Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

লুপ্তপ্রায় লোকনাট্য ‘যুগি যাত্রা’

লোকসংস্কৃতির প্রবাহমানতার ধারায় লোকনাট্যের ঐশ্বর্য ও বৈচিত্র‌্য আজও অপরিহার্য। বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রচলিত বা অপ্রচলিত লোকনাট্যগুলির আনুপূর্বিক পর্যালোচনার অনুভব থেকে এই প্রবন্ধের প্রয়াস। আমাদের বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ পরিক্রমায় পরিশীলিত সাহিত্যের যে চর্চা হয়েছে, সেই তুলনায় লোকনাট্যের সার্থক আলোচনা হয়নি। লোকসংস্কৃতির শেকড়ে নিবিড় থেকে এই না পারা, না হওয়ার পরিসর আমাকে কষ্ট দেয়। সেই তাগিদ থেকে একটি পর্যালোচনা। ‘যুগি পালা’ বা ‘যুগি যাত্রা’-র আন্তর কাঠামোয় উঠে আসে নিম্নবর্গের লোকজীবনের অসাম্প্রদায়িক ও বহু ভাষাভাষী মানুষের সহাবস্থান। রূপকাশ্রয়ী নাট্যকাহিনিতে মানুষের জীবন, ধর্ম, পেশা, গীতিধর্মিতা, স্থানীয় মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক মানসের প্রতিচ্ছবি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে এই পালায়।

উৎস ও প্রবাহ

‘যুগি যাত্রা’ সীমান্ত বাংলার লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন শাখার মধ্যে একটি অন্যতম উপশাখা। এক সময় রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের গ্রামেগঞ্জে, হাটে-বাজারে অস্থায়ী মঞ্চে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হত এই যাত্রা। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অগণিত দর্শক সমাগমে গীতিনাট্যধর্মী পালাটির সংলাপ ও গানে ভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণ থাকলেও এর গান স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ফিরত। এতদঞ্চলের মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল ‘যুগি যাত্রা’। বর্তমান যুগের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এর দেখা মেলে না। অবলুপ্ত গ্রামীণ লোকনাটক হিসাবে ইতিহাস হয়ে রয়েছে। এখানকার প্রধান শিল্পীদের স্মৃতিপটের অপ্রচলিত লোক নাট্যকলা হিসাবে অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর একটি গানে গোপীবল্লভপুর অঞ্চলের যুগি সম্প্রদায়ের পরিচয় পাওয়া যায়।
‘‘ছিঁড়া কাঁথা ছিঁড়া ঝুলি যুগীরা চলে ঢলি ঢলি।
শিব-ডম্বুর বজাই, যুগীয়া মিলিলে যাই।।’’
‘যুগি’ অর্থে ভিক্ষাজীবী সম্প্রদায়বিশেষ। আর ‘যাত্রা’ অর্থে গমন করা। সংস্কৃত ‘যা’ ধাতু থেকে ‘যাত্রা’ শব্দের উৎপত্তি। এক বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ যারা কাঁধে ঝোলা, হাতে ডমরু ও কলাকৌশল দেখানোর অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে গ্রামগঞ্জের গৃহস্থ বাড়িতে পাঁচালি সুরে নৃত্যগীতের মাধ্যমে, অলৌকিক কর্মকাণ্ডের অভিনয় দেখিয়ে রুজিরোজগার করতেন, এই অঞ্চলে তারাই যুগি নামে পরিচিত ছিলেন। গোপীবল্লভপুর নিবাসী মধুপ দে-র কথা থেকে জানা যায়— ‘‘সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতেন, যুগিরা নানারকম ‘গুহ্যাচার’ গুপ্ত মন্ত্র ইত্যাদির দ্বারা তারা অসাধ্যসাধন করতে পারতেন, তন্ত্রমন্ত্রের দ্বারা তারা নানারকম অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ড করে দেখাতেন।’’ মানুষের বিশ্বাস, যুগি সম্প্রদায় থেকে যুগি যাত্রার উদ্ভব। এরা লোকালয় থেকে অনেক দূরে নির্জন পল্লিতে বসবাস করতেন। মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে এদের বাস ছিল, তার প্রমাণ পাই। বর্তমানে বেলপাহাড়ি থানার যুগিবাঁধ গ্রামে এই সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে। তাছাড়া নিম্নবর্গের জনবসতি অধ্যুষিত ‘যুগীপাড়া’, ‘যুগীসোল’, ‘যুগীঘাট’ প্রভৃতি স্থাননামের উল্লেখ পাই। এবং এই অঞ্চলে যুগি সম্প্রদায়ের নিজস্ব একটি সংস্কৃতিও ছিল, যা স্থানীয় মানুষের কাছে যুগি যাত্রা বলে পরিচিত ছিল। লোকনাট্য পালাটি এতদঞ্চলে অন্যান্য যাত্রাপালার মত ‘লোকযাত্রা’ হিসাবেই পরিচিতি। বর্তমানে আঞ্চলিক পালাগুলিকে লোকনাটক হিসাবে অভিহিত করা হলেও স্থানীয় মানুষের কাছে লোকযাত্রা হিসাবেই সমাদৃত।
১২০২ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে তুর্কি আক্রমণের অব্যবহিত পরেই এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক মানচিত্রের দ্রুত পটপরিবর্তন ঘটে। এই যুগসন্ধিক্ষণে মুসলিম ধর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম ধর্মাবলম্বী পির-ফকিরদের আবির্ভাব ঘটে। পির-ফকিরদের দল সত্যপিরের মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য গ্রামে গ্রামে পাঁচালির সুরে পালাগান করে ধর্মপ্রচারে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। এদের অনুকরণ করে পালাগান তৈরি হতে থাকে। যুগিরাই যে এই পালার সৃষ্টিকর্তা, এ সম্পর্কে তেমন কোনও প্রামাণ্য তথ্য মেলেনি। গোপীবল্লভপুর নিবাসী প্রখ্যাত লোক-গবেষক মধুপ দে বলেন যে, ‘‘যুগিরা কিন্তু যুগি যাত্রা তৈরি করেননি। যুগিদের দেখে যুগি চরিত্রটিকে মূল চরিত্র করে অন্যান্য মানুষ লোকনাটকটি তৈরি করেছেন। এবং যার জন্য নাটকে দেখা যাবে যুগি একটা প্রধান চরিত্র, যে কিনা যা ইচ্ছা অসাধ্যসাধন করতে পারে।’’ অর্থাৎ যুগি চরিত্রের অলৌকিক ক্ষমতায় আকৃষ্ট হয়ে ওই সম্প্রদায়ের মানুষের থেকে উদ্ভব ঘটেছে যুগি যাত্রার। আবার কেউ কেউ বলেন, নাথ সম্প্রদায়ভুক্ত যোগী সম্প্রদায় থেকে যুগি যাত্রার উদ্ভব। পালাটির পাঁচালির মধ্যে জয়ানন্দ-চম্পাবতীর উল্লেখ পাই। পালাটি অঞ্চলভেদে ‘যুগি যাত্রা’ বা ‘দক্ষিণযাত্রা’ পালা নামে অভিহিত হয়ে থাকে। পালাটির মধ্যে সত্যনারায়ণের কিছু কাহিনি ও সুর ব্যবহৃত হলেও এর বিষয় ও ভাবনার মধ্যে সমাজ-ইতিহাসের উপাদানগুলি বিদ্যমান। তাছাড়া যোগী জাতির অবক্ষয়টিও এই পালায় উপস্থাপিত হয়েছে। ধর্মের অবক্ষয় ও বিবর্তনের ছবিটিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে শ্যামল বেরার রচনায় ভবনাথ সরকারের মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য, ‘‘মেদিনীপুরে এসে এই পালার (মীননাথ ও গোরক্ষনাথ) মূল আদর্শ হারিয়ে এক বিচিত্র রূপ ধারণ করেছে। যার মধ্যে আছে এক ভ্রষ্ট যোগীর কামনা ও লালসার সরস কাহিনী।’’
পালাটির উৎপত্তিস্থল উপরি উল্লিখিত যুগি পাড়া ছাড়াও সুবর্ণরেখার বিস্তীর্ণ অববাহিকা অঞ্চল। ওড়িশা ও বিহারের সীমান্ত অঞ্চলেও এর প্রচলন ছিল। কারণ পালাটির মধ্যে তিনটি ভাষার সংমিশ্রণ রয়েছে। পালাটির লিখিত রূপ না পাওয়ার ফলে কাঁসাই তীরবর্তী ধেড়ুয়া অঞ্চলের প্রধান শিল্পীদের মহড়া ও অভিনয়ের ব্যবস্থা করে, মহড়া চলাকালীন সংলাপ লিপিবদ্ধ করে একটি পালাও রচনা করা হয়েছে। চাঁদাবিলা নিবাসী পরেশ মাহাতোর সক্রিয় সহযোগিতায় পালাটি সমৃদ্ধ হয়েছে। কারণ ওস্তাদের সমস্ত পালাটি মুখস্থ থাকে। মুখস্থের ধারা এক পুরুষ থেকে অন্য পুরুষে সঞ্চারিত হয়ে বর্তমান সময়ে এসে পৌঁছেছে। যাত্রাপথে ওস্তাদের হাতে এর ভাষা, ঘটনা, স্থান ও উপস্থাপনায় পরিবর্তন ও পরিমার্জন ঘটেছে স্বাভাবিকভাবেই। ইতিবাচক কোনও দর্শন না থাকায় সমাজ বিবর্তনের ধারায়, জনসমাজে আর এর অন্তর্ধান ঘটেছে।

স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য

ক্ষেত্রসমীক্ষাকালে প্রাপ্ত পালাটির কাহিনি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পালাটির নাট্যগুণ সমস্ত রকমের ধর্মীয় বাতাবরণ অতিক্রম করে রূপধর্মী অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে কৌতুক রস, ভাবাবেগ ও নাট্যদ্বন্দ্বে এই পালার নাট্যরসই প্রধান হয়ে উঠেছে। যদিও এই পালাগানের বিশেষ উদ্দেশ্য হল, সত্যপিরের মাহাত্ম্য প্রচার, তবুও বিষয়ভাবনার মধ্যে আমাদের তৎকালীন সমাজ ইতিহাসের অনেক উপাদান নিহিত রয়েছে। বিশেষ করে লোকজীবনের ওপর প্রভাবিত নানান বিচিত্র রূপের সংস্কৃতিক সমন্বয় ঘটেছে। যুগি এই নাটকটির প্রধান চরিত্র, সেই হেতু যুগি জাতির অবক্ষয়ের সন্ধান করতে হলে পালাটির বৈশিষ্ট্যগত আলোচনার প্রয়োজন। যুগি যাত্রায় যুগি সম্প্রদায়ের ভ্রষ্টাচারের রূপটি পালাটির আদ্যেপান্ত পর্যন্ত প্রতিফলিত হয়েছে। বর্তমান সমাজ এই ভ্রষ্টাচারকে গ্রহণ করেনি।

যুগি যাত্রার অভিনয়কালের মুহূর্ত।

কাহিনি বিন্যাস

লোক যাত্রাপালাটির মধ্যে লোকসাহিত্যের সব ক’টি উপাদানই বিক্ষিপ্তভাবে বিন্যস্ত আছে। একদিকে আছে বাস্তব জীবনের ছবি, যার মধ্যে পাই আদি লোকজীবনের লোককথা, রূপকথার নানা অলৌকিক বাতাবরণ। কাহিনির মধ্যে মিলেছে নানান নাট্যিক উপাদান। একটি পঞ্চমাঙ্ক নাটকের মত প্রাপ্ত পালাটিও পঞ্চমাঙ্কের। তবে প্রতিটি অঙ্কের দৃশ্যসংখ্যা সমানও নয়। প্রথম অঙ্কে পাঁচটি, দ্বিতীয় অঙ্কে তিনটি, তৃতীয় অঙ্কে তিনটি, চতুর্থ ও পঞ্চম অঙ্কে চারটি দৃশ্য বর্তমান। পালাটির মধ্যস্থিত প্রধান প্রধান চরিত্রগুলি একান্তভাবে বাঙালির গ্রামীণ জীবনের পটভূমি থেকে উঠে এসেছে। এই সমস্ত চরিত্রে ব্যবহৃত ভাষাসমূহ পালাগানটিকে সীমায়ত আঞ্চলিকতার আবেষ্টনী থেকে প্রসারিত করেছে এক সুবিস্তৃত লোকায়ত জীবনের ক্ষেত্রে। যেখানে হীরানন্দ, জয়ানন্দ, রূপবতী, চম্পাবতী, বাঘাম্বর ও পদ্মাবতীর মুখের ভাষা আঞ্চলিক উপভাষারই একটি বাস্তব রূপ। অন্যদিকে ফকিরের সংলাপ পুরোটাই হিন্দিতে। আর নর্তকীদের গান বা চম্পাবতী, পদ্মাবতীর গানগুলির ভাষা ওড়িয়া। ভাষার এই ত্রিধারার সংমিশ্রণই পালাটির জনপ্রিয়তা সীমান্ত অঞ্চলে ব্যাপক প্রসারতাই সাক্ষ্য দেয়।
যুগি যাত্রার কাহিনির সঙ্গে চণ্ডীমঙ্গলের ধনপতি আখ্যানের যেমন মিল আছে, তেমনই এই যাত্রাপালার কেন্দ্রীয় কাহিনি স্থানীয় লোককথা আশ্রয়ী। আবার চণ্ডীমঙ্গলে ধনপতি সদাগর দেবী চণ্ডীর মঙ্গলঘটে পদাঘাত করে বাণিজ্যযাত্রা করেছিলেন এবং পরিণামে বিদেশে রাজকারাগারে বন্দি হতে হয়েছিল। সদাগরপত্নী চণ্ডীর পূজা করে আশীর্বাদ লাভ করেন এবং পুত্র শ্রীমন্ত চণ্ডীর কৃপায় বাণিজ্যযাত্রা করে সেই দেশে গিয়ে পিতাকে মুক্ত করে।
যুগি যাত্রায় দেখা যায়, সত্যপির-বেশী ফকিরকে অপমান ও অগ্রাহ্য করায় জয়ানন্দ সদাগরকে ফকির ভয় দেখায় যে, সে তার স্ত্রী চম্পাবতীকে যুগির হাতে তুলে দেবে। ফকিরের এই কথায় কর্ণপাত না করে জয়ানন্দ বাণিজ্যযাত্রা করে। পরিণামে ফকিরের প্ররোচনা ও প্রদত্ত যাদুশক্তির সাহায্যে যুগি চম্পাবতীকে হরণ করে নিয়ে যায়। পরে জয়ানন্দ ও তাঁর পাঁচ ভাই চম্পাবতীকে উদ্ধার করতে গিয়ে যুগির হাতে নিহত হয়। চম্পাবতী শিবের ব্রত করে দৈববাণীতে জানতে পারে পুত্রসম বাঘাম্বর তাকে উদ্ধার করবে। যুগি ধনসম্পত্তি ও ক্ষমতার অহঙ্কারে সত্যপির-বেশী ফকিরকে অপমান করে। ক্রোধান্মত্ত ফকির জয়ানন্দের ভ্রাতুষ্পুত্র বাঘাম্বরকে আশীর্বাদ করে। বাঘাম্বর কৌশলে যুগিকে হত্যা করে চম্পাবতীকে উদ্ধার করে। নারীহরণ-নারী উদ্ধার এই পালার মোটিভ।
মঙ্গলকাব্যের ন্যায় বন্দনা অংশ আসলে লোকনাট্যের বা পালাগানের নান্দীমুখ রচনা করে। কাহিনির শুরুতে রাজা দূত কর্তৃক একটি সংবাদ পান।
‘‘আগো মহারাজ, আপনকার মন্দিরে, হীরা নীলা মোতি মানিক প্রবালাদি সমস্তই পরিপূর্ণ ওছি। কিন্তু সামান্য চন্দন চামরের জন্য মঙ্গলমাতা দেবীর সন্ধ্যারতি বন্ধ অওছি। তবে মহারাজ আপনকু সেই চন্দন চামর আনি দেইতে হেবু।’’
এই সংবাদ দিয়েই নাট্যকাহিনির বীজ রোপিত হয়েছে এবং প্রারম্ভিক উপস্থাপনার (exposition) কাজটি নাটকে যথাবিধি সম্পন্ন হয়ে প্রথম অঙ্কের পাঁচটি দৃশ্যে। যেখানে রাজ আদেশকে মাথা পেতে নিয়ে হীরানন্দ ও তার ছয় ভাই দূরদেশে চন্দন-চামর আনতে রওনা দিয়েছে। পারিবারিক মায়ার বাঁধন কাটিয়ে তাদের এই যাত্রা নাট্যকাহিনির সূত্রপাতকে সার্থক করে তুলেছে। সেই সঙ্গে প্রথম অঙ্কের মোট দৃশ্যে ফকিরের আবির্ভাব, জয়ানন্দ কর্তৃক ফকিরের অপমান এবং ফকিরের অভিশাপ—
‘‘দেখ সদাগর, তুমকো হাম এক দফা দেখা গা, তোর নারী চম্পাবতী কো হাম যুগীয় হস্তরে দেগ। তব হামরো নাম মদিনা কা ফকির।’’
পরবর্তী কাহিনির সূত্রপাতকেও সূচিত করেছে সার্থকভাবে। সৃষ্টি করেছে এক অদম্য কৌতূহল।
নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কে নাট্যকাহিনির ঊর্ধ্বগতি (rising action) কতকগুলি ‘বৃত্ত’ ও ‘উপবৃত্তে’র সন্নিবেশে ঘটনাগতির ক্রমবিস্তার ঘটিয়েছে। অপমানিত ফকির, যুগির সঙ্গে গোপন চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে—
‘‘আরে দেখ শিবনাথ হামারা পাশ থোড়া ধূলি মন্ত্র হ্যায়। এ ধূলি মন্ত্র সতী কা আঙ্গ রে ছিটায়ে দেনে সে একটো সুন্দর কালিয়া কুকুর হো জায়েগা।’’
ফকিরের এই ক্ষমতা কাহিনিতে এক অলৌকিক বাতাবরণ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে ভিক্ষার ছলনায় যুগি কর্তৃক অপহৃত হয় চম্পাবতী। এই ঘটনায় পৌরাণিক মিথ (myth) হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি, যা আমরা চম্পাবতীর গাওয়া গান থেকেই জানতে পারি—
‘‘পরনারীর প্রতিফল শুন শুন কর্ণর
যুগীবর হে
আগো দেখ সে লঙ্কার রাবণ
সীতাকে কইল হরণ
সীতা লাগি প্রাণে মইল (২ বার)
রাম হস্তর যুগীবর হে…’’
পালাগানটির তৃতীয় অঙ্কের কাহিনি এসে পৌঁছেছে তার চূড়ান্ত বিন্দু বা ক্লাইমেক্সে। যা কাহিনিটির ঊর্ধ্বগতির সর্বোচ্চ শিখর। রাজার মৃগয়া করতে বনে গমন; সেখানে যুগির কবল থেকে চম্পাবতীকে উদ্ধার—
‘‘আরে হীন ভিক্ষু যুগী, কার রমণী হরণ করিয়া
আমার পাখেরে মিথ্যা কথা প্রকাশ করছি।’’
কাহিনিতে নতুন মাত্রা এনেছে। সঙ্গে সঙ্গে ফকিরের সহযোগিতায় সে-যাত্রায় যুগির উদ্ধার, কিন্তু যুগির অলৌকিক শক্তির বলে একে একে কোটাল সহ রাজা পরাজিত ও নিহত হন। যুগির এই পরাক্রমে ভীত ও মুগ্ধ চম্পাবতী রাধ্য হয়েই আবার যুগির কাছেই ফিরে আসে।
‘‘বাঃ বাঃ মু এতে বেলা জগন্নাথ হরি গেলি। যে রাজার পদধরি তুণ্ডে ক্ষমা চাউদিলি গে রাজা তোর কাই গেলা গো।’’
অন্যদিকে দীর্ঘদিনের যোগসূত্রতা ছিন্ন হওয়ার সুবাদে জয়ানন্দের সঙ্গে চম্পাবতীর শেষ সম্পর্কের জোড়া লাগার সম্ভাবনাও বিনষ্ট হয়ে যায়। কারণ জয়ানন্দ যখন চম্পাবতীকে ফিরিয়ে আনতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে, তখনই তার মায়ের মুখ থেকে নির্গত হয় নিষ্ঠুর নির্ঘোষ।
‘‘না বাবা তাঙ্কু আনি আর কি হেব। সে তো কুল কলঙ্কিনী হয়ে গেছে।’’
এই কলঙ্কের দায়ভার পড়েছে চম্পাবতীর ওপর। তাই জয়ানন্দের বিয়ের কথা উঠতেই বড়ভাই তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেয়—
‘‘ভাই জয়ানন্দ, তাঙ্কু আনিবার আর প্রয়োজন নাই। তম্ভুকে ভাল কন্যা দেখে জিভা দেবু।’’
আর এর মধ্য দিয়েই কাহিনি চরম পর্যায়ে উন্নীত হয়ে যায়।
চতুর্থ অঙ্কের চারটি দৃশ্যে আখ্যানবস্তু তার পরিণামের অভিমুখে যাত্রা করেছে। শালিনীর সহযোগিতায় জয়ানন্দ চম্পাবতীর অসহায় অবস্থান জানতে পারল। এবং যুগির কবল থেকে তাকে উদ্ধার করার পন্থাটাও সে জেনে নিল।
‘‘আহা বাবা যুগীর মন্দির সাক্ষাতে। জিবে বটে খুব সাবধান। মোর পাখরে গুটে তত্ত্ব নিয়ে যেও। তুন্ডের নারীর শিয়রে গুটে সোনার কাঠি রূপার কাঠি আছে। সোনার কাঠি ছুঁয়াইলে সতী চেতন পাই আর রূপার কাঠি ছুঁয়াইলে সতী সচেতন হই জিবে।’’
কিন্তু যুগির হাতে জয়ানন্দ ও চম্পাবতীর শেষ পর্যন্ত নিস্তার হল না। এই সঙ্গে কাহিনির আরও একটি ‘উপবৃত্তের’ সূচনা ঘটে হীরানন্দের স্ত্রী রূপবতীকে ঘিরে—
‘‘তুম্ভের গর্ভে যদি পুত্র জন্মগ্রহণ করে তাহলে তার নাম রাখিবা বাঘাম্বর। আর যদি কন্যা জন্মগ্রহণ করে তাহলে নাম বাখবু আমার যুবতী পুত্র হইয়ে খাওয়ায়ে দাওয়ায়ে লিখাপড়া শিখাইবু। আর আশুর যদি আসিতে বিলম্ব হয় তাহলে আমাদের অন্বেষণে পাঠাইব। আর এই জয় পত্র দিয়া তাহা হস্তরে দিমু।’’
কাহিনির গ্রন্থিমোচন ঘটতে থাকে মঞ্চে বিবেকের আবির্ভাবে। সে কপট ছলনাকারী যুগিকে সাবধান করে দেয়—
‘‘যাদু তুমি ঘুঘু দেখছ ফাঁদ তো দেখনি।
ফাঁদ দেখলে অবাক হয়ে চেয়ে রইবে যাইমনি।
যাদু তুমি ঘুঘু দেখেছ
ফাঁদ তো দেখনি।’’
এই অঙ্কেরই শেষদৃশ্যে রূপবতীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে বীর বাঘাম্বর। যে কিনা এর পর কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু থেকে মূলকাহিনিকে সুনিয়ন্ত্রিত করে পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।
পঞ্চম অঙ্কের চারটি দৃশ্য নিয়ে এই যাত্রা পালাগানটির শেষ পরিণতি ঘটেছে। বাঘাম্বরের দুঃসাহসিক অভিযাত্রায় শেষপর্যন্ত যুগির কবল থেকে চম্পাবতীকে উদ্ধার করতে সে সমর্থ হয়েছে। রূপকথার অলৌকিক বাতাবরণের মোড়কে এই অঙ্কেরই শেষদৃশ্যটির নাট্যিক তাৎপর্য বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে। চম্পাবতীর ছলনায় যুগির মৃত্যুর রহস্য শেষপর্যন্ত জানা গেছে।
‘‘আহা বাবা, সেই সাত সমুদ্র লঙ্কার পারে বটবৃক্ষের পেচক পক্ষী আছে। সেই পক্ষীর মৃত্যু হলে তবে যুগীর মৃত্যু হেব।’’
এবং যুগির মৃত্যুর পর কাহিনির পরিসমাপ্তি সবার সঙ্গে সবার মিলনের মধ্য দিয়ে বাঘাম্বরের জয় ঘোষিত হয়েছে। এভাবেই পালাগানটি পৌঁছে গেছে সার্থক সমাপ্তির অন্তিমলগ্নে।

সাক্ষাৎকার।

পরিবেশন পদ্ধতি

যুগি যাত্রার অভিনয়াংশ বেশ উচ্চ স্বরে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গানের দ্রুততার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ফলে বাদ্যযন্ত্রের লয় কখনও কখনও চৌগুণ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পালা শুরু করার আগে যাত্রার মত ধূপ জ্বেলে পূজা করা হয়। বাজনাদাররা মঞ্চে প্রবেশ করে গৎ বাজান। গৎ বাজানো শেষ হলে লোকনাটকের অধিকাংশ পালার মত বন্দনাগীত শুরু হয়। এরপর অঙ্ক ও দৃশ্য অনুযায়ী অভিনয় চলতে থাকে। যেহেতু আধুনিক শব্দযন্ত্রের ব্যবহার ছিল না তাই উচ্চমার্গে চড়া সুরে অভিনয়ের সংলাপ পরিবেশিত হয়। কারণ বৃহৎ অংশের দর্শকমনে প্রভাব ফেলতে অভিনয়ের অতিকৃতি থাকে। প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত তা বজায় রাখা হয়। প্রতিটি দৃশ্যের অভিনয়াংশে নৃত্যগীতের প্রাধান্য বজায় থাকে। আবার প্রধান চরিত্রগুলির আবির্ভাবের সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রে বিশেষ ঝংকার তৈরি করা হয়, যাতে চরিত্রের বিশেষ উপস্থিতি দর্শকমনে দাগ কাটে। যেমন চতুর্থ দৃশ্যে যুগির চাবুক চালানোর আবহসঙ্গীত বিশেষভাবে প্রয়োগ করা হয়। নৃত্য অংশ প্রায়শই দলগত হয়। যদি দলের আর্থিক অসঙ্গতি থাকে তখন একক অথবা দ্বৈত নৃত্য পরিবেশিত হয়।
কখনও কখনও দর্শকদের একঘেয়েমি কাটানোর জন্য মূল পালার বাইরেও অন্য গানের দ্বারা কৌতুকপূর্ণ নৃত্য পরিবেশন করা হয়। কখনও বিষয়-নির্ভর, কখনও বিষয়-বহির্ভূত। তা অবশ্য নির্ভর করে স্থানীয় দর্শকদের চাহিদা অনুযায়ী। পালা চলাকালীন সামান্য উপকরণ ব্যবহার করে দৃশ্যরচনা করা হয। যেমন জয়ানন্দের ব্যবসায় যাত্রাকালে নদী পারাপার হওয়ার দৃশ্যে একটি শাড়িকে কোমরে জড়িয়ে দণ্ডিমাঝি নৌকা প্রস্তুত করে। অনুরূপভাবে একটি চেয়ারকে রাজ সিংহাসন, নদীর পাড় বা ঘরের আসবাবপত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়। কোনও দৃশ্যরচনার জন্য আলাদা কোনও উপকরণের আধিক্য লক্ষ্য করা যায় না। সম্পূর্ণ পালাটির পরিবেশন চলে সহজ ও স্বাভাবিক নিয়মে। অনুষ্ঠান হয় মূলত আয়োজনমূলক।

মঞ্চশৈলী

এই পালার মঞ্চ তৈরি হয় গ্রামের খোলা মাঠে, হাটবাজারের আটচালায়, মূলত বর্গাকৃতি সমতলভূমির ওপর। ভূমি হতে অপেক্ষাকৃত এক থেকে দেড় ফুট উঁচু চারটি তক্তপোষ (খাট) বেঁধে চারপাশে চারটি খুঁটি গেড়ে তার ওপর চামড়া দিয়ে ছাউনি করা হয়। অভিনয়মঞ্চের চারপাশে দর্শক বসে। কেবল সাজঘর থেকে মঞ্চ প্রবেশ পর্যন্ত অংশটি খালি রাখা হয় শিল্পীদের যাতায়াতের জন্য। অভিনয়ের প্রয়োজনে এই রাস্তার মধ্যেও কোনও কোনও চরিত্র অভিনয় করেন। যাত্রাপালার বিবেকের মত, যুগি পালার বিবেক চরিত্রটি যখন সাজঘর থেকে গান ধরেন তখন এই পরিসরটি মঞ্চ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। তবে বেশিরভাগ সময় সমতলভূমির মঞ্চে অভিনয় হয়। হ্যাজাক লাইটের আলো যুগি যাত্রায় ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবহার হয়ে থাকে। যদিও ইদানীংকালে এই পালা আর অভিনীত হয় না। তবে বিশেষ আয়োজনে প্রধান শিল্পীরা সংক্ষিপ্ত আকারে পালাটি পরিবেশন করেন।

সাজপোশাক

পালার চরিত্রানুযায়ী পোশাকগুলি শিল্পীরা নিজেরাই সংগ্রহ করেন। বিশেষ কয়েকটি চরিত্রের পোশাক ভাড়া করে আনা হয়। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত পোশাকগুলিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ওস্তাদদের বাড়িতে জমা করা হয়। অনুষ্ঠান শেষ হলে তা আবার সকলকে ফেরত দেওয়া হয়। অবশ্য অতীতে যখন নিয়মিত যুগি যাত্রা পরিবেশিত হত তখন দলের নিজস্ব পোশাক ও বাদ্যযন্ত্র থাকত। চরিত্র অনুযায়ী শিল্পীরা নিজেরাই নিজেদের রূপসজ্জা করেন। যেগুলি স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য নয় তা শহর থেকে আনানো হয়।

বাদ্যযন্ত্র

যুগি যাত্রায় স্থানীয় লোকবাদ্য ছাড়াও পাশ্চাত্য বাদযন্ত্রের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। সম্ভবত গ্রামীণ যাত্রার বাদ্যযন্ত্রের প্রভাব এর মধ্যে পড়েছিল। সে কারণে দেশীয় বাদ্যযন্ত্রগুলির সঙ্গে হারমোনিয়াম, ক্লারিওনেট এমনকী সিন্থেসাইজারও ব্যবহৃত হয়।

ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র

চর্মজাত                  ফুৎকারজাত                  ধাতুজাত

ঢোল                      হারমোনিয়াম                করতাল

ডিগি তবলা            বাঁশি                             ঝুমকা

ঢিকরা                   ক্লারিওনেট                     জাড়া

সঙ্গীতের কথা, সুর ও তাল

যুগি যাত্রার গান গদ্য কথনে বেশি পরিবেশিত হয়। পদ্য ছন্দে গান ব্যবহৃত হয়। আবার ‘চড়িয়া চড়িয়ানি’ পালায় পদ্য ছন্দের গান বেশি পরিমাণে ব্যবহৃত হয়। এ থেকে অনুমান করা যায় যে, ‘চড়িয়া চড়িয়ানি’-র অনেক পরে যুগি যাত্রার উৎপত্তি হয়েছিল। যুগি পালায় যে গানগুলি গাওয়া হয় সেগুলি মূলত ওড়িয়া ভাষায়। কিন্তু গানের সুর স্থানীয় গানের মত স্বতন্ত্র সুর ও তাল বজায় রেখে পরিবেশিত হয়। সঙ্গীতে দাদরা, কাহারবা, তেওড়া প্রভৃতি তাল ব্যবহৃত হয়। নাটকের গতি অনুযায়ী গানের গতি কখনও বাড়ে, কখনও কমে, তেমনই গানের তাল মাত্রার পরিবর্তন ঘটে। মূলত নিরক্ষর শ্রেণির মানুষের দ্বারা এই পালা পরিবেশিত হত। সে কারণে এর বিধিবদ্ধ স্বরলিপি, তালের বোল কিছুই পাওয়া যায় না। শিল্পীদের প্রখর স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করে পরিণত সঙ্গীতশিল্পীর সহযোগিতায় একটি গানের স্বরলিপি তৈরি করেছি। যাতে গানগুলির সম্বন্ধে একটা ধারণা দেওয়া যায়। যুগি পালায় সত্যপিরের পাঁচালির সুর ব্যবহৃত হলেও তা একটি ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়েছে।

যুগি পালার গান ও স্বরলিপি

পঞ্চ দেব হে, পঞ্চদেব হে
কণ্ঠে বস পদ করি সেবা হে–
আইলেন মা সরস্বতী নির্মল বনে গো,
নির্মল বনে।

এলাকা ও সময়

যুগি যাত্রা পালার এলাকা মেদিনীপুরের পশ্চিমাঞ্চল ছাড়াও বিহার ও ওড়িশা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই বিষয়ে পূর্বেই বিস্তৃত আলোচনা করেছি। গোপীবল্লভপুর থানার সুবর্ণরেখার বিস্তীর্ণ অববাহিকা অঞ্চল থেকে শুরু করে কাঁসাই নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলিতে ছাড়িয়ে হলদিয়া, তমলুক পর্যন্ত এর এলাকা বিস্তৃত হয়েছিল। কারণ এই অঞ্চলগুলি ছিল পলিমাটির উর্বরা কৃষিভূমি। কৃষিজীবী মানুষেরা ফসল ওঠার আনন্দে পৌষমাস থেকে চৈত্র-বৈশাখ পর্যন্ত রাতে পালাগুলি পরিবেশন করতেন। দর্শক ও শিল্পীরা যেহেতু শ্রমজীবী ও কৃষিজীবী সে কারণে সারাদিনের শ্রমের পর রাতের অবসরেই পালার আসরে হাজির হতেন।
বাংলার নির্জন পল্লিতে আঞ্চলিক লোকনাট্যগুলির মাধ্যমে মানবজীবনের অন্তরের আত্মপ্রকাশ ঘটে। গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের জীবনের জন্ম থেকে মৃত্যু, ভাল-মন্দ, দুঃখ-আনন্দ, ন্যায়-অন্যায়, আশা-আকাঙ্ক্ষার যাবতীয় অভিঘাত উপলব্ধি করা যায়। যদিও বর্তমান জীবনযাপনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে লোকনাট্যের বাহ্যিক পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে লোকসংস্কৃতি সতত পরিবর্তিত হয়ে চলবে, এটাই ঐতিহ্যের ক্রিয়াত্মক রূপ। অতীতের গর্ভে থাকে বর্তমানের বাস্তবতা, যা ভবিষ্যতের অভিমুখ। যতদিন পৃথিবীতে মানবজীবন ও জীবের অস্তিত্ব বিরাজ করবে, ততদিন লোকনাট্য লোকজীবনের অঙ্গ হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র
১. মধুপ দে, ‘লোকযাত্রা’, জেলা লোক সংস্কৃতি গ্রন্থ, মেদিনীপুর লোক সংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র, প্রথম প্রকাশ : ২০০১।
২. মধুপ দে, সাক্ষাৎকারে সংগৃহীত, ২১ মে ২০০২।
৩. তদেব।
৪. শ্যামল বেরা, একটি গ্রামীণ লোক যাত্রাপালা : সতী চম্পাবতী হরণ, লোক সংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র, সপ্তদশ সংখ্যা ২০০০।
৫. মন্টু দে, যুগিযাত্রার শিল্পী, মালবাঁধি, পশ্চিম মেদিনীপুর, সাক্ষাৎকারে সংগৃহীত, সেপ্টেম্বর ২০০১।

চিত্র : লেখক
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »