Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বিশেষ নিবন্ধ: মোহাম্মদ সাদউদ্দিন

জীবনানন্দ দাশ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: কিছু প্রাসঙ্গিক কথা

বাংলা সাহিত্যের দুই মহারথী— একজন জীবনানন্দ দাশ, অন্যজন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। একজন ফরিদপুরের (এখন মাদারিপুর) ভূমিপুত্র, অন্যজন বরিশালের। অর্থাৎ দুজনেই পূর্ববঙ্গ বা অধুনা বাংলাদেশের। জীবনানন্দ রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। সুনীলকে বলা হয় এ-যুগের রবীন্দ্রনাথ। দুজনেই তাঁদের সৃজনশীলতায় পাঠকের কাছে আজও সমাদৃত। পূর্ববঙ্গের সন্তান হলেও দুজনের খ্যাতি কিন্তু সেই কলকাতাতে এসে।
জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছিল গভীর শ্রদ্ধা। ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা সম্পাদনা সুনীলের অনন্য কৃতিত্ব। আর এই পত্রিকাতে তিনি দাবি করেন, ‘তখন সবাই জীবনানন্দ দাশে আচ্ছন্ন। কফি হাউসে তরুণ কবিদের আড্ডায় বিষয় হিসাবে বুদ্ধদেব বসু ও বিষ্ণু দে ক্রমশ স্থানচ্যুত হয়ে সেখানকার সিংহাসনে বসানো হয় জীবনানন্দ দাশকে। কৃত্তিবাসের দলবলই যে প্রথম প্রকাশ্যে জীবনানন্দকে নিয়ে একটা হৈচৈ শুরু করে, এটাও দাবি করা যেতে পারে’। [দ্রষ্টব্য: গানের জীবনানন্দ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ/ তরুণ মুখোপাধ্যায়]।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্মৃতিচারণায় আরও বলেন যে, সিগনেট প্রেসে তিনি কবিকে দেখেছেন। অর্থাৎ জীবনানন্দকে দেখেছেন। কিন্তু কথা বলতে সাহস করেননি তিনি। সুনীল এও দাবি করেন যে, তিনি জীবনানন্দের ল্যান্সডাউনের (এখন শরৎ বসু রোড) বাড়ি গিয়েছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে একমঞ্চে কবিতাও পাঠ করেছেন। বেঁচে থাকাকালীন কবি জীবনানন্দ দাশ মানুষের নিন্দা, ঘৃণা বা ব্যঙ্গ পেয়েছেন। কিন্তু সুনীল মনে করেন ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রকাশের পর জীবনানন্দের খ্যাতি দারুণভাবেই বেড়ে যায়।
১৯৫৪ সালের অক্টোবরে ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’-র বইটা বের হল। আবার ওই ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর ট্রাম দুর্ঘটনায় কবি জীবনানন্দ দাশ মারা গেলেন। জীবিতকালে যে খ্যাতি তিনি পেতে লাগলেন, এই একটিমাত্র দুর্ঘটনায় তা শেষ হয়ে গেল। সেই জীবনানন্দ দাশের মরদেহ নিয়ে সুনীল সেদিন শ্মশানেও যান। কবির মরদেহও সেদিন তিনি বহন করেন। এটাই ছিল সুনীলের কাছে একটি স্মরণীয় ঘটনা যে, তিনি জীবনানন্দের শরীর ছুঁয়েছিলেন। জীবৎকালে যাঁর সঙ্গে কথা বলার সাহস হয়নি, কবির মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহকে ছোঁয়ার সুযোগ হয়েছিল। এ এক অবাক করার মতোই ঘটনা। কেওড়াতলা শ্মশানে জীবনানন্দ দাশের দাহকার্য শেষ হয়। তারপর সুনীল ও তাঁর অনুগামী কবিরা অনর্গল কবিতা পাঠ করেন।
জীবনানন্দ বাংলার মুখ অবয়বে সমগ্র পৃথিবীকে দেখতে চান। কোন বাংলা? সেই বাংলা হল ধানসিঁড়ি, সুগন্ধা, গন্ধা, কীর্তনখোলা, রূপসা নদীর তীরবর্তী বাংলা। তাই তার মুখ দিয়ে দৃঢ় উচ্চারণ ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ/ খুঁজিতে যাই না আর…’। অন্য এক জায়গায় বলেন, ‘তোমরা যেখানে সাধ চ’লে যাও— আমি এই বাংলার পারে র’য়ে যাব’। কী আন্তরিক উচ্চারণ! কী আবেগ! কী অনুভূতি তাঁর!
তাই ২০২৩ সালে যেদিন আমি বরিশাল ভ্রমণ করি সেদিন অনেক জায়গাতে ঘুরেছি। কিন্তু জীবনানন্দের স্মৃতিবিজড়িত ধানসিঁড়ি, সুগন্ধা, গন্ধা, কীর্তনখোলা, বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ, কলেজের ভিতর জীবনানন্দ হল— যেন আমাকে ব্যাপকভাবে অনুভূতিশীল করেছিল। ঢাকা থেকে বরিশাল আসার পথে সবকিছুতেই যেন জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলার’ পরশ পেয়েছিলাম। আবার বরিশাল থেকে যখন খুলনায় এলাম তখন আমার বন্ধু এহ্তেশামুল হক শাওন যখন আমাকে নিয়ে যান রূপসা নদীর তীরে, তখন কেবল কবির কবিতা বারবার মনে হচ্ছিল। ‘রূপসার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক সাদা ছেঁড়া পালে ডিঙ্গা বায়’।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কৈশোর কেটেছিল ফরিদপুর জেলার মাদারিপুর মহকুমার একটা গ্রামে। এখন মাদারিপুর নিজেই একটা স্বতন্ত্র জেলা। এই মাদারিপুর জেলার কালকিনি থানার মাইজপাড়া গ্রামই হল সুনীলের পৈতৃকভূমি। দেশভাগের পর সুনীলও চলে আসেন কলকাতায়। বাংলাদেশের প্রতি তাঁর ছিল নাড়ির টান। সুনীলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এ পাই সে আলোচনা। এমনকি সুনীলের ‘যদি নির্বাসন দাও’ কবিতায় সেই আবেগ দেখা যায়। তাই ওই কবিতায় তিনি বলতে দ্বিধা করেননি, এ আমারই বাংলাদেশ। সেখান থেকে তাঁকে নির্বাসন দিলে ‘আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো আমি বিষপান করে মরে যাবো।’ কী বলিষ্ঠ উচ্চারণ!
জীবনানন্দ যেমন বলেন, ‘তোমার প্রতিজ্ঞা ভেঙে তুমি চলে গেছো কবে’, সুনীলও তেমনই বলে উঠেন, ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো কেউ কথা রাখেনি’। আর ওই কবিতাতে তিনি তাঁর ছোটবেলার নাদের চাচাকেও ভোলেননি। একটা দারুণ হাহাকার তাঁকে জড়িয়ে ধরে। একটা শৈশব নস্টালজিয়া বার বার তাঁকে কুরে কুরে খায়।
জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ এক চিরন্তনী নারী ও সর্বজন আকাঙ্ক্ষিত প্রিয়া। তাই তিনি বলতে পারেন:
‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে— সব নদী— ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’
এ এক অদ্ভুত অনুভূতি। বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে গিয়ে তিনি আত্মসমর্পণ করেন বনলতা সেনের কাছে।
ওই ২০২৩ সালেই যখন আমি রাজশাহী থেকে নাটোর যাই, তখন আমার মনে এই অনুভূতির উদয় হয়েছিল। আমি যেন নাটোরে পাখিগুলোর মধ্যে বনলতা সেনকে দেখি।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও আবিষ্কার করেন নীরা নামক এক নারীকে। এই কাব্য-নায়িকাও একসময় তরুণদের কাছে ছিল এক স্বপ্ন-নারী। তাই ‘সত্যবদ্ধ অভিমান’ কবিতায় সুনীলের বেপরোয়া উচ্চারণ, ‘এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি– এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায় ?’ এ এক অসাধারণ কাব্যিক উচ্চারণ, যা সুনীলকেই মানায়।
২০২৩ সালে বাংলাদেশ সফরে ঢাকা থেকে কবি মোহন রায়হান আমাদের নিয়ে যান পদ্মা সেতু দেখাতে। সঙ্গে আরও অনেক কবি-সাহিত্যিক ছিলেন। সে-সময় আমাদের পদ্মা সেতু বাদ দিলেও গোপালগঞ্জ ও মাদারিপুর যাওয়ার সৌভাগ্য ঘটে। আর তখন আলোচনায় উঠে আসে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা। তাঁর পৈতৃক নিবাস ও তাঁর শৈশবকাল নিয়ে।
তাই সুনীলকে জীবনানন্দের উত্তরসূরি বললে কি ভুল হবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × 5 =

Recent Posts

কাজী তানভীর হোসেন

চেতনার বিবর্তন ও ঈশ্বরের নৃবিজ্ঞান

মানুষের অজ্ঞানতা ও ভুলের গর্ভেই ঈশ্বরের জন্ম হয়েছিল; আর মানুষের জ্ঞান ও সভ্যতার ঐতিহাসিক অগ্রগতিই একদিন ঈশ্বরের কবরে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেবে। জ্ঞানতাত্ত্বিক আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান তাত্ত্বিকভাবে বিনাশ করবে অলৌকিক সৃষ্টিকর্তার ধারণা, আর সম্পদের সুষম বণ্টন ও সাম্যবাদ (Communism) বিলুপ্ত করবে প্রাচীন টোটেমীয় কুসংস্কারকে। একদিন ধর্মের এই অন্ধ খোলস ভেদ করে স্থান করে নেবে উচ্চতর গণিত, আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্ব এবং বিজ্ঞানসম্মত মানবিক কর্তব্যবোধ।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

ব্রিটিশ ছোটগল্প

আমি আগে থেকেই আমেরিকার পাখি বইটি সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু কখনও বইটির সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাইনি। ঠিক যেভাবে কেউ নদীর ধারে বসে সময় কাটায়। বাবার হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমি যেন ধৈর্যের অর্থ শিখে নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। এডি ঠিকই বলেছিল— আমিও মাছ ধরতে যেতে চাইছিলাম। জলের ধারে বসে থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু বাবাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো সম্ভব হয়নি। তাই আমি অডুবন-এর সরোবরসম বইয়ে আমার জাল ফেললাম।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »