Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ইনস্টলমেন্টে গোপীনাথ: লে হালুয়া

বড়পিসিকে আমরা পিসিমণি বলতাম। তাঁর ছেলেমেয়েদের ডাকা হত বড়দা, ছোটদা, বড়দি আর ছোটদি বলে। কিছুদিন আগে ছোটদা মারা গেছেন, বছর-পঞ্চাশেক বয়সে। আজ ছোটদি ছাড়া আর কেউই বেঁচে নেই। ছোটদির সঙ্গে কথা হচ্ছিল। পুরনো দিনের অনেক গল্প বাইরে এল আর সেই গল্পের অনেকখানি জুড়ে ছোটদার কথা। ছোটদা, বাংলার একসময়ের নামী ফুটবল খেলোয়াড় অলোক মুখার্জি। জন্মেছেন গত শতকের ষাটের দশকে। তাঁদের শৈশব-বাল্য-কৈশোর কাল আজকের মত একবারেই ছিল না। ছোটদার প্রসঙ্গ, ছোটদার ছোটবেলার গল্পে তাঁর সখা গোপীনাথ থাকবে না, তাই কি হয়? সেই গোপীনাথ বা গোপীদার দুষ্টুমি ও মজার গল্প বলতেই ধারাবাহিক ‘ইনস্টলমেন্টে গোপীনাথ’।

চতুর্থ কিস্তি

আমরা যখন আজ ধাপে ধাপে বয়সের সিঁড়ি চড়ছি তখন সত্যিই মনে হচ্ছে পুরনো দিনগুলো গল্পের দুনিয়াই ছিল। আমাদের ছেলেপুলেরা এমনতর ছোটবেলা পেল না। হয়তো শহরের কোনও বাচ্চাই আজ আর তা পায় না। এই গল্পগুলোর অছিলায় তবুও তো একবার উঁকি মারা যাচ্ছে ওই দিনগুলোয়!
বছর বাইশ হল আমি পশ্চিম বাংলার বাইরে। তবু আজও আমি সেদিনকার লিলুয়া রেল কলোনির অবিকল বর্ণনা দিতে পারি। প্রতিটা বাড়ি, প্রতিটা রাস্তা, প্রতিটা গাছ, মাঠ— সব আমাদের একান্ত আপন ছিল। আসলে কী জানো, তখন ম্যাপ (Map) আমাদের মনে ছিল, ফোনে (Phone) ছিল না।
এবারের গল্পটাও গোপীনাথ আর ছোটদা-দের ছেলেবেলা নিয়ে। ষাটের দশকের গল্প। শোনো সেই গল্প।
রেল কলোনির পাঁচিল যেখানে শেষ, ঠিক তার পরেই একটা গুরদুয়ারা ছিল। সেখানে, প্রতি রবিবার শিখদের জমায়েত হত, ‘প্রসাদ’ বিতরণ চলত। একবার, গোপীনাথের ওই প্রসাদ খাবার খুব ইচ্ছে হল। একেবারে নিজস্ব কায়দায় সে বলল, ‘মাইরি! রবিবার সকালে ওই রাস্তা দিয়ে আসা দায় হয়েছে। এত সুন্দর দেশি ঘিয়ের সুজির গন্ধ! ওই সুজি… খবর নিয়েছি, শিখরা ওটাকে ‘হালওয়া’ বলেন। ও ‘হালওয়া’ আমাকে টানছে।’
ছোটদার চোখেমুখে প্রশ্ন, ‘‘সুজিকে ‘হালওয়া’ বলে?’’ (এখানে তোমাদের বলে রাখি, ওদের ছোটবেলায়, মানে এই ধরো ষাটের দশকে, ঘরে টিভিই ছিল না, মোবাইল ফোনের কথা তো ভুলেই যাও। কাজেই, সবাই যে সব হিন্দি জানে, এমনটা যেন ভেবে বোসো না।) গোপীনাথ সেদিকে দৃকপাত না করে বলল, ‘নামে কী আসে যায়? আমরা লিলুয়ার সঙ্গে মিলিয়ে নয় হালুয়া বলব! ওই হালুয়া হল গিয়ে চুম্বক; এই আসছে রবিবার আমাকে কেউ আটকাতে পারবে না।’
গোপীনাথ ছোটদাকে সাবধান করল, ‘আসছে রবিবার ট্রায়াল অভিযান। তাই ভিড় বাড়ানোর দরকার নেই। শুধু গুরু তুমি আর আমি— আমরা দুজনেই ট্রিপ মারব। পরে গতিক দেখে বাকিদেরও নিয়ে যাওয়া যাবে।’ সারা সপ্তাহ রবিবারের অপেক্ষায় কাটল অথচ গোপীনাথ একবারও হালুয়া নিয়ে উচ্চবাচ্য করল না। ছোটদা ভাবল, ‘কে জানে গোপীর মনে আছে কিনা!’
রবিবার। সকাল দশটার আগেই গোপীনাথ হাজির। ‘সত্যি গোপী কথার খেলাপ করে না’, মনে মনে বলল ছোটদা। তুবড়ি-তেজে গোপীনাথ বলল, ‘গুরু, একটা রুমাল নিয়ে নাও। চলো আজ হালুয়া খেয়ে আসি।’ এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, গোপীনাথ ছোটদাকে প্রায়ই ‘গুরু’ বলে সম্বোধন করত। ছোটদা ফুটবলটা বরাবরই দুর্দান্ত খেলত। এই একটা জায়গায় গোপীনাথ, ছোটদাকে তার গুরু স্বীকার করে নিয়েছিল। আর আমরা বড় হয়ে, যখন ছোটদাকে প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে খেলতে দেখেছি, তখন মনে হয়েছিল সেই ছোট বয়সেও গোপীনাথের চোখ প্রতিভা চিনতে ভুল করেনি।
সে যাহোক, ছোটদা রুমাল তো সঙ্গে নিল কিন্তু হালুয়ায় উৎসাহ দেখাল না। ‘দ্যাখ গোপী, তুই যা। আমি বাইরে দাঁড়াব।’ গোপীনাথ এতটুকুও আপত্তি না করে বলল, ‘গুরু তাই হবে। তবে মনে রেখো, ওখানে নিশ্চিন্তে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না। ও হালুয়ার গন্ধ হল চুম্বক, ও ঠিক তোমাকেও ভেতরে টানবে ওরা গুরুদুয়ারার পথে পা বাড়াল।
গুরুদুয়ারায় বেশ ভিড়। কোনও উৎসবের দিন মনে হচ্ছে। রবিবারকে ধর্মকর্মের জন্য ব্যবহার করছে সব। সারা সপ্তাহ যা কাজের চাপ! নিশ্বাস নেবার সময় থাকে না। গোপীনাথ মাথায় রুমাল বেঁধে নিল। হালুয়ার গন্ধ ততক্ষণে ছোটদাকেও তার চুম্বকত্ব দেখানো শুরু করেছে। ছোটদাও কিন্তু কিন্তু করতে করতে মাথায় রুমাল বাঁধল। গুরুদুয়ারায় ঢুকল ওরা। হালুয়ার গন্ধকে দিক-নির্ণায়ক মেনে গোপীনাথ এগিয়ে চলেছে। ছোটদা ইতঃস্তত করে আওয়াজ দিল, ‘এই গোপী, অমন হনহন করে যাচ্ছিস কেন?’ অযথা প্রশ্নে খুবই বিরক্ত হল গোপীনাথ। শুধু বলল, ‘ফলো মি।’ দু-চারজন সর্দারজি ওদের সামনে দিয়ে আসছেন। নজর তাদের দিকে পড়তেই হঠাৎ গোপীনাথ তালি বাজিয়ে বলতে শুরু করল, ‘গুরু নানকো, জন্মদিনোকো…’। সর্দারজিরা বিস্ময়সূচক দৃকপাত করে নিজেদের দিশায় এগিয়ে গেলেন। গতি বাড়াল গোপীনাথ। হালুয়ার দেশি ঘিয়ের গন্ধ তীব্র হয়েছে। গন্তব্য আর গোপীনাথ বেশি দূরে নেই। অবশেষে পৌঁছে গেল হালুয়া বিতরণস্থলে। শালপাতার বাটি ভরে ভরে সবাইকে হালুয়া দেওয়া হচ্ছে। ঘি চুপচুপে হালুয়ার সে কী চমক! খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে গোপীনাথ হালুয়া নিল। ছোটদার হাতেও পৌঁছল বাটি। তারপর দুজনে গুরদুয়ারা থেকে বেরোনোর রাস্তা ধরল। হালুয়ার বাটি এমনভাবে সাফ হল যে ওই বাটিতে আবার অন্যদের হালুয়া দেওয়া যায়!
ছোটদাই প্রথম মুখ খুলল। ‘হ্যাঁ রে গোপী, তুই ওসব কী বলে চ্যাঁচাতে শুরু করলি? ওটার কী দরকার ছিল?’ হাজির জবাব গোপীনাথ বলল, ওটা গুরদুয়ারার মন্ত্র বলতে পারিস। ওই মন্ত্রের জোরেই ওরা আমাদের শিখ ভেবে হালুয়া দিল।’
‘মোটেও না। এমনিও ওরা যে আসছিল, সবাইকেই হালুয়া দিচ্ছিল। ওমন পাগলামো করার কোনও দরকার ছিল না’, বলল ছোটদা। গোপীনাথ, বিইং (being) গোপীনাথ, ছোটদার কথায় একটুও পাত্তা দিল না। বলল, ‘বাজে কথা রাখ তো। আসল কথাটা শুনে রাখ, এবার থেকে রবিবার আর হালুয়ার গন্ধ মানেই গুরুদুয়ারা ফিক্স। যাতায়াতের পথে আমি ঠিক হালুয়া ডে (day) ট্রাক (track) করতে থাকব।’ ছোটদার তো মাথায় হাত। গোপীনাথ বলল, ‘‘মাথায় হাত দিয়ে বুদ্ধিটাকে ভাল করে ঘষে নে আর মন্ত্রটা শিখে রাখ। ‘গুরু নানকো, জন্মদিনকো’।’’ ছোটদা বলল, ‘তা না হয় হল। কিন্তু প্রতি রবিবার তো আর গুরু নানকের জন্মদিন থাকবে না। তখন?’ উত্তরে গোপী বিজ্ঞের মতো নাক উঁচু করে বলল, ‘লে হালুয়া! বড্ড জ্বালাস। পরের কথা পরে ভাবা যাবে। কপাকপ হালুয়া খেলি কিনা বল? আর জেনে রাখ, জন্মদিন হোক বা না হোক আমি ঠিক হালুয়া ম্যানেজ করব। গোপী হালুয়াকে আর হালুয়া গোপীকে ঠিক খুঁজে নেবে। চল এবার খেলতে চল। হালুয়া হজমও তো করতে হবে!’
ওরা চলতে থাকল আমতলা মাঠের দিকে। ওই মাঠে আমরাও ছেলেবেলায় খেলেছি। আমতলা মাঠ মনের মধ্যে আজও তেমনি সবুজ হয়ে আছে।

চিত্র : গুগল

ইনস্টলমেন্টে গোপীনাথ: লিচু চুরি

ইনস্টলমেন্টে গোপীনাথ: চাঁদা আদায়

ইনস্টলমেন্টে গোপীনাথ: ঘুগনি সেল

Advertisement

ইনস্টলমেন্টে গোপীনাথ: মুদিখানার প্রত্যাবর্তন

ইনস্টলমেন্টে গোপীনাথ: আচার অভিযান

ইনস্টলমেন্টে গোপীনাথ: পরীক্ষার খাতা

ইনস্টলমেন্টে গোপীনাথ: পথের চাঁদা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty − 5 =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »