Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

গুহ্যকালী: নজর পড়েছিল হেস্টিংসের, আগলে রাখেন মহারাজা নন্দকুমার

এক পুরাকীর্তি নিয়ে দুই বিখ্যাত মানুষের মিত্রতা একসময় বৈরিতার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। শেষপর্যন্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করে একজনের হস্তক্ষেপে অন্যজনের গলায় বসে ফাঁসির রজ্জু। এমন লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছিল আমাদেরই দেশে, ব্রিটিশ আমলে। ঘটনার চরিত্রদের একজন বাঙালি, অন্যজন ইংরেজ। একজন মহারাজা নন্দকুমার, অন্যজন লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস। লুটেরা ব্রিটিশের চক্রান্তে নন্দকুমারের ফাঁসি হলেও তাঁর অবদান ভোলেননি দেশবাসী। তাঁরই দৌলতে যে বেঁচে গিয়েছিল সেই অমূল্য পুরাকীর্তি ‘গুহ্যকালী’!

ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল তখন ওয়ারেন হেস্টিংস। কাশীতে একটি কুয়ো খোঁড়ার সময় হঠাৎই উঠে এসেছিল এক সর্পভূষণা দেবীমূর্তি। অতীতে কোনও হানাদারের হাত থেকে বাঁচাতে হয়তো এভাবেই মূর্তিটিকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। তো, মহারাজা চৈত সিংহ চেয়েছিলেন, মন্দির তৈরি করে দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠিত করতে। কিন্তু কাশীরাজের সাধে বাধ সাধেন হেস্টিংস। তিনি এই আশ্চর্য পুরাকীর্তিটিকে নিজের দেশে পাচারের মতলব করেন। মূর্তির ওপর হেস্টিংসের নজর পড়ায় কাশীরাজ চৈত সিং প্রমাদ গণলেন। উপায়ন্তর না দেখে শেষমেষ বিগ্রহটিকে গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে খবর রটিয়ে দিলেন, পুরাকীর্তিটি চুরি হয়ে গিয়েছে।

এদিকে, মহারাজ নন্দকুমার গোপনে নৌকোয় চাপিয়ে সেই মূর্তি নিয়ে চলে আসেন নিজের বাড়ি বীরভূমের ভদ্রপুরে। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার নলহাটি শহর থেকে কিছুটা দূরেই মহারাজা নন্দকুমারের ভিটে আকালীপুর। এখানেই ব্রাহ্মণী নদীর তীরে পুরোদমে চলছিল ‘গুহ্যকালী’ মন্দির তৈরির কাজ। ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের চক্রান্তে ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ আগস্ট কলকাতায় প্রকাশ্যে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ান মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসি হলে মাঝপথেই থেমে যায় মন্দির নির্মাণের কাজ। পরে নন্দকুমারের পুত্র গুরুদাস শোকাহত মনে অসম্পূর্ণ মন্দিরেই প্রতিষ্ঠা করেন কষ্টিপাথরে নির্মিত সর্পভূষণা গুহ্যকালীর বিগ্রহ। পুরাকীর্তিটি একটি বিরলদর্শন কালীমূর্তি। এমন কালীমূর্তি গোটা দেশে আর নেই।

কেন এই কালীমূর্তি বিরলদর্শন? সাধারণভাবে আমরা দেবী কালীর পায়ের তলায় শিবকে শুয়ে থাকতে দেখি, কিন্তু আকালীপুরের দেবী গুহ্যকালীর পদতলে ‘শব’ বা ‘শিব’ নেই। সাধারণত আমরা কালীদেবীর পায়ের তলায় ‘শিব’-কেই দেখতে অভ‍্যস্ত হলেও এর অন্য ব‍্যাখ‍্যাও আছে। এ প্রসঙ্গে সাধক রামপ্রসাদ জানাচ্ছেন, ‘শিব’ নয়, মায়ের পদতলে পড়ে থাকেন ‘শব’ এবং এই ‘শব’ পড়ে থাকেন ‘শিব’ হবার আশায়। মা কালী করেছেন অসুর নিধন। তাই কালী শিবারূঢ়া নন, তিনি শবারূঢ়া। তাই মায়ের পায়ের তলায় ‘শিব’ নয়, পড়ে আছে ‘শব’ অর্থাৎ নিহত দৈত্যের দেহ বা মৃতদেহ। সাধক-কবি রামপ্রসাদ বলছেন, ‘শিব নয় মায়ের পদতলে।/ ওটা মিথ্যা লোকে বলে।।/ দৈত‍্য বেটা ভূমে পড়ে।/ মা দাঁড়াবে তাহার উপরে।।/ মায়ের পাদস্পর্শে দানবদেহ।/ শিবরূপ হয় রণস্থলে।।’

অধ্যাত্ম মতে, আকালীপুরের গুহ্যকালী সৃষ্টি ও প্রলয়ের পরবর্তী রূপ হিসেবে বস্ত্র পরিহিতা, দ্বিভুজা, সর্পবেদিমূলে যোগাসনা। তিনি বিনাশ করছেন না এবং তাই তাঁর হাতে খড়্গ অস্ত্র নেই, তার বদলে তাঁর দু’হাতে রয়েছে সর্পবলয়। দেবী ঘন মেঘের মত কৃষ্ণবর্ণা, পরণে রক্তবস্ত্র, লোল জিহ্বা, প্রসারিত ভয়ংকর দন্ত, কোটর মধ্যগত চক্ষু, গলায় সর্পহার, কপালে অর্ধচন্দ্র, মাথায় আকাশগামিনী জটা, হাসি মুখ, বৃহ‍ৎ উদর, কানে শব-কুণ্ডল, ডান হাতে বরমুদ্রা, বাম হাতে অভয়প্রদায়িনী অট্টহাসা মহাভয়ংকরী দেবী গুহ্যকালী সাধকের অভিষ্ট ফল প্রদানকারিণী, শিবমোহিনী। অন্যদিকে, মায়ের অষ্টকোণাকৃতি মন্দির সাধককে দিচ্ছে যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত‍্যাহার, ধারণা, ধ‍্যান ও সমাধি— এই অষ্টাঙ্গিক যোগের নির্দেশ।

মহাভারতের কাহিনি ধরলে, মগধরাজ জরাসন্ধ পাতালে মন্দির তৈরি করে গুহ্যকালীর আরাধনা করতেন। ইতিহাস বলছে, গত প্রায় আড়াইশো বছর আগে রানি অহল্যাবাঈ মূর্তিটি দিয়েছিলেন কাশীরাজ চৈত সিংকে। কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের পুনর্নির্মাণ রানি অহল্যাবাঈয়ের অসংখ্য উল্লেখযোগ্য কাজের অন্যতম বলে মানা হয়। কিন্তু লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস দুর্লভ মূর্তিটি ইংল্যান্ডে নিয়ে গিয়ে সেখানকার যাদুঘরে রাখার পরিকল্পনা করেন। মাঝখান থেকে তা হস্তগত করেন মহারাজা নন্দকুমার। বিষয়টি জানাজানি হতেই মহারাজা নন্দকুমার হেস্টিংসের চিরশত্রুতে পরিণত হন, যার জেরে অন্য অজুহাতে নন্দকুমারকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। বেনারসের শেষ স্বাধীন রাজা চৈত সিংয়ের সঙ্গেও একসময় যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। তবে সে কাহিনি ভিন্ন।

Advertisement

জনশ্রুতি এই, মহারাজা নন্দকুমার নাকি স্বপ্নে দেবীর আদেশ পান যে, তাঁকেই মূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাই কাশীরাজের সহায়তায় মহারাজা নন্দকুমার কাশীর গঙ্গা থেকে মাতৃবিগ্রহ তুলে নৌকো করে দ্বারকা নদী এবং দ্বারকা থেকে ব্রাহ্মণী নদীপথে আসেন আকালীপুরে। নন্দকুমারের ভিটে ভদ্রপুরের কাছে নৌকোর গতি নিয়ন্ত্রণে না আসায়, নৌকো এসে থামে সোজা আকালীপুরে। এখানেই নির্জনে দেবীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। ব্রাহ্মণী নদীর তীরে অবস্থিত শ্মশান চত্বরে এখনও রয়েছে  পাথরের তৈরি সেই প্রতিষ্ঠাবেদি। ইতিমধ্যে হেস্টিংসের কুচক্রে ফাঁসি হয়ে যায় নন্দকুমারের। তবে আগেই পুত্র গুরুদাসকে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সেইমত অসমাপ্ত মন্দিরেই প্রতিষ্ঠা হয় গুহ্যকালীর।

আকালীপুরে এসেছেন তারাপীঠ-ভৈরব সাধক বামাক্ষ‍্যাপা। তিনি আকালীপুরের এই সর্পভূষণাকে বলেছেন, বেদের বেটি। এখন সারা বছর বহু পর্যটক ভিড় জমান নির্জন ব্রাহ্মণী নদীর তীরে। মন্দিরে নিত্যদিন নিয়ম করে চলে পুজো। অন্নভোগে থাকে মাছ। প্রতিদিন কুপন কেটে বহু মানুষ গ্রহণ করেন সেই অন্নভোগ। আকালীপুরের কালীমূর্তি নিয়ে পুরাণ, ইতিহাস একাকার। জনশ্রুতি, নন্দকুমারের ফাঁসির দিন নাকি বজ্রাঘাত হয়েছিল মন্দিরে, দেখা দিয়েছিল ফাটল। আবার, সন্ধ্যার পর সেখানে মানুষের যাতায়াতে মানা। এখনও স্থানীয়দের বিশ্বাস, সন্ধের পর নাকি দেবী মন্দির থেকে বেরিয়ে ভয়ংকর মূর্তি ধরে শ্মশান এলাকায় ঘুরে বেড়ান। তাই পুজোপাঠ-দর্শন সেরে রাত নামার আগেই এলাকা ছাড়তে হয় সবাইকে।

পৌরাণিক কাহিনি বা লোকবিশ্বাস যাই বলুক, বাস্তব এই যে, অদ্বিতীয় ভাস্কর্যটি বুক দিয়ে আগলে রাখতে চেয়েছিলেন মহারাজা নন্দকুমার। বিচারক-বন্ধু স্যার এলিজা ইম্পেকে ব‍্যবহার করে হেস্টিংস অন্যায়ভাবে নন্দকুমারকে ফাঁসিতে ঝোলাতে সমর্থ হলেও আশ্চর্য পুরাকীর্তিটিকে ইংল্যান্ডে নিয়ে যেতে পারেননি। শত চেষ্টাতেও হেস্টিংস তার নাগাল পাননি। লোকচক্ষুর অন্তরালে দেবীজ্ঞানে প্রতিষ্ঠা পেয়ে সেই পুরাকীর্তি রয়ে গিয়েছে নন্দকুমারের ভিটেতেই। আসলে, প্রবলকেও কখনও কখনও হেরে যেতে হয় দুর্বল প্রতিপক্ষর কাছে। যেমনটা হেরেছেন ওয়ারেন হেস্টিংস। আর হেরেও যেন জিতে গিয়েছেন নন্দকুমার। আকালীপুরের কালীকে লোকে বলে, নন্দকুমারের কালী।

চিত্র: গুগল

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 + 8 =

Recent Posts

তন্ময় চট্টোপাধ্যায়

মাতৃভাষা: অবিনাশী হৃৎস্পন্দন ও বিশ্বজনীন উত্তরাধিকার

প্রতিটি ভাষার নিজস্ব একটি আলো আছে, সে নিজের দীপ্তিতেই ভাস্বর। পৃথিবীতে আজ প্রায় সাত হাজার ভাষা আছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই শতাব্দীর শেষে তার অর্ধেকেরও বেশি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এ তথ্য সত্যিই বেদনাদায়ক। একটি ভাষার মৃত্যু মানে কেবল কিছু শব্দের মৃত্যু নয়— সে মানে একটি জগৎদর্শনের অবলুপ্তি, একটি জাতির স্মৃতির চিরকালীন বিনাশ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক বহুমাত্রিক। নিজের মাতৃভাষাকে ভালবাসা, তাকে চর্চায় রাখা, তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর তার সাথে অন্য সমস্ত ভাষার প্রতি আরও বেশি করে শ্রদ্ধাশীল হওয়া।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শংকর: বিচিত্র বিষয় ও আখ্যানের কথাকার

শংকরের জনপ্রিয়তার একটি কারণ যদি হয় সাবলীল ও সহজ গতিচ্ছন্দময় ভাষা, অন্য আরেকটি কারণ হল, নিজ সময়কে করপুটে ধারণ করা। তার সঙ্গে মিশেছে আমাদের পরিকীর্ণ জগতের বহুকিছু, আমাদের নাগালের মধ্যেই আছে, অথচ আমরা এ-পর্যন্ত যার হদিশ পাইনি, তাকে পাঠকের দরবারে এনে হাজির করা। ১৯৫৫-তে যে উপন্যাসটি দিয়ে বাংলা-সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব, সেই ‘কত অজানারে’ হাইকোর্টের জীবনযাপন, সেখানকার আসামি-ফরিয়াদি, উকিল-ব্যারিস্টার প্রমুখের চিত্র। লেখকের নিজ অভিজ্ঞতাপ্রসূত রচনা এটি। তিনি প্রথম জীবনে হাইকোর্টের সঙ্গে চাকরিসূত্রে যুক্ত ছিলেন।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর তিনটি কবিতা

তারপরে একদিন আকাশে মেঘের সাজ, মুখরিত ধারাবারিপাত/ রঙিন ছাতার নিচে দু’গালে হীরের গুঁড়ি, মন মেলে ডানা/ আরো নিচে বিভাজিকা, নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া দুই উদ্ধত শিখর/ কিছুটা অস্পষ্ট, তবু আভাসে ছড়ায় মায়া বৃষ্টিস্নাত নাভি/ তখনই হঠাৎ হল ভূমিকম্প, পাঁচিলের বাধা ভাঙে বেসামাল ঝড়/ ফেরা যে হবে না ঘরে মুহূর্তে তা বুঝে যাই, হারিয়েছি চাবি/ অনেক তো দিন গেল, অনেক ঘুরেছি পথে, বিপথে অনেক হল ঘোরা/ তাকে তো দেখেছি, তাই নাই বা পড়ুক চোখে অজন্তা ইলোরা।

Read More »
সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার…

মনু-পরাশর-বৃহস্পতি-কৌটিল্যদের অনুশাসন এসে নারী প্রগতির রাশ টেনে ধরল। নারীর শিক্ষালাভের ইতি ঘটল, অন্তঃপুরে বাস নির্দিষ্ট হল তাঁর জন্য। তাঁকে বাঁধা হল একের পর এক অনুশাসনে। বলা হল, স্বাধীনতা বলে কোনও পদার্থ থাকবে না তাঁর, ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি’! কুমারী অবস্থায় পিতা-মাতার অধীন থাকবে সে, বিয়ের পর স্বামীর, বার্ধক্যে সন্তানের। ধাপে ধাপে তাঁর ওপর চাপানো হতে লাগল কঠিন, কঠিনতর, কঠিনতম শাস্তি।

Read More »
স্বপনকুমার মণ্ডল

গরিব হওয়ার সহজ উপায়

এককালে পর্তুগিজ-মগরা আমাদের নিম্নবঙ্গ থেকে দাস সংগ্রহ করত মালয়-বার্মাতে শ্রমিকের কাজের জন্য, ইংরেজ সাহেবরাও কিনত গোলাম। আজ আবার মানুষ সস্তা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসকের দরকার নেই। খোলাবাজারে নিজেরাই নিজেদের কিনছে দেশের মানুষ। মানুষ বিক্রির মেলা বসে এখন গ্রামগঞ্জের হাটে হাটে।

Read More »