Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

চোখের আলোয়

অনেকেই কোনও খবর রাখিনি, আমরা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ পক্ষকাল পালন করছি। জাতীয় চক্ষুদান পক্ষ, ২৫-এ আগস্ট থেকে ৮-ই সেপ্টেম্বর; ভারতে এই পনেরো দিন দেশবাসীকে চক্ষুদানের ব্যাপারে খবরাখবর পৌঁছে দিতে, জনসচেতনতা প্রসারে ও চক্ষুদানের অঙ্গীকারে নানা কাজকর্ম হয়ে থাকে। ডা. আর ই এস মুথাইয়া ১৯৪৮-এ চেন্নাইতে প্রথম কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করেন। তাঁর উদ্যোগেই চেন্নাই রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অফ অফথ্যালমোলজি-তে ভারতের প্রথম আই ব্যাঙ্ক গড়ে ওঠে। তাহলে আমরা এবছর সেই উদ্যোগের পঁচাত্তর বছরে পদার্পণ করেছি। এমন এক গুরুত্বপূর্ণ পক্ষকালে ভারতের দৃষ্টিহীন মানুষ, চক্ষুদান ও কর্নিয়া প্রতিস্থাপন কোনখানে দাঁড়িয়ে দেখে নেওয়া যাক।

National Programme for Control of Blindness (NPCB)-এর ২০২০-র হিসেবে নানান বয়স মিলিয়ে ভারতে প্রায় ৪.৮ কোটি দৃষ্টিহীন মানুষ রয়েছেন। এর মধ্যে দুটি চোখেরই কর্নিয়ার কারণে অন্ধত্ব ৭.৪ শতাংশের। আশার কথা, গত দশ বছরে এর প্রায় ৫০ শতাংশ দৃষ্টিহীন মানুষের সংখ্যা কমেছে। যাই হোক, এখনও ভারতে কমবেশি ৬৮ লক্ষ মানুষ শুধুমাত্র কর্নিয়ার অসুস্থতার কারণে দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতায় জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে ৪০ লক্ষ মানুষের দুই চোখের কর্নিয়াই বিপন্ন। এ দেশে বছরে এক লক্ষ কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হলেও কুল্লে ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়। আবার পরবর্তী বছরে নতুন কর্নিয়া-জনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে প্রায় ২০,০০০। তা আই ব্যাঙ্ক এবং চক্ষুদানের উদ্যোগকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

পাঁচটি স্তর নিয়ে কর্নিয়া গঠিত।

চক্ষুদান নিয়ে মানুষের মনের মধ্যে জমাট বেঁধে আছে নানা ভীতি, অন্ধসংস্কার আর ভিত্তিহীন বিশ্বাস। অথচ চক্ষুদান মানে মোটেই শবদেহের কোনও বিকৃতি দেখা যাবে না; পরজন্ম যদি থেকেও থাকে তবে অন্ধ হয়ে জন্মানোর অভিশাপ নিতান্তই কষ্টকল্পনা। কোনও ধর্মগ্রন্থেই মরণোত্তর চক্ষুদানে কোনও আপত্তির কথা বা কারণ লেখা নেই।‌‌ তবু মানুষের মনে কোথায় যেন একটা জড়তা চেপে বসে আছে। প্রয়াত প্রিয়জনের চোখদুটি যদি দৃষ্টিহীন গ্রাহকের চোখে প্রতিস্থাপন করা হয়, তবে সেই মানুষটি তো আরও কতদিন এই সুন্দর পৃথিবীর আলো, রং, রূপ দেখতে থাকবেন। এ তো একরকম মরণোত্তর জীবন বলা চলে। অনেক ক্ষেত্রেই যদি বা কোনও মানুষ তাঁর চক্ষুদুটি লিখিতভাবে দান করেও যান, দেখা যায় মৃত্যুর পর আত্মীয়-স্বজনের নানান ওজর-আপত্তিতে মৃতের নিকট আত্মীয়েরা পিছিয়ে যান। তাই জাতীয় চক্ষুদান পক্ষটিতে আমাদের বিদ্যালয় স্তর থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কাছে অবধি সচেতনতার বার্তা নিয়ে পৌঁছতে হবে।

এখন দেখা যাক, কর্নিয়া বলতে আমরা কী বুঝব। চোখের ওপরে পাতলা (৫০০ থেকে ৬০০ মাইক্রন) স্বচ্ছ আবরণীকলার নাম কর্নিয়া। পাঁচটি স্তর নিয়ে কর্নিয়া গঠিত। রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী এই পুরো স্তরগুলি অথবা উপরিস্তরটি মৃত মানুষটির চোখের ওপর থেকে মৃত্যুর ছয় ঘণ্টার মধ্যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। এই কর্নিয়া সংগ্রহের জন্য মৃত ব্যক্তির চোখে কোনও রকম বিকৃতি হয় না। চাইলে কৃত্রিম স্বচ্ছ প্লাস্টিকের আবরণী দিয়ে চোখের উপরিতল ঢেকেও দেওয়া যেতে পারে। সংরক্ষিত সুস্থ কর্নিয়া পরে কোনও রোগীর অসুস্থ কর্নিয়া সরিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয় (কেরাটোপ্লাস্টি)। কর্নিয়ার রোগে রোগী কিছুই স্পষ্ট দেখতে পারেন না; সব কিছুই ঘোলাটে অস্বচ্ছ লাগে, কেননা চোখের রেটিনাতে স্পষ্ট ছবি তৈরিতে আলোকে লেন্সের ভিতর দিয়ে সঠিকভাবে প্রতিসরণের মুখ্য দায়িত্ব এই কর্নিয়ার। তাই মৃত্যুর পর চোখদুটি পুড়িয়ে দিয়ে, বা মাটির নিচে চাপা দিয়ে, যদি নষ্ট না করে, দান করে দেন, তাহলে মৃত মানুষটির চোখ দিয়ে আরও দীর্ঘদিন একজন বা দুজন জীবিত মানুষ এই আলো আর রঙের দুনিয়ায় সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারবেন।

সারা দেশে Eye Bank Association of India (EBAI)-র অধীনে কমবেশি ৭৫০টি আই ব্যাঙ্ক ও চক্ষু সংরক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এগুলির মধ্যে ১৫টি আই ব্যাঙ্ক দেশের বার্ষিক কর্নিয়া সংগ্রহের অর্ধেক সংগ্রহ করে থাকে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে বলছে, আমাদের রাজ্যে মোট দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের ৩.৫% থেকে ৪.২% মানুষ অসুস্থ কর্নিয়ার কারণে দৃষ্টিহীন। এখন এই রাজ্যে কর্নিয়া সংগ্রহ যথেষ্ট বেড়েছে; বিগত পনেরো বছরের সংগৃহীত কর্নিয়ার যথাযথ ও সফল ব্যবহার ২৬.৫% থেকে বেড়ে ৫৯% হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় সাফল্য। কলকাতার Regional Institute of Ophthalmology (RIO) জানাচ্ছে, ২০১৫ থেকে ২০১৮-র মধ্যে সংগৃহীত ৬৩৪৮টি কর্নিয়ার ২৬৫৭টির উপযুক্ত ব্যবহার সম্ভব হয়েছে। এই সংখ্যা আরও বাড়াতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

এ রাজ্যের ৩১টি আই ব্যাঙ্কের ৯টি আছে কলকাতায় আর বাকি সব জেলায় ছড়িয়ে। এছাড়াও রয়েছে কমবেশি ৪০টি চক্ষু সংগ্রহ ও সংরক্ষণ কেন্দ্র। এখন দরকার চক্ষুদানের জন্য জনসচেতনতা প্রসারের কাজে সকলের অংশগ্রহণ; এগিয়ে এসে নিজে সপরিবারে চক্ষুদানের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে স্বজন-প্রতিবেশীকে উদ্বুদ্ধ করার কাজ ত্বরান্বিত করা। মনে রাখতে হবে চক্ষুদানে দাতা ও গ্রহীতার ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, জাতি কিছুই কোনও বাধা নয়; এমনকি রক্তের গ্রুপ নিয়েও কোনও বাছবিচার নেই। দরকার শুধু প্রয়াত মানুটির স্বজন-পরিজনের মুক্তমনের দরদী চিন্তার। তাহলেই আগামী দিনে এ দেশে সুস্থ চোখের মানুষ যথার্থই চক্ষুষ্মান হয়ে উঠবেন, এগিয়ে আসবেন দৃষ্টিহীন মানুষকে দৃষ্টিদানে।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × two =

Recent Posts

কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধ: অন্ধকারে আলোর দিশারী

তিনি বলেন গেছেন, হিংসা দিয়ে হিংসাকে জয় করা যায় না, তাকে জয় করতে প্রেম ও ভালবাসা দিয়ে। মৈত্রী ও করুণা— এই দুটি ছিল তাঁর আয়ুধ, মানুষের প্রতি ভালবাসার, সহযোগিতার, বিশ্বপ্রেমের। তাই তো তাঁর অহিংসার আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে,— চীন, জাপান, মায়ানমার, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানে। এই বাংলায় যে পালযুগ, তা চিহ্নিত হয়ে আছে বৌদ্ধযুগ-রূপে। সুদীর্ঘ পাঁচ শতাব্দী ধরে সমগ্র বাংলা বুদ্ধ-অনুশাসিত ছিল। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ বৌদ্ধ কবিদের দ্বারাই রচিত হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

স্যার রোনাল্ড রস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য

রোনাল্ড রসকে তাঁর গবেষণার সহায়তাকারী এক বিস্মৃত বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯২৯)। তাঁর অবদান কিন্তু খুব কম নয়। তিনি ছিলেন রস-এর অধীনে সহ-গবেষক। রস নোবেল পেলে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর নেতৃত্বে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কিশোরীনাথের ভূমিকার বিষয়টি বড়লাট লর্ড কার্জনকে জানান। কার্জন এ-বিষয়টি ব্রিটিশ সরকারের গোচরে আনেন। এর ফলে ১৯০৩ সালে যখন দিল্লিতে দরবার বসে, তখন ডিউক অফ কনট-এর মাধ্যমে কিশোরীনাথকে ব্রিটিশরাজ সপ্তম এড‌ওয়ার্ড-এর তরফ থেকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। পরে কলকাতা
র সেনেট হলে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সভাপতি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

দুই হুজুরের গপ্পো

১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই, আলবার্ট আইনস্টাইন বার্লিনের উপকণ্ঠে নিজের বাড়িতে স্বাগত জানান ভারতীয় কবি, দার্শনিক ও সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেল বিজয়ী। তাঁদের এই সাক্ষাৎকারটি ইতিহাসের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত ও মননশীল আলাপচারিতায় পরিণত হয়, যেখানে তাঁরা বিজ্ঞান ও ধর্মের চিরন্তন দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেন। “সায়েন্স অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান ট্রাডিশন: হোয়েন আইনস্টাইন মেট টেগোর” গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই বইতে বিশ শতকের শুরুতে ভারতের বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ এবং ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক চিন্তার মেলবন্ধন তুলে ধরা হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শতবর্ষী বাঙালি

বাঙালিদের মধ্যেও শতায়ু লোক নেহাত কম নেই। একটা কথা মনে রাখা জরুরি, বিখ্যাত ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের আয়ু নিয়ে বিশেষ কোনও গবেষণা থাকে না। আবার একটু বেশি বয়স্ক মানুষকে শতায়ু বলে চালিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ-ও রয়েছে। তবে শতবর্ষের আয়ুলাভ যে মানুষের কাঙ্ক্ষিত, তা উপনিষদের‌ একটি বাক্যে সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে— ‘জীবেম শরদঃ শতম্’, অর্থাৎ শতবর্ষ বাঁচতে ইচ্ছে করবে। কেবল অলস জীবন নিয়ে বাঁচবার ইচ্ছে করলেই হবে না, কর্ম করে বাঁচার কথাও বলা হয়েছে সেখানে— ‘কুর্বেন্নেবেহ কর্মাণি জিজীবিষেচ্ছতম্ সমাঃ’।

Read More »