Search
Generic filters
Search
Generic filters

গড়িয়া: ত্রিপুরার জনজাতিদের উৎসব আজ সর্বজনীন

ত্রিপুরার কয়েকটি উপজাতি সম্প্রদায় বিশেষ করে ত্রিপুরী, জমাতিয়া, নোয়াতিয়া ও রিয়াং সম্প্রদায়ের মধ্যেই সাধারণত ‘গড়িয়া পূজা’ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে সামাজিক কাঠামো অনুসারে এই গড়িয়া পূজার পদ্ধতি, রীতিনীতি সম্প্রদায়ভেদে কিছুটা পার্থক্যও থাকলেও উদ্দেশ্য মূলত এক।

বর্তমানে সর্বজনীন চেহারা নিলেও ‘গড়িয়া পূজা’ ত্রিপুরার বিশেষ কয়েকটি উপজাতির এক মহান গৌরবময় পূজা ও উৎসব। তাঁদের সমাজে কোন যুগ থেকে এই পূজা চলে আসছে তা বলা কঠিন, তবে বয়সের দিক দিয়ে এই পূজা-উৎসব যে সুপ্রাচীন তা বলতেই হবে। গড়িয়া দেবতা তাদের পরম আরাধ্য এবং উপজাতিদের বদ্ধমূল ধারণা ও বিশ্বাস, তাঁর শুভাশিস ছাড়া জাগতিক কল্যাণ, সুখশান্তি, ভোগবিলাস ও অস্তিত্ব কোনওটাই সম্ভব নয়। তাই, দেবতাকে পরম ভক্তিভরে শ্রদ্ধা নিবেদনের অভিপ্রায়ে প্রতিটি উপজাতি নরনারী এই ‍পূজা-উৎসবের শুভদিনের জন্য সাগ্রহ প্রতীক্ষায় থাকেন। এসময় তারা প্রাত্যহিক জীবনের যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট, শোক-তাপ, হতাশা-বেদনা, অতৃপ্তি-অপ্রাপ্তি ভুলে নাচ-গান, হাসিঠাট্টায় মশগুল হয়ে থাকেন।

গড়িয়া মূর্তি তৈরি হয় বাঁশ, আদিবাসীদের হাতেবোনা তাঁতে তৈরি কাপড় ও চাল দিয়ে।

কলকাতা বা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ গড়িয়া কথাটা শুনলে ভাবেন যাদবপুরের কাছে অবস্থিত গড়িয়া বা গড়িয়াহাটের কথা। কিন্তু ত্রিপুরার বাসিন্দাদের কাছে গড়িয়া একটা উৎসবের নাম। বৈশাখ মাসের সপ্তম দিনে হয় মূল গড়িয়া পূজা। আগে গড়িয়া পুজো ত্রিপুরার জনজাতিদের লৌকিক দেবতার পুজো হিসাবে চিহ্নিত হলেও আজ তা সর্বজনীনতা লাভ করেছে। গড়িয়া পুজো এখন সমগ্র ত্রিপুরাবাসীর। ত্রিপুরায় উনিশটি জনজাতি সম্প্রদায় রয়েছে। এরা অনেকাংশই বিশ্বাস করেন, গড়িয়া দেবতা এমন এক অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন দেবতা যাঁর কৃপাতেই মানুষ সুখে ও শান্তিতে বসবাস করতে পারেন। তাঁর ইচ্ছাতেই দেশের সমৃদ্ধি ঘটে।

খুব জাঁকজমকভাবে ত্রিপুরার জনজাতি সম্প্রদায়ের লোকেরা এই পুজো পালন করে থাকেন। পুজোকে কেন্দ্র করে নানান ধরনের খাবার তৈরি করা হয়। ভোগে থাকে বিভিন্ন প্রকারের পিঠে। তাছাড়া পাঁঠা, হাঁস-মোরগ, পায়রা বলি দেওয়া হয়। এই পূজায় হাঁসের ডিমও ব্যবহৃত হয়। ভোগেও মাংসের আয়োজন করা হয়। জনজাতিদের বিশ্বাস, গড়িয়া পুজোর সাতদিনের মধ্যে যদি কেউ অসুস্থ হন কিংবা কোনও বিপদে পড়েন তা হলে গড়িয়া দেবতার মানত করলে সেই ব্যক্তি সুস্থ উঠবেন। এই পূজা অনেকটা শাক্ত মতে শিবের রাজসিক পূজা। মতান্তরে হিন্দু দেবতা দুর্গাপুত্র গণেশকে সনাতন ‍আদিবাসীরা গড়িয়ারূপে পূজা করেন। জনজাতিরা এই পূজার পূজারীদের ‘অচাই’ এবং প্রধান পূজারীকে ‘চন্তাই’ বলে বিশেষ মর্যাদা দেন।

পাঁঠা, হাঁস-মোরগ, পায়রা বলি দেওয়া হয়। এই পূজায় হাঁসের ডিমও ব্যবহৃত হয়। ভোগেও মাংসের আয়োজন করা হয়।

প্রতিবছর বৈশাখ মাসের প্রথম দিন থেকে গড়িয়া দেবতাকে নিয়ে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে ঘোরেন একদল লোক। গড়িয়া দেবতা বাড়িতে আসছেন দেখে বাড়ির নারীরা উঠানে জল ছিটিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে একটি পিঁড়ি বসান। গড়িয়া মূর্তিকে সেই পিঁড়িতে বসনো হয়। পরিবারের কর্তা, গৃহিণীসহ সব সদস্য ধূপ দেখিয়ে বরণ করে প্রণাম করেন। একই সঙ্গে চালসহ অন্য ফসল ও নগদ টাকা চাঁদা হিসেবে দেন। দেবতাকে উঠানে পিঁড়িতে বসানোর পর পরিক্রমা করা হয় সমবেত গান ও নৃত্য সহযোগে। একইভাবে পহেলা বৈশাখ থেকে ৬ বৈশাখ পর্যন্ত এভাবে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে পরিক্রমা করা হয়। বৈশাখ মাসের সপ্তম দিনে হয় গড়িয়া পূজা। এদিন গ্রাম ঘুরে যে চাঁদা সংগৃহীত হয়, তা দিয়ে পূজার আয়োজন হয়।

গড়িয়া মূর্তি হিন্দুদের অন্য সব মূর্তি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। গড়িয়া মূর্তি তৈরি হয় বাঁশ, আদিবাসীদের হাতেবোনা তাঁতে তৈরি কাপড় ও চাল দিয়ে। কোথাও পূজোর প্রসাদ হিসেবে চাল বা ভাত থেকে তৈরি সুরা পরিবেশিত হয়। ‘রাজমালা’ সহ সমসাময়িক গ্রন্থাদি মতে, মহাভারতে যযাতি নামে একজন পরাক্রমশালী রাজা ছিলেন। রাজা যযাতির অবাধ্য পুত্র দ্রুহ্য পিতা কর্তৃক স্বীয় রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে গঙ্গা ও সাগরের সঙ্গমস্থল ‘সাগর দ্বীপে’ নির্বাসিত হন। রাজা দ্রুহ্যের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দৈত্যরাজ সিংহাসন আরোহণ করেন। মহারাজা দৈত্যের পুত্রের নাম ত্রিপুর। এই রাজা ত্রিবেগ থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে ধাবিত হয়ে কিরাত রাজ্য অধিকার করেন এবং ত্রিবেগ ও কিরাত জনজাতির মধ্যে মহামিলন ঘটান। ত্রিপুর রাজা তাঁর বিজিত রাজ্যের নামকরণ করেন ত্রিপুরা এবং প্রজাদের নামকরণ করেন ত্রিপুর জাতি।

দেবতাকে উঠানে পিঁড়িতে বসানোর পর পরিক্রমা করা হয় সমবেত গান ও নৃত্য সহযোগে।

বিষ্ণু পুরাণ গ্রন্থে আছে, ভারত সাম্রাজ্যের পূর্ব প্রান্তে কিরাতের বাস। কামরূপ (আসাম) ও রাক্ষ্যাং (আরাকান) প্রদেশের মধ্যবর্তী ভূ-ভাগকে আর্যরা সুম্ম বা সুহ্ম নামে আখ্যায়িত করেন। টিবেটো বর্মন শান বংশীয় জনগোষ্ঠী সেখানে শক্তিশালী রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। এই রাজ্যটিই মহাভারত গ্রন্থে ত্রৈপুরা, কখনও বা ত্রৈপুরী নামে আখ্যায়িত হয়।

ত্রিপুরীরা নিজেদের চন্দ্রবংশোদ্ভুত ক্ষত্রিয় কুলজাত বলে দাবি করেন। নৃতাত্ত্বিক বিচারে ত্রিপুরা জাতি মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভুত। মঙ্গোলীয়রা প্রায় ৫ হাজার বছর আগে মঙ্গোলিয়া থেকে ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে আগমন করেছিল। এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পরিচিত ছিল বোডো (Bodo) বা বরো (Boro) নামে। পূর্ব ভারতে আর্যদের আগমনের পূর্বে এই বোডো বা বরো জনজাতি এখানে আধিপত্য কায়েম করেছিল। রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনিসূত্রে জানা যায়, ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্বাঞ্চল রাজ্যসমূহ বোডো বা বরো জনজাতির নৃপতি কর্তৃক শাসিত হত। আর্যগণ তাদেরকে কিরাত, দানব ও অসুর নামে আখ্যায়িত করত। এই বোডো বা বরো জনজাতির একটি শক্তিশালী দল গঙ্গা, শীতলক্ষা, ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরী প্রভৃতি নদনদীর অববাহিকার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। ত্রিপুরীরা সম্পূর্ণ অনার্য জাতি। তাই ত্রিপুরার সনাতন অধিবাসীদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে বৈচিত্র্যমণ্ডিত উৎসব ও পূজাপার্বণ। আর এই পূজাপার্বণে যে অনুষ্ঠানের রীতি রয়েছে, তার পুরোটাই প্রকৃতি জগতের রূপ-রসের ব্যঞ্জনায় পুষ্ট।

বৈশাখ মাসের প্রথম দিন থেকে গড়িয়া দেবতাকে নিয়ে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে ঘোরেন একদল লোক।

এখন উপজাতিদের প্রধান উৎসব গড়িয়া পূজা ত্রিপুরা রাজ্যের সর্বত্র যথাযোগ্য মর্যাদায়, ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে পালন করা হয়। এই রাজ্যের উপজাতিদের প্রধান‌ এই উৎসবকে কেন্দ্র করে রাজ্যের সর্বত্র ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়। গড়িয়া পূজাকে কেন্দ্র করে গত প্রায় এক মাস ধরে উপজাতি মানুষের মধ্যে নানারকম প্রস্তুতি চলে। গড়িয়া পূজার জায়গাও তৈরি করা হয় বাঁশ দিয়ে। পূজার দিন হাঁস, মুরগি, কবুতর ও পাঁঠা বলি দেওয়া হয়। আবার কেউ কেউ কবুতর বলি না দিয়ে গড়িয়ার কাছে উৎসর্গ করে ছেড়ে দেন। এই পূজাতে প্রয়োজন হয় বাড়িতে তৈরি বিশুদ্ধ মদ ও মুরগির ডিম।

এছাড়া গড়িয়া পূজা উপলক্ষে ত্রিপুরার জনজাতিদের বাড়িতে পিঠাপুলি সহ নানারকমের চিরাচরিত খাবার তৈরি করা হয়। যেমন চিকভর্তা, হলুদভর্তা, গোদক, বাঁশের অঙ্কুর দিয়ে তৈরি নানা রকমারি খাবার, দেশি মুরগির ভর্তা, কাঁকড়া ভাজা, গুগলি শামুক দিয়ে তৈরি খাবার, বাঁশের ভেতর রান্না করা মাংস, জুমের চাল দিয়ে তৈরি খাবার অতিথি আপ‍্যায়নের জন্য তৈরি করা হয়। বাঙ্গুই ভাত, মুয়া (বাঁশের অঙ্কুর) সেদ্ধ, মাউখভি (মিষ্টি) এগুলো তো ভোজের পাতে থাকেই।

চৈত্রসংক্রান্তিকে ত্রিপুর ভাষায় বলে বিষু আর হারি। বিষু অর্থাৎ চৈত্রসংক্রান্তির আগের দিন গড়িয়া পূজার ঘট স্থাপন করেন গড়িয়া পূজার প্রধান পুরোহিত ‘চন্তাই, ও তার সহকারী ‘বাবুয়া’। ত্রিপুরার সংস্কৃতির এক বিশেষ অঙ্গ নাচ। ভিন্ন ভিন্ন উপজাতির নিজস্ব নৃত্যধারা বজায় আছে এখানে, যা বিভিন্ন পার্বণের সময় প্রদর্শিত হয়। নিজ নিজ ঐতিহ্যের পোশাক, গহনায় সজ্জিত হয়ে এরা নাচ করেন। গড়িয়া দেবতার পূজা উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয় উপজাতীয় ‘গড়িয়া নৃত্য’। এই নৃত্য মাদলের তালেতালে করা হয়। ৫-৭ দিন ধরে ‘গড়িয়া নৃত্য’ পরিবেশন করা হয়। দল বেঁধে গড়িয়া দল গ্রামে গ্রামে ঘুরে গড়িয়া নৃত্য পরিবেশন করে। এছাড়া পালাগান ও বিভিন্ন খেলাধুলাও এইসময় চলে।

গড়িয়া দেবতা বাড়িতে আসছেন দেখে বাড়ির নারীরা উঠানে জল ছিটিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে একটি পিঁড়ি বসান।

লেখক মৃগাঙ্ক চক্রবর্তীর একটা লেখা থেকে গড়িয়া পূজার মিথ সম্পর্কে জানা যায়: বহুকাল আগে ত্রিপুরায় হাচুকতি আর লকতায় নামে দুজন দম্পতি বাস করত। পেশায় তারা ছিল জুমচাষি। ত্রিপুরার পাহাড়ি এলাকায় ওরা শান্তিতে বসবাস করত। কিন্তু শান্তি আর কোথায়? এত বছর বিয়ের পরও ওরা নিঃসন্তান। অনেক চেষ্টাচরিত্র করেও সন্তান হয়নি। শেষে উপায় না দেখে হাচুকতি আর লকতায় একটা ছেলেকে দত্তক নিল। সুখেই কাটছিল এরপরের দিনগুলো। কিন্তু সে গুড়ে বালি। জন্মানোর তিন বছরের মধ্যেই সেই সন্তান অকালে মারা গেল। সন্তানশোকে মুহ্যমান হাচুকতি আর লকতায় দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে সন্তানকামনায় ব্রহ্মার উদ্দেশে প্রার্থনায় লেগে পড়ল। ওদের খাওয়াদাওয়া ঘুম সব মাথায় উঠল। সাত বছর কেটে গেলে, একদিন ব্রহ্মার টনক নড়ল। তখন তিনি নিজেই নরসিঁয়ং নামে হাচুকতি আর লকতায়ের ভিটায় জন্ম নিলেন। আর তার বছর তিনেকের মধ্যেই জন্ম নিল খুলুংতি আর মাইলুংতি নামের দুই মেয়ে। হাচুকতি আর লকতায়ের এখন ভরা সংসার। আর সন্তানশোক নেই। কিন্তু সমস্যা একটাই, নরসিঁয়ংয়ের মেরুদণ্ড অস্বাভাবিক শক্ত। অথচ বাচ্চাদের মেরুদণ্ড এত শক্ত হওয়া ভাল লক্ষণ নয়। সে যাই হোক, বড় হয়ে এই নরসিঁয়ংই হলেন নরসিংহ বা নৃসিংহ। তিনি হিরণ্যকশিপুকে হত্যা করে ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা করলেন। কালক্রমে নরসিংহের বীরত্বের কথা জায়গায় জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল। এমন একজন নির্ভীক বীর ছেলের এবার তো বিয়ে দিতে হয়। কিন্তু সেখানে আর এক বিপত্তি।
ছয় ছয় বার বিয়ে দেওয়ার পরও বিয়ে ভেঙে গেল নরসিংহের। বন্ধুবান্ধবরা এসব নিয়ে নরসিংহের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করে। টোনটিটকিরি কেটে নরসিংহকে ওরা ডাকে ‘গরয়া’ নামে। কারণ নরসিংহের সবেতেই গড়মিল। বিয়ে টিকছে না একের পর এক। তাই এরকম নামকরণ। গরয়া কথার মানেই তো গড়মিল। এই গরয়া নামটাই অপভ্রংশে হল গড়িয়া।
এদিকে আগের বিয়েগুলো ভেঙে গেছে তো কী হয়েছে? তাই বলে তো আর গড়িয়াকে বিয়ে না দিয়ে থাকা যায় না। অতএব গড়িয়ার জন্য সপ্তম বারের জন্য আর একটা বিয়ের আয়োজন করা হল। পাত্রীর নাম বুকমা। বুকমার সঙ্গে গড়িয়ার বিয়ে তো হল। কিন্তু বিয়ের পরদিনই গড়িয়া জেদ ধরল, সে সন্ন্যাস নেবে। সন্ন্যাসে যাওয়ার সময় গড়িয়া সবাইকে জানাল, সে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার এক রূপ। তারপর গড়িয়া তার স্ত্রী বুকমাকে জলের দেবী আর বোন মাইলুমার আর খুলুমাকে যথাক্রমে ধান আর কার্পাসের দেবী বানিয়ে, সন্ন্যাসের উদ্দেশে নিজের বাড়ি ছাড়ল।
হাচুকতি আর লকতায়ের এই সন্তান নরসিঁয়ংই গড়িয়া দেবতা নামে ত্রিপুরার দেববর্মা, জমাতিয়া, নোয়াতিয়া, খাকলু, রিয়াং, কলই, উচই সম্প্রদায়ের মানুষদের দ্বারা পূজিত হয়ে আসছেন।

এত গেল পৌরাণিক বা ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা। তবে যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ পূজাতেও নানা পরিবর্তন এসেছে। এখন ত্রিপুরার বিভিন্ন জেলার লোকজন এমনকি অনেক ক্লাবের উদ্যোগেও গড়িয়া পূজার আয়োজন করা হয়। এই বারোয়ারি পূজায় গড়িয়া দেবতার বিগ্রহকে সঙ্গে নিয়ে সাত দিনব্যাপী পাড়া না ঘোরা হলেও প্রতি বছর ৭ বৈশাখ নিয়মনীতি মেনে ও পূর্ণ শ্রদ্ধার সঙ্গে গড়িয়া পূজার আয়োজন করা হয়। আর এই উপলক্ষে মেলা ও নানান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন হয়। এই পূজা এখন তাই ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিকভাবেও সমগ্র ত্রিপুরা রাজ্যের একটি অন্যতম প্রধান উৎসবে পরিণত হয়েছে। তাই ত্রিপুরায় গড়িয়া পূজা উপলক্ষে রাজ্যব্যাপী সরকারি ছুটি থাকে।

চিত্র: গুগল

বাথুকাম্মা: মেয়েদের একান্ত নিজস্ব কুসুম মহোৎসব

ফুল দেই: উত্তরাখণ্ডের ফুলেল উৎসব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five − three =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »