Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

দুনিয়া বদলানো একটি উদ্ভাবনার বীজ

উদ্ভাবনার ক্ষেত্রে স্বজ্ঞা বা intuition মাঝে মাঝে খুবই কার্যকরী হয়ে উঠতে পারে। এমন ঘটনার কথা আমরা আগেও শুনেছি কয়েকজন বন্দিত সৃষ্টিশীল মানুষের ক্ষেত্রে। আবিষ্কারের ‘ইউরেকা’ মুহূর্ত, আলোকিত-ফ্লাশের মত হঠাৎ কখনও উদ্ভাবকের মাথায় খেলে যায়। কখনও বা কাঙ্ক্ষিত সমাধানের কোনও সূত্র বা সংকেত (ক্লু) ভেসে ওঠে আবিষ্কারকের ভাবনার চিত্রপটে। কখনও আবার ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে ধরা দেয় সেরকমই কিছু সমাধান সূত্র। কবির গানের কথায় যেমন— ‘হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন…’, হয়তো অনেকটা সেরকমই।

১৯৫১ সালের কথা। সেই দিনটি ছিল ২৬ এপ্রিল। সকালে উঠে আমেরিকান পদার্থবিদ চার্লস হার্ড টাউনস (Charles Hard Townes, ১৯১৫-২০১৫) ওয়াশিংটন-ডিসির একটি পার্কের বেঞ্চিতে বসেছিলেন। সকালটি ছিল চমৎকার আর দারুণ মনোরম। চারপাশের গাছগুলিতে ফুল ফুটে ছিল। অল্পবিস্তর হাওয়ায় মৃদু দুলছিল পাতা আর ফুলগুলি। অপরূপ এক মায়াময় আলো ছড়ানো ছিল চারপাশ জুড়ে। সেই সকালে, পার্কের বেঞ্চে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ টাউনসের মাথায় স্পার্কের মত ঝিলিক মেরে উঠল একটি ভাবনা। আর সেই অঙ্কুরিত ভাবনা থেকেই জারিত হল যুগান্তকারী একটি তত্ত্ব। যে তত্ত্ব অদূর ভবিষ্যতে পল্লবিত হয়ে উঠবে বৈপ্লবিক একটি যুগে। যে যুগ অভাবনীয় সব প্রযুক্তির জন্ম দিয়েছে। নতুন সেই যুগের নাম ‘লেজার’ যুগ। প্রফেসর টাউনস তাঁর এই অভিজ্ঞতার কথা নোবেল প্রাইজ অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় এবং তাঁর বায়োগ্রাফি-তে খুব সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন ।

চার্লস হার্ড টাউনস (১৯১৫-২০১৫)।

লেজার (LASER) যার পুরো কথা হল Light Amplification by Stimulated Emission of Radiation। কীভাবে কী হয়, সেইসব বিজ্ঞান-প্রযুক্তির কথা না-জানলেও, আজ সম্ভবত এমন কোনও মানুষ নেই যিনি ‘লেজার’ কথাটির সঙ্গে পরিচিত নন। লেজার-প্রিন্টার, লেজার-ট্যাগ, লেজার-বিম, লেজার-সার্জারি… এইসব শব্দ এখন আমাদের অনেকের কাছেই পরিচিত। প্রফেসর টাউনস তখনই বলেছিলেন, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ‘লেজার’ একদিন অভাবনীয় বিপ্লব নিয়ে আসবে। হয়েছেও তাই। তিনি বুঝেছিলেন ‘অপটিকেল-লাইট’-এর যে ‘অ্যাম্পলিফায়েড-এমিসন’ তা তৈরি করতে সক্ষম হবে ‘ইন্টেন্স-আলো’-র এক ধরনের ‘এনার্জি-বিম’— যার ক্ষমতা হবে অভাবনীয়। নির্ভুলভাবে তা সঠিক দূরত্ব নির্ণয় কিংবা সার্জারি-করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে। আজ তো আমরা প্রত্যক্ষ করছি, হুবহু সেটাই হয়েছে।

তিনি আসলে আগ্রহী ছিলেন স্পেক্ট্রোস্কোপি করার জন্যে একধরনের অতীব ছোট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের সৃষ্টি করায়, অণু-পরমাণুর পরীক্ষা করার জন্যে। তারই চেষ্টা করছিলেন হার্ড টাউন নানাভাবে। কিন্তু কিছুতেই ঠিক পন্থার খোঁজ মিলছিল না। যদিও তিনি কখনওই ভাবেননি এই উদ্ভাবনের প্রায়োগিক দিক নিয়ে। তিনি শুধু বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান করছিলেন। অবশেষে ২৬ এপ্রিলের সেই সকাল তাঁর ভাবনার কুঁড়িগুলি ফুল হয়ে ফুটে উঠল।

২৮ জুলাই, মানবসভ্যতার এই যুগ প্রবর্তক চার্লস হার্ড টাউনসের জন্মদিন।

যাই হোক, সেই ভাবনার পরে সাত বছর চলল নিরন্তর গবেষণা। তারপর একটি গবেষণাপত্রে টাউনস তাঁর এই কীর্তিমান সাফল্যের কথা প্রথম প্রকাশ করলেন। এরকম ম্যাজিকের মত ব্যাপারস্যাপার কে আর বিশ্বাস করবে? তাঁর কথা অনেক তাবড় তাবড় ফিজিসিস্টরাও প্রথমে বিশ্বাস করেননি। তাঁর ওই তত্ত্বকে নাকচ করেছিলেন। তাঁর গবেষণার ফলাফলকে ‘ইমপ্রাকটিক্যাল’ বলেছিলেন। কিন্তু ড. টাউনস ওইসব ফিজিস্টদের ভুল প্রমাণ করলেন একদিন।

১৯৬৪ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন চার্লস হার্ড টাউনস তাঁর এই অসামান্য আবিষ্কারের জন্যে।

‘লেজার’ আবিষ্কারের পরে পরেই, তা সামরিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে আমেরিকা। সামরিক ক্ষেত্র ছাড়াও মেডিকেল এবং কমার্সিয়াল কাজের ক্ষেত্রেও লেজার-এর প্রভূত উপযোগিতা রয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, টাউনস-এর লেজার আবিষ্কার এক নতুন যুগের প্রবর্তন করেছে। প্রগতি আর বিকাশের এক নতুন সুউচ্চ শিখরের সন্ধান দিয়েছে।

১৯৬৪ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি অনুষ্ঠানে।

নোবেল পুরস্কার পাওয়ার তিন বছর পরে, অদ্ভুতভাবে হার্ড টাউনস বদল করলেন তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র। ‘লেজার’ গবেষণা থেকে ‘আস্ট্রোফিজিক্স’-এর গবেষণায় সরে আসেন। সেখানেও তিনি ‘ইনফ্রা-রেড এস্ট্রোনমি’-র কাজে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন। শুধু গবেষণা নয়, ‘ইউএস-প্রেসিডেন্সিয়েল আডভাইসার’ হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। এছাড়াও, মানুষের প্রথম চাঁদে যাওয়ার কাজে তিনিই ছিলেন মুখ্য উপদেশক।

শুধু পদার্থবিদ্যা নয়। মিউজিক, ভাষা এবং ধর্ম নিয়ে ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। আজ ২৮ জুলাই, মানবসভ্যতার এই যুগ প্রবর্তক চার্লস হার্ড টাউনসের জন্মদিন। তাঁকে আমাদের স্যালুট জানাই।

চিত্র: গুগল

2 Responses

  1. ”লেজার’..তিন অক্ষরের এই ছোট্ট শব্দটির সঙ্গে আজ আমরা কে না পরিচিত ? অথচ আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিপ্লব সৃষ্টিকারী এই লেজার’এর আবিষ্কারক হার্ড টাউনস’এর নাম আমরা কজনই বা জানি। কজনই বা জানি অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন এই ‘এনার্জি বিম’ এর আবিষ্কারের গোড়ার কথা। ধন্যবাদ জানাই লেখক সিদ্ধার্থ মজুমদার’কে এই সুন্দর উপস্থাপনাটি পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য।

    1. ধন্যবাদ জানাই, ড. অঞ্জনা ঘোষ, আপনার সহৃদয় মন্তব্যের জন্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 − six =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও দুই বিখ্যাত বাঙালি

কী অসাধারণ শিক্ষাই না আমরা পেতে পারি, উৎসাহিত হয়ে পারি খেলোয়াড়দের থেকে! একটি উদাহরণ: প্রথম বিশ্বকাপে সোনাজয়ী উরুগুয়ে দলে ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তেরো বছর বয়সে মেশিনে তাঁর ডানহাত কাটা পড়েছিল। অদম্য উৎসাহে তিনি ফুটবল খেলেছেন, জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন, আর ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও তাঁর-ই করা! তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ডাকতেন— ‘এল ডিভিনো মানকো’, অর্থাৎ একহাত-বিশিষ্ট ঈশ্বর।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »
অপরাজিতা মৈত্র

গোদাবরীর গোমুখে

গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা।

Read More »
রুহ

রুহের কবিতাগুচ্ছ

একই আলোকমালায় কাটিয়েছি/ বহুকাল দু’জনে…/ বলিনি কখনও।/ তারা খসা দেখেছি একসাথে, যদিও/ গোপন থেকেছে চাওয়া-পাওয়া।/ মাঝে বহুদিন, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো/ একা… নীরবে বয়েছি যাতনা।/ আজ মিথ্যের নেই অবকাশ/ তোমাকে কি পড়েনি মনে/ কোনও মুহূর্ত বা ক্ষণে/ ভাবিনি কি একান্ত বন্ধু আমার—/ এতদিন পরে, পুনর্মিলনে বলেছ/ পাখি হতে চেয়েছিলে এ জীবনে

Read More »