সেবা সিং
পঞ্জাবি ভাষা থেকে অনুবাদ: গৌরী মৈত্র
শহরে যাওয়ার পথে চৌরাস্তার কাছেই হঠাৎ আমার সাইকেল পাংচার হয়ে গেল। চারপাশে দৃষ্টি ঘোরালাম, খানিকটা দূরেই টালির ওপর ঝুলে থাকা টায়ার আর ধোঁয়া নজরে পড়ল। সারাই করতে হবে ভেবে বিরক্ত মনে সাইকেল ঘষটাতে লাগলাম। দেখি, দোকানে চার-পাঁচ জন মত কাজে ব্যস্ত। চোদ্দো-পনেরো বছরের দুটো ছেলে সামনে বসে সাইকেল মেরামত করছিল। ওই বয়সেরই আর-একজন সবে কাজ করে উঠে দাঁড়িয়েছিল, তখনই বড় মিস্ত্রি ডাক দিল— ‘ও মমতু, আগে সর্দারজির সাইকেল ঠিক করে দে।’ মমতু সাইকেল নিয়ে মাটিতে শুইয়ে দিল আর টায়ার খুলতে লাগল। আমি পাশেই একটা টুলে বসে এদিক-সেদিক দেখছিলাম। মমতু টিউব বের করে হাওয়া ভরতে শুরু করে দিয়েছিল। বড় মিস্ত্রি ওকে ধমকে বলল— ‘আরে বলদ, তোর মন কোথায়? সাইকেলের টিউবে হাওয়া ভরছিস, না লরিতে, রে?’ সত্যিই তো, টিউবটা বালিশের মত ফুলে উঠেছিল, আর দু-একবার পাম্প দিলেই ওর কম্মো ফতে হয়ে যেত!
দোকানের মালিক হরিয়া সাইকেলের সামনের চাকা টাইট করে দূরে ফেলতে গিয়ে বলল— ‘সর্দারজি, আসলে ওর কোনও দোষ নেই! আজ এমনই এক ঘটনা ঘটেছে যে—’ বলেই সে হেসে ফেলল। অন্যান্যরাও হাসতে লাগল। এটুকু বলে হরিয়া যেন এক রহস্যের সৃষ্টি করল। ব্যাপারটা জানবার জন্য ব্যস্ত হয়ে আমিই কথা বাড়ালাম— ‘সে যাই হোক না কেন, তোমরা ওকে ওর মর্জিমত কাজ করতে দিয়ো! বেশি বকাবকি কোরো না!’ —‘এ কেমন কথা বলছেন সর্দারজি? দেখলেন না, ওর নিজের মত কাজ করতে গিয়ে টিউব তো প্রায় ছিঁড়েই ফেলছিল।’ গলা নামিয়ে হরিয়া বলল— ‘ও এমনতর কাজই করছে। যদি বলি— ভাই, পেছনের চাকা পাংচার, তো ও সামনের চাকা খুলে দেয়…!’ ইতিমধ্যে এক ব্যক্তি সাইকেলের ক্যারিয়ার ধরে উঁচু করে সামনের চাকায় ভর করে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে আসছে। তার সাইকেলের তালার চাবি হারিয়ে গিয়েছিল। হরিয়া এবার তালা নিয়ে পড়ল আর তাই কথার ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ল। হরিয়া তালায় তার ঢুকিয়ে ঘোরাচ্ছিল, আর মমতুর দিকে মুখ করে মৃদু মৃদু হাসছিল। এরপর সে ছোট ছেলেটিকে চা আনতে পাঠাল। সবাই চায়ে সুড়ুৎ সুড়ুৎ চুমুক দিতে দিতে কাজ করে যাচ্ছিল। পাশেই ‘ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস’-এর লোকজন ওয়েল্ডিং সেট-এর তার ও অন্যান্য জিনিসপত্র সামলাচ্ছিল। বগলে ট্রানজিস্টার চেপে, সামনের রেডিওর দোকানদার শাটার ফেলে দোকানে তালা ঝোলাচ্ছিল। চারপাশের দোকানগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ওরা সবাই চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে খানিকক্ষণ জিরিয়ে নেওয়ার ভান করছিল। কাজকম্মো শেষ করে আসলে সবার বাড়ি যাওয়ার তাড়া। চায়ে চুমুক দিতে দিতে আমি এমনিই মমতুকে জিজ্ঞেস করলাম— ‘কীরে ভাই মমতু! —এটাই তোর আসল নাম তো?’
‘কেন গো সর্দারজি। আমার নাম তো অশোক কুমার।’ —গর্বের সঙ্গে ও বলল। ‘এরা এমনিই আমায় মমতু মমতু বলে ডাকতে থাকে।’ পাশের একজনের দিকে ইঙ্গিত করে বলল— ‘যেমন একে সবাই খীরা বলে ডাকে।’ মনে হল সেজন্যই তার মমতু নামের জন্য কোনও আক্ষেপ নেই।
‘সর্দারজি, দোকানে সবারই কোনও না কোনও নাম দেওয়া রয়েছে!’ সবচেয়ে ছোট সেই ছেলেটিকে এই প্রথম বথা বলতে শুনলাম।
‘মমতু, ফের শোনা রে দোস্ত, সকালের তোর সেই গপ্পো—’ খীরা বলল। মমতু একটু সঙ্কুচিত হয়ে পড়ল। সে বাঁহাতে একটা টিউব টেনে পাংচার ঠিক করার মেশিনের নীচে রাখল আর বড় এক পাত্র থেকে জল নিয়ে আঙুলে ওই মেশিনে ফোঁটা ফোঁটা ফেলতে লাগল। জল গরম মেশিনের শব্দে উড়ে যাচ্ছে। ও মেশিনটা কষে তার চারপাশে টিউবটা জড়িয়ে নিতে থাকল। সকালের ঘটনাটার ব্যাপারে বোধহয় কিছু প্রকাশ করতে চাইছে না।
‘শোনা রে অশোক কুমার, তোর গপ্পো!’ — আমি ওর পুরো নামটা উচ্চারণ করে ওকে উৎসাহিত করতে চাইলাম।
‘কিছুই নয় সর্দারজি, ওরা এমনি এমনিই বলছে।’ কিছুটা সে ক্ষিপ্ত যেন! আসলে ওরা সবাই ওকে সকাল থেকেই খ্যাপাচ্ছিল। আর তাই সে হাসির পাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
‘বেচারা ওরা সারাদিন লোহার সঙ্গে যুঝতে থাকে, একটা না একটা অজুহাত তো চাই, টাইম পাস করার জন্য! কি, তাই না?’ —সদ্য সাইকেল ঠিক করাতে আসা এক বৃদ্ধ মন্তব্য করলেন।
‘আমিই শোনাচ্ছি তোমাদের সেই সকালের গপ্পো’— হরিয়া আর থাকতে পারল না, শেষে হার মেনে সে-ই গল্পটা শুরু করল।
‘সকালে দোকান খুলে সবে মমতু কাজে হাত লাগিয়েছে কী, তখনই সামনের রাস্তায় সাইকেল আরোহী এক কলেজগামী মেয়ের ওড়না ওর ফ্রাই-হুইলে আটকে গেল। মেয়েটি অনেক টানাটানি করল কিন্তু কিচ্ছু হল না। তারপর এদিক-সেদিক তাকিয়ে দেখল। সেই সময় সবাই যার-যার কাজে ব্যস্ত। নিশ্বাস নেওয়ার সময়ই বা কার থাকে!’ হরিয়া মৃদু-মৃদু হেসে যাচ্ছে আর সঙ্গে সঙ্গে রিমে টায়ার লাগাচ্ছে। ‘আমি মমতুকে বললাম, ভাই, যা না, ওড়নাটা ওর বের করে দিয়ে আয়, কিন্তু সে রাজি হলে তবে না? বললাম— আচ্ছা ঠিক আছে! তুই সাইকেলটাই ধরে নিয়ে আয়। এখানে বসে ছাড়িয়ে দে, যদি ওখানে তোর লজ্জা লাগে! ও তাও শুনল না। কেমন দ্বিধাগ্রস্ত।’ হরিয়া টায়ার চড়িয়ে সাইকেল স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে দিল আর ছোট ছেলেটি হাওয়া ভরতে লাগল। ‘তবে এবার আমি ওকে ধমক দিতেই ও নড়ল।’ হরিয়া একবার এপাশ-ওপাশ চোখ বুলিয়ে অনেকটা রহস্য করে বলল— ‘সর্দারজি, আপনাকে একটা মজার কথা শোনাই! যখন ও সাইকেলটা ধরে নিয়ে এল, মেয়েটির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। বেচারি, ওড়নার বাকি অংশটা হাতে ধরে ওর পিছন-পিছন হেঁটে আসছিল’— বলেই হরিয়া জোরে হেসে উঠল। অন্যরাও ওর সঙ্গ দিল। আমিও না হেসে পারলাম না।
হরিয়া বলে চলল— ‘ব্যাস এ তো যে করে হোক ওড়নাটা ছাড়াতে পারল বটে, কিন্তু তাতে ওড়নার একদিক কালো হয়ে গেল আর ছিঁড়েও গেল। মেয়েটি ওড়নার ওই টুকরোটা ছিঁড়ে মমতুর হাতে ধরিয়ে দিল। একটু মুচকি হাসি হেসে প্যাডেলে পা তুলে দিল। দ্রুত চালিয়ে চলে গেল। আর— আর মমতু মহাশয় তো ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।’ এ পর্যন্ত বলে হরিয়া জোরে হেসে উঠল— ‘‘এর তো খারাপ অবস্থা হয়ে গেল। খীরা বলল— ‘ভাই। তুই ওই ওড়নাটা শুঁকে দেখ, সুন্দর গন্ধ পাবি!’ —আর তারপর ও সত্যি সত্যিই গন্ধ শুঁকতে লাগল। ‘শুঁকে নে, শুঁকে নে, তারপর পকেটে ঢুকিয়ে রাখ।’ মমতু তা-ই করল। কাজে আর মন নেই। মাঝে-মাঝে শোঁকে আবার রেখে দেয় পকেটে। এর পর তো খীরা, ছোটু, মোটু সবাই শুঁকে শুঁকে দেখল। মমতু রেগে ঝাপটা মেরে টুকরোটা ছিনিয়ে শুঁকে দেখে বলল— ‘আরে, তোমরা তো শুঁকে শুঁকে গন্ধটা সব শেষ করে দিয়েছ।’’ হরিয়া নীচু স্বরে বলল— ‘গন্ধটা ফুরিয়ে গেছে দেখে ও খুব মুষড়ে পড়ল। কতক্ষণ পর্যন্ত ও গুম মেরে একা বসে থাকল, কোনও কাজে হাতই লাগাল না। তারপর কী জানি, কী ওর মনে হল ও ওড়নার অংশটা পকেট থেকে বের করে ঝটাপট মোবিল অয়েলে চুবিয়ে দিল। দেখুন, ওই পড়ে আছে ন্যাতাটা।’ হরিয়া আঙুল তুলে দেখাল। বলা শেষ করে ও জল দিয়ে টিউবের কোথা থেকে হাওয়া বেরচ্ছে খুঁজতে বসল। কারও মুখে কোনও বিষাদ বা হাসির চিহ্নও নেই। সব চুপচাপ। মমতুর মুখ নিপাট-নির্লিপ্ত মতন! তবে ওর হাত কাজ করে যাচ্ছে। স্ট্যান্ডে রিম লাগিয়ে নিপ্পলে চাবি দিয়ে ঢিলে তারগুলো টাইট করছে আর ভাঙা ফুটোফাটা পাল্টে ঠিক করে দিচ্ছে। মনে হচ্ছিল কোথায় যেন ও ভেতরে ভেতরে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎই মমতু হাতের কাজ ফেলে উঠে দাঁড়াল আর মোবিল অয়েলে ভেজা ওড়নার টুকরোটা কুড়িয়ে হরিয়ার মুখে জোরে ছুড়ে মারল। দেখলাম কাঁদতে কাঁদতে ও সামনের রাস্তার ওপারে ছুটে চলে গেল।
চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়
***
লেখক পরিচিতি
কাশ্মীরে বসবাসকারী অধ্যাপক সেবা সিং পঞ্জাবি লেখকের চেয়ে পঞ্জাবি ভাষা এবং সাহিত্যকে একটা মর্যাদাপূর্ণ স্থান করে দেওয়ার প্রচেষ্টার জন্য বেশি খ্যাত। তিনি ‘পঞ্জাবি সাহিত্ সভা’-র উপস্থাপক ছিলেন। ছোটগল্পে তাঁর বিশেষ স্থান রয়েছে। এছাড়া উপন্যাস, সফরনামা, প্রবন্ধ, আত্মজীবনী এবং ‘লোকধারা’-র ওপর প্রচুর লেখা রয়েছে। ১৩ এপ্রিল ২০১৯ তিনি গত হয়েছেন।
