Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ডা. স্মরজিৎ জানা, যৌনকর্মীদের দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি আর আমাদের যৌনজীবন

সুমিতা বকশি ও প্রদীপ বকশি

স্মরজিতের (২১ জুলাই ১৯৫২-৮ মে ২০২১) সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় ঘটে রাজা রামমোহন রায়ের সুবাদে, ১৯৯৮ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহের কোনও এক সকালে, কলেজ স্ট্রিটের পশ্চিম দিকের একটি গলির শেষে, মাটির নিচে, একটি হোটেলের তলঘরে। সেই সময়ে সেখানেই ছিল যৌনকর্মীদের আস্থা অর্জন করে ও তাঁদের সাহায্য নিয়ে এইচআইভি/এইডস অতিমারী প্রতিরোধে নিবেদিত— সোনাগাছি প্রকল্পের ও সেই প্রকল্পের উদ্যোগে গড়ে ওঠা দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির (১৯৯২-) ভাড়া করা সদর দপ্তর। সেদিন সেই অফিস তখন সবে খুলেছে, ঘরে ঝাঁট পড়ছে, ঘর মোছা হচ্ছে, তবে কাজ শুরু হয়ে গেছে। সেই বছরের মার্চ মাসের ১৮ তারিখে রাজা রামমোহন রায় মহাশয়ের স্মরণে একটি সভার আয়োজন করা হয়েছিল, বসু বিজ্ঞান মন্দিরে। আমরা সেই সভায় আসার জন্য প্রকল্পের পরিচালক স্মরজিৎকে ও তাঁর সহকর্মীদের নেমন্তন্ন করতে গিয়েছিলাম। তাঁরা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেন আমরা তাঁদের ডাকছি। উত্তরে আমরা বলি যে, আমাদের বিচারে তাঁরা আমাদের সমাজে মেয়েদের অধিকার সংক্রান্ত কাজের এলাকায় রামমোহনের অন্যতম উত্তরাধিকারী— সেই জন্য। তারপর প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় জুড়ে, স্মরজিতের, দুর্বারের ও কলকাতার যৌনকর্মীদের সঙ্গে আমাদের পরিবারের একাধিক সদস্যের নানা কাজের, বহু সম্পর্ক গড়ে ওঠে। স্মরজিৎকে ও তাঁর সহকর্মীদের আপনি-আজ্ঞে করার কাল অতি দ্রুত শেষ হয়ে যায়। অতিমারী প্রতিরোধের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ এক ডাক্তার, প্রশাসক ও সংগঠক হিসেবে ডা. স্মরজিৎ জানা-র কাজের কথা ইউএনএইডস-এর ও দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি-র প্রতিনিধিরা বলেছেন ও বলবেন (কপুর ২০২১; দুর্বার ২০২১)। দুর্বার-এর বিভিন্ন প্রকাশনায় তাঁদের নানা কাজের বিস্তারিত বিবরণ আর প্রাসঙ্গিক আলোচনা ছড়িয়ে রয়েছে, নিচে উল্লেখপঞ্জিতে সেই প্রকাশনাগুলির তালিকার হদিস পাওয়া যাবে। এখানে আমরা সেসবের পুনরাবৃত্তি করব না, শুধু স্মরজিৎ ও দুর্বার-এর কাজের স্থানীয়, সমকালীন ও বিশ্ব-ঐতিহাসিক তাৎপর্যের কয়েকটি মাত্রার কথা উল্লেখ করব।

আধুনিক ফ্রান্সের প্রথম রাজনৈতিক বিপ্লবের কালে ওলিম্প দ্য গোজেস (১৭৪৫ মতান্তরে ১৭৪৮-১৭৯৩) মেয়েদের ও নাগরিকাদের অধিকারের ঘোষণাপত্র রচনা করে, মেয়েদের অধিকারের অভাবের বিচারে সেই বিপ্লবের অন্যতম সামাজিক সীমাবদ্ধতার কথা প্রকাশ করেন (গোজেস ১৭৯১)। তার প্রায় তিরিশ বছর পরে প্রকাশিত হয় রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩) রচিত হিন্দুদের উত্তরাধিকার আইন অনুসারে নারীদের প্রাচীন অধিকার-সীমার আধুনিক অবৈধ লঙ্ঘন প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য (রামমোহন ১৮২২)। সেখানে তিনি মেয়েদের অধিকারের ব্যাপারে আমাদের দেশের আধুনিক হিন্দু পুরুষদের অমানবীয় স্বার্থপরতার প্রবল সমালোচনা করেন। আর তারও প্রায় তিরিশ বছর পরে কার্ল মার্ক্সের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও সহযোদ্ধা, কলোনের ডা. রোলান্ড ড্যানিয়েলস (১৮১৯-১৮৫৫) তাঁর ‘মানুষ— শারীরবৃত্তীয় নৃবিদ্যার একটি খসড়া রূপরেখা’ শীর্ষক রচনায় ও মার্ক্সকে লেখা কয়েকটি প্রাসঙ্গিক চিঠিপত্রে (ড্যানিয়েলস ১৮৫১/১৯৮৪, ১৮৫১/১৯৮৮) আধুনিক শ্রমিকের পেশার সঙ্গে তার স্বাস্থ্যের সম্পর্কের বিজ্ঞানসম্মত পর্যালোচনার সূত্রপাত করেন।

গোটা ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দী জুড়ে সারা পৃথিবীর নাগরিক সমাজগুলির প্রাগ্রসর অংশের মানুষজনের মধ্যে এইসব চিন্তাভাবনা আলোড়ন সৃষ্টি করে। কয়েকটি শহরের সমাজে খানিকটা বেশি আলোড়ন হয়। কলকাতা সেই শহরগুলির মধ্যে অন্যতম। স্মরজিৎ ও তাঁর সহকর্মীদের উদ্যোগে কলকাতায় গড়ে ওঠা দুর্বার-এর কাজকর্মে, বিষয়গতভাবে, আধুনিক সামাজিক চিন্তাভাবনার এই ধারাগুলির উত্তরাধিকারের একত্র সমাবেশ ঘটেছে (দুর্বার ১৯৯৭)। এইচআইভি/এইডস অতিমারী প্রতিরোধ করতে গিয়ে সোনাগাছি প্রকল্পের ও দুর্বারের কর্মীরা মানুষ হিসেবে আধুনিক যৌনকর্মীদের নাগরিক ও সামাজিক অধিকারের, আর যৌন পরিষেবায় নিয়োজিত শ্রমজীবী হিসেবে যৌনস্বাস্থ্যের এলাকায় তাঁদের পেশাগত অধিকারের অবিভাজ্যতার কথা বুঝতে পারেন, আর সেই বোধ থেকে প্রেরিত হয়ে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এরমধ্যে অন্যতম প্রধান পদক্ষেপ: যৌনকর্মীদেরই সহকর্মী যৌনশিক্ষাবিদ ও যৌনস্বাস্থ্যকর্মী বা পিয়ার এডুকেটর হয়ে উঠতে প্রেরিত করা ও প্রশিক্ষিত করা।

স্মরজিৎ তাঁর ছাত্রজীবনে ও পরে রাজনৈতিক প্রতিবাদে, আন্দোলনে, ও বিজ্ঞানমনস্কতার প্রচারে নিবেদিত সাংবাদিকতায় সক্রিয় ছিলেন। সোনাগাছি প্রকল্পের কাজে যোগ দেওয়ার আগে তিনি মানুষের পেশা সংক্রান্ত স্বাস্থ্যের অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করেছিলেন। তাঁর অতীত জীবনের সেই জ্ঞান, বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা কলকাতায় যৌন পরিষেবায় নিয়োজিত শ্রমজীবীদের পেশাগত স্বাস্থ্যের ব্যবস্থাপনা করে, এইচআইভি/এইডস অতিমারী প্রতিরোধ করার কাজ শুরু করেন। দুর্বার-এর এই কাজ ভারতে, দক্ষিণ এশিয়ায় ও সারা পৃথিবীতে আজও একটি বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

আমাদের যৌনকর্মীদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ সামাজিক, রাজনৈতিক ও আর্থিক নিরাপত্তাহীন, বিপদাপন্ন শ্রমজীবী মানুষ। তার ওপর, যৌনতা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিদ্যমান জড়তার, বিধিনিষেধের, কপটতার ও ভণ্ডামির কারণে, আমাদের আধুনিক সমাজে তাঁরা ব্রাত্য, ঘৃণিত ও নিন্দিত। এই পরিস্থিতিতে, গত শতাব্দীর শেষ দশকে কলকাতায়, পশ্চিমবঙ্গে ও ভারতে যৌনকর্মীদের নানা মৌলিক অধিকার আদায়ের একাধিক আন্দোলনের সূচিমুখ হিসেবে দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি আত্মপ্রকাশ করে। এই আন্দোলনগুলির সুবাদে কলকাতার যৌনকর্মীদের সঙ্গে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের ও অন্য দেশের যৌনকর্মীদের ও স্বাস্থ্যকর্মীদের, মহিলা যৌনকর্মীদের সঙ্গে পুরুষ যৌনকর্মীদের, তাঁদের অপেক্ষাকৃতভাবে স্থায়ী খদ্দেরদের, সমকামীদের, শবরদের, সমুদ্রগামী জেলে, ট্রাক ড্রাইভার, নাচনি, যাত্রাপালা, নাটক, সিনেমা আর টেলিভিশনের সিরিয়ালের নির্দেশক ও অভিনেতা-অভিনেত্রী, বাউলদের ও আধুনিক গায়ক-গায়িকাসহ অন্যান্য বিনোদনকর্মীদের, বিভিন্ন স্তরের শ্রমজীবী মানুষের নানা সংগঠনের, আর রাজনীতিবিদ, চিকিৎসক, আইনজীবী, শিক্ষক, অধ্যাপক, কবি, সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, খেলোয়াড় ও সাংবাদিকদের নিবিড় যোগাযোগ গড়ে ওঠে। কলকাতায় ও অন্য জায়গায় দুর্বার-এর উদ্যোগে ধারাবাহিকভাবে আয়োজিত মে দিবসের মাঝরাতের মিছিলে, বিভিন্ন মেলায়, উৎসবে, সভায়, সমাবেশে ও সম্মেলনে মুম্বই শহরে ২০০৪ সালে আয়োজিত বিশ্ব সামাজিক মঞ্চে, আর ভারতে ১৯৫৬ সালে জারি করা তথাকখিত অনৈতিক কারবার (নিবারণ) অধিনিয়ম তুলে দেওয়ার দাবিতে ২০০৬ সালে দিল্লিতে কয়েক হাজার মানুষের সমাবেশে ও পার্লামেন্ট অভিযানে— যৌনকর্মীদের অধিকার অর্জনের আন্দোলনের সঙ্গে এই সকল স্তরের মানুষের মৈত্রীর ও সহমর্মিতার প্রতিফলন ঘটে।

দুর্বারের শিক্ষামূলক কাজকর্ম আমাদের সমাজের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সমকালীন বিষয়কে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছে। দুর্বার, সমাজ ও সরকারকে একথা বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে, দালাল, মালকিন, বাড়িওয়ালা, সুদের কারবারি মহাজন, গুন্ডা ও পুলিশের জোর-জবরদস্তি, মারপিট আর আর্থিক নিপীড়ন হতে মুক্ত পরিবেশেই, যৌনকর্মীদের ও খদ্দেরদের মধ্যে নিরাপদ বিনোদনমূলক যৌন আচরণের বন্দোবস্ত করে, তাঁদের রোগমুক্ত যৌনস্বাস্থ্যের অধিকার সুনিশ্চিত করা যেতে পারে।

বর্তমানে আমাদের পারিবারিক ও পরিবারের বাইরের যৌনজীবন, যৌনস্বাস্থ্য ও বিনোদনমূলক যৌন পরিষেবার বাজার নানা মাত্রায়, প্রতিনিয়ত ও দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। অন্য বহু পরিষেবা প্রদানকারী শ্রমজীবীর পেশার মত যৌনপরিষেবার পেশাও গভীর সংকটে পড়েছে। তার ওপর, কোভিড-১৯ ভাইরাসের অতিমারীর যে ঝড়ের ধাক্কায় গত বছরে স্মরজিৎ মারা গিয়েছেন, তার দাপটে অন্য বহু পেশার মত যৌনকর্মীদের পেশার পুরোনো রূপগুলিও কিছু দিনের মধ্যেই প্রায় লাটে ওঠে।

আজ থেকে প্রায় একশো আশি বছর আগে, ফরাসি দার্শনিক, অর্থশাস্ত্রবিদ ও সাংবাদিক আঁতোয়ান-ইউজিন বুরে (১৮১০-১৮৪২) রচিত ইংল্যান্ডে ও ফ্রান্সে শ্রমজীবী শ্রেণিগুলির দারিদ্র (১৮৪২) শীর্ষক একটি বই পড়ার সময়ে নেওয়া একটি নোটে কার্ল মার্ক্স লিখেছিলেন: “সম্পত্তি ও চরম নিঃস্বতা কি থাকা উচিত? বিবাহ ও গণিকাবৃত্তি, পরিবার ও পরিবারহীনতা কি থাকা উচিত? এই ব্যাপারগুলির সবকয়টিই তাদের নিজ নিজ বৈপরীত্যে বিকশিত হয়েছে, আর কেবলমাত্র অতি বড় মিথ্যা ও মোহমায়া মারফত সাধারণ স্থির-নিশ্চিত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পেরেছে’’ (মার্ক্স ১৯৯৮: ১৪২-১৪৩)। এই বাক্যগুলি আজও উন্মুক্ত প্রশ্ন হিসেবে বজায় রয়েছে।

এই প্রশ্নগুলির বিষয়বস্তু ও সেগুলির উত্তরের আলোচনা আমাদের যৌনসঙ্গিনী বান্ধবীদের-স্ত্রীদের আর যৌনকর্মীদের একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। পিতৃতন্ত্রের বা পুরুষ-প্রাধান্যের শাসন ও লোকাচার হতে মেয়েদের মুক্তির আলোচনার ও প্রয়াসের পরিধির মধ্যে আমাদের মজুরিহীন যৌনসঙ্গিনী বান্ধবীরা-স্ত্রীরা, আর যৌন পরিষেবার বাজারে মজুরিশ্রমে নিয়োজিত আমাদের যৌনকর্মীরা একে অপরের পরিপূরক। আমাদের যৌনকর্মীরা পিস-রেটের ও অনিয়মিত বন্দোবস্তের যৌনসঙ্গী বা স্বামী। পিতৃতন্ত্র হতে উত্তরণ তাই খদ্দের-স্বামী দশা হতে ছেলেদের, আর যৌনকর্মী-স্ত্রী দশা হতে মেয়েদের যুগপৎ উত্তরণ ছাড়া অন্য কোনওভাবে সম্ভব নয়। কতদিনে আর ঠিক কোন কোন পর্যায় পার হয়ে তা সম্ভব হবে তা আমরা আজও জানি না।

আমাদের অপেক্ষাকৃতভাবে স্থায়ী ও আংশিক সময়ের ভ্রাম্যমাণ যৌনকর্মীরা, তাঁদের দীর্ঘস্থায়ী ও অস্থায়ী খদ্দেররা, আর আয়ের জন্য তাঁদের ওপর নির্ভর করে থাকা বাড়িওয়ালা/বাড়িওয়ালি, মালিক/মালকিন, পাচারকারী, দালাল, পুলিশ, স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারী ও পুনর্বাসন শিল্প-বাণিজ্যের অন্তর্গত উদ্ধারকারী এনজিও-গুলির, আর খয়রাতি পুঁজির মালিকদের সেবায় নিয়োজিত দাতা সংস্থাগুলির মালিক ও কর্মচারীরা সকলেই জন্মসূত্রে নানা পরিবার হতে আগত। তাঁরা সকলেই পরিবারের ও পরিবারহীনতার, আর সম্পত্তির ও নিঃস্বতার নানা স্তরে জীবন কাটান। তাই আমাদের যৌনকর্মীদের কেন্দ্র করে আবর্তিত, এঁদের সকলের জীবনের বর্তমান দশা হতে উত্তরণের পথের সন্ধান, আমাদের জায়মান নাগরিক সমাজগুলি হতে আরও সংবেদনশীল, আরও মানবীয় সমাজে উত্তরণের পথে যাত্রার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন স্তরের সমাজগুলি নানা মাপের রাষ্ট্রের অধীন। ফ্রান্স, জার্মানি, পর্তুগাল, জাপান, ভুটান, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি অপেক্ষাকৃত ছোট মাপের রাষ্ট্রগুলির মধ্যেকার অধিকাংশ সমাজ খানিকটা কাছাকাছি দূরত্বের সামাজিক সময়ের মধ্যে বিরাজ করে। আর নাইজেরিয়া, ভারত, চিন, রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত বড় মাপের রাষ্ট্রগুলির নানা সমাজ, সামজিক সময়ের বিচারে তুলনামূলকভাবে একে অপরের থেকে বেশি দূরত্বে অবস্থান করে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের অরণ্য-পর্বতের প্রায় নব্য প্রস্তর যুগের কৃষিপূর্ব সমাজের শিকারী ও ফলমূল-আহরণকারী অধিবাসীদের, আর আমাদের শহরগুলির ডিজিটাল শিল্প-সংস্কৃতির, আন্তর্জাল-নির্ভর কর্মীদের মধ্যেকার সামাজিক সময়ের দূরত্ব প্রায় আট-দশ হাজার বছরের। এঁদের মাঝখানের জায়গাটা জুড়ে রয়েছে কয়েক হাজার ভাষা-ভাষী, বহু স্তরের জাতিভেদ প্রথায় নিমজ্জিত, গ্রামের, মফস্বলের ও শহরের, চাষবাসের ও শিল্প-বাণিজ্যের অগণিত সমাজ। এখানে সকলের স্বাস্থ্য, জীবন, জীবিকা ও শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য অনেক স্তরের বহু বড় বড় ভিত্তি তৈরি করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে স্মরজিতের ও দুর্বারের কাজের এলাকার, অর্থাৎ, আমাদের নিরাপদ ও নিরোগ যৌনজীবনের ব্যবস্থাপনার কথাটাই বিবেচনা করা যাক।

গত শতাব্দীর বিশের দশকে রঘুনাথ খোঁডো কর্ভে (১৮৮২-১৯৫৩) মহাশয় মুম্বই শহরে আমাদের দেশের আধুনিক যৌনসাক্ষরতার অভিযান শুরু করেন (কর্ভে ১৯৩১)। তার পর থেকে প্রায় একশো বছর পার হয়ে গেছে; কিন্তু আজও আমাদের দেশের বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন সমাজের শাসকদের ও শাসিতদের কর্মরত ও বেকার, সচ্ছল ও দরিদ্র, মেয়েদের ও ছেলেদের, আর এই দুই লিঙ্গ পরিচয়ের বাইরে এলজিবিটিকিউ+ পরিচয়বাহী, প্রাপ্তবয়স্ক, কিশোর-কিশোরী ও শিশুদের, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, অসুস্থ ও প্রতিবন্ধীদের, আর কর্মহীন ও অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের যৌনজীবন যে ঠিক কেমন— সে সম্বন্ধে আমাদের কাছে কোনও নির্ভরযোগ্য ও প্রতিনিধিত্বমূলক তথ্য নেই (বকশি ও বকশি ২০১০)। সে তথ্য না জেনে আমাদের সকলের জন্য কোনও যৌনস্বাস্থ্য পরিষেবা গড়ে তোলা যাবে না। সেই দরকারি তথ্য যোগাড় করার জন্য সবার আগে একটি ‘সর্বভারতীয় মানবীয় যৌনজীবন সর্বেক্ষণ সংস্থা’ বা ‘সার্ভে অব হিউম্যান সেক্সুয়াল লাইভস ইন ইন্ডিয়া’ গড়ে তুলতে হবে। আর সেই সর্বেক্ষণের আলোকে, আমাদের আগামী প্রজন্মগুলির স্বার্থে, বর্তমানে, আমাদের সকলের যৌনসাক্ষরতার ও যৌনস্বাস্থ্যের লক্ষ্যে নিবেদিত বহুমুখী, গভীর ও ব্যাপক সামাজিক অভিযান ও আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে। সেইসব অভিযান ও আন্দোলন আমাদের বিদ্যমান যৌন অসন্তোষের, ক্ষোভের, বঞ্চনার ও মিথ্যাচারের অবসান ঘটিয়ে আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অনুসন্ধিৎসার ও সৃজনশীলতার নতুন নতুন স্রোতমুখ খুলে দেবে। পরিণতিতে, আগামী দিনে আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির সব স্তরে সকলেই উপকৃত হবেন।

উল্লেখপঞ্জি

কপুর: Kapoor, Nandini (2021), UNAIDS Saddened by the death of Smarajit Jana https://www.unaids.org/en/resources/presscentre/featurestories/2021/may/20210510_smarajit-jana

কর্ভে: कर्वे, रघुनाथ धोंडो (1931), समाजस्वास्थ्य मासिकातील निवडक लेख, वर्ष १ ते ३, १९३१ [সমাজস্বাস্থ্য মাসিক পত্রিকা থেকে নির্বাচিত নিবন্ধ, ১ম-৩য় বর্ষ, ১৯৩১], मुंबई: र. धों. कर्वे, राइट एजेंसी: https://archive.org/details/in.ernet.dli.2015.366682

গোজেস, ওলিম্প দ্য (১৭৯১), Déclaration des droits de la femme et de la citoyenne, Paris, বাংলা অনুবাদ: মেয়েদের ও নাগরিকাদের অধিকারের ঘোষণাপত্র (২০০৭), কলকাতা: https://www.academia.edu/26179293/Olympe_de_Gouges_Meyeder_O_Nagarikader_Adhikarer_Ghoshonapotro_1791

ড্যানিয়েলস: Daniels, Roland (1851/1984) an Karl Marx, 08 Februar-01 Juni 1851, in Marx-Engels-Gesamtausgabe2 (MEGA2) [মার্ক্স-এঙ্গেলস-রচনাসমগ্র2 (মাএরস2)] III/4 [তৃতীয় বিভাগ/ চতুর্থ খণ্ড] (১৯৮৪), Text, Anhang [পরিশিষ্ট]: 308-09, 320, 336-41, 345-46, 355-57, 360-65, 385-87, 391-96, Berlin: Dietz Verlag, মানুষের স্বাস্থ্য, শ্রম, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানসমূহ প্রসঙ্গে কার্ল মার্ক্সকে লেখা রোলান্ড ড্যানিয়েলসের চিঠিপত্র, ৮ই ফেব্রুয়ারি-১লা জুন ১৮৫১ (বাংলা অনুবাদ: ১৯৮৬, কলকাতা, পরিমার্জিত পাঠ ২০০৮):
https://www.academia.edu/25416987/Daniels_to_Marx_On_Human_Health_Labour_Technology_and_the_Sciences

__ (1851/1988), Mikrokosmos: Entwurf Einer Physiologischen Anthropologie [মানুষ— শারীরবৃত্তীয় নৃবিদ্যার একটি খসড়া রূপরেখা], Erstveroeffentlichnung Des Mamuskripts Von 1851 [১৮৫১ সালে রচিত পাণ্ডুলিপিগুলির প্রথম প্রকাশ]; Hrsg. von Helmut Elsner (1988), Frankfurt/ M etc.: Peter Lang.

দুর্বার (১৯৯৭), এ লড়াই জিততে হবে, দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি আয়োজিত যৌনকর্মীদের প্রথম সর্বভারতীয় সম্মেলনে তাঁদের জবানবন্দি, কলকাতা, দুর্বার।
__ (1997-), প্রকাশনার তালিকা: https://durbar.org/publication/
__ (2021), A Tribute to Dr. Smarajit Jana

A tribute to Dr. Smarajit Jana

Tribute to Dr Smarajit Jana

বকশি, সুমিতা ও প্রদীপ (2010), “ভারতীয় উপমহাদেশের অধিবাসীদের যৌনজীবনের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে”, দুর্বার ভাবনা, দ্বিতীয় বর্ষ, প্রথম সংখ্যা: ৩-৮, কলকাতা: দুর্বার।

মার্ক্স: Marx, Karl (1998), Exzerpte and Notizen Sommer 1844 bis Anfang 1847 [উদ্ধরণ ও নোট: ১৮৪৪ সালের গ্রীষ্ম হতে ১৮৪৭ সালের প্রারম্ভ], MEGA2 IV/3 [মাএরস2 চতুর্থ বিভাগ/তৃতীয় খণ্ড], Berlin: Akademie Verlag.

রায়, রামমোহন (১৮২২), “হিন্দুদের উত্তরাধিকার আইন অনুসারে নারীদের প্রাচীন অধিকার-সীমার আধুনিক অবৈধ লঙ্ঘন প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য’’, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গ: নির্বাচিত ইংরেজি রচনার বাংলা অনুবাদ, ১৯৯৮: ১-১০, কলকাতা: বিশ্বকোষ পরিষদ।

চিত্র: গুগল
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

আবদুল্লাহ আল আমিন

মাহমুদ দারবিশের কবিতায় ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রাম

যুবা-তরুণ-বৃদ্ধ, বাঙালি, এশিয়ান, আফ্রিকান যারাই তাঁর কবিতা পড়েছেন, তারাই মুগ্ধ হয়েছে। তাঁর কবিতা কেবল ফিলিস্তিনি তথা আরব জাহানে জনপ্রিয় নয়, সারা বিশ্বের ভাবুক-রসিকদের তৃপ্ত করেছে তাঁর কবিতা। তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক পঠিত নন্দিত কবিদের একজন।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর কবিতা: কিছু কিছু পাপ

শৈবাল কে বলেছ তাকে, এ যে বিষম পাথরে/ সবুজ জমা, গুল্মলতা পায়ে জড়ায়, নাগিনী/ হিসিয়ে ফণা বিষের কণা উজাড় করো আদরে/ তরল হিম, নেশার ঝিম কাটে না তাতে, জাগিনি

Read More »
সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »