Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

জামাইষষ্ঠী: শাস্ত্রে, পুরাণে, জীবনে

কয়েক দশক আগেও যে কোন বাঙালি বিয়েতে উপহারের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল শংকর-এর ‘সোনার সংসার’ উপন্যাস। যে উপন্যাসের শুরুতেই ভাগ্যবান শ্বশুরমশাই শ‍্যামসুন্দরের ঘরে ষষ্ঠীর দিনে চার-চারজন জামাই আসার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে। অত্যন্ত জনপ্রিয় এই উপন্যাস পরবর্তীতে টেলিভিশনের সিরিয়াল-রূপেও জয় করেছিল দর্শক-শ্রোতার মন। তার মূল কারণ উপন্যাসটি বাঙালির পারিবারিক সম্পর্কের ঠাস বুনোটের একটি সুন্দর কাহিনি।

চার জামাই-এর শাশুড়ি সুহাসিনী যখন তার বিদেশে থাকা বড় ছেলে অমলেন্দুর কথা ভেবে ষষ্ঠীর দিনে তার ছবিতেই ফোঁটা দেন, তখন কোথাও যেন তার নিজের সন্তান আর বিবাহসূত্রে সন্তান জামাইদের মধ্যে যোগসূত্র রচিত হয়।

বাঙালির আবহমান সংসার ও সন্তানের মঙ্গলকামনার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে ষষ্ঠী ব্রতের মাহাত্ম্য।

ব্রতকথায় জামাইষষ্ঠী

লোকপুরাণ মতে বা ষষ্ঠীর ব্রতকথায় নীল ষষ্ঠী বা অরণ্য ষষ্ঠীর ব্রতকথার একদম শেষ অংশে জামাইষষ্ঠীর উল্লেখ আছে। গল্পটা মোটের উপর এই রকম— নানা বিপর্যয় পেরিয়ে দেবী ষষ্ঠী এক বউকে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ষষ্ঠীতে অরণ্য ষষ্ঠী ব্রত এবং তার যথাবিহিত নিয়মকানুন শিখিয়ে দিলেন। সেই ব্রত পালনের পর সে মেয়ে-জামাইকে নেমন্তন্ন করল। জামাইয়ের কপালে দইয়ের ফোঁটা দিয়ে হাতে তুলে দেওয়া হল আম-কাঁঠালের বাটা। সেই থেকেই ওই দিনটি জামাইষষ্ঠী হিসেবেও পালিত হয়।

ষষ্ঠীদেবীর পৌরাণিক উৎস

পাঁচালি এবং পুরাণে ষষ্ঠীকে লৌকিক দেবী হিসাবে উপস্থাপিত করা হলেও তিনি তা নন। তাঁর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে। সেখানে তিনি দেবসেনা অর্থাৎ দেবসেনাপতি কার্তিক-এর ভার্যা। মহাভারতের বনপর্বে আছে, দ্রৌপদী বলছেন— গৃহে তাঁর মূর্তি রেখে যথাবিহিত পূজা করলে সংসার সুখের হয়, সন্তানে পরিপূর্ণ থাকে। খিল হরিবংশ মতে, কৃত্তিকা সহ যে ছয়জন মাতৃকা কার্তিকেয়কে স্তন্যপান করিয়েছিলেন, দেবী ষষ্ঠী তাদের সম্মিলিত মূর্তি। কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ সংকলিত বৃহৎ তন্ত্রসারে তিনি প্রসূতি ও শিশুদের রক্ষাকর্ত্রী। প্রয়োজনে সন্তানরক্ষার্থে নিষ্ঠুরা।

‘বাংলার ব্রত’-য় ষষ্ঠী

কালীঘাট পটে অরণ্যষষ্ঠী।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিখ্যাত বই ‘বাংলার ব্রত’-য় লিখেছেন— বাংলায় গ্রাম্য দেবতার পাশাপাশি শাস্ত্রীয় পৌরাণিক দেবদেবীকে লোকদেবতা হিসাবে পূজা করার প্রচলন আছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলছেন, লোকবিশ্বাস মতে ষষ্ঠী দেবী পুত্র দান করেন। শিশুর জন্মের পর বছরে বারোটি ষষ্ঠী পালনের রেওয়াজ যেমন— জ্যৈষ্ঠ মাসে অরণ্য ষষ্ঠী, শ্রাবণ মাসের লোটন ষষ্ঠী, ভাদ্র মাসে মন্থন ষষ্ঠী, আশ্বিন মাসের দুর্গা ষষ্ঠী, অঘ্রাণ মাসে মুলো ষষ্ঠী, পৌষ মাসে পাটাই ষষ্ঠী, মাঘ মাসে শীতল ষষ্ঠী, চৈত্র মাসে অশোক ষষ্ঠী প্রভৃতি। জ্যৈষ্ঠ মাসে অরণ্য ষষ্ঠীর সঙ্গে প্রকৃতি আরাধনার এক বিশেষ সাযুজ্য আছে। বেঙ্গল স্কুল অফ আর্টের ক্যাটালগে রক্ষিত অবনীন্দ্রনাথ বা মতান্তরে গগনেন্দ্রনাথের আঁকা একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বাড়ির দালানে অরণ্যের ছোট প্রতিরূপ তৈরি করে সেখানে ব্রত পালন করা হচ্ছে।

উনিশ শতকের জামাইষষ্ঠী

বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য ছাড়াও জামাইষষ্ঠী পালনের স্বরবর্ণ আছে কালীপ্রসন্ন সিংহ লিখিত ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’-য়। সেখানে বলা হচ্ছে, কলকাতার শোভাবাজারের মল্লিকদের বাড়িতে জামাইষষ্ঠী পালনের ঘটার কথা। ইটালিয়ান মার্বেলের বাসনে খাওয়ার পর পিতলের গামলায় মুখ ধুয়ে রূপোর বাটা থেকে লবঙ্গপান মুখে দিয়ে তবেই সামান্য সময়ের জন্য বিশ্রাম। তারপর পরবর্তী খাওয়ার প্রস্তুতি।

নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পরিবারের কর্তা ক্ষিতীশচন্দ্রের মেয়ে অন্নপূর্ণার স্বামী হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায় ছিলেন বৈঁচির রাজা। জামাইষষ্ঠী উপলক্ষে তার জন্য সাজা পানের খিলি রাখা থাকত সোনার লবঙ্গ দিয়ে। প্রত্যেকবার খাওয়ার আগে সে সোনার লবঙ্গ তিনি ছুড়ে ফেলে দিতেন। এদিক-ওদিক পড়ে থাকা সেই সোনার লবঙ্গ কুড়িয়ে নিতে দৌড়াদৌড়ি করত রাজবাড়ির দাস-দাসীরা। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়ির জামাইষষ্ঠীর বৈভবের এমনই নানা বিবরণ ছড়িয়েছে নানা জায়গায়।

জামাইরূপে চৈতন্যদেব

জামাইরূপী চৈতন্যদেব।

জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষে নবদ্বীপের মহাপ্রভু মন্দিরে পালিত হয় জামাইষষ্ঠী। সেদিন চৈতন্যদেব আর শ্রীকৃষ্ণের অবতার নন, বরং জামাই। কেননা এই মন্দিরের সেবায়েতরা বংশপরম্পরায় বিষ্ণুপ্রিয়ার ভাইদের উত্তরপুরুষ। প্রায় পাঁচশো বছর ধরে চৈতন্যদেবের বিগ্রহকে সেখানে ধুতি-পাঞ্জাবি পরিয়ে যথাবিহিত নিয়ম মেনে জামাই হিসাবে রাজকীয় ভোগ দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। বিশিষ্ট সাংবাদিক সুধীরকুমার চক্রবর্তী লিখেছিলেন, মালদার রথবাড়ি গ্রাম সংলগ্ন জঙ্গলিটোলায় চৈতন্যদেব এই বিশেষরূপে পূজিত হতেন।

সিনেমায় জামাইষষ্ঠী

১৯৩১ সালের ১১ এপ্রিল কলকাতার ক্রাউন সিনেমা হলে পরিচালক অমর চৌধুরীর পরিচালনায় মুক্তিলাভ করে প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাই ষষ্ঠী’। চলচ্চিত্রের ইতিহাস বলে— এই সিনেমার হাত ধরেই বাংলা কমেডি সিনেমার পথচলা শুরু। সিনেমায় জামাইষষ্ঠী একটি মজার উপলক্ষ হয়ে ওঠার দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে নানা জায়গায়।

শুধু বাংলা সিনেমায় নয়, জামাইষষ্ঠীর অনুষঙ্গ ছড়িয়ে আছে ২০১৯-এ জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত মৈথিল চলচ্চিত্র ‘গামক ঘর’-এ। দুটি চরিত্র মৈথিলী আর বাঙালি ছট্টি বা ষষ্ঠীর মিল-অমিল নিয়ে তর্ক করে। তবে শিশুর জন্মের ছয় দিন বাদে উদযাপিত লোকাচারের সঙ্গে এই অরণ্য ষষ্ঠীর কোনও যোগাযোগ নেই— এমনই মত বিশেষজ্ঞদের।

চিত্র: লেখক কর্তৃক সংগৃহীত/ গুগল
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
স্বপ্না অধিকাবরী
স্বপ্না অধিকাবরী
2 years ago

গল্প টা বেশ উপভোগ করলাম

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

সনজীদা খাতুন: শ্রদ্ধাঞ্জলি

সাতচল্লিশ-পরবর্তী পূর্ববঙ্গে বেশ কিছু সাংস্কৃতিক সংস্থা গড়ে ওঠে, যাদের মধ‍্যে ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমী’, ‘ক্রান্তি’, ‘উদীচী’ অন‍্যতম। রাজনৈতিক শোষণ ও পূর্ববঙ্গকে নিপীড়নের প্রতিবাদে কখনও পরোক্ষভাবে কখনও সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল এইসব সংগঠন। ‘ছায়ানট’ এমনি আর এক আগ্নেয় প্রতিষ্ঠান, ১৯৬৭-তে জন্মে আজ পর্যন্ত যার ভূমিকা দেশের সুমহান ঐতিহ‍্যকে বাংলাদেশের গভীর থেকে গভীরতরতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে সুস্থ ও সংস্কৃতিবান নাগরিক গড়ে তোলা। ওয়াহিদুল হক ও সনজীদা খাতুনের মানসসন্তান এই ছায়ানট। মূলত রবীন্দ্রনাথের আদর্শে গড়ে ওঠা সঙ্ঘ, কাজী নজরুলের প্রিয় নামটিকে জয়ধ্বজা করে এগিয়ে চলেছে বহু চড়াই-উৎরাই, উপলব‍্যথিত গতি নিয়ে।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর গুচ্ছকবিতা

বিলাপ অভিসার জল আনতে চল রে সখী, জল আনতে চল নিভু নিভু আলোর সাজে সূর্য অস্তাচলে শেষবিকেলের রশ্মিমালায় বুকে ব্যথার ঢল লজ্জা আমার আবির হয়ে

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

যত মত তত পথ

বহুদিক দিয়েই একজন স্বতন্ত্র মননের ধর্মীয় সাধক। তাঁর অনুগামীর সংখ্যা ধারণাতীত, আর তা কেবল তাঁর স্বদেশ বা এই উপমহাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, সারা বিশ্বব্যাপী। এবং দিনের পর দিন তাঁর অনুগামীর সংখ্যা বাড়ছে। শ্রীরামকৃষ্ণ এবং সারদামণি ও স্বামী বিবেকানন্দকে কেন্দ্র করে যে ভাব-আন্দোলন, তার ফলশ্রুতিতে তাঁদের নিয়ে নিয়ত চর্চা ও গবেষণা হয়ে চলেছে। পৃথিবীব্যাপী দুশোর ওপর রামকৃষ্ণ মিশনের কার্যাবলি প্রমাণ করে (প্রতিবছর এর সংখ্যা বাড়ছে), আজকের এই অশান্ত বিশ্বে তাঁরা মানুষের কতখানি আশ্রয়।

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব ছয়]

রবীন্দ্রভাবনায় যে নৃত্যধারা গড়ে উঠল তা দেশিবিদেশি নৃত্যের সমন্বয়ে এক মিশ্র নৃত্যধারা, তৎকালীন শিক্ষিত শহুরে বাঙালির সংস্কৃতিতে যা নতুন মাত্রা যোগ করল। নাচের প্রতি একরকম আগ্রহ তৈরি করল, কিছু প্রাচীন সংস্কার ভাঙল, মেয়েরা খানিক শরীরের ভাষা প্রকাশে সক্ষম হল। এ কম বড় পাওনা নয়। আরও একটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, শিল্পক্ষেত্রে ভাবের সাথে ভাবনার মিল ঘটিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টির প্রচেষ্টা। গতে বাঁধা প্র্যাক্টিস নয়। নিজের গড়ে নেওয়া নাচ নিজের বোধ অনুযায়ী।

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব পাঁচ]

বাংলার মাটি থেকে একদা এই সুদূর দ্বীপপুঞ্জে ভেসে যেত আসত সপ্তডিঙা মধুকর। আর রবীন্দ্রনাথের পিতামহ, যাঁর কথা তিনি কোথাও প্রায় উল্লেখই করেন না, সেই দ্বারকানাথ-ও বাংলার তৎকালীন ব্যবসায়ীকুলের মধ্যে প্রধান ছিলেন। শুধু তাই-ই নয়, একদা তাঁর প্রিয় জ্যোতিদাদাও স্টিমারের ব্যবসা করতে গিয়ে ডুবিয়েছেন ঠাকুর পরিবারের সম্পদ। নিজে রবীন্দ্রনাথ বাণিজ্য সেভাবে না করলেও, জমির সম্পর্কে যুক্ত থাকলেও একদা বাংলার সাম্রাজ্য বিস্তার, বাণিজ্য-বিস্তার কী তাঁরও মাথার মধ্যে ছাপ ফেলে রেখেছিল? তাই ইউরোপ থেকে আনা বাল্মিকী প্রতিভার ধারাকে প্রতিস্থাপন করলেন জাভা বালির কৌমনৃত্য দিয়ে?

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব চার]

তৎকালীন দেশের বাস্তব সত্যের সঙ্গে মিলছে না বর্ণবাদ, উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ, মিলছে না পিকেটিং ও বিদেশি দ্রব্য পোড়ানোর আন্দোলন। রবীন্দ্রনাথ দেখতে পাচ্ছেন গ্রামে গ্রামে গরিব মানুষের খাওয়া নেই, নেই বেশি দাম দিয়ে দেশি ছাপ মারা কাপড় কেনার ক্ষমতা। দেখছেন পিকেটিংয়ের নামে গরিব মুসলমানের কাপড়ের গাঁঠরি পুড়ে যাচ্ছে যা দিয়ে সে তার পরিবার প্রতিপালন করে। রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করছেন তাঁর লেখায়। ‘গোরা’ ও ‘ঘরে বাইরে’ এমনই দু’টি উপন্যাস। গোরা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় প্রবাসী পত্রিকায়। পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশ ১৯১০ সালে। ঘরে বাইরের প্রকাশকাল ১৯১৬।

Read More »