Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

অ্যাম্পিয়ার: যাঁর নাম আমাদের প্রতিদিনের উচ্চারিত একটি শব্দ

আজ থেকে দুশো সাতচল্লিশ বছর আগে ফ্রান্সের লিয়োঁ-তে একটি ধনী ও অভিজাত পরিবারে জন্ম হয়েছিল ছেলেটির। বাবা মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। মা ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণা ক্যাথোলিক আর বাবা ছিলেন একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ সিল্ক-ব্যবসায়ী। আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন বাবা। লাতিন এবং ফরাসি সাহিত্য ছাড়াও বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। ছেলেকে কখনওই তিনি ধরাবাঁধা আর প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চাননি। তাই কোনও স্কুলে ভর্তি করেননি ছেলেকে। কেন না, তিনি বিশ্বাস করতেন ‘Education direct from nature’, ‘সরাসরি প্রকৃতি থেকে শিক্ষা’— এই মতাদর্শে। বাড়িতে বাবার বিশাল লাইব্রেরি ছিল। সেখানে নানান ধরনের বই। বাবার ইচ্ছে অনুযায়ী ছোট থেকেই নিজের ইচ্ছে ও আগ্রহমত যা ইচ্ছে হত, তাই পড়ত ছেলেটি। কিছু অসুবিধা হলেই বাবাকে জিজ্ঞেস করে নিত। এইভাবে পড়াশোনা করার জন্যে ছেলেবেলা থেকেই নানান বিষয়ে জানবার আগ্রহ আর কৌতূহল জেগে ওঠে ছেলেটির।

কে এই ছেলেটি? যার কথা বলছি সেই ছেলেটির পুরো নাম অ্যাঁন্দ্রে-মারি অ্যাম্পিয়ার (André-Marie Ampère, ১৭৭৫-১৮৩৬)। পরবর্তী সময়ে তিনিই পরিচিত হয়ে উঠবেন একজন খ্যাতিমান ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী এবং গণিতবিদ হিসেবে। Electrodynamics (যা এখন electromagnetism নামে পরিচিত) শাখার জনক হিসেবে মান্যতা পাবেন তিনি। ইলেকট্রিসিটি এবং ম্যাগনেটিজম এর মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে অ্যাম্পিয়ারের তত্ত্বর কথা স্কুলে বিজ্ঞানের ক্লাসে সবাইকে পড়তে হয়। অ্যাম্পিয়ারের ওই ভিত্তিস্থাপনই পরবর্তীকালে ইলেকট্রিসিটি এবং ম্যাগনেটিজম এই দুটি শাখাকে নানা দিকে আরও পল্লবিত ও সমৃদ্ধ করে তোলে। সহজ ও সাধারণ একটি পরীক্ষা থেকে কী গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এলেন! একটি পরিবাহী তারের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ পাঠানো হলে চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়। তৈরি-হওয়া এই চৌম্বকক্ষেত্র, পরিবাহী তারটির নীচে বসানো চুম্বক-শলাকার বিক্ষেপ ঘটায়। অ্যাম্পিয়ারের যখন পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স, তখন ‘ইলেকট্রোম্যাগনেটিজম’ নিয়ে তাঁর বিখ্যাত কাজগুলি করেছেন।

অ্যাম্পিয়ারের এই উদ্ভাবনার কথা মাথায় রেখে পরবর্তী সময়ে উদ্ভাবিত হয়েছে আরও একাধিক নতুন নতুন তত্ত্ব এবং প্রযুক্তি। আমরা দেখেছি অ্যাম্পিয়ারের পর ফ্যারাডে, এডিসন, তেসলা কিংবা ম্যাক্সওয়েল কীভাবে এগিয়ে নিয়ে নিয়ে গেছেন তড়িৎ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রটিকে। আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, তড়িৎক্ষেত্র থেকে চুম্বকক্ষেত্র নির্মাণ কিংবা চুম্বকক্ষেত্র থেকে তড়িৎক্ষেত্র নির্মাণ-ই যাবতীয় ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির মূলে।

আবার ফিরে দেখব কেমন ছিল অ্যাম্পিয়ারের ছোটবেলা? কীভাবে বেড়ে উঠেছেন? অ্যাম্পিয়ারকে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে গেলে, তাঁর প্রতিভা আর অবদানের পাশাপাশি তাঁর বেড়ে ওঠার কথা জানাটাও খুব জরুরি। সেই সঙ্গে জানা দরকার তাঁর জীবন সংগ্রামের কথাও।

ছোটবেলা থেকেই ইতিহাস, সাহিত্য, ভ্রমণ ও প্রকৃতি বিজ্ঞানের পাশাপাশি অংক আর জ্যামিতিতে খুব আগ্রহ ছিল অ্যাম্পিয়ারের। বাবার মত বালক অ্যাম্পিয়ারেরও ছিল সব বিষয়ে জানার বিপুল আগ্রহ। আগেই বলেছি, বাড়িতে বাবার লাইব্রেরিতে ছিল নানান বিষয়ের বইয়ের বিশাল সংগ্রহ। সেই লাইব্রেরির জ্ঞানের ভাণ্ডারে সময় কাটতে থাকে অ্যাম্পিয়ারের। ওখানেই তিনি আকণ্ঠ জ্ঞানের তৃষ্ণা মিটিয়েছেন। ছোটবেলাতেই এনসাইক্লোপিডিয়ার সমস্ত বিষয় পড়ে ফেলেছিলেন অ্যাম্পিয়ার। বারো-তেরো বছর বয়স থেকেই ‘অ্যাডভান্সড ম্যাথামেটিক্স’-এর বই পড়া শুরু হয় অ্যাম্পিয়ারের। গণিতের অধিকাংশ বই যেহেতু ছিল লাতিন ভাষায়, তাই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লাতিন ভাষা শিখে নিয়েছিলেন অ্যাম্পিয়ার। গণিতবিদ অয়লার লেয়নার (Leonhard Euler) এবং জাক ব্যর্নুলির (Jacqes Bernoulli) গণিত বইগুলি পড়ার জন্যেই লাতিন শিখেছিলেন অ্যাম্পিয়ার।

আগেই বলেছি সেভাবে কোনও স্কুলে পড়েননি অ্যাম্পিয়ার। বাবার সংস্পর্শে এসে নানান অজানা বিষয় জেনেছেন। পরবর্তী সময়ে অ্যাম্পিয়ার নিজের কথা লিখতে গিয়ে এক জায়গায় সেই কথাই বলেছেন, “My father… never required me to study anything, but he knew how to inspire in me a great desire for knowledge. Before learning to read, my greatest pleasure was to listen to passages from Buffon’s natural history. I constantly requested him to read me the history of animals and birds…”। বাবা নিজে তো শিখিয়েছেনই, সেই সঙ্গে বাবা তাঁর চেনাজানা বিশেষজ্ঞ কয়েকজন শিক্ষকের কাছে যাতে কিশোর অ্যাম্পিয়ার সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি বুঝে আসতে পারে, তার যথাযথ ব্যবস্থাও করেছেন।

আইফেল টাওয়ারে খোদিত অ্যাম্পিয়ারের নাম। ছবিতে একেবারে ডানদিকে।

সব সময় সবার জীবন সহজ-সরল পথে চলে না। অ্যাম্পিয়ারের জীবনেও একসময় নেমে এল চরম সংকট। যখন মাত্র চোদ্দো বছর বয়স, তখন ফ্রান্সে শুরু হয়েছে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। এর তিন বছর পরে, অ্যাম্পিয়ারের সতেরো বছর বয়সে, বড় দিদি মারা গেল। এই ক’বছরে ফরাসি বিপ্লবের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। অত্যাচারী রাজা ল্যুইস-XVI এর অপশাসনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছেন দেশের সাধারণ মানুষ। টগবগ করে ফুটছে অসন্তোষ। দিদির শোক কাটতে না কাটতেই অ্যাম্পিয়ারের জন্যে অপেক্ষা করে ছিল খুব বড় এক ট্র্যাজেডি। দিনটি ছিল ২৪ নভেম্বর, ১৭৯৩। আরও অনেকের সঙ্গে অ্যাম্পিয়ারের বাবাকেও বন্দি করা হয়েছিল এবং গিলোটিনে বাবার মাথা কেটে হত্যা করা হল। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করতে চাই যে, অ্যাম্পিয়ারের বাবার হত্যার কয়েকমাস পরেই ১৭৯৪ সালের ৮ মে ফরাসি বিপ্লবে আরও একটি কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটেছিল। আধুনিক রসায়নবিদ্যার জনক স্বনামধন্য ল্যাভঁসিয়েরকে গিলোটিনে মুণ্ডচ্ছেদ করে হত্যা করা হয়েছিল।

বাবার মৃত্যুর এই মর্মান্তিক ঘটনা আঠারো বছরের অ্যাম্পিয়ারের জীবনে নিয়ে এল এক চরম ব্যক্তিগত সংকট। বাবাকে হত্যা করার ঘটনার পরে পরেই অ্যাম্পিয়ারের জীবনের সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেল। বাবার মৃত্যুর ওই সুতীব্র ধাক্কা সামলাতে পারলেন না অ্যাম্পিয়ার। অ্যাকুইট ডিপ্রেশনের মধ্যে চলে গেলেন তিনি। থমকে গেল তাঁর জীবন। আঠারো বছরের অ্যাম্পিয়ার তখন নির্বাক ভাবলেশহীন। যেন এক অন্য মানুষ। আর স্বভাবতই ওই চরম দুর্দিনে অ্যাম্পিয়ারের ওইরকম অবস্থায় বাড়ির অন্যরাও দিশেহারা। তখন একটাই চিন্তা, কী করে স্বাভাবিক ও সুস্থ হয়ে উঠবে ছেলে?

সেই সময় পরিবারের সবাই সিদ্ধান্ত নিলেন, বাড়ি থেকে দশ কিলোমিটার দূরে নির্জন একটি গ্রামে তাঁদের পরিবারের যে বাগানবাড়িটি রয়েছে, সেখানে অ্যাম্পিয়ারকে রাখবার। বাড়ির এই শোকের আবহ থেকে এবং অন্য সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্নভাবে তাকে রাখা গেলে, তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠতে পারবেন অ্যাম্পিয়ার। ওই বাগানবাড়িতেও ছিল বাবার অন্য আর একটি লাইব্রেরি। সেখানেও ছিল বইয়ের বিশাল সম্ভার। কয়েকদিন যেতে না যেতেই, সেখানে নিজের মনে একাকী বইয়ের জগতে ডুবে থাকতেন অ্যাম্পিয়ার।

ওই দূর নির্জন বাগানবাড়িতে থাকার সময় অ্যাম্পিয়ারের জীবনে এসেছিল ‘জুলি ক্যারোন’ নামের একজন তরুণী। অসহায়, বিধ্বস্ত, বিপন্ন অ্যাম্পিয়ারের পাশে পরম বন্ধুর মত সেসময় থেকেছেন জুলি। অ্যাম্পিয়ারকে শুশ্রূষা, সান্ত্বনা আর সাহস যুগিয়েছেন জুলি মাসের পর মাস। জুলির মমতা, সেবা, ভালবাসা আর আন্তরিকতার জন্যেই অ্যাম্পিয়র তাড়াতাড়ি সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। তবু ওই চরম সংকট আর দুরবস্থা থেকে অ্যাম্পিয়ারের স্বাভাবিক ও সুস্থ হয়ে উঠতে দেড় বছরের কাছাকাছি সময় লেগেছিল।

পরবর্তীকালে জুলি ক্যারোন নামের ওই মেয়েটিই হয়েছিলেন অ্যাম্পিয়ারের স্ত্রী।

চব্বিশ বছর বয়সে অংকের শিক্ষকতার স্থায়ী কাজ পেলেন অ্যাম্পিয়ার। অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে অনেকখানি মুক্ত হলেন এর ফলে। বিয়ে করলেন প্রণয়ী জুলি-কে। বিয়ের এক বছর পরে অ্যাম্পিয়ার ও জুলির ঘরে জন্ম নিল একটি পুত্রসন্তান। অ্যাম্পিয়ারের নবজাতক ছেলের নাম দেওয়া হল অ্যাম্পিয়ারের নিহত বাবার নামে।

তাঁদের সুখ আর আনন্দের আকাশে কখন যে আবার ট্র্যাজেডির ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেল। তখনও চার বছরের বিবাহিত জীবন পার হয়নি জুলির সঙ্গে। কঠিন অসুখে ভুগছিলেন কয়েক বছর থেকেই। অ্যাবডমিন্যাল ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন স্ত্রী জুলি। স্ত্রীর মৃত্যুর এক বছর আগে সুবিখ্যাত এ-কোলে সেন্ট্রাল প্রতিষ্ঠানের ফিজিক্স ও কেমিস্ট্রির অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন অ্যাম্পিয়ার। স্ত্রীর মৃত্যুর পর অ্যাম্পিয়ার প্যারিস চলে গেলেন ‘এ-কোলে পলিটেকনিক’-এ শিক্ষকতার কাজ নিয়ে।

শুধু গণিত ও পদার্থবিদ্যা নয়, ইতিহাস, দর্শন ও জ্যোতির্বিদ্যা সহ একাধিক বিষয়ে ছিল অ্যাম্পিয়ারের আগ্রহ। ‘astatic needle’ উদ্ভাবন করেছিলেন আম্পিয়ার, যেটি পৃথিবীর ম্যাগনেটিক-ফিল্ডে কোনও প্রভাব ফেলে না। যা আধুনিক ‘আস্টেটিক-গ্যালভ্যানোমিটার’-এর জন্যে একটি অপরিহার্য যন্ত্রাংশ। তড়িৎ প্রবাহের উপস্থিতি ও পরিমাপ করতে প্রয়োজন হয় এই গ্যালভ্যানোমিটার। ফিজিক্স ও গণিত ছাড়াও রসায়নশাস্ত্রেও আগ্রহ তৈরি হয়েছিল অ্যাম্পিয়ারের। ‘ফ্লোরিন’ মৌলের আবিষ্কার এবং নামকরণ করেছেন তিনিই। এ ছাড়া, ‘ফ্লোরিন’ মৌল যে ‘ক্লোরিন’-এর সঙ্গে যে অনেক মিল আছে, সে বিষয়টিও অ্যাম্পিয়ার উল্লেখ করেছিলেন।

আমরা সকলেই জানি তাঁর নামেই ‘ইলেকট্রিক কারেন্ট’ পরিমাপের SI একক— ‘Ampere’। যা কখনও সংক্ষেপে ‘Amp’ হিসেবেও লেখা হয়ে থাকে। বস্তুত ‘Ampere’ একক আমাদের প্রায় প্রতিদিনের উচ্চারিত একটি শব্দে পরিণত হয়ে উঠেছে আজ। ‘Ammeter’ যন্ত্রের সাহায্যে কোনও সার্কিটে বিদ্যুৎ প্রবাহ পরিমাপ করা হয়। সেই পরিমাপের একক ‘Amp’ বা ‘A’। আজ আমরা জেনেছি একটি সম্পূর্ণপরিবাহী সার্কিটে যে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় বস্তুত তা ‘ইলেকট্রনের প্রবাহ’। আর এই বিদ্যুৎ শক্তিই ঘরের ইলেকট্রিক আলো, পাখা থেকে বিদ্যুৎচালিত ট্রেন চলে।

আর একজন বিজ্ঞানী জর্জ সিমন ওহ্‘ম্’ যার বিখ্যাত সূত্রটি ওহ্‘ম্’-এর সূত্র ( Ohm’s Law) হিসেবে স্কুলে পড়তে হয়। একটি বৈদ্যুতিক বর্তনীতে প্রবাহ, রোধ ও ভোল্টেজের মধ্যে যে সম্পর্ক থাকে, তা তিনি পরীক্ষার মাধ্যমে দেখান। ১৮২৭ সালে আবিষ্কৃত সেই সম্পর্ক সূত্রটি হল V = I R, যেখানে ‘V’ হল প্রবাহ সৃষ্টিকারী ভোল্টেজ এবং R হল তড়িৎপ্রবাহের প্রতিবর্তনীর রোধ। আর ‘I’ হল তড়িৎপ্রবাহ। যা ওহমের সূত্র হিসেবে পরিচিত। রোধ পরিমাপের একক বিজ্ঞানী ওহমের নামের সম্মানে করা হয়েছে ‘ওহম’। ‘V’ এসেছে ইতালিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী Alessandro Volta-র নামের সম্মানে। ‘I’ এর একক আম্পিয়ারের নামের প্রতি সম্মান জানিয়ে ‘I’।

ভাবতে আশ্চর্য লাগে, প্রথাগত কোনও স্কুল-কলেজে না পড়েও কেবলমাত্র অসীম জ্ঞানতৃষ্ণা আর গভীর আগ্রহ অ্যাম্পিয়ারকে ওইরকম মাপের একজন সফল বিজ্ঞানী হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে। তবে একথা ঠিক যে, তাঁর অবদানের কথা সেসময় তাঁর দেশবাসী অনুধাবন করতে পারেননি।

তাঁর মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে গুস্তাফ আইফেল ১৮৮৯ সালে সুবিখ্যাত ‘আইফেল টাওয়ার’ নির্মাণ করেন। সেই টাওয়ার ফলকে বাহাত্তর জন বিখ্যাত ফরাসি কৃতিমান বিজ্ঞানী ও মনীষীর নাম খোদাই করা হয়। আইফেল টাওয়ারের সেই ফলকে অন্য কীর্তিমান মানুষদের সঙ্গে অ্যাম্পিয়ারের নামটিও উজ্জ্বল অক্ষরে খোদাই করা আছে। এছাড়া, অনেক রাস্তা, স্কুল, লিয়োঁ মেট্রো স্টেশন, ইলেকট্রিক-নৌ-পরিবহণেও অ্যাম্পিয়ারের নাম রাখা হয়েছে। বিশ্বের সমস্ত বিজ্ঞানী তাঁর ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিজমের কাজকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। James Clerk Maxwell-এর মত বিশ্ববন্দিত পদার্থবিজ্ঞানী, সঠিকভাবেই অ্যাম্পিয়ারকে ‘The Newton of Eelectricity’ বলেছেন।

তবে অ্যাম্পিয়ারের জীবন সুখের ছিল না মোটেই। দিদির মৃত্যুর পরে বাবার মৃত্যু। বাবার মৃত্যু বেদনায় নিজের মানসিক অবসাদ নেমে আসা। তারপর বিয়ের এক বছর যেতে না যেতেই স্ত্রীর লাগাতার অসুস্থতা। তখন তিনি জীবিকার জন্যে অন্য শহরে। স্ত্রী-সন্তানকে ছেড়ে অন্য শহরে একা থাকার জন্যে, পরিবারের জন্যে দুশ্চিন্তা আর অপরাধবোধ। বিয়ের চার বছরের মাথায় স্ত্রীর মৃত্যু, তখন ছেলের বয়স তিন বছরও হয়নি। জুলির মৃত্যুর তিন বছরের মাথায় দ্বিতীয় বিয়ে করেন অ্যাম্পিয়ার। সে বিয়ে টিকল না। দুবছর পরে আইনগতভাবে ডিভোর্স হয়ে যায় দুজনের। অ্যাম্পিয়ারের দায়িত্বে পড়ল এক বছরের কন্যার প্রতিপালন করার। এখানেই শেষ নয়। পুত্র বড় হতেই তার সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয়ে ওঠে। নিত্যদিন বাদানুবাদ আর তর্ক লেগেই থাকে। মেয়ের বিয়ের পর, মদ্যপ স্বামীর জন্যে মেয়ের অসুখী জীবনের ঘটনায় সব সময় অ্যাম্পিয়ারকে দুশ্চিন্তায় রাখত। একসময় স্বামীকে ছেড়ে বাবার কাছে চলে আসতে হল মেয়েকে। তার এক বছরের মাথায় আবার জামাইও শ্বশুরালয়ে এসে উপস্থিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। একদিকে বাড়িতে দমবন্ধ করা পরিস্থিতি অন্য দিকে প্রতিবেশীদের নিন্দা আর কটুকথা। সে এক জটিল আর দুঃসহ পরিস্থিতি।

এই সব অশান্তি, শোক, যন্ত্রণা আর টানাপড়েনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে অ্যাম্পিয়ারকে। অবশেষে একষট্টি বছর বয়সে ১০ জুন ১৮৩৬ সালে যখন অসুস্থ অ্যাম্পায়ার মারা যাচ্ছেন, তখন তিনি সম্পূর্ণ একা। পাশে কোনও আত্মীয় ছিলেন না।

তাঁর সমাধি ফলকে এপিটাফ লেখা আছে, ‘He loved the human kind; he was simple, good and grand.’ এপিটাফে আরও লেখা ‘Tandem felix’ অর্থাৎ ‘happy at last’। সত্যিই অ্যাম্পিয়ারের মত সরল ও দয়ালু হৃদয়ের মানুষের জীবনে অবশেষে মৃত্যুর হাত ধরেই সুখ আর শান্তি বয়ে এল।

চিত্র: গুগল
Advertisement
4.5 8 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

আবদুল্লাহ আল আমিন

মাহমুদ দারবিশের কবিতায় ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রাম

যুবা-তরুণ-বৃদ্ধ, বাঙালি, এশিয়ান, আফ্রিকান যারাই তাঁর কবিতা পড়েছেন, তারাই মুগ্ধ হয়েছে। তাঁর কবিতা কেবল ফিলিস্তিনি তথা আরব জাহানে জনপ্রিয় নয়, সারা বিশ্বের ভাবুক-রসিকদের তৃপ্ত করেছে তাঁর কবিতা। তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক পঠিত নন্দিত কবিদের একজন।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর কবিতা: কিছু কিছু পাপ

শৈবাল কে বলেছ তাকে, এ যে বিষম পাথরে/ সবুজ জমা, গুল্মলতা পায়ে জড়ায়, নাগিনী/ হিসিয়ে ফণা বিষের কণা উজাড় করো আদরে/ তরল হিম, নেশার ঝিম কাটে না তাতে, জাগিনি

Read More »
সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »