Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস: অফুরন্ত মেজাজের মানুষ

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে আমার আলাপ হয় আরিফ ভাইয়ের মাধ্যমে। আর আরিফ ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ হয় কলকাতা বইমেলায়, যখন তিনি ‘মারিয়েট্টা’-র কর্মী।
১৯৮৫। পুরনো পরিচয়ের সূত্রে ঢাকায় দেখা হল আরিফ ভাইয়ের সঙ্গে। তখন তিনি হাক্কানিতে যোগ দিয়েছেন। একদিন নিয়ে গেলেন আখতারুজ্জামানের বাসায়। পুরনো ঢাকার নারিন্দায়।
তাঁর দুর্দান্ত সব ছোটগল্প, যতটুকু সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল, যোগাড় করে পড়েছি, এবং লেখক গিসেবে তাঁর স্বতন্ত্র ও সম্ভ্রান্ত অবস্থান সম্পর্কে সচেতন ছিলাম।
আলাপের দু-মিনিটের মধ্যেই মনে হল তাঁর সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গতা যেন একযুগ পুরনো। আহমদ ছফা এবং ওয়াহিদুল হকও ছিলেন এরকম; মুহূর্তে আপন ও অন্তরঙ্গ করা লোক।
আখতারুজ্জামান বহুপ্রসূ লেখক ছিলেন না। ১৯৮৫ নাগাদ সম্ভবত দুটি গল্পগ্রন্থ বেরিয়েছে তাঁর, এবং তাঁর অমন রচনাকৃচ্ছ্রতা সত্ত্বেও দু-বঙ্গে তিনি তখন রীতিমত আলোচিত একটি নাম।
কোনও এক তরুণ প্রকাশক তাঁর প্রথম বইটি ছেপেছিলেন ইলিয়াস তাঁর স্বভাবসুলভ মজাদার ভঙ্গিতে সেই প্রকাশকের হঠকারিতা ও আহাম্মুকে কাজের জন্য ছদ্ম-তিরস্কার করলেন।
প্রথমেই জানতে চাইলেন, ঢাকায় এসে নানখাটাই, পাতক্ষীর, বাকেরখানি, মরণচাঁদের মিষ্টি খেয়েছি কিনা, কোনো কুট্টির সঙ্গে আলাপ হয়েছে কিনা। আহসান মঞ্জিল, বলধা গার্ডেন, তাঁতিবাজার লক্ষ্মী বাজার ঘুরে দেখতে বললেন।
বাংলাদেশের লেখালেখি, বিশেষ করে গদ্যসাহিত্য নিয়ে কথা হল। সত্যেন সেন, শওকত ওসমান, সেলিনা হোসেন, শওকত আলীর ভূয়সী প্রশংসা করলেন। দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বাসুদেব দাশগুপ্ত, মহাশ্বেতা দেবী, দেবেশ রায় নিয়ে একেবারে অনর্গল, উচ্ছ্বসিত, বাঙ্‌মুখর। আর বললেন হাসান আজিজুল হকের কথা। ‘ওকে ফলো করে যান খালি’, এই ছিল হাসান সম্পর্কে তাঁর সেদিনের উচ্চারণ।
আসবাব-বাহুল্য ছিল না ঘরটিতে, ছিল না পোশাক-আশাকের ধার ধারা, ছিল কেবল হৃদয়ের প্রবল, মাত্রাতিরিক্ত উষ্ণতা। কোথা থেকে যে ঘণ্টাতিনেক কেটে গেল সেদিন, মালুমই পাইনি। মধ্যে দু-তিনবার চা পরিবেশন করে গেলেন ওঁর স্ত্রী সুরাইয়া ভাবী। সঙ্গে নাস্তাও ছিল অবধারিতভাবে।
চলে আসবার সময় জানালাম, খুব শিগগিরই আবার আসছি।
গেলাম কিছুদিন পর। বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে উঠতে শুরু করেছে ’৪৭ পরবর্তী থেকে, এবং এর সঙ্গে এখানকার গল্প-উপন্যাস বিকশিত হওয়ার উপক্রমণিকা তৈরি হয়েছে জানালেন। তবে বিদেশি লেখকদের অনুকরণ করার বিপজ্জনকতাও ঘটছে, যা দুশ্চিন্তার কারণ তাঁর কাছে। এছাড়া বাংলাদেশে যে বেশ কিছু নৃগোষ্ঠী, তাঁদের লেখা সাহিত্যকে তুলে আনবার অনুকূলতা তৈরি করতে হবে, তা না হলে বাংলা সাহিত্য সম্পূর্ণতা পাবে না। এটা খুব বিবেচনাযোগ্য কথা বলে মনে হল। সাঁওতাল, ওরাঁও, রাজবংশী, খাসিয়া, মণিপুরী চাকমারা যেমন, তেমনই অতি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, যেমন বংশী, রাখাইন, কোচ, উরুয়াদের লোককথা, গান, কবিতাকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসবার কথা তাঁর মাথায় ক্রিয়াশীল। আর প্রাণস্পন্দন শুনতে চান তিনি নিম্নবর্গের মানুষের। যার কিছু কিছু নিদর্শন তাঁর গল্প-উপন্যাসে আছে।
তাঁর প্রথম উপন্যাস বেরল যখন, ‘চিলেকোঠার সেপাই’, সেসময় শিবনারায়ণ রায় আমাকে তাঁর ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকায় উপন্যাসটির আলোচনা লিখতে দিলেন। আলোচনাটি প্রকাশিত হলে আমি সেই লেখাটির ফটোকপি করে তাঁকে পাঠাই। পরে দেখা হল যখন, বললেন, এভাবে তাঁর উপন্যাসটিকে আর কেউ বিশ্লেষণ করেননি। আমি বললাম, বিশ্লেষণের আরও বাকি আছে। আপনার প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘নিরুদ্দেশযাত্রা’-র রঞ্জু এ-উপন্যাসের রঞ্জুতে কীভাবে ক্রম-উত্তরিত হয়েছে, আমি তা দেখাব। আর দেখাব, না, ঠিক ঋণ নয়, কীভাবে লুশ্যুনের ‘The Diary of A Mad Man’-এর প্রভাবকে কাজে লাগিয়েছেন। উনি অবাক হয়ে গেলেন লুশ্যুন প্রসঙ্গ উত্থাপনে। মুখে কেবল একটি শব্দই উচ্চারণ করলেন, ‘জহুরি’। লিখেছিলাম একটা দীর্ঘ প্রবন্ধ গল্পটি নিয়ে। কিন্তু তিনি সেটা পড়ে যেতে পারেননি। তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘খোয়াবনামা’ নিয়ে তো আরও বড় লেখা লিখেছি। না, এটাও তাঁকে পড়ানোর সৌভাগ্য হয়নি।
১৯৮৯-তে সস্ত্রীক ঢাকায় এলাম। দেখা হল একবার, কিন্তু ফোনে কথা হত প্রায় রোজ। আর ঘণ্টাদুয়েকের কমে ফোন ছাড়তেন না। অফুরন্ত মেজাজের মানুষ ছিলেন, কথার মধ্যে বিচ্ছুরিত হত রসিকতা আর ব্যঙ্গের তীব্র ঝর্নাধারা। আমার স্ত্রীর সঙ্গেও জমে গেল খুব। কেন জানি না, ওকে বললেন, চোখে সুর্মা পরতে। তাহলে নাকি ওকে মানাবে খুব।
কলকাতাতেও দেখা হল একবার। কোনও এক সাহিত্যসভা উপলক্ষ্যে এসেছিলেন। সেবার হুমায়ুন আহমেদও আসেন। আমাকে বললেন, অবিশ্যি নিতান্তই মজা করে, হাইকোর্ট দেখতে চান। বাঙ্গালকে হাইকোর্ট দেখানো লাগে না, তাঁর কাছে মিথ। বাঙ্গাল হয়েও তিনি হাইকোর্ট দেখেননি, না ঢাকার, না কলকাতার। নিতান্তই মজা করে বলা।
ছিয়ানব্বইতে কলকাতায় এলেন ক্যানসারের চিকিৎসা করাতে। আগেই শুনেছিলাম সংবাদটা। পার্ক সার্কাসে উঠেছেন। ভাবী ও ছেলে পার্থ সহ। গেলাম দেখা করতে। রোজ আড্ডা, হাসিঠাট্টা, কে বলবে দুদিন বাদে তাঁর একটি পা কেটে বাদ দিতে হবে!
এই সময়তেই তাঁকে আনন্দ পুরস্কার দেওয়া হয় ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসের জন্য।
তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতাম, অথচ স্ত্রীকে নিয়ে কেন যেতাম না, অনুযোগ করলেন। তখন বাধ্য হয়ে সত্যি কথাটা জানাতেই হল তাঁকে— ক্যানসারে মারা গেছে গত ১৩ই ফেব্রুয়ারিতে। শুনে স্তব্ধ হয়ে রইলেন।
অপারেশনের দিন সারাক্ষণ ছিলাম ‘Repose’ নার্সিংহোমে। সারস্বতসাধক অন্ধ হয়ে যান এমন উদাহরণ আছে— হোমার, মিলটন, সুরদাস। দুর্ঘটনায় মৃতও আছেন, আলবেয়ার কামু। ক্যানসারে মৃত্যুও যে হয়নি তা নয়। কিন্তু এইভাবে পা কাটা যাওয়া… না, মর্মন্তুদ।
অপারেশনের পর দেখা হত সেই পার্ক সার্কাসের বাড়িতে। নিজে যে কী পরিমাণ রসিক ছিলেন, ওই বিধুরতার মধ্যেও প্রমাণ রেখেছিলেন তার। ‘তৈমুর লঙ-এর মতন আমিও এখন আখতারুজ্জামান লঙ।’ লঙ, মানে ল্যাঙড়া, ভাবা যায় নিজেকে নিয়ে অমন রসিকতা? তাঁর পক্ষেই সম্ভব। আবার বলতেন, ‘পা মেলে বসতে হয় না বলে চায়ের কাপটা এখন রাখা যাচ্ছে শূন্যস্থানে, কী সুবিধে, তাই না?’ আবার বলতেন, ‘পা-খান রাইখ্যা গেলাম, দেখবেন, যত্ন-আত্তির অভাব না হয় যেন!’
Repose-এ থাকাকালীন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও ভর্তি ছিলেন ওখানে। আমাকে দিয়ে চিরকুটে শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছিলেন তাঁকে। এমন ছিল তাঁর সৌজন্যবোধ।
ঢাকা ফিরে আর বেশিদিন বাঁচেননি। তাঁর স্মৃতি আমার কাছে সততই সুখের।

চিত্রণ: মুনির হোসেন

হাসান আজিজুল হক: আদ্যন্ত রসিকপুরুষ

Advertisement

কানু বিনে গীত নাই, রাধা সম প্রীত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 + 2 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »