Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

প্রদীপ ঘোষের ছোটগল্প

দু’চাকার সাইকেল

চেম্বারে ঢুকতেই মি. দত্ত এসে অনুযোগের সুরে বললেন, ‘স্যার, এই কেসটা নিয়ে আগেও দু’বার আপনাকে বলেছিলাম, ফাইলটা আপনার কাছেই আটকে আছে। ম্যানেজার হিসেবে আপনি ডিসবার্সড করে দিলেই ওঁর হাজবেন্ডের এক্সিডেন্টাল ডেথের ইনসিওরেন্স ক্লেইমটা পেয়ে যান উনি। ভদ্রমহিলাকে বছরখানেক ধরে ঘোরাচ্ছি। আজকে উনি চেঁচামেচি করে বলছেন, আপনাদের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার আমার পূর্বপরিচিত, আমি ওঁর সাথেই কথা বলব।’

‘এত কাজের চাপ দেখতেই তো পাচ্ছেন, ফাঁকি তো আর দিচ্ছি না, না। পূর্বপরিচিত? ঠিক আছে পাঠিয়ে দিন; হ্যাঁ, কী নাম বলুন তো?’

‘মধুজা। বললেন, আপনার গ্রামেরই মেয়ে নাকি।’

সারা শরীরের রক্ত চলকে আমার মুখে, ভাগ্যিস মাথা নিচু করে ফাইলে সই করছিলাম, তা নইলে মি. দত্তর চোখে নির্ঘাত ধরা পড়ে যেতাম।

‘অতল, তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি বলে হৃদি ভেসে গেল অলকানন্দা জলে।’ বড়সড় হোঁচট খাওয়ার পরদিনই গ্রাম ছেড়েছিলাম, তাও আজ কতকাল হয়ে গেছে।

মধুজা পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে একহাতে আমার চোখ বন্ধ করে, ফুল ভর্তি অন্য হাত নাকের কাছে রেখে বলল, ‘বলো তো কী ফুল?’

রজনীগন্ধার মতো দাপুটে না হলেও মেহেকে মিষ্টি সুবাসের অন্য তীব্র পেলবতা। বুঝতে মুশকিল হবে কেন? বাতাবিলেবু ফুলের সৌরভ আমারও যে ভীষণই প্রিয়। এমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে যে, তাতে প্রবল অস্বস্তি ঢাকতেই রূঢ়ভাবে বলেছিলাম, ‘তোর মতো গাঁইয়াও নই আর বনেবাদাড়ে ঘুরেও বেড়াই না। চোখ ছাড়, নতুবা বলব কী করে?’

সদ্য যুবতী মেয়ের হাসিতে একশো চঞ্চলা হরিণীর খুরের আওয়াজ। হাসি থামিয়ে বলল, ‘দেখতে হবে কেন? তুমি না প্রেমিক? অনুভব করে বলো?’

‘কী কথায় কী কথা, যেন চালতার আচারে লেবুপাতা।’

‘এই তো লক্ষ্যের কাছাকাছি, বলে ফেলো, বলে ফেলো।’

‘তুই ছাড়বি আমায়, কেউ দেখলে কী ভাববে বল তো?’

‘অরুদা, তুমি এত লাজুক কেন গো?’

‘তোকে নিয়ে কী যে করি!’

Advertisement

‘কেন? সিম্পল্! বিয়ে করে ফেলো, হিহিহিহি…। বলতে পারলে না তো? জানতাম পারবে না। বাতাবিলেবু ফুল। অরুদা, আমাদের বাসর এই ফুল দিয়েই সাজাব, আমার আবদারটা তোমায় রাখতেই হবে কিন্তু, এই বলে দিলুম।’

‘পাগলি একটা, দাঁড়া চাকরিটা তো আগে পেতে দে।’

এ মেয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো অনর্গল কথা বলে, বাতাসের মতো পাতার ঝালরে গান গায়। বসন্তে শিমুল, শীতের সর্ষে ফুল। আগুনের বলয় আলোর বিভা। মনে কিন্তু সাদা-কমলায় নিষ্পাপ শিউলি। নিঃশব্দের ফল্গু অনন্তের ফাল্গুনী আমি ওকে ভীষণ ভাল চিনি।

ভুল ভুল, পুরোটাই ভুল।

কলকাতায় চাকরির পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি, দেখলাম স্টেশন রোডের বাঁশঝাড়ের পেছনে মধুজা সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গম্ভীর কিছু ব্যাপার হবে নিশ্চয়ই। কাছে যেতেই হরিণীর সরলতা উধাও, সিংহীর গর্জনে আছড়ে পড়ল।

‘তুমি একটা বিজনেস তো অন্তত শুরু করতে পারতে? আমার দাদা তো প্রথম থেকেই…।’

‘দাঁড়া দাঁড়া, তোর বাবার ফ্যাক্টরি ছিল, তা বাদে তিনি নিজে হাতে ধরে তোর দাদাকে শিখিয়েছিলেন ব্যবসার অলিগলি। কিন্তু আমাকে নিজেই যা হোক কিছু একটা…, ঠিক আছে, চাকরি না পেলে ব্যবসাই শুরু করব, তাতে টাকা-সময় দুটোই লাগবে। সেটাই হবে, আমায় শুধু কিছুটা সময় দে…।’

‘আর সময় নেই অরুদা, বাড়ির লোকজনকে অনেক দিন আটকে রেখেছিলাম। তাছাড়া এবার আমিও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। জীবন খুব ছোট অরুদা, অপেক্ষা করে করে ফুরিয়ে ফেলতে চাইনি। শোনো, সব ঠিক হয়ে গেছে, আর ঠিক পনেরো দিন বাদে আমার বিয়ে। কার্ড পাঠিয়ে দেব, এসো কিন্তু।’

সাইকেলে উঠেই মধুজা প্যাডেলে চাপ দিল। চিৎকার করে বললাম, ‘আমাদের বাতাবিলেবু ফুলের বাসরের কী হবে মধুজাআআ…?’

কথাগুলো ব্যপনে বাতাসে মিলিয়ে গেল। সাইকেলের চাকা বনবন। মধুজা ততক্ষণে আমার জীবন থেকে অনেকটাই এগিয়ে গেছে, বাস্তবিক-ই।

চিত্রণ: ধৃতিসুন্দর মণ্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × one =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »