিতান্ত সুলভ। বেছে নাও
একে বা অন্যকে ক্ষণে ক্ষণে মনে মনে
অতল প্রেমের আহ্বানে। তবু জেনো
বাম কি দক্ষিণ পন্থা ক্রমাগত দ্বিধান্বিত হবে,
ফিরে আসা যাবে না কখনো।
নির্বাচন ফেরানো যায় না, অস্তিবাদী,
যতবারই বেছে নাও: গুলিবৃষ্টি ক্ষুধার্ত মিছিলে;
পুলিশ-ফাটকে মৃত্যু উদ্দাম প্রহারে; যোগী দিয়ে ধর্ষণ করানো…
কোন্ ভ্রান্তি বেছে নিলে কোন্‌টা ফেরানো যায়—
গুজরাটে আগুন জ্বেলে হাত সেঁকে চৌকিদারে
কতটুকু ক্ষতি ঘটালে প্রাণীর ঠিক জানে কাশীর মহিষী।
ধ্বংসের অলাতচক্রে গ্যালাক্সিরা জ্বলে শুধু নিভে যাবে বলে।
অনিশ্চিতি জগতের ভ্রূণে, তবু নিজে তুমি নিশ্চিত হয়েছো,
যে-ভুল নিশ্চিত ধ্বংস করে দেয় লোক, দেশ, কাল।
উৎসভুলে যাওয়া যাবে? ভুলের উৎস কোন্‌খানে?
ল্যাস্‌কোর গুহার গায়ে পূর্বাপর বলে কিছু নেই
সহস্রাব্দী পরম্পরা এক লগ্নে স্থির হয়ে আছে
বিলুপ্তিতে মগ্ন এক চিরন্তন সার্বভৌম ভ্রম।
‘ভুল’ কথাটার কোনো মানে নেই,
যা-কিছু করো না, সবই ভুল।
কোথায় ফিরবে বলো?
আর ফেরা যাবে?
ফেরা যায়?
ফেরা?

যদি ফের              সে-নাম ধরে ডাকি
ফিরে হবে             বুলবুলিটি পাখি?
উড়ে আর             কোনখানে বা যাবে,
হাতে বসে             বুলবুলি ধান খাবে।

ফোনে যদি           আবার জাগো নিশা
সেদিনের              সেসব কথার দিশা
খুঁজে পাবে            কোন্ আকাশের মেঘে
ভাবো তাই           রাত্তিরেতে জেগে।

মনে যদি              উদাস হাওয়া চলে
আকাশেতে           অবাক তারা জ্বলে
তবে ফের             সেই চিঠিটা লিখে
চেয়ে থাকো          কাল সকালের দিকে।

সেকি আর           রইলো ধরা হাতে?
চলে গেল             বেভুল ঠিকানাতে
বেয়ারিং              খরচা দিয়ে কে সে
তুলে নিলো          নাম-না-জানা দেশে।

কথা দিয়ে           বৌ কথা কইলো না
অবেলায়            বইলো চোখের লোনা
পাখি তাই           দেখলো ঘাড় বাঁকিয়ে
উড়ে গেল           ঝাপ্‌টে দুখান ডানা।

আজ এই পড়ন্ত নৈঃশব্দ্যে বুঝি, এই বিচূর্ণন
চিরদিনই ছিল। দুটো শতদীর্ণ আয়নার ভাঙা
অসংলগ্ন টুকরো কিছু মেঝেতে ছড়িয়ে ঝল্‌কায়।
হারানো টুকরোগুলো পেলে ভাবা যেতো
প্রতিবিম্বে অর্থ কিছু ছিলো না ছিলো না।
ইতিমধ্যে যত দুঃখ, যত সুখ পাওয়ার যন্ত্রণা,
কাঁচের ক্রূরতা নিয়ে বিঁধে থাকে পায়ে।
যে-ভ্রান্তি অন্তিম প্রাপ্তি, তার তীক্ষ্ণ কোনা
অস্তিত্বের গোড়ালিতে কী রক্ত ঝরায়!
নিখোঁজ টুকরোগুলো জীবনের কেবলি ছলায়:
‘ঘটেই তো আছে সব ফোর্থ ডাইমেনশনে,
‘আঁকা আছে ল্যাস্‌কোর গুহাতে—
‘ভূত ভবিষ্যৎ ভুলে সবই বর্তমান। পড়ে নাও।’
পড়ি তাই সময়ের রমন্যাস; শেষ হতে কতই বা বাকি—
অযথা সৃষ্টির এক সত্যান্বেষী কাহিনী, যেখানে
দর্শনের অন্তরালে নারী করে নিরাসক্ত খুন;
উৎকণ্ঠ উল্টিয়ে পাতা দেখি শেষ শ্বাসরুদ্ধ ক্ষণে
স্কোয়্যার ব্র্যাকেটে লেখা :
.                                   [পরবর্তী জীবনে দেখুন]

১০

তাই আজ অচঞ্চল স্থির জলাশয়
.              অচল হৃদয়
কেবল টিঁকিয়ে রাখা স্পন্দনের নেই প্রণোদনা
.              অভ্যস্ত বেদনা
সর্বাঙ্গে জড়িয়ে বসা ক্লান্ত খাটিয়ায়

নিরাশাবল্মীকে ঢাকা মন থাকে স্থির
.              আঁধারে বধির
আশ্রয়সন্ধান বৃথা অন্য কোনো অস্থায়ী জগতে
.              নির্যাতিত হতে
এই তো যন্ত্রণাঘেরা বঞ্চনাপ্রাচীর

সময়ে মরচেপড়া অনিচ্ছুক গতি
.              মননে বিরতি
স্মৃতির ছ্যাৎলাপড়া অতীতে পা-দুটো হড়কায়
.               অন্যমনতায়
কী ভুলিনি ভুলে যাই সেই এক ক্ষতি

অস্তিত্বে সময়ে মিল নেই এই বিলুপ্ত জগতে
.              প্রণয় সঙ্গতে
লয়েতে অমিল ছিলো তাই স্থায়ী হলো এ-অরতি
.              পূর্ণতার যতি
কারো তা পড়লো ফাঁকে কারো বা সমেতে

আযৌবন ঘিরে আছে একই দুঃখরোগ
.              বঞ্চনাসম্ভোগ
সূর্যদত্ত এ-তাম্রস্থলীও চেটে খাওয়া দ্রৌপদীর
.              জন্মকুণ্ডলীর
ভৌমদোষে উচ্ছিষ্ট এ কালসর্পযোগ

১১

দুঃখবাগানেতে দোলে মাকড়সার জাল;
ধরে নেয় আমাদের নির্ভুল আঠালো
মমতাবন্ধনে। মন শূন্যয় ভরায়—
ভয়াল ওজন যার। গাঢ় ব্ল্যাকহোল
মানে না মনের কোনো অবলম্ব চাই।

বাগান নির্জন। কোথা রমণীয় বিলাসবিছানে
রমণী রমণ করে: বিষবৃক্ষ বীজ ফেলে বিষের বাগানে,
ডালে ডালে টাঙানো ঊর্ণায় ধূর্ত হাওয়া খেলে যায়,
সুশ্রোণী এলায় ঊরু। এ তো তার জানা—
নিজের জালের আঠা পা ধরে টানে না।

স্মৃতির স্বভাব তুমি জানো:
ষোলো হাঁটু নেড়ে ক্রমে কদাকার সেইখানে আসে
দুঃখলালা দিয়ে মুড়ে তুলে রাখে বেঁধে
অবসরে ভোগ করবে বলে।
কাজেই উদ্বায়ী মন শূন্যে ঝোলে, দেখে অসহায়
তার অতীত তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে
পেশাদারী নির্লিপ্ত হিংসায়।

শূন্যে ঝোলে মাছি।
আছি কি না আছি আজ সে-তর্কে কী ফল?
থাকে না তা তোমার গোচরে। তবু সেই
থাকা-না-থাকার মধ্যে সর্বগর্ভ শূন্যের ঈথারে
যোগাযোগ আছে। কত বিশ্বচরাচর
অগণ্য ঊর্ণার টানে বাঁধা পরস্পর
রাখা আছে ল্যাস্‌কোর গুহাতে।
সেই স্মৃতিবাক্সর ভেতরে
আমি না-থাকলে তুমি ঠিক টের পাবে;
হয়তো গালে সে-ছোঁয়া লাগবে হঠাৎ— ঘুরে যেই
ফিরে চাবে, খুঁজে পাবে— কেউ কোথা নেই।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

8 + thirteen =

Recent Posts

গৌতম চক্রবর্তী

ব্রিটিশ ছোটগল্প

আমি আগে থেকেই আমেরিকার পাখি বইটি সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু কখনও বইটির সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাইনি। ঠিক যেভাবে কেউ নদীর ধারে বসে সময় কাটায়। বাবার হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমি যেন ধৈর্যের অর্থ শিখে নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। এডি ঠিকই বলেছিল— আমিও মাছ ধরতে যেতে চাইছিলাম। জলের ধারে বসে থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু বাবাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো সম্ভব হয়নি। তাই আমি অডুবন-এর সরোবরসম বইয়ে আমার জাল ফেললাম।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
তপোমন ঘোষ

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে…

হঠাৎ চোখ পড়ে বুথের এক্সিট দরজাটার দিকে… একটা ছোট্ট ছায়া ঘোরাফেরা করছে! চমকে উঠে সে দেখে, সেই বাচ্চাটা না! মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল… মজা করে পোলিং অফিসার তার ছোট্ট আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভোটের কালি। হুড়োহুড়িতে মা ছিটকে গেছে কোথাও— নাকি আরও খারাপ কিছু! বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার। শুনশান বুথে পোলিং আর সেক্টর অফিসার গলা যথাসম্ভব নিচুতে রেখে ডাকতে থাকেন বাচ্চাটাকে। একটা মৃদু ফোঁপানি… একটা হালকা ‘মা মা’ ডাক— বাচ্চাটা এইসব অচেনা ডাকে ভ্রূক্ষেপও করে না, এলোমেলো পায়ে ঘুরতে থাকে।

Read More »