পাগল
চাপ চাপ কালো মেঘ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আকাশ জুড়ে। টানা একসপ্তাহ চলছে মেঘেদের এই তাণ্ডব। মুষলধারে বৃষ্টি এখন কিছুটা কমেছে। কিন্তু বৃষ্টির কণা যেন বাতাসে মিশেই আছে। মাঝে মাঝে আকাশে গুড়গুড় শব্দ হচ্ছে। কয়েক দিন ধরে টানা বৃষ্টিতে খেতখামার সব জলে থৈ থৈ। ডাঙার দিকের উঁচু জমিগুলোতে ধান গাছের খোঁচা খোঁচা সবুজ মাথা এখনও জেগে আছে। শোলের কাছের নিচু জমির ধান গাছেরা বৃষ্টির জলের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছে দু’দিন আগেই। সেখানে যে কখনও ধান গাছ ছিল, কেউ বুঝতেই পারবে না। মনে হচ্ছে যেন কোনও খরস্রোতা নদী। এ দু’দিনে শোলটা তার শক্তি পেয়ে ফুলেফেঁপে উঠেছে, যেন মাঠের সমস্ত জমিগুলো গিলে ফেলবে।
মাঠের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে মানুষ চলাফেরা করছে। চাষিরা জমির আলে কোদাল নিয়ে হাঁটছে। আল কেটে যদি সামান্য জলও খেত থেকে সরানো যায়! তা হলে হয়তো এ যাত্রায় পাকা ধান বাঁচাতে পারবে।
প্লাস্টিকের বস্তাকে টোকার মতো করে মাথায় দিয়েছে অবিনাশ। এক হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে বার বার দেখছে সে। উশকোখুশকো মুখ। চোখগুলো আরও কোটরে ঢুকেছে। লম্বাটে শরীরটা যেন এই ক’দিনের বৃষ্টিতে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। লুঙ্গিটাকে হাঁটুর উপর পর্যন্ত গুটিয়ে পায়ে পায়ে জমির আল আন্দাজ করে পুরো জমি ঘুরেছে অবিনাশ। এখন উঠে উঁচু জমির আলে দাঁড়িয়েছে। এই আলেও থিক থিকে জল।
“ধানের কি অবস্থা অবিনাশদা?” বদন জিজ্ঞেস করল। তার মাথা গামছা দিয়ে জড়ানো। নিজের জমির আল থেকে ঘুরে এসে অবিনাশের পাশে দাঁড়াল সে।
আকাশের দিকে আরেক বার তাকিয়ে অবিনাশ বলল, “কাল রোইদ উঠবে মনে হয়।”
“রোইদ উঠলেই বা কী। ওই দিকে ডিভিসি জল ছাড়ছে। ঝাড়খণ্ডেও নাকি বৃষ্টি হচ্ছে এক টানা।”
হাওয়ায় অবিনাশের মাথার বস্তাটা ফট্ ফট্ শব্দে উড়ে উঠল। কোনও রকমে বস্তাটাকে মাথায় চেপে ধরল অবিনাশ, “তাইলে আমার ধান কি আর বাঁচবে না?”
কিছু ক্ষণ চুপ থেকে বদন বলল, “আমার না হয় বাপের দিনের দুই বিঘা জমি আছে। ফ্যালতে পারব না তাই চাষ করতে হয়। তুমি কী কারণে এই বর্ষাকালে শোলের ধারে জমি লিজ নিতে গেলা।”
আকাশের দিকে আরেকবার তাকাল অবিনাশ। সত্যিই তো স্বামী-স্ত্রী মিলে লোকের জমিতে মুনিষ দিয়ে দিন তার কাটছিল ঠিকই। চার হাজার টাকা করে দু’বিঘে জমি লিজ নেওয়ার কি খুব দরকার ছিল! তাছাড়া প্রতিবছর বন্যা হয় না। এই বছরটাও তো না হইলে পারত।
ঘরের চালের ভাত কি আর সবার কপালে সয়? সেই কত বছর আগে নিজেদের জমি ছিল! বাবার সঙ্গে জমিতে ধান আনতে যেত অবিনাশ। ধান ঝাড়া, বাছা, সেদ্ধ। তারপর ঘরে আসত নতুন চাল। তখন পাড়ায় ধানকল মেশিন চলে এসেছিল। সেদ্ধ করে শুকানো ধান ভানতে যেত বাবার সঙ্গে। হলারে ধান ঢুকত, বেরিয়ে আসত গরম চাল। সেই চাল ঘরে আনার আগে ঘর লেপে রাখত অবিনাশের মা। নতুন চালের ভাত খাবার আনন্দ ছড়িয়ে পড়ত বাড়িতে।
এখন আর সে দিন নেই। নদীর ধারের দু’বিঘে জমি ছিল। এখন নদীর বুকে। কোনও চিহ্ন নেই তার। ডাঙার উপরের বিঘে খানেক জমি বোনের বিয়ের সময় অবিনাশের বাবা বিক্রি করেছিলেন।
কোমরে লুঙ্গির খোঁট থেকে একটা বিড়ি বের করে অবিনাশের দিকে এগিয়ে দিল বদন। চিন্তিত মুখে বলল, “এই বর্ষাকালে ধান পাওয়া ভাইগ্যের ব্যাপার। আর বছর তাও কয়ডা ধান পাইছিলাম। তার আগের বছর বন্যায় জমিতে পলি পইড়া সব ধান নষ্ট হইয়া গ্যালো। বৌ পোলা মাইয়া মিল্যা একমাস ধইরা জমি খালাস করলাম।” বিড়ির একদলা ধোঁয়া ছেড়ে অবিনাশ জিজ্ঞেস করে “ওই ধান এক্কেবারে নষ্ট হইয়া গেছিল?”
বাড়িতে রোইদে শুকাইলাম কিন্তু ধানের রং কালা হয়ে গেছিল। এট্টা পাইকারও সেই ধান কিনল না।”
“সেই ধান ফ্যালাই দিলা বদন ভাই?”
“সে কি ফ্যালন যায়? তুমি কি তোমার শরীলের রক্ত ফ্যালতে পারবা?”
সিদ্ধ কইরা চাইল করলাম কিন্তু সেই চাইলের ভাত হইল তিতা। তিতা চাইল কি ব্যাচা যায়? সারা বছর তিতা ভাত খাইলাম।”
অবিনাশ আরেকবার নিচের আলে হাঁটুজলে নামল, “খড়গুলা মনে হয় রোইদে শুকাইলে ঠিক থাকবে।”
বাড়ি চলো অবিনাশদা, নদীর জল বাড়ে। জিনিসপত্র সব গোছাইতে হবে।”
২
উঁচু জমির জল সম্পূর্ণ নেমে গেছে। শোলের কাছের জমিগুলোতে এখনও গোড়ালিসমান জল। ধানগাছ সব শুয়ে আছে। শোয়া ধানগাছের ওপরে যেন কেউ কাদা দিয়ে সুন্দর করে লেপে দিয়েছে। শোল তার রাগ কমিয়ে আবার নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। কতকগুলো বক একবার নিচের দিকের জমিতে আসছে একবার শোলের দিকে যাচ্ছে, যেন উৎসব লেগেছে ওদের। দুটো মাছরাঙা পাখি অনেকক্ষণ ধরে শোলের পাশের ঝোপে চুপ করে বসে আছে। সুযোগ বুঝে ঝুপ করে শোলের জলে ঠোঁট ডুবিয়ে উড়ে যাচ্ছে।
জমির পিচ্ছিল আলে দাঁড়িয়েছে অবিনাশ। হাতে কাস্তে। লুঙ্গিটাকে গুটিয়ে হাঁটুর উপর পর্যন্ত তুলেছে। কোমরে শক্ত করে গামছা বাঁধা। বন্যার পলি পড়ে জমির আল ভয়ানক পিচ্ছিল। বন্যার পর এখনও মানুষের পায়ের ছাপ পড়েনি, কেবল অবিনাশের বড় বড় পায়ের ছাপ ছাড়া। যত তাড়াতাড়ি পারে ধান কেটে তুলতে হবে। দেরি হলে ধান থেকে কল বেরিয়ে যেতে পারে। ধান থেকে চারা বেরোনোকে অবিনাশেরা কল বেরোনো বলে।
হাতের কাস্তেটাকে শক্ত করে ধরেছে অবিনাশ। আল থেকে জমিতে পা রাখতেই মট করে একটা শব্দ হল। বাঁ পা তুলে কোনও রকমে ব্যালেন্স রাখল অবিনাশ, “শালার! শামুকে ভইরা গেছে দ্যাশ।” বাঁ পায়ের তলায় আটকে আছে শামুকের খোলসের টুকরো। রক্ত বেরোতে লাগল ক্ষতস্থান থেকে। কোনও রকমে ডান পায়ে ভর দিয়ে বাঁ পা তুলে শামুকের ভাঙা টুকরোটাকে ছাড়িয়ে নিল। তীক্ষ্ণ টুকরোটা একটু ক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখে দূরে ছুড়ল। “যতই রক্ত বের হোক এখন তোমার ছুটি নাই।” বাঁ পায়ের দিকে তাকিয়ে কাটা জায়গায় মাটি ঘষে নিল ক্ষাণিকটা।
শুকনো জমিতে দাঁড়ানো ধান গাছে হাঁটু মুড়ে বসেও কাস্তে চালানো যায়। শুয়ে পড়া ধানগাছ তার ওপর জল আর পলি পড়ে পিচ্ছিল। এরকম জমিতে সারাক্ষণ উপুড় হয়েই কাটতে হবে। আলের ধারে কাদা হাতড়ে এক গোছা ধানগাছ ধরে কাস্তে চালিয়ে দিল অবিনাশ। কাদামাখা গোছাটা হাতে চলে এল। “শালার শুইয়া থাকোন তোমাগো। বাইর করতেছি।” ধানের গোছাটাকে উঁচু করে আলে তুলে রাখল। জমিতে রাখলে জলকাদায় শুকোবে না।
একটা একটা করে ধানের গোছা হাতড়ে কাটতে লাগল অবিনাশ। দু’ পাই ধান কেটে আলে তুলে রেখেছে। জমির মাঝের দিকের ধান কেটে জমিতেই ছোট ছোট গাদা করেছে। পরে আলে তুলে রাখবে। ভ্যাপসা গরম পড়েছে খুব। সূর্য এখন তার সমস্ত তেজ দেখাচ্ছে। অবিনাশের মাথা থেকে পুরো শরীর ঘামে জবজবে। কাস্তে উঁচিয়ে একবার সূর্যকেও গাল দিল, “শালার! এখন ত্যাজ বাড়ছে?” রাস্তার দিকে তাকাল আরেকবার। নিজের সাইকেলটা ছাড়া কাউকে দেখতে পেল না। মেজাজ এবার আরও গরম হয়েছে। বাঁ হাত দিয়ে এক গোছা ধান তুলে ডান হাতের কাস্তেটা চালাল। হঠাৎ কাস্তেটা বেঁকে ত্যারচাভাবে উপরে উঠে গেল। অবিনাশের বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল ছুঁয়ে গেল ধারালো কাস্তেটা। আঙুলের মাথা থেকে নখের অর্ধেক বরাবর ঝুলে রইল। কাস্তেটা আলে রেখে কোমর থেকে গামছা খুলে হাতটা চেপে ধরল অবিনাশ। “শালার! শরীলে এত রক্ত আসে কই থেকে।” উঁচু জমির আলে উঠে দাঁড়াল। আঙুলটা জোরে চেপে একটু সামনের দিকে এগিয়ে গেল। জল কাদার তলায় দূর্বা ঘাসেরাও দমবন্ধ হয়ে মৃতপ্রায়। তারই মধ্যে দু’একটা ডগা সতেজ হয়েছে এই দু’দিনে। কয়েকটা তুলে বাঁ হাতের তালুতে রেখেছে। ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে ঘষে কিছুটা নরম করে দূর্বা ঘাসের মণ্ড তৈরি করেছে। কাটা জায়গা থেকে গামছা সরিয়ে নিল। রক্ত কমেনি। দূর্বার রস লাগিয়ে আবার চেপে ধরল কিছুক্ষণ।
কোমরের খোঁট থেকে একটা বিড়ি করল। বিড়িটা ধরিয়ে আবার রাস্তার দিকে তাকাল অবিনাশ। সাইকেলের পাশে সাত বছরের ছেলে মধুকে দেখা যাচ্ছে। মাথায় একটা পোঁটলা। অবিনাশের রাগ যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেল। ছেলে কাছে আসতেই, “আয় শালার! আইজ তরে জমিতে পুঁইত্যা পোঁচামু।”
মধু বাবার মুখ দেখে ভয়ে কোনও সাড়া দিল না। মাথা থেকে গামছা জড়ানো ভাতের গামলা নামিয়ে রাখল। তাড়াতাড়ি জমিতে নেমে জমির মাঝে কেটে রাখা ধানের গোছা আনতে লাগল।
“তর মা কোথায়? এখনও তার আসার সময় হইল না? রাগে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল অবিনাশ।
“মা’য় কেলাবে গেছে।”
“এখন কেলাবে ক্যান? ধানে কয় পোঁচ দিলেও আরও তাড়াতাড়ি হইত না?”
“চাইল দিচ্ছে কেলাবে। সবার লাইন দিয়া আনতে হবে।”
অবিনাশের রাগ কিছুটা কমেছে। ত্রাণে চালের সঙ্গে ডাল নুন আলুও দেয়। সামনে ভোট আছে। এই জন্য কম্পিটিশন একটু বেশি। নাকমুখ দিয়ে বিড়ির ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে অবিনাশ ভাবল ভোটটা তো প্রতি বছরই হতে পারে।
আগের বার ভোটের সময় এই দলের দাদারা একবার ডাকে, ওই দলের দাদারা একবার ডাকে। বাড়ি থেকে মোটর সাইকেলে করে মিছিলে নিয়ে গেছে। একবেলা করে মাংস-ভাত দিয়েছে। বড় দাদাদের কী ভাল ব্যবহার!
বিড়ির মাথাটা মাটিতে চেপে আগুন নেভাল অবিনাশ। মধুর দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাতের গামলাডা খুল তো।”
মধু তাড়াতাড়ি এসে গামলার গামছা খুলে সামনে রাখল। “এখন পান্তা ভাত! ছুইড়া ফ্যালামু।” অবিনাশের চোখ দিয়ে যেন আগুন ছুটছে।
“মা’য় কইছে জ্বালানি নাই। বাড়ির কাঠপাতা সব ভিজা। বিকালে রান্না বসাবে।” কাঁপা গলায় উত্তর দিল মধু।
“সরকার থেকে যেই গ্যাসটা পাইছি ওইডা দিয়া রানতে পারে নাই?”
“ওই গ্যাসটা শ্যাষ হইয়া গ্যাছে অনেক দিন।”
অবিনাশ চোখ নামিয়ে গামলার দিকে রাখল। ভাত নুন আর দুটো লঙ্কাপোড়া একসাথে জড়িয়ে আছে।
‘‘বাবা তোমার হাত কাইট্যা গ্যাছে? গামছাডা রক্তে লাল হইয়া রইছে।” আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল মধু।
“চাষ করতি গেলে রক্ত লাগে। রক্ত ছাড়া কি ফসল হয় রে ব্যাডা!”
কাঁটাছেঁড়ায় অবিনাশ বিচলিত হয় না। এই তো গত বছরই ডাঙাপাড়ায় মুনিষ দিতে গিয়েছিল। কোদাল কোপানোর সময় ডান পায়ের আঙুলের মাথা কেটে গেছে। একমাস খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটেছে। আলুর সিজনে লরিতে আলু লোড করছিল। লরির পেছনের পাটাতন খুলতে গিয়ে বাঁ হাতের কেনে আঙুল কেটেছে।
মধু আর কিছু বলে না। মাঠের মাঝে রাখা কাটা ধান আলে তুলতে শুরু করে। পাঁজা করে যতটা বেশি ধান নেওয়া সম্ভব ততটা ধান নিয়ে তুলে রাখছে।
খাওয়ার পর আলে বসে আরেকটা বিড়ি ধরাল অবিনাশ। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে মধুর দিকে তাকাল। ছেলেটার মুখে কেমন একটা মায়া।
“মধু ইস্কুল খুলব কবে।”
“ইস্কুল তো খুলা”
“তই যাওনাই ক্যান?”
“মা কইছে এখন কিছু দিন বাড়িতে থাকতে। ধান নেওয়া হইলে যাব।”
অবিনাশ আবার বিড়ির ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে মাঠের দিকে তাকাল। এখনও সিকিভাগ ধান কাটতে পারেনি।
বিড়িটা ফেলে উঠে পড়ে অবিনাশ, “মধু, মাইকে কি কয় শুনছিস?”
“হ বাবা। কেলাবেও শুনছি। চাষিগোরে ক্ষতিপূরণ দেবে।”
একগোছা ধানগাছ দিয়ে কয়েক তারি ভেজা ধান বেঁধেছে অবিনাশ। আলে বসে মধুকে বোঝাটার একদিকে ধরে মাথায় তুলে দিতে বলে।
রাস্তায় উঠতেই বদনের সঙ্গে দেখা, “কই গেছিলা বদন ভাই।”
“কেলাবের দিকে। ক্ষতিপূরণ নিতে গেলে কী কী কাগজ লাগবে জানতে গেছিলাম। পার্টির লোকেরা সব আইছে ওইখানে।”
“কী কী কাগজ লাগবে?”
জমির পর্চার জেরক্স আর একটা ফরম ফিলাপ করলেই হবে।”
বাড়ি ফিরে ধানের শিষগুলো কেটে নিল। খড় জলে ধুয়ে কেটে রাখল গোরুর সামনে। গোরুটা ক’দিনে খুব কাবু হয়ে গেছে। অবিনাশের মায়া হল। পিঠে হাত বুলাল, “এগুলা খাও এখন।” খড়গুলো শুঁকে মুখ ফিরিয়ে নিল গোরুটা।
“শালার খাইবা না। লাটসাহেব আইছ জানি।” গোরুটাকে কয়েক চড় দিয়ে গজগজ করতে করতে ক্লাবে চলে গেল সে।
সূর্যটা পশ্চিম আকাশে ঝুলছে। কোনও তেজ নেই এখন যেন ভীষণ দুর্বল। কিন্তু ক্লাব মাঠের লম্বা লাইনটা এখনও কমেনি। গ্রামের সবাই ভিড় করেছে। ক্লাব মাঠে দুটো ম্যাটাডর দাঁড়িয়ে। ক্লাবের মাঠটা বেশ বড়। মাঠের দু’দিকে দিকে দুটো পার্টি ত্রাণ দিচ্ছে। দু’দলকে ঘিরে গ্রামবাসীরা ভিড় করেছে। একটু এগোতেই অবিনাশ দেখতে পেল এক পার্টির দাদাদের সঙ্গে রঞ্জিত মণ্ডল দাঁড়িয়ে।
“দাদা জমির পর্চাডা যদি দেন। ভাল হয় তাইলে। ধান সব নষ্ট হইছে।” ফাঁকে ডেকে রঞ্জিত মণ্ডলকে বলল অবিনাশ। “দেখো ভাই। তুমি লিজে নিছিলা চাষ করতে। এইবার লাভ ক্ষতি সব চাষেই বুইঝা লও। ক্ষতিপূরণের টাকা আমি তোমারে দিতে পারব না।”
কাঁদো কাঁদো গলায় অবিনাশ বলল, “দাদা, ক্ষতি তো আমার হইছে। তাইলে ক্ষতিপূরণ আমার পাওনা।”
“কিন্তু জমি তো আমার। পর্চাও আমার নামে।” মুচকি হেসে বলল রঞ্জিত।
অবিনাশ গিয়ে একদলের পার্টির দাদাদের জানায় বিষয়টা। তারা জানিয়ে দেয় এ বিষয়ে কিছুই করতে পারবে না। অন্য দলের দাদাদেরও বিষয়টা জানায়। তারাও জানিয়ে দেয় কিছু করতে পারবে না। দলের নেতা গোছের একজন বলল, “অত ভাববেন না দাদা। যা ত্রাণ পেলেন একসপ্তাহ শুয়ে শুয়ে খেতে পারবেন।”
অবিনাশের স্ত্রী কমলা একটা ব্যাগ হাতে ভিড় থেকে বেরিয়ে এল। হাসিমুখে দাঁড়ালো অবিনাশের সামনে, “ধরো তো ব্যাগটা। কী ভারী! চাইল, ডাইল ,আলু, সোয়াবিন সব দেছে।”
“সব দেছে…!” চিৎকার করে ব্যাগটা তুলে আছাড় মারল অবিনাশ। দু’কেজি চালের প্যাকেট, দু’শো গ্রাম লাল মুসুর ডালের প্যাকেট, একশো গ্রাম নুনের প্যাকেট, ক’টা আলু ব্যাগ থেকে বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে মাঠে।
পাশে কয়েকটা বাঁশের লাঠি পড়ে ছিল। অবিনাশ ছোঁ মেরে একটা লাঠি তুলে নিল। মুহূর্তের মধ্যে উঠে পড়ল ম্যাটাডরে। সাদা প্লাস্টিকের বস্তায় চাল, ডাল, আলু রাখা আছে। অবিনাশ সমস্ত শক্তি দিয়ে বাঁশের লাঠি চালাতে শুরু করল সেই বস্তাগুলোর ওপর। কয়েকটা বস্তা ফেটে গেছে সঙ্গে সঙ্গেই। হাঁপাতে হাঁপাতে চিৎকার করতে লাগল অবিনাশ, “এইখানে সব আছে! সব! এইখানে মানুষরে এক বেলা খাবার দিয়া, দু’বেলা মারার ফাঁদ আছে। যেন অবিনাশের ওপর কোনও অশুভ শক্তি ভর করেছে।
লাইন থেকে কয়েক জন ছোঁ মেরে উঠে গেল ম্যাটাডরে। চ্যাংদোলা করে নামিয়ে আনল অবিনাশকে। ম্যাটাডরের পেছনের চাকার পাশে মুখ থুবড়ে পড়ল অবিনাশ। ছেঁড়া বস্তা থেকে কিছু চাল গড়িয়ে পড়ল অবিনাশের গায়ে। ক্লাব মাঠের প্রায় সকলেই অবাক হয়ে দেখছিল এতক্ষণ। হঠাৎ কয়েক জন “পাগল পাগল” চেঁচিয়ে ছুটে আসতে লাগল অবিনাশের দিকে।
চিত্রণ: বাপ্পাদিত্য জানা







