ও বন্ধু, ও আমার ভালবাসা
টেবিলের একপাশে নামিয়ে রাখা মোবাইল ফোনের রিংটোন বেজে উঠল— ‘ও বন্ধু, ও আমার ভালবাসা’। ফোনটা রিসিভ করল অনিকেত। রিসিভ করার আগেই অবশ্য স্কিনে ভেসে উঠেছে শতরূপার নামটা।
—হ্যাঁ বলো?
—তুমি কাল একবার আসতে পারবে?
—কোথায়?
—কেন, যেখানে আমরা মাঝে মাঝে আড্ডা দিই, সেই শালী নদীর পাড়ে।
—ঠিক আছে।
শতরূপার চেনা কণ্ঠস্বর আজ কেমন যেন অচেনা লাগল অনিকেতের। ওর গলাটা কেমন যেন ভারী ভারী লাগল। শুধু আজ নয়, বেশ কয়েক দিন ধরেই সে লক্ষ্য করছে শতরূপার চোখেমুখে কেমন যেন একটা বিষন্নতার ছাপ দিনের পর দিন স্পষ্ট আকার নিচ্ছে। অন্যমনস্ক হয়ে থাকে সব সময়। কিন্তু ও তো এমন থাকার মেয়ে নয়, সব সময় নিজে যেমন হাসিখুশি থাকতে ভালবাসে তেমনই অপরকেই হাসিখুশি রাখতে চায়। অনিকেত আর ভাবতে পারে না, সব কিছু কেমন যেন গুলিয়ে যায়।
শতরূপার এই অবস্থা দেখে অনিকেতের মনে একটা ভয় ধরে গেছে, তা হলে কি চিঠির ব্যাপারটা ও ধরে ফেলেছে? না হলে হঠাৎ করে দেখা করতে বলল কেন? সায়ক কি শতরূপাকে কিছু বলেছে? নাকি ওদের ব্রেকআপ হয়ে গেছে! সায়ক সেই কথা অনিকেতকে একবারও জানাবে না, এমনটা হতেই পারে না। সায়ক আর শতরূপাকে নিয়ে একরাশ ভাবনা সাগরের ঢেউয়ের মতো ধাক্কা মারছে অনিকেতের মাথার মধ্যে, আর তারই মাঝে নিজের অজান্তেই সে নিজেকে ডুবিয়ে ফেলছে সেই ঢেউয়ে।
বিকালবেলায় খেলার মাঠে এক চক্কর দিয়ে সন্ধে নামতেই বাড়ি ফিরে এসে মোবাইলটা নিয়ে সায়ককে কল করল অনিকেত। বার কয়েক চেষ্টা করেও সায়ককে ফোনে না পেয়ে হালকা মাথাটা ভারী হয়ে গেল তার। পড়াতেও মন বসাতে পারে না কিছুতেই। আরও একবার ট্রাই করল, না কিছুতেই ওকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। না থাক আর বৃথা চেষ্টা করে লাভ নেই, মোবাইল অন করলেই মিসকলের অ্যালার্ট মেসেজ দেখে নিশ্চয় ও ফোন করবে— এমনটা ভেবে পড়ার টেবিলের একপাশে মোবাইল ফোনটা নামিয়ে রাখে অনিকেত।
পড়ার টেবিলে চিন্তায় চিন্তায় কখন না জানি ঘুম এসে গিয়েছিল তার দুচোখ জুড়ে। মোবাইল ফোনের চেনা রিংটোন বেজে উঠতেই তন্দ্রা ছুটল তার। সায়কের ফোন! রিসিভ করার সাথে সাথে বলে উঠল সে— শতরূপা ফোন করেছিল?
—হ্যাঁ।
—কী বলছিল!
—কী আর বলবে, ও যা করে সেই ন্যাকামিপনা।
—এরকম করে বলছিস কেন?
—তা কেমন করে বলব বল, সব সময় ফোন করে কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করলে ভাল লাগে!
—এ আবার কেমন কথা, শতরূপা তোকে ভালবাসে, তাই তো ফোন করে।
—আর তোর ভালবাসার কপাল, শোন, স্কুল লাইফে ওরকম দু-একটা ভালবাসা হয়েই থাকে। ক’দিন মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা, দেখা করা, চিঠি দেওয়া-নেওয়া। তা বলে—
—তা বলে কী?
—আর কী, ফোন করলেই শতরূপা সিরিয়াস হয়ে যায়। বিয়ের কথা পর্যন্ত বলে। তুই বল, এখন কি বিয়ে করার বয়স?
—সে না হয় ঠিক আছে, কিন্তু—
—আর কোনও কিন্তু নয়, ওসব ছাড়। মন দিয়ে পড়া চালিয়ে যা। নিজের পায়ে আগে দাঁড়াতে হবে।
—কাল শতরুপা দেখা করতে বলেছে, তোর ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞাসা করলে কী বলব?
—তোকে কিছু বলতে হবে না, ওকে যা বলার বলে দিয়েছি।
সায়কের সাথে কথা শেষ হতে ঘড়ির কাঁটায় দশটা। খাওয়াদাওয়া সেরে বিছানায় শীতের কাঁথা মুড়ে শুয়ে পড়ে অনিকেত। উত্তরের জানালা খোলা থাকায় একটা শীতল বাতাস হু হু করে ঢুকছে ঘরে, জানালাটা বন্ধ করতে গিয়ে তার চোখ যায় জানালার বাইরে। চাঁদের আলোয় সবকিছু দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। আকাশপানে চেয়ে চাঁদটাকে দেখে মনে হয় শতরূপা যেন তার চাঁদমুখে, ঠোঁঠের কোণে একটা লাজুক হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ধড়াস করে জানালার পাল্লা লাগিয়ে কাঁথার মধ্যে মুখ লুকিয়ে নেয় অনিকেত। নিজের মনেই বলে ওঠে— ভাই-সমান বন্ধুর প্রেমিকাকে নিয়ে সে এ কী ভাবছে! না না এ ঠিক না। নিজেকে নিজের কাছে ভীষণ ছোট মনে হয় তার।
অনিকেতেরই বা কী দোষ, জীবনে প্রথম ভালবাসার মানুষটার যে ছবি বুকের মধ্যে গেঁথে গেছে, তাকে ভুলব বললেই কি সহজে ভোলা যায়। গলায় মাছের কাঁটা লাগার মতো খচখচ করে, মাঝে মাঝে ভীষণ অস্বস্তি হয়, আবার কখনও ভীষণ কষ্ট লাগে।
।। দুই।।
শীতের দুপুরের সোনালি রোদ গায়ে মেখে সাইকেল নিয়ে ধীর গতিতে শালী নদীর অভিমুখে এগিয়ে যায় অনিকেত। তার বাড়ি থেকে শালী নদীর দূরত্ব প্রায় চার-পাঁচ কিলোমিটার হবে। পথে যেতে যেতে রাস্তার দুপাশের সবুজ সরিষা খেত,আলুর খেত। দিগন্তবিস্তৃত মাঠের পর মাঠ সবুজ হয়ে আছে। যা দেখে মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়। মনে হয় নীল আকাশের নীচে কেউ সবুজ চাদর মিলে দিয়েছে।
এ রাস্তা অনিকেতের ভীষণ চেনা। এ রাস্তায় তার অনেক দিনের আনাগোনা। কখনও বর্ষায় শালী নদীর রাক্ষসী রূপ দেখতে, আবার কখনও শরতে নদীর ধারের কাশফুলের টানে কিংবা ফাগুনের শুকিয়ে যাওয়া মরা শালীর বুকে বালির ওপর দিয়ে হাঁটার টানে বারে বারে ছুটে এসেছে সে।
একদিন এক ঝড়বৃষ্টির বিকালে বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পেতে সে আশ্রয় নিয়েছিল শালী নদীর পাড়ে আমগাছটার নীচে। বৃষ্টির জলে ভিজে তার ওপর ঝোড়ো হাওয়ায় শরীরে একটা কাঁপুনি সবে শুরু হয়েছে, ঠিক এমন সময় সমবয়সী একটি মেয়ে ভিজতে ভিজতে এসে দাঁড়াল সেই আমগাছেরই নীচে। মেয়েটির অপরূপ সৌন্দর্য দেখে মোহিত হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে দেখছিল সে। হঠাৎ মেয়েটির কণ্ঠস্বরে সম্বিত ফিরে এল তার।
—আরে আমাদের ক্লাসের অনিকেত না, তুমি এখানে?
মেয়েটির মুখে নিজের নাম শুনে বেশ অবাক হয়ে গেল অনিকেত। এমনিতেই মেয়েদের বিষয়ে অনিকেত ভীষণ ভিতু টাইপের। মেয়েদের সাথে কথা বলতে গেলে লজ্জায় তার মুখ লাল হয়ে ওঠে। তারপর এমন বৃষ্টিস্নাত অবস্থায় একটা গাছের তলে— মনের মধ্যে তার ধুকপুকুনি বাড়ছিল। তবু আমতা আমতা করে সে বলল— তুমি— মানে আমাকে—।
—একই ক্লাসে পড়ি, অথচ তোমাকে চিনব না। তোমার আর সায়কের ফার্স্ট-সেকেন্ড হওয়ার লড়াই সবার মুখে মুখে। আর তাছাড়া স্কুলের ম্যাগাজিনে তোমার লেখা কবিতার সবাই নাম করে। স্কুলের সরস্বতী পুজোয় স্বরচিত কবিতা পাঠ করে প্রথম হলে। তবে তোমার মতো ব্রিলিয়ান্ট ছেলেদের কি আর আমার মতো পিছনের বেঞ্চে বসা মেয়েদের মনে থাকে!
মেয়েটা একটানা কথাগুলো বলে ফেলল। অনিকেত হাঁ হয়ে শুনে গেল। আর মনে করতে চাইল ক্লাসের কথা— না, কই মেয়েটাকে তো সেভাবে মনে পড়ছে না। আসলে, স্কুলে গিয়ে মেয়েদের দিকে তাকাবে বা মেয়েদের সাথে আলাপ করে বন্ধু পাতাবে, এমন বুকের পাটা তার কোনও কালেই ছিল না। ইতিমধ্যে বৃষ্টি পড়া বন্ধ হয়েছে। চোখের সামনে থেকে মেয়েটা একটু একটু করে দূরে চলে যাচ্ছে, অনিকেতের ভীষণ ইচ্ছে করছিল নামটা জানার, কিন্তু সাহসে কুলাল না। বুক ফাটলেও মুখ ফুটে সে মেয়েটাকে কিছু বলতে পারল না। বাড়ি ফিরে রাতে বিছানায় শুয়ে বার বার মনে পড়ছিল মেয়েটার মুখটা। আর আফসোস হচ্ছিল নামটা জানা হল না। পরের দিন স্কুলে যাওয়ার জন্য ছটফট করছিল অনিকেত।
পর পর আজ দুদিন হয়ে গেল মেয়েটাকে ক্লাসে তো দূরঅস্ত স্কুলেই দেখতে পায়নি অনিকেত। ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না সে। তিনদিনের মাথায় স্কুলে ক্লাস শুরুর আগে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আপন খেয়ালে ডুবেছিল। হঠাৎ একটা মেয়েলি কণ্ঠস্বরে তার সম্বিত ফিরল— কী ভাবছ একা একা এখানে দাঁড়িয়ে!
উত্তরে কী বলবে কিছু খুঁজে পাচ্ছিল না অনিকেত, চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। মেয়েটি হঠাৎ করে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল— আমি শতরূপা, আজ থেকে তোমার বন্ধু হলাম।
স্কুলে এলেই অনিকেতের চোখ যেন শতরূপাকে খোঁজে, বার বার আড়চোখে তাকিয়ে দেখে, ভীষণ ভাল লাগে শতরূপাকে। মনের মধ্যে অনেক কথা জমা হয়ে উপন্যাস হয়। অথচ শতরূপার কাছে এলে মুখ দিয়ে একটা বাক্য ফোটে না।
বন্ধু সায়ক বার বার জিজ্ঞাসা করে— কী হয়েছে বল তো তোর, সব সময় দেখি কেমন আনমনা হয়ে থাকিস।
—না,না তেমন কিছু নয়। এমনি—
—সত্যি বলছিস তো, আমি কিন্তু বিকালেই তোদের বাড়ি যাব, কাকিমার কাছে জেনে আসব।
—আমার কিছু হলে তোকে বলব না এমনটা কখনও হয়েছে?
—তা ঠিক, কিন্তু তোকে দেখে আমার কেমন একটা সন্দেহ হচ্ছে! দ্যাখ, আমার কাছে কিছু লুকাচ্ছিস না তো?
সায়কের একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে হাঁপিয়ে উঠে অনিকেত। সায়কটা এমনিই, একটু এদিক-ওদিক হয়েছে কী ও একেবারে অস্থির হয়ে ওঠে। সায়ক তো শুধু অনিকেতের বন্ধু নয়, যেন মায়ের পেটের ভাই।
এই প্রথম অনিকেত সায়কের কাছে কোনও কিছু গোপন করল। তবে সেটা ইচ্ছে করে নয়, ভয়ে। সায়ক যদি শতরূপার কথা জানতে পারে, তা হলে এক্ষুনি গিয়ে কী বলতে কী যে বলবে, তার কোনও ঠিকঠিকানা নেই। তার চেয়ে ভাল খবরটা গোপন করে একসময় সায়ককে সে চমকে দেবে। আর সেদিন সায়ক খুশিতে একেবারে লুটোপুটি খাবে।
দেখতে দেখতে স্কুলের সরস্বতী পুজো এসে গেল। পুজোর দুদিন আগে থাকতে সারা স্কুল চত্বর জুড়ে সাজো সাজো রব। এবছরই অনিকেত, সায়ক, শতরূপাদের স্কুলের গণ্ডি শেষ। তাই শেষ সরস্বতী পুজোটা জমিয়ে করতে আয়োজনের কোনও ত্রুটি রাখেনি। নাচ, গান, নাটক, কবিতা সবই হবে। পুজোর আগের দিনই ঠাকুরমহল থেকে বেশ বড় একখানা প্রতিমা এসে গেছে।
সকাল সকাল স্নান সেরে নতুন পাঞ্জাবি-পাজামা পরে স্কুলে হাজির সায়ক, অনিকেত। এক এক করে স্কুলের বাকি ছাত্রছাত্রীরাও আসতে শুরু করেছে। অনিকেতের চোখ ঘুরছে এদিক-সেদিক, আজ নিশ্চয় ও শাড়ি পরে আসবে। শাড়ি পরে নিশ্চয় আজ ওকে দারুণ লাগবে। চোখ বন্ধ করে সে কল্পনায় শতরূপার ছবি আঁকে। তার মনের ক্যানভাসে শতরূপাকে নিয়ে কবিতারা উঁকিঝুঁকি মারে।
অনিকেতের অপেক্ষা শেষ, শতরূপা এসে গেছে। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে মনের অলিন্দে শতরূপার যে ছবি এঁকেছিল, এ যেন তার চেয়ে হাজার গুণ সুন্দর। এক পা এক পা করে এগিয়ে আসছে শতরূপা, তার পায়ের নূপুরের শব্দ যেন কত কথা বলছে। আর ভাবতে পারে না অনিকেত। সে মনে মনে ঠিক করে নেয়, আজ যেমন করেই হোক শতরূপার সামনে সে তার প্রেম নিবেদন করবেই। সেইমতো বার কয়েক শতরূপার কাছাকাছি গিয়েও তার মুখ দিয়ে কোনও কথা ফুটল না।
পুজো শেষ, প্রসাদ বিতরণ চলছে, শতরূপাকে দেখতে না পেয়ে অনিকেতের যেন পাগলপারা অবস্থা। এক এক করে সব ক্লাসরুম দেখা হয়ে গেছে তার, কোথাও শতরূপার দেখা মেলেনি। ছাদে ওঠার সিঁড়িতে বসে পড়ে সে, মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। হঠাৎ এমন সময় ছাদ থেকে কার হাসির শব্দ কানে ভেসে আসে। এক পা এক পা করে সে ছাদের দিকে পা বাড়ায়। ছাদের দরজায় আস্তে করে ঠেলা দিতেই সে শতরূপাকে দেখতে পায়, মুহূর্তেই খুশির ঝলক ফুটে ওঠে তার চোখেমুখে। ছাদের দরজাটা পুরো খুলতেই সে অবাক হয়ে যায়, শতরূপার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সায়ক। এত বড় ছাদে আর কেউ নেই। মনের মধ্যে একরাশ প্রশ্ন ভিড় করে এলেও নিজেকে সামলে নিয়ে সে সায়কের উদ্দেশে বলে— তুই এখানে, আর আমি গোটা স্কুল জুড়ে তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। অনিকেতের প্রশ্নের উত্তরে সায়ক বলল— যাক বাবা, বড় বেঁচে গেছি, আমি ভাবলাম কে না কে? তুই এখানে এসে ভালই করেছিস, নইলে আমাদের দুজনকে একসাথে দেখলে কালই গোটা স্কুল জুড়ে একটা রব উঠে যেত।
—তা তো উঠতই। তা বন্ধু, আমি যা ভাবছি তা কি সত্যি?
—সেটা তুই যা খুশি ভাবতে পারিস!
অনিকেতের দিকে একবার ভাল করে তাকিয়ে মুখে কোনও কথা না বলে লাজুক হাসি নিয়ে ছাদ থেকে দৌড়ে নীচে নেমে গেল শতরূপা।
কয়েকটা দিন পেরিয়ে গেছে, অনিকেত ভাল নেই। মনে বড় আঘাত পেয়েছে। শতরূপাকে কিছুতেই ভুলতে পারে না সে। বন্ধু সায়কের কথা ভেবে শত কষ্ট বুকে চাপা দিয়ে মনকে মিছে সান্ত্বনায় ভোলানোর চেষ্টা করে।
একটা দিন ছিল দুই বন্ধু অপেক্ষায় থাকত বিকালের, বিকাল হলেই দুজনে হাত ধরাধরি করে বেরিয়ে পড়ত। কোনও দিন শালী নদীর পাড়ে কাশবনে, আবার কোনও দিন গভীর জঙ্গলে শালগাছের নীচে। বিকাল ফুরিয়ে যেত তবু ওদের কথা ফুরাত না। মাথার উপর দিয়ে পাখিদের দল কিচিরমিচির করতে করতে উড়ে যেত, পশ্চিম আকাশের কোণে সূর্যটা ক্রমশ ছোট হতে হতে কোথায় হারিয়ে যেত, বড় বড় শালগাছের মাথা বেয়ে নেমে আসত ঝুঁঝকি ঝুঁঝকি অন্ধকার, ঝোপে ঝোপে চিঁচিঁ পোকার ডাকের সাথে বনের যত শেয়াল ডেকে উঠত। পুব আকাশের চাঁদটা ওদের দেখে যেন মুচকি হেসে বলত— খোকারা এইবার বাড়ি যা।
সোনালি বিকেলের সেই স্বপ্নের দিন আজ যেন কঠিন বাস্তবের মাটিতে গড়াগড়ি খায়, বিকালে যতক্ষণ দুজনে আড্ডা দেয়, সায়ক শতরূপার কথায় বলে যায়। যা অনিকেতের কাছে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটের মতো এসে লাগে।
সবচেয়ে বড় আঘাতটা তখনও অনিকেতের পাওয়া বাকি ছিল। একদিন সন্ধ্যায় সায়ক এসে হাজির, অনিকেত পড়ার টেবিলে বসে। সায়ক এসে তার সামনে একটা চিঠি ফেলে দিয়ে বলল, এটা পড়ে দেখ। চিঠির ভাঁজ খুলতে খুলতে অনিকেত বলল, কী এটা?
—প্রেমপত্র।
—কার?
—শতরূপা দিয়েছে আমাকে।
—তোর প্রেমপত্র নিয়ে আমি কী করব!
—পড়ে দেখ!
—অসম্ভব।
—আরে পড়ে দেখ না। তারপর জম্পেস করে একটা চিঠি লিখে দে।
—তোর প্রেমপত্র আমি পড়ব, তার উত্তর আমি দেব! কী বলছিস তুই একবার ভেবে দেখেছিস?
ছাড়ার পাত্র নয় সায়ক। ওর জেদের কাছে হার মানল সে। বলল, ঠিক আছে রাত্রে লিখে রাখব।
—এই না হলে আমার বন্ধু। একগাল হাসি মুখে নিয়ে সায়ক বিদায় নিল।
রাত্রে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সায়ককে লেখা শতরূপার প্রেমপত্র অনিকেত পড়ে। পড়তে পড়তে সে যেন নিজেকে কোথায় হারিয়ে ফেলে। তার মনের কোণে লুকানো বাসনা আবার যেন জেগে উঠছে। সব কিছু ভুলে সে একটা সাদা কাগজ ও কলম নিয়ে চিঠির উত্তর লিখতে শুরু করে। লিখতে লিখতে বার বার শতরূপার মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একটানা সে চিঠি লেখা শেষ করে ফেলে। চিঠি তো নয়, যেন তার মনের কোণে জমানো ব্যথা-বেদনার জ্বলন্ত দলিল। জলের অভাবে আধমরা গাছ যেমন একটু জল পেয়ে আবার বেড়ে ওঠে, পাতা মেলে, কুঁড়ি ফোটায়, কুঁড়ি থেকে ফুল, ফুল থেকে ফল— তেমনি করে তার মনে নতুন করে ভালবাসা প্রস্ফুটিত হচ্ছে। চিঠি লেখা শেষ, চারিদিকে রাত্রির নিস্তব্ধতা। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে আকাশে একফালি চাঁদ যেন ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে, মুখে বিদ্রুপের হাসি নিয়ে।
একসময় চিঠিটা বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে অনিকেত, মুখটা বালিশে গুঁজে বোবা কান্নায় ভেঙে পড়ে, তার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। ভীষণ কষ্ট হয় তার।
সায়ককে লেখা শতরূপার একটার পর একটা চিঠি জমা হয় অনিকেতের কাছে। সে চিঠি পড়ে অনিকেত ফিরতি চিঠি লিখে দেয় সায়কের হাতে। অনিকেতের একদম ভাল লাগত না, কিন্তু সায়কের জোরাজুরির কাছে সে বড় অসহায়।
দু’মাস যেতে না যেতে সায়কের কথাবার্তা শুনে অনিকেতের মনে হল, সায়ক ও শতরূপার প্রেমটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হতে শুরু করেছে। গতকাল রাতে সায়কের কথা শুনে বেশ অবাক হয়েছিল অনিকেত। শতরূপার মতো মেয়ে অনেক ভাগ্যে জোটে, অথচ সায়ক ওদের সম্পর্কটা কত আলগাভাবে দেখে। আর অনিকেত শতরূপাকে সেই প্রথম দেখার পর থেকেই ওকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল, সারাটি সময় ধরে শতরূপার ভাবনায় ডুবে থাকত। স্কুলে গিয়ে শতরূপাকে একটিবার কাছ থেকে দেখবার জন্য মন ব্যাকুল হয়ে উঠত। ওর সঙ্গে দুটো কথা বলার জন্য ছটফট করত।
অনিকেত একবার ভেবেছিল বেশ করে ঝাড়বে সায়ককে। কিন্তু পারেনি, মনের মধ্যে একটা ভয় কাজ করছিল। পাছে সায়কের কাছে সে ধরা পড়ে যায়?
বেখেয়ালি ভাবনায় নিজের মনে গুনগুন করতে করতে একসময় শালী নদীর ধারে পৌঁছে যায় অনিকেত। সামনে তাকিয়ে দেখে মরা শালীকে। শীত পেরিয়ে গ্রীষ্ম আসতে ঢের দেরি, এরই মধ্যে নদীর বুক খালি। একফোঁটা জলও নেই। একেবারে শুকিয়ে গেছে। যে একফালি সরু দাঁড়ার মতো জল ঝিরঝির করে বইছিল, তাও কৃষকেরা উপর মানায় বাঁধ দিয়ে আটকে রেখেছে। নদীর পাড় ঘেঁষে ধূ ধূ বালির মাঝে একটা বিশাল পাথর, দূর থেকে তাকিয়ে দেখে অনিকেত, শতরূপা সেখানে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। সাইকেলটা একপাশে রেখে এক পা এক পা করে এগিয়ে যায় অনিকেত। তার মনের মধ্যে নানান ভাবনারা ভিড় করে আসে— শতরুপা বসে আছে তার পথ চেয়ে, সে পিছন দিকে গিয়ে হঠাৎ করে চমকে দেবে তাকে। শতরূপা মুখে লাজুক হাসি নিয়ে বলবে— অনিকেতদা, তুমি না। না না লাজুক হাসি না, শতরূপা অভিমান করে মুখ গোমড়া করে থাকবে, তার আসতে দেরি হয়েছে। তারপর শতরূপার সামনে সে কত কাকুতিমিনতি করে তার অভিমান ভাঙবে।
—ওখানে দাঁড়িয়ে আছ যে, এখানে এসো।
শতরূপার ডাকে সম্বিত ফিরে আসে অনিকেতের। সে ভীষণ লজ্জা পায়, নিজেকে বড় স্বার্থপর মনে হয় তার। যে স্বপ্ন সত্যি হবার নয়, সেই স্বপ্ন কেন যে বারবার ফিরে এসে ঘিরে ধরে, তার কোনও কারণ খুঁজে পায় না সে।
—কী অত ভাবছ বলো তো, বসো।
শতরূপার থেকে একটু তফাতে বসে অনিকেত বলে— তারপর কী ব্যাপার বলো তো। হঠাৎ ডেকে পাঠালে।
—বারে আমি ডাকলে আসতে নেই বুঝি!
—না, না তা কেন, এমনি বললাম।
—ও তাই।
—কিন্তু তোমার চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে, তুমি কিছু বলতেই আমাকে ডেকেছ। সায়কের সাথে কিছু হয়েছে তাই তো, ও নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। সায়ককে তো জানোই, পড়াশোনার বিষয়ে ও কত সিরিয়াস।
—না আসলে তা নয়!
—তা হলে কী!
—আসলে…
—আরে বাবা, বলবে তো কী?
—না, মানে বলছিলাম…
শতরূপার মুখের পুরো কথা শোনার আগেই অনিকেতের বুক ধুকপুক করতে থাকে। এবার শতরূপা নিশ্চয় চিঠির কথা বলবে! শতরূপা বলে— আসলে কি জানো তো অনিকেতদা, আমার বিয়ের জন্য বাবা-মা যেভাবে উঠেপড়ে লেগেছে, তাতে করে যেকোনও দিন বিয়ের ঠিক করে ফেলবে। আমি বাবা-মাকে কত করে বললাম যে, সেকেন্ড ইয়ার চলছে, অন্তত গ্র্যাজুয়েশনটা কমপ্লিট করি, কিন্তু বাবা-মা সে-কথা শুনলে তো।
শতরূপার মুখ থেকে বিয়ের কথা শুনে অনিকেতের মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে বলল— সায়ককে এ কথা বলেছ?
—না এখনও বলা হয়নি। আর বললেও এ ব্যাপারে সে মাথা গলাবে বলে তো আমার মনে হয় না। তুমি কিছু একটা করো, অনিকেতদা।
—আমি, মানে— কী যে করব মাথায় কিছু আসছে না।
—তা হলে কী হবে এখন?
কথায় কথায় বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধে হয়ে এল। একদল পাখি কিচিরমিচির করতে করতে ওদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল। নদীপাড়ের ছোট ছোট ঝোপ থেকে শিয়াল ডেকে উঠল। শতরূপা বিষণ্ণ মুখে অনিকেতকে অনেক বড় দায়িত্ব দিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল। অনিকেতও সাইকেল নিয়ে বাড়ির পথে। রাস্তায় যেতে যেতে নানা দুশ্চিন্তায় মাথা ভারী হয়ে গেছে তার। সায়কের প্রতি একটা রাগ জন্ম নেয় তার মনে।
।। তিন।।
এখন মধ্যরাত, আকাশে একটা গোটা রুটি চাঁদ জ্বলজ্বল করছে। বিছানায় শুয়ে থাকলেও কিছুতেই চোখের পাতা এক করতে পারে না অনিকেত। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে থাকে। এক সময় বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে সে। পশ্চিম দিকের জানালার পর্দা সরিয়ে জানালা খোলে, তাকিয়ে দেখে আকাশের দিকে। জোৎস্নালোকিত মধ্যরাত চারিদিক দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। কিন্তু সায়ক ও শতরূপার ব্যাপারটা কিছুতেই পরিষ্কার বুঝে উঠতে পারছে না সে। আজ তিনদিন হয়ে গেল সন্ধ্যা হলেই শতরূপার ফোন আসে, অনিকেতের কাছে, কাকুতিমিনতি করে বলে: —অনিকেতদা, কিছু একটা করো প্লিজ। আমি এখন বিয়ে করতে চাই না। অনিকেত সব বোঝে, আসলে শতরূপার বিয়ে করতে না চাওয়াটা একটা বাহানা। সে সায়ককে হৃদয় দিয়ে ভালবাসে। তাই সায়ককে ছাড়া অন্য কারও সাথে বিয়ের কথা ভাবতেই পারে না। সায়কের কাছ থেকে তেমন কোনও সদুত্তর না পেয়ে তার বন্ধুর কাছে কাকুতিমিনতি করছে, যাতে করে অনিকেত সায়ককে বুঝিয়েসুঝিয়ে কিছু একটা উপায় বের করে। কিন্তু সায়কের সাথে বার তিনেক কথা বলে সমস্যার সমাধান দূরঅস্ত, সমস্যা যেন আরও বেশি করে ঘোরতর জটিল হয়ে পড়েছে। সায়ক অনিকেতকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, এই মুহূর্তে তার কিছু করার নেই। এমনকি শতরূপাকেও জানিয়ে দিয়েছে— শতরূপা যেন তার পথ চেয়ে না থাকে।
রাত বাড়তে থাকে, কিছুতেই চোখের পাতা এক করতে পারে না অনিকেত। শতরূপার করুণ মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে বার বার। বুকের ভেতরটা কেমন যেন চিনচিন করে ওঠে। বিছানার বালিশে মুখ গুঁজে উপায় খুঁজতে থাকে। কিন্তু না কোনও উপায় সে খুঁজে বের করতে পারে না। সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে সায়কের ওপর। সায়কটা যে এমন স্বার্থপরের মতো ব্যবহার করবে তা কোনওদিন কল্পনাও করতে পারেনি। না না এভাবে চুপ করে অপেক্ষা করে কোনও লাভ হবে না, কিছু একটা করতেই হবে তাকে। যেমন করে হোক শতরূপার বিয়েটা আটকাতেই হবে। কিন্তু সেটা কীভাবে? ফোনটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে অনিকেত। সায়ককে কি ফোন করবে সে? হ্যাঁ। মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে ডায়াল করে। ফোনের ও প্রান্ত থেকে কথা ভেসে আসে— কী রে, ঘুম আসছে না নাকি!
—কী করে আসবে, তুই এমন একটা কাণ্ড করিস না।
—আমি আবার কী করলাম।
—বাঃ, এমন ভাব করছিস যেন কিচ্ছুটি জানিস না।
—কী উল্টোপাল্টা বলছিস!
—আমি উল্টোপাল্টা বলছি, শতরূপাকে তুই কী বলেছিস?
—ওকে যা বলার সব বলে দিয়েছি, ওসব নিয়ে তোকে আর ভাবতে হবে না।
—সত্যি তুই আজ বড় স্বার্থপর হয়ে গেছিস।
—আমি স্বার্থপর, নাকি তুই!
—আমি! কী বলছিস তুই…
—তুই কি ভেবেছিস, আমি কিছু বুঝি না, ঘাসে মুখ দিয়ে চলি? শোন অনি, তোর সব চালাকি আজ আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে।
—কী বলছিস তুই, আমি তোর সাথে চালাকি করেছি!
—হ্যাঁ করেছিস। সেদিন না বুঝলেও আজ আমি পরিষ্কার বুঝতে পেরেছি। ক্লাসে তুই ফার্স্ট হলে, আমি মনখারাপ করতাম। আর তুই সেটা বুঝতে পেরে পরের বছর আমাকে ফার্স্ট করার জন্য ইচ্ছে করে পরীক্ষার খাতায় ভুল করতিস। তুই কি ভেবেছিলি, আমি কোনও দিন বুঝতে পারব না?
—কী ভুলভাল বলছিস, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
—আমার মাথার দিব্যি, বুকে হাত রেখে বল তো, শতরূপাকে তুই ভালবাসিস না! কোনওদিন তো আমাকে কিছু লুকাসনি, তা হলে এতবড় সত্যিটা কেন গোপন করলি?
—কী পাগলের মতো বলছিস তুই!
—এখনও! এখনও সত্যিটা লুকাবি? ঠিক আছে, তবে শোন, যেদিন তুই আমাকে দেওয়া শতরূপার প্রথম প্রেমপত্রের উত্তর লিখে দিয়েছিলি, সেই চিঠি পড়েই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, শতরূপাকে তুই কতখানি ভালবাসিস। ওরে, হৃদয় থেকে না ভালবাসলে যে ওরকম চিঠি লেখা যায় না। আর তাই সেদিনই আমি শতরূপাকে চিঠিটা দিয়ে সব কথা বলেছিলাম। তোর মুখ দিয়ে মনের কথাটা বের করব বলেই শতরূপা আর আমি তোর সামনে এই ছোট নাটকটা করলাম। আমার চেয়ে তোকে কে আর ভাল চেনে বল?
সায়কের কথার কী উত্তর দেবে খুঁজে পায় না অনিকেত, আমতা আমতা করে বলে— আর শতরূপার বিয়ের কথাটা।
ফোনের ও প্রান্ত থেকে সায়ক বলে— ওটা ওই নাটকেরই একটা পাঠ। তোর মুখ থেকে সত্যিটা শুনব বলে।
—বাহ বন্ধু বাহ, নাটক, অভিনয়, দারুণ বলেছিস। কিন্তু এটা যে নাটকের মঞ্চ নয়, কঠিন বাস্তব। শতরূপাকে আমি ভালবাসি, হ্যাঁ, কথাটা একেবারে সত্যি। প্রথম যেদিন ওকে দেখেছিলাম ভালবেসে ফেলেছিলাম। অনেক বার ভেবেছি, কথাটা শতরূপাকে জানাব। কিন্তু পারিনি রে।
—সে তো আমি জানি, বুক ফাটবে তোর তবু মুখ ফুটে তুই কিছু বলতে পারবি না। মনের কষ্টটা মনেই চেপে রেখে কষ্ট পাবি, তাই তোর মুখ দিয়ে ভালবাসার কথাটা বলাব বলেই এই ছোট নাটকটা তোর সঙ্গে করতে হল। বন্ধুর জন্য নিজের ভালবাসার বলি দিতে চাস?
—কী করে যে তোকে বোঝাই, বুঝে উঠতে পারছি না।
—পারবি না। আর তোকে পারতেও হবে না।
—তুই বিশ্বাস কর, শতরূপা তোকেই ভালবাসে…
—সত্যিটা লুকাতে আর কত নাটক করবি! তুই হয়তো ভুলে গেছিস স্কুলের সরস্বতী পুজের দিন ছাদের ঘটনাটা।
—সেদিন শতরূপাই আমাকে টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিল ছাদে। বলেছিল, ও তোকে মনেপ্রাণে ভালবাসে এবং ও সেই কথা তোর মুখ থেকেই শুনতে চায়।
—সত্যি বলছিস তুই!
—হ্যাঁ রে। আমি না তোর বন্ধু, সেই ছোট্টবেলার বন্ধু।
দুই বন্ধুর কথোপকথনের মাঝেই সময় গড়িয়ে গেছে অনেকটা। রাত শেষ হয়ে কখন যে ভোর হয়ে গেছে, তা বুঝতেই পারেনি অনিকেত। বাইরে ভোরের পাখির মিষ্টিমধুর ডাক শোনা যায়। একপাশে মোবাইল ফোন নামিয়ে রেখে বালিশে মুখ গুঁজে চোখ বন্ধ করে অনিকেত। শতরূপাকে নিয়ে এতদিন ধরে যে স্বপ্নগুলো অনিকেতের স্মৃতির মণিকোঠায় জমেছিল, তারা সবাই একসাথে ভিড় করে এসে জমাট বাঁধে মনের আকাশে।
সবে অনিকেতের চোখে ঘুম নেমেছে, হঠাৎ করে মোবাইল ফোনটা চেনা স্বরে বেজে উঠল— ও বন্ধু ও আমার ভালবাসা।
অনিকেত ঘুম ঘুম চোখে মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে তাকিয়ে দেখল, স্ক্রিনে ভাসছে শতরূপার নামটা।
চিত্রণ: ধৃতিসুন্দর মণ্ডল






