দু’চাকার সাইকেল
চেম্বারে ঢুকতেই মি. দত্ত এসে অনুযোগের সুরে বললেন, ‘স্যার, এই কেসটা নিয়ে আগেও দু’বার আপনাকে বলেছিলাম, ফাইলটা আপনার কাছেই আটকে আছে। ম্যানেজার হিসেবে আপনি ডিসবার্সড করে দিলেই ওঁর হাজবেন্ডের এক্সিডেন্টাল ডেথের ইনসিওরেন্স ক্লেইমটা পেয়ে যান উনি। ভদ্রমহিলাকে বছরখানেক ধরে ঘোরাচ্ছি। আজকে উনি চেঁচামেচি করে বলছেন, আপনাদের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার আমার পূর্বপরিচিত, আমি ওঁর সাথেই কথা বলব।’
‘এত কাজের চাপ দেখতেই তো পাচ্ছেন, ফাঁকি তো আর দিচ্ছি না, না। পূর্বপরিচিত? ঠিক আছে পাঠিয়ে দিন; হ্যাঁ, কী নাম বলুন তো?’
‘মধুজা। বললেন, আপনার গ্রামেরই মেয়ে নাকি।’
সারা শরীরের রক্ত চলকে আমার মুখে, ভাগ্যিস মাথা নিচু করে ফাইলে সই করছিলাম, তা নইলে মি. দত্তর চোখে নির্ঘাত ধরা পড়ে যেতাম।
‘অতল, তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি বলে হৃদি ভেসে গেল অলকানন্দা জলে।’ বড়সড় হোঁচট খাওয়ার পরদিনই গ্রাম ছেড়েছিলাম, তাও আজ কতকাল হয়ে গেছে।
মধুজা পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে একহাতে আমার চোখ বন্ধ করে, ফুল ভর্তি অন্য হাত নাকের কাছে রেখে বলল, ‘বলো তো কী ফুল?’
রজনীগন্ধার মতো দাপুটে না হলেও মেহেকে মিষ্টি সুবাসের অন্য তীব্র পেলবতা। বুঝতে মুশকিল হবে কেন? বাতাবিলেবু ফুলের সৌরভ আমারও যে ভীষণই প্রিয়। এমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে যে, তাতে প্রবল অস্বস্তি ঢাকতেই রূঢ়ভাবে বলেছিলাম, ‘তোর মতো গাঁইয়াও নই আর বনেবাদাড়ে ঘুরেও বেড়াই না। চোখ ছাড়, নতুবা বলব কী করে?’
সদ্য যুবতী মেয়ের হাসিতে একশো চঞ্চলা হরিণীর খুরের আওয়াজ। হাসি থামিয়ে বলল, ‘দেখতে হবে কেন? তুমি না প্রেমিক? অনুভব করে বলো?’
‘কী কথায় কী কথা, যেন চালতার আচারে লেবুপাতা।’
‘এই তো লক্ষ্যের কাছাকাছি, বলে ফেলো, বলে ফেলো।’
‘তুই ছাড়বি আমায়, কেউ দেখলে কী ভাববে বল তো?’
‘অরুদা, তুমি এত লাজুক কেন গো?’
‘তোকে নিয়ে কী যে করি!’
‘কেন? সিম্পল্! বিয়ে করে ফেলো, হিহিহিহি…। বলতে পারলে না তো? জানতাম পারবে না। বাতাবিলেবু ফুল। অরুদা, আমাদের বাসর এই ফুল দিয়েই সাজাব, আমার আবদারটা তোমায় রাখতেই হবে কিন্তু, এই বলে দিলুম।’
‘পাগলি একটা, দাঁড়া চাকরিটা তো আগে পেতে দে।’
এ মেয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো অনর্গল কথা বলে, বাতাসের মতো পাতার ঝালরে গান গায়। বসন্তে শিমুল, শীতের সর্ষে ফুল। আগুনের বলয় আলোর বিভা। মনে কিন্তু সাদা-কমলায় নিষ্পাপ শিউলি। নিঃশব্দের ফল্গু অনন্তের ফাল্গুনী আমি ওকে ভীষণ ভাল চিনি।
ভুল ভুল, পুরোটাই ভুল।
কলকাতায় চাকরির পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি, দেখলাম স্টেশন রোডের বাঁশঝাড়ের পেছনে মধুজা সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গম্ভীর কিছু ব্যাপার হবে নিশ্চয়ই। কাছে যেতেই হরিণীর সরলতা উধাও, সিংহীর গর্জনে আছড়ে পড়ল।
‘তুমি একটা বিজনেস তো অন্তত শুরু করতে পারতে? আমার দাদা তো প্রথম থেকেই…।’
‘দাঁড়া দাঁড়া, তোর বাবার ফ্যাক্টরি ছিল, তা বাদে তিনি নিজে হাতে ধরে তোর দাদাকে শিখিয়েছিলেন ব্যবসার অলিগলি। কিন্তু আমাকে নিজেই যা হোক কিছু একটা…, ঠিক আছে, চাকরি না পেলে ব্যবসাই শুরু করব, তাতে টাকা-সময় দুটোই লাগবে। সেটাই হবে, আমায় শুধু কিছুটা সময় দে…।’
‘আর সময় নেই অরুদা, বাড়ির লোকজনকে অনেক দিন আটকে রেখেছিলাম। তাছাড়া এবার আমিও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। জীবন খুব ছোট অরুদা, অপেক্ষা করে করে ফুরিয়ে ফেলতে চাইনি। শোনো, সব ঠিক হয়ে গেছে, আর ঠিক পনেরো দিন বাদে আমার বিয়ে। কার্ড পাঠিয়ে দেব, এসো কিন্তু।’
সাইকেলে উঠেই মধুজা প্যাডেলে চাপ দিল। চিৎকার করে বললাম, ‘আমাদের বাতাবিলেবু ফুলের বাসরের কী হবে মধুজাআআ…?’
কথাগুলো ব্যপনে বাতাসে মিলিয়ে গেল। সাইকেলের চাকা বনবন। মধুজা ততক্ষণে আমার জীবন থেকে অনেকটাই এগিয়ে গেছে, বাস্তবিক-ই।
চিত্রণ: ধৃতিসুন্দর মণ্ডল







