Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ঋত্বিক ঘটক ও বাংলাদেশ

ঋত্বিককুমার ঘটক নিঃসন্দেহে এই উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক। কেবল চলচ্চিত্রেই যে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল তা নয়। কিশোর বয়স থেকেই তিনি নাটকে অভিনয় করেছেন, কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন গল্প, নাটক, প্রবন্ধ। রাজশাহী কলেজে পড়াকালীন তিনি ‘অভিধারা’ নামে একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন। যৌবনেই যোগ দিয়েছিলেন রাজনীতিতে। পিতা ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট। তাই ছাত্রজীবনে তাকে নানা জেলায় ঘুরতে হয়েছে, আর তাই তাঁর বিদ্যালয়-জীবন কেটেছে বিভিন্ন স্থানে ও জেলায় জেলায়।

একথা অনস্বীকার্য যে, আজ ঋত্বিকের মূল পরিচয় একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র পরিচালকরূপে। আর তাঁর সমগ্র চলচ্চিত্রভাবনার পেছনে ক্রিয়াশীল সাতচল্লিশের দেশভাগের বেদনা ও আর্তি, ক্ষত। দুই বাংলার ভাগ হয়ে যাওয়াকে তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। পারেননি কোনও সচেতন ও স্থির মস্তিষ্কের মানুষ। তবে ঋত্বিকের যন্ত্রণাটা এতই প্রবল ও চিরস্থায়ী হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, সমগ্র জীবনটাই তিনি ব্যয় করে ফেললেন দেশভাগের কাজরীগাথা নির্মাণে।

অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন, ‘আর সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে, ভাগ হয়নিকো নজরুল’। নজরুলের মতো ঋত্বিক-ও ভাগ হননি। তার প্রমাণ, ৪৭-এর দেশভাগের দরুন তিনি তাঁর জন্মভূমি রাজশাহী ছাড়তে বাধ্য হলেও কোনওদিন তার মাতৃভূমিকে ভুলতে পারেননি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বেপরোয়া হয়ে পূর্ববঙ্গে ঢুকে পাক-সৈন্যদের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ের ছবি তুলেছেন। সারা ভারতের চলচ্চিত্রজগতের মানুষকে,— দিলীপকুমার, নার্গিস, লতা মঙ্গেশকর প্রমুখকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তুলেছেন। যুদ্ধের শেষে রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়ে ঢাকায় পদার্পণ করামাত্রই বিহ্বল হয়ে কেঁদে ফেললেন! এবং অচিরেই বাংলাদেশের মাটিতে বসে নির্মাণ করলেন অদ্বৈত মল্লবর্মণের কালজয়ী উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-কে ভিত্তি করে তাঁর চলচ্চিত্র।

ঋত্বিক ঘটকের জীবনের প্রথম বাইশ বছর (১৯২৫-১৯৪৭) কেটেছে মূলত পূর্ব-বাংলায়, যা এখনকার বাংলাদেশ। তাঁর জন্ম ঢাকার ২,ঋষিকেশ দাস রোডের ঝুলন বাড়িতে। ১৯৪৭, অর্থাৎ দেশভাগ ও স্বাধীনতা প্রাপ্তির আগে পর্যন্ত তিনি মূলত পূর্ব-বাংলায় কাটান। আমরা দেখব, পূর্ব-বাংলা যেমন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল, সে-দেশ, সে-ভূমির প্রভাব তদনুরূপ ঋত্বিকেরও পড়েছিল তাঁর চলচ্চিত্রে।

ঋত্বিক পড়াশোনা শুরু করেন সম্ভবত যশোরে, দু-আড়াই বছর বয়সে, যখন তাঁর ম্যাজিস্ট্রেট বাবা সুরেশচন্দ্র ঘটক সেখানকার কার্যভার নিয়ে সে-জেলায় যান। ঋত্বিকের যমজ বোন প্রতীতি দত্তের স্মৃতিচারণে সেসময়ের বেশ কিছু ছবি পাই। সেই সময় বাবার সাহচর্যে ঘোড়ায় চড়া শিখেছিলেন ঋত্বিক। ওই বয়সেই রবীন্দ্রনাথের গান শোনার সূচনা, ‘আমার অভিমানের বদলে আজ নেবো তোমার মালা’! প্রতীতি লিখছেন, ‘ঋত্বিক আর আমি গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম’। বই আর গান সে বয়স থেকেই ছিল ঋত্বিকের নিত্যসঙ্গী। ভূতের ভয় ছিল তাঁর বেজায়। তাই মাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোতেন। আর ছিল যমজ বোনটির সাথে ভাব, মেলামেশা ও সুখদুঃখ ভাগ করে নেওয়া।

কী যে অসম্ভব টান ছিল ঋত্বিকের, এই বোনটির প্রতি! শিশু বয়স থেকেই একসাথে ওঠাবসা থাকাটাই স্বাভাবিক, তবে একজনের জ্বরে আরেকজনের জ্বর বাঁধানো? ছোটবেলায় দু’জনকে পড়তে পাঠানো হল দার্জিলিংয়ে। প্রতীতি লিখছেন, ছোটবেলায় ‘একসঙ্গে ঘুমিয়েছি। একরকম পোশাক পরেছি, একসঙ্গে সাইকেল চালিয়েছি। — এক মুহূর্তের জন্যও আমরা কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারতাম না।’ ওদের ডাকনাম ছিল ভবা আর ভবি। আট বছর বয়সে বোনের ডিপথিরিয়া হল। ছোঁয়াচে রোগ। কাছে যাওয়া বারণ। ভবা ভবিকে লুকিয়ে দেখতে গিয়ে নিজের রোগ বাঁধিয়ে স্বস্তি! ‘তোকে ছাড়া একদম ভালো লাগছিলো না রে! অসুখ হয়ে ভালোই হলো’— ভবা উবাচ!

ন’বছর বয়সে ভবির টাইফয়েড। জ্বর ছাড়ল ৮৬ দিন পর। ‘আমার অসুখের সময় ঋত্বিক ঘরের সব জিনিসপত্র পাগলের মতো ভেঙে ফেলত। আমার খেলনা, বই বুকে চেপে আমাদের খেলাঘরে বসে বসে শুধু কাঁদত।’ আড়বাঁশি বাজাতেন ভাই, আর বোনের গান। এই অসম্ভব ভাইবোন লগ্নতাই কি ঋত্বিকের ছবিতে বারবার ঘুরেফিরে আসেনি? আর তাঁর শেষপর্যায়ের ছবি ‘তিতাস’-এ?

যশোরের পর ঋত্বিকের ময়মনসিংহ-পর্ব। এখানেও ঘটনা কম ঘটেনি। সেখানে তিনি মিশনারি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। ঋত্বিকের জীবনের এই পর্যায়টি সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ-সময় ঋত্বিক ছিলেন অসম্ভব দুরন্ত। কিন্তু স্কুলের প্রিন্সিপাল ইংরেজ মহিলা মিস হগবেনের স্নেহ-ভালবাসায় ঋত্বিকের জীবনে পরিবর্তন আসে। ঋত্বিক আর প্রতীতি তাঁর কাছে ছিলেন Rit আর Prit। কেবল কি তাই? হগবেন তাঁকে এমন একটি শাশ্বত শিক্ষা দিয়ে গেছেন, যা ঋত্বিকের জীবনে গাঁথা হয়ে গিয়েছিল। হগবেন তাঁকে বলেছিলেন, ‘Whatever you do, do with your mind.’ ঋত্বিক কি তাঁর শিল্পকর্মের মাধ্যমে তাঁর শিক্ষয়িত্রীর কথাটি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেননি?

ঋত্বিকের পরিবারটি ছিল পরিশীলিত ও শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতে অগ্রণী। শোনা যায়, আদিতে তাঁরা কাশ্মীরি। তাঁদের কোনও এক পূর্বপুরুষ প্রথমে পাবনায় এসে বসবাস করতে থাকেন। পরে তাঁরা রাজশাহীতে থিতু হন। তাই একদিকে কাশ্মীরী ব্রাহ্মণের ঐতিহ্য, আর অন্যদিকে বরেন্দ্র ভূমির সংস্কৃতিতে গড়ে উঠেছিল তাঁদের সাংস্কৃতিক পরম্পরা। বাড়িতে গানবাজনার চল ছিল। নাটক অভিনীত হত। তাঁদের রাজশাহীর বাড়িতে এমনকি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আসর-ও বসত। ঋত্বিকের বড়ভাই মণীশ ঘটকের উৎসাহ ছিল এতে, যে কারণে ১৯৩৫ সালে রাজশাহীতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কনফারেন্সে ফয়েজ খাঁ, আব্দুল করিম খাঁ, ওঙ্কারনাথ ঠাকুর প্রমুখ এসে তাঁদের বাড়িতে ছিলেন। পরবর্তীতে আমরা যে ঋত্বিককে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর কাছে সরোদের তালিম নেওয়ার কথা জানতে পারি, তখন এই উৎসটির কথা মনে না পড়ে পারে না। শুধু কি তাই? ঋত্বিকের যাবতীয় ছবিতে যে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ব্যবহার, তার উৎস নির্দেশ পাই তো এখানেই। এসব কি বাংলাদেশ-বাহিত ঐতিহ্য নয়? ঋত্বিকের কবিতা লেখার সূচনা (প্রতীতি জানাচ্ছেন, ঋত্বিকের কবিতা দেশ পত্রিকায় বেরোয় নাকি তিনি ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়!), গল্প-নাটক লেখার, ‘অভিধারা’ নামে পত্রিকা সম্পাদনার সূচনা পূর্ব-বাংলায় বসে।

প্রকৃতিকে দু’চোখ মেলে দেখার সূচনা ও ময়মনসিংহ থেকে। টর্নেডো দেখেছেন, দেখেছেন ব্রহ্মপুত্রের মতো ভয়াল নদী, বাবার সঙ্গে দুই ভাইবোন হাতির পিঠে চড়ে সুসং যাত্রা, এসব তাঁর মনে চিরস্থায়ী দাগ রেখে যায়। দাদা লোকেশ ঋত্বিককে ছবি আঁকায় তালিম দেন। হ্যাঁ, ঋত্বিক ছবিও আঁকতে পারতেন।

মাঝে তিনি কলকাতা ও কানপুরে কিছুকাল কাটালেও ফের রাজশাহীতে এসে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হন। ঋত্বিকের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় ছিল এই পর্যায়টি। ইংরেজি অনার্সের ছাত্র ঋত্বিক শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন নামকরা অধ্যাপক আবু হেনাকে। এ-সময় নাটক নিয়ে মেতে ওঠা, পত্রিকা সম্পাদনা, গল্পের পর গল্প লিখে চলা, এবং সেসব গল্প দেশ, শনিবারের চিঠি, অগ্রণী-তে প্রকাশিত হয়ে রাতারাতি লেখক খ্যাতি লাভ, এসব ঘটেছিল। গঠন পর্বের এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে বাদ দিয়ে কি ঋত্বিকের মূল্যায়ন সম্ভব?

বাংলাদেশের কাছে তাই ঋত্বিকের ঋণ অসীম।

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 + twelve =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »