Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

টিকটিকি ও পরাগমিলন

শিরোনামে পাশাপাশি দুটো শব্দ কি খুব বেমানান লাগছে? হ্যাঁ, লাগারই কথা। কারণ পরাগমিলন শব্দটার সঙ্গে মৌমাছি, ভীমরুল, বোলতা, প্রজাপতি, পাখি এদের কথাই অবধারিতভাবে এসে যায়। সেখানে পাখিও না, পতঙ্গও না। একেবারে টিকটিকি? দেখা যাক, আপাতবিরোধী এই দুই শব্দের মেলবন্ধন ঘটানো যায় কিনা।

সময়টা ২০১৭ সালের শেষের দিক। রুথ কাজিয়েন (Ruth Cozien) ও টিমো ভ্যান ডার নিয়েট (Timo van der Niet) নামের এক গবেষক দম্পতি দক্ষিণ আফ্রিকার ড্রাকেন্সবার্গ পাহাড়ের ওপরে আয়োজিত Citizen Science Workshop-এ যোগ দিতে গিয়েছিলেন। এই ওয়ার্কশপের কাজের তালিকায় ছিল ওই পাহাড় অঞ্চলের নানা ধরনের গাছপালার অনুসন্ধান ও সেই সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ। পরিকল্পনামাফিক ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে তাঁরা পাহাড়ের বিভিন্ন দিকে অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন। এই সময় একদিন নিয়েট দম্পতি ও তাঁদের দলের অন্য সদস্যরা আবিষ্কার করেন এক অদ্ভুত ধরনের সবুজ রঙের ফুল, পাতার আড়ালে আর খুব নীচে (মাটির খুব কাছাকাছি), তীব্র গন্ধযুক্ত আর প্রচুর মধুপূর্ণ।

রহস্যময় গুথ্রিয়া ক্যাপেনসিস।

গ্রুপের অন্য সদস্যরা এই নতুন ধরনের ফুলগুলো দেখলেন, প্রশংসা করলেন, নতুন সংগ্রহের তালিকায় যুক্তও করলেন। তবে ওই পর্যন্তই। এরপর আর ওই ফুলগুলো সম্পর্কে বিশেষ মনোযোগ দিলেন না। তবে নিয়েট দম্পতি কিন্তু ওই ফুলগুলো সম্পর্কে কৌতূহলী হলেন।

প্রায় বেশিরভাগ গাছের ফুলই সাধারণত হয় উজ্জ্বল রঙের আর এই উজ্জ্বল রংই তো পাখি-পতঙ্গদের আকর্ষণ করে পরাগমিলন ঘটায়। কিন্তু এই বিশেষ ধরনের সবুজ ফুলগুলো বেশ অন্য রকম, যেন ছদ্মবেশধারী (camouflaged) আর খুব নীচের দিকে পাতার আড়ালে মাটির খুব কাছাকাছি নিজেদেরকে লুকিয়ে রেখেছে। তাই পাখি বা পতঙ্গের দ্বারা এদের পরাগমিলন সম্ভব হওয়ার কথা নয়। তাহলে প্রশ্ন হল, এই শ্রেণির ফুলের পরাগমিলন হয় কীভাবে?

গুথ্রিয়া ক্যাপেনসিসের পুরুষ ও স্ত্রী ফুল।

প্রাথমিক অনুসন্ধান করে নিয়েট দম্পতি দেখলেন, বহু আগে ১৮৭৬ সালে এই ফুলের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হলেও এই ফুল বা এই গাছের বাস্তুসংস্থান (ecology) নিয়ে এযাবৎ আর কোনও গবেষণা হয়নি। নিয়েট দম্পতি কিন্তু এই গাছ ও ফুলগুলো সম্পর্কে বিশেষ আগ্রহ অনুভব করলেন। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন অনুসন্ধান পর্ব আরও এগিয়ে নিয়ে যাবেন তাঁদের নিজেদের মত করে।

এর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নিয়েট দম্পতি আবার যাত্রা করলেন ওই ড্রাকেন্সবার্গ পাহাড়ে। এবার তাদের সঙ্গী হলেন আরও দুজন। তাঁদের দুই অধ্যাপক বন্ধু, যাঁরা দুজনেই উদ্ভিদ বিজ্ঞানের গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। এক সপ্তাহান্তে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে এই চারজনের দল আবার রওনা হল ড্রাকেন্সবার্গ পাহাড়ের উদ্দেশে।

সন্ধানপর্ব চলত মোশন ট্রিগার ক্যামেরা বসিয়ে।

শুরু হল দ্বিতীয় পর্যায়ের অনুসন্ধান পর্ব। তাঁরা প্রতিদিন ভোর ছ’টায় বেরিয়ে পড়তেন, টানা ১২-১৪ ঘণ্টা পাহাড়ের আনাচেকানাচে ঘুরে ঘুরে সন্ধানপর্ব চালাতেন মোশন ট্রিগার ক্যামেরা বসিয়ে, হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াতেন কোন সে প্রাণী যারা এই পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মাটির সঙ্গে প্রায় মিশে থাকা ফুলগুলোর পরাগমিলন ঘটায়?

কাজটা খুব সহজসাধ্য ছিল না। প্রায় মাটির কাছাকাছি সবুজ পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সবুজ রঙের ফুলগুলোকে ক্যামেরাবন্দি করা খুবই কষ্টসাধ্য ছিল। প্রথমদিকে তারা ধরেই নিয়েছিলেন রাতচরা ইঁদুর বা ওই জাতীয় (noctoral rodents) কোনও প্রাণী এই প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে থাকা ফুলগুলোর পরাগমিলন ঘটায়। আর সেইমত অনুসন্ধানও চালাচ্ছিলেন, কনকনে ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশাঘেরা রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্যামেরা ফিট করে বসে থাকতেন। কিন্তু অবশেষে তাদের ভুল ভাঙল।

Advertisement
হন্যে হয়ে খোঁজ।

অসীম ধৈর্য্য সহকারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও ফুটেজ নিয়ে অবশেষে নিশ্চিত প্রমাণ পেলেন, না, কোনও পাখি, পতঙ্গ বা কোনও স্তন্যপায়ী জীব নয়, এই ফুলের পরাগমিলন ঘটায় টিকটিকি। ওই পাহাড়ি অঞ্চলের দুই বিশেষ প্রজাতির টিকটিকি Pseudocordylus melanotus ও Tropidosaura gularis।

এই টিকটিকিরা দীর্ঘ সময় ধরে ফুলে ফুলে বিচরণ করে যথেচ্ছ মধু পান করে। আর এই মধু পানের সময় তাদের মুখের চারপাশে অজস্র পরাগরেণু আটকে যায়। আর এভাবেই ফুলে ফুলে পরাগরেণু ছড়িয়ে দেয় এক ফুল থেকে অন্য ফুলে মধু আহরণের মাধ্যমে। সুদীর্ঘ ভিডিও ফুটেজ থেকে আরও এক চমকপ্রদ পর্যবেক্ষণ হল, মধুপানের সময় এই টিকটিকির দল শুধু যে প্রচুর পরিমাণে পরাগরেণু বহন করে তাই নয়, এই পরাগরেণু এরপর একদম যথাস্থানে অর্থাৎ সুনির্দ্দিষ্টভাবে ফুলের স্টিগমাতে নিয়ে প্রতিস্থাপিত করে। এইরকম নিয়মানুগ আচরণ কিন্তু পাখি, প্রজাপতি বা অন্যান্য শ্রেণির পরাগমিলনকারীদের মধ্যে দেখা যায় না।

সিউডোকর্ডিলাস মেলানোটাস টিকটিকি।

ইঁদুর বা ওই জাতীয় কোনও প্রাণীর দ্বারা যে এই ফুলের পরাগমিলন হয় না, তার সপক্ষে আরও এক যুক্তি হল, তীব্র গন্ধযুক্ত এই ফুলের গন্ধের কারণ হল স্যাফ্রান্যাল (safranal) নামক এক রাসায়নিক যৌগের উপস্থিতি। তীব্র গন্ধের এই যৌগের স্বাদও অত্যন্ত তিক্ত। তাই একথা ধরে নেওয়াই যায় যে, এই তিক্ত স্বাদ ইঁদুর শ্রেণির প্রতিরোধক হিসেবেই কাজ করে। অপরদিকে এই গবেষক দল পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, তিক্ত স্বাদ ওই টিকটিকিদের মোটেও বিকর্ষণ করে না।

পরিশেষে প্রকৃতির আরও এক বিস্ময়কর সৃষ্টির কথা বলি। এই ফুলগুলোর সবুজ রং আর তার ওপরে কমলা রঙের গ্রন্থি (glands), প্রায় ঠিক ওই দু’রকম রঙেরই সংযোজন (color combination) কিন্ত উপরোক্ত শ্রেণির মধ্যে এক শ্রেণির টিকটিকির (pseudocordylus menangis) দেহে বর্তমান (চিত্রে দ্রষ্টব্য)। প্রকৃতির বুকে এরকম আরও কতই যে বিস্ময় লুকিয়ে আছে তার কতটুকুই বা আমরা জানি!

তথ্যসূত্র:
www.indefenseofplants.com>blog
www.fs.ed.us>pollinators>animals
www.bbc.com> earth> story> 201…

চিত্র: গুগল

One Response

  1. সত্যিই অবাক করা। পরাগ সংযোগকারী আরও এক খেলোয়ার যে টিকটিকি তা অজানা ছিল। খুব ভালো উপস্থাপনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × three =

Recent Posts

সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার…

মনু-পরাশর-বৃহস্পতি-কৌটিল্যদের অনুশাসন এসে নারী প্রগতির রাশ টেনে ধরল। নারীর শিক্ষালাভের ইতি ঘটল, অন্তঃপুরে বাস নির্দিষ্ট হল তাঁর জন্য। তাঁকে বাঁধা হল একের পর এক অনুশাসনে। বলা হল, স্বাধীনতা বলে কোনও পদার্থ থাকবে না তাঁর, ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি’! কুমারী অবস্থায় পিতা-মাতার অধীন থাকবে সে, বিয়ের পর স্বামীর, বার্ধক্যে সন্তানের। ধাপে ধাপে তাঁর ওপর চাপানো হতে লাগল কঠিন, কঠিনতর, কঠিনতম শাস্তি।

Read More »
স্বপনকুমার মণ্ডল

গরিব হওয়ার সহজ উপায়

এককালে পর্তুগিজ-মগরা আমাদের নিম্নবঙ্গ থেকে দাস সংগ্রহ করত মালয়-বার্মাতে শ্রমিকের কাজের জন্য, ইংরেজ সাহেবরাও কিনত গোলাম। আজ আবার মানুষ সস্তা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসকের দরকার নেই। খোলাবাজারে নিজেরাই নিজেদের কিনছে দেশের মানুষ। মানুষ বিক্রির মেলা বসে এখন গ্রামগঞ্জের হাটে হাটে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহাশ্বেতা দেবী: স্বনামে চিহ্নিত অনশ্বর প্রতিভা

গ্রামশি-বর্ণিত ও পরবর্তীতে বহুলচর্চিত ‘সাব অলটার্ন’-এর আগেই মহাশ্বেতার লেখায় ব্রাত্যজনসংহিতা মূর্ত; ‘অরণ্যের অধিকার’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৭-এ। আর সাব অলটার্ন-তত্ত্ব প্রথম দানা বাঁধছে ১৯৮২-তে জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, রণজিৎ গুহ, গৌতম ভদ্র, শাহেদ আমিন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়দের সঙ্কলন প্রকাশের মাধ্যমে। অবশ্য তার বহু আগেই ইতিহাস রচনায় সাব অলটার্ন চেতনায় স্থিতধী দেখা গেছে রবীন্দ্রনাথকে। স্বামী বিবেকানন্দ মূর্খ, চণ্ডাল ও দরিদ্র ভারতবাসীর মাহাত্ম্য বুঝিয়ে গেছেন, আর বিভূতিভূষণকেও আমরা সামগ্রিক বিচারে প্রান্তিক মানুষের কথাকার রূপেই পাই। কিন্তু মহাশ্বেতা আরও ব্যাপক, গভীর, তন্ময়, নিবিড়, ও নিঃসন্দেহে দলিত জনতার কথাকার।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

সারদাদেবী: এক অনন্যা মাতৃরূপা

ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়ে ও বধূ হয়ে তিনি কিনা মুসলমান ঘরামি আমজাদকে খেতে দিয়ে তার এঁটোকাটা নিজের হাতে পরিষ্কার করেন! বিধর্মী খ্রিস্টান নিবেদিতার সঙ্গে বসে আহার করেন! আর তাঁর চেয়েও বড় কথা, সে যুগের বিচারে বিপ্লবাত্মক ঘটনা, স্বামীর মৃত্যুর পর যে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন তিনি, বিধবাবিবাহের প্রবর্তক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-ও যা কল্পনায় আনতে গেলে নির্ঘাত মূর্ছা যেতেন, লালপেড়ে শাড়ি আর সোনার বালায় ভূষিতা থাকতেন তিনি! আজকের উচ্চশিক্ষিত সমাজেও ক’জন পারবেন এ-কাজ করতে, বা নিদেন এ কাজকে সমর্থন করতে?

Read More »
মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »