Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

পেয়ারা গাছ ও উল্টোদিকের হাওয়া

বাড়িটার কী অবস্থা, রবি? ফোনে জিজ্ঞাসা করল অনুপম। রবি বলল, আছে। এখনও দাঁড়িয়ে আছে। আয় চলে আয় একদিন। দেখা হবে, বাড়িটাও দেখতে পারবি। বাল্যকালটাও মনে পড়বে। ঘুরে যা।

দীর্ঘ কুড়ি বছর বিদেশবাসের পর নিজের দেশের বাড়িটি দেখতে যাবে ঠিক করল অনুপম। সঙ্গে বিভান। আগের বারে যখন এসেছিল তখন বিভান ছোট। কলকাতায় এসে বিভানের মামার বাড়িতে ছিল। চন্দননগর যাওয়া হয়নি। বিভানকে সে অনেক দিন বলেছে, গিয়ে দেখবি কী সুন্দর আমাদের বাড়ি। দোতলা বাড়ি, চার দিকে বাগান, বাগানের পিছনে একটি কাঁঠাল গাছ। পুকুরপাড়ে কলা বাগান। চন্দননগরের শেষপ্রান্তে, যেখানে মানকুন্ডু শুরু, ঠিক সেই সংযোগস্থলে আমাদের বাড়িটি ছিল খুব বিখ্যাত। কত যে বিখ্যাত লোক আসত আমাদের বাড়িতে। জ্যাঠামশাই ও বাবা রাজনীতি করতেন, সেই কারণে আমাদের বাড়িটি একডাকে চিনত সবাই। চল, এমন বাড়ি তুই কোথাও পাবি না।

বিভান বলল, কোনও বিখ্যাত মানুষ এসেছিল?

শুনেছি নেতাজি, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এমন অনেকে এখানে সভা করতে এসে আমাদের বাড়িতে থেকেছেন। আমার মা ও জেঠিমা খুব ভাল আদরযত্ন করে খাইয়েছিলেন।

ওঁদের সঙ্গে তোমার ছবি আছে?

না বোধ হয়। আমি তখন ছোট। দেখতে হবে। বাড়ির দেওয়ালে টাঙানো ছবির মধ্যে দেখতে হবে।

বিভানের হাতে একটি ক্যামেরা, মাথায় টুপি, চোখে রঙিন চশমা। রিকশা থেকে নেমে বাড়িটির সামনে এসে দাঁড়াতেই এক বৃদ্ধা। বিভানের মুখটি ধরে আদর করে বলল, আমাদের খোকাবাবুর ছেলে কী মিষ্টি দেখতে হয়েছে গো?

অনুপম বলল, লীলা মাসি, তুমি কেমন আছ?

লীলা অনুপমের দিকে তাকিয়ে বলল, যেমন দেখছ। ছেলেকে নিয়ে এসছ বলে খুব খুশি হয়েছি।

হাঁ, নিয়ে এলুম। নিজেদের ভিটেবাড়িটা দেখবে না তা কি হয়? বলে বাড়ির সামনে সিমেন্টের ধাপির ওপর বসে পড়ল অনুপম। লম্বা বারান্দা,
বড় বড় লাল রঙের থাম। থামের নীচে ও উপরে নানা ডিজাইন। প্রতিটি থামের পিছনে একটি করে ঘর। ঘরের সাইজ আজকালকার ফ্ল্যাটের মত খুপরি নয়। আঠারো বাই কুড়ি ফুটের ঘর। খাট, পালঙ্ক সব ঢুকে যায় ঘরের মধ্যে। তারপরেও ঘরে হাত-পা ছড়িয়ে আড্ডা মারার জায়গা অনেক। এত বড় বাড়িতে একা থাকে লীলা মাসি। বিভান ক্যামেরা উঁচিয়ে ছবি তুলতে যাবে, অনুপম বলল, আগে গোটা বাড়িটা দেখে নে, পরে না হয় ছবি তুলবি। কেউ তো পালিয়ে যাবে না?

অনুপমের দিকে তাকাল বিভান। মুখে কিছু বলল না। ফোটগ্রাফি তার নেশা।

বিভান ঘুরে বেড়াচ্ছে সারা চৌহদ্দি জুড়ে। কখনও বসে, কখনও নিচু হয়ে কখনও ক্যামেরা তাক করে আছে ছাদের দিকে। বিভান যেন নতুন জীবন পেয়েছে। অনুপম তাকিয়ে দেখল লীলা মাসিকে। শেষবার যখন রাগে-দুঃখে এই বাড়ি ছেড়েছিল, তখন লীলা মাসি ছিল পূর্ণযৌবনা। বিমানের সঙ্গে বিয়ের বছর দুই কেটেছে। এই দুই বছরে অনেক চেষ্টা করেছিল কিন্তু পারেনি। বিমানের পাশে তার মায়ের পরিবর্তে লীলা মাসিকে সে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। আর পারেনি বলেই একদিন এই চন্দননগর ছেড়ে চলে গিয়েছিল কলকাতা। তারপর আমেরিকা। বিমানের মৃতুর খবরে কাজের জন্য এসেছিল। সেই শেষ। তার পর সে আর এইমুখো হয়নি। কেনই বা হবে? লীলা মাসির ছেলেরা তার সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করেনি। কে কোথায় আছে জানারও প্রয়োজন পড়েনি।

একটা প্লেটে দুটো মিষ্টি ও জল এনে লীলা মাসি বলল, ছেলেটা ভারি মিষ্টি হয়েছে। বউমা কেমন আছে?

ভাল।

তা তোমার ছেলেমেয়ে?

দুই ছেলে এক মেয়ে।

কলকাতায় এসেছে?

না। আমি বিভানকে নিয়ে একাই এসেছি।

মেয়ে বড়?

হাঁ। এবার কলেজে যাবে।

বাঃ বাঃ। ওদের খুব দেখতে ইচ্ছে করে।

কোনও উত্তর দিল না অনুপম। কেন ইচ্ছে করবে? সে তো তাদের কেউ নয়। তার সঙ্গে তারই কোনও সম্পর্ক নেই তো তার ছেলেমেয়েদের কেন হবে? বাবা বিয়ে করেছিলেন বলে? কথাটা মনে হতেই মাথায় বহু দিনের রাগটি ফোঁস করে উঠল।

অনুশীলার কঠিন রোগে মৃত্যুর ছ’মাস যেতেই লীলাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল বিমান। ইস্কুলের শেষধাপে অনুপম। কম কথা শুনতে হয়নি তাকে। ইস্কুলের বন্ধুবান্ধব, পাড়ার বন্ধুদের নানান ফিসফাস তাকে প্রায় প্রতিনিয়ত বিদ্ধ করত। লীলাকে মা বলেনি কোনওদিন। মাসি বলে সম্বোধন করেই কাটিয়ে দিয়েছিল দিন। ইস্কুল শেষ করে সেই যে সে কলকাতায় চলে গিয়েছিল, কোনওদিন আর ঘরমুখো হয়নি। বিমান অনেক চেষ্টা করেছিল। লাভ হয়নি।

তোমরা দুপুরে খাবে তো? কী ভালবাসে বিভান? মাছ খায়?

না না তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না। আমরা হেভি ব্রেকফাস্ট করে এসেছি।

তা বললে কি হয়?

হয়। কিচ্ছু কোরো না। বলে বাড়িটি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল অনুপম।

বয়সের ভারে কুঁজো, ফর্সা গায়ের রং। শিরা-উপশিরা হাতের চামড়া ঠেলে তাকিয়ে আছে দুহাতের ওপর। চুল পেকে শনের নুড়ি। একটি চোখে ঘসা কাচ। অনুপমের মনে হল চোখের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে এসেছে লীলার। এক-একটি ঘর ঘুরে দেখতে থাকল অনুপম। দেওয়াল জোড়া বড় বড় ফ্রেমে পূর্বপুরুষদের ছবি। কোনও দেওয়ালে দেবদেবীর ছবি। যে ঘরটিতে সে এসেছে সেটি ছিল বসার ঘর। আর দেওয়ালে একটি ছবিতে অনুপম নিজেকে দেখতে পেল। বিভান বিভান, লুক, এখানে আমি কোথায় বল তো?

বিভান অনেক চেষ্টা করে বলল, ফিফথ ফ্রম দি লেফ্ট হ্যান্ড সাইড অব দি লাস্ট রো।

অনুপম বলল, ঠিক। বলেছিলাম না পাওয়া যাবে আমাকে পুরনো ছবির মধ্যে।

এই বাড়িটার সঙ্গে অনুপমের শৈশব ও কৈশোর লেগে আছে। বার বার মনে পড়ে এই বাড়িটির কথা তার বিদেশবাসে। তার এই বাড়িতে না আসার একটি কারণ তার বাবা বিমান। কোনও দরকার ছিল না তার লীলা মাসিকে বিয়ে করে অনুশীলার জায়গায় বসানোর। বিমান চাইলেও লীলাকে সে মা বলে ডাকেনি। কেন বিয়ে করেছিল বিমান? তার তো সংসার ভেঙে পড়ছিল না। ভেসে যাচ্ছিল না। তাদের লেখাপড়া ভালভাবেই হচ্ছিল। তা সত্ত্বেও বিমান লীলা মাসিকে বিয়ে করে একটি অঘটন ঘটিয়েছিল। অনুশীলা এই বাড়ির যেমন মধ্যমণি ছিল, লীলা মাসি ঠিক উলটো। এ বাড়িতে আসার কিছু দিনের মধ্যে লীলা মাসি সব কিছু নিজের কন্ট্রোলে রাখতে রাখতে বাড়িটা কেমন শৃঙ্খলের বাঁধনের মধ্যে চলে গিয়েছিল। প্রতিটি কাজের জন্য অনুমতি নিতে হত লীলা মাসির। এক-এক সময় দমবন্ধ হয়ে আসত অনুপমের। সেই চাপা কষ্ট আর অনুশীলার অনুপস্থিতি থেকে তার বাড়ির বাইরে চলে যাওয়া।

সিঁড়ির ওপরে পা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল অনুপম। তাকিয়েই চমকে উঠল সে। বাইরের দেওয়াল থেকে একটি পেয়ারা গাছ গজিয়ে উঠেছে। গাছটি আকারে বেশ বড়। শিকড় প্রায় সবটাই ঢুকে গেছে দেওযালের মধ্যে। মাকড়সার জালের মত আঁকড়ে ধরেছে দেয়াল। অনেকগুলো ডালে কচি কচি পাতা এসেছে। ছোট ছোট মুঁছি পেয়ারা এসেছে ডালে ডালে।। হাওয়ায় পাতাগুলো তিরতির করে নড়ছে। অনুপমের মনে হল, এই গাছটি কি এ বাড়ির উত্তরাধিকারী? যেভাবে গজিয়ে উঠেছে যে তাকে আর এই বাড়ি থেকে আলাদা করা যাবে না। বার বার তাকিয়ে দেখছিল অনুপম। বিভানের মত চঞ্চল, প্রাণবন্ত গাছটি রোদে হাসছে, খেলছে ও দুলছে হাওয়ায়।

কাছেপিঠে দেখতে পেল না বিভানকে। অনুপম ডাকল, বিভান, কোথায় তুই?

বিভান ছাদের উপরের সিঁড়ি থেকে উত্তর দিল, এখানে। উপরে উঠে এসো।

অনুপম লীলা মাসিকে বলল, একবার উপরে দেখে আসি।

যাও। দেখে এসো। কী আর দেখবে? সবই ভেঙে ভেঙে পড়ছে।

তাই নাকি? কেন সারানো হয়নি?

না। কে করবে? আমাকে তো দেখছ। এই শরীরে আমি কি পারি? তাছাড়া তুমি তো আছ?

কথাটি একেবারে মিথ্যে নয়। এই জরাজীর্ণ শরীরে বাড়ির মেরামত দেখভাল করা যে একেবারেই সম্ভব নয়, সে কথা বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। মাথা নাড়ল অনুপম। মনে হল অপরাধটি তারই। তারই মেরামতের কাজটি করানো উচিত ছিল। ভাষার ভিতর সেই কথাটা লুকিয়ে লীলা মাসি নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করছে। অনুপম বলল, হাঁ তোমার শরীর যে এত খারাপ হয়ে গেছে জানতাম না।

জানলে কী করতে? লীলা বলল।

জানি না। দূর থেকে অনেক কিছু খেয়াল রাখা যায় না মাসি।

তাহলে? বলার জন্য বলছ?

না। মনে হল তাই বললাম। বলে অনুপম দোতলায় এসে দাঁড়াল।

তার স্মৃতির দোতলার এখন একবারেই অন্য রূপ। সেই পুরনো দোতলার ছবিটি মনের মধ্যে টেনে আনল অনুপম। বাবার তৈরি এই বাড়ির বারান্দা থেকে ছালচামড়া খুলে পরার মত পলেস্তারা খসে পড়েছে মেঝেতে। বারান্দায় যে রেলিং ছিল তার বাল্যকালের খেলার প্রধান সঙ্গী সেটি কবে যেন ভেঙে, দাঁতমুখ খিঁচিয়ে ভেঙে পড়েছে। কিছু আধখেঁচড়া লেগে আছে বারান্দার গায়ে। পর পর তিনটি ঘরে চামচিকির বাসা। দরজা খুলতেই দু-চারটি চামচিকি ঘরের বাইরে উড়ে গেল। দিনের আলোয় চোখে পড়ল একদিকের দেয়াল ফেটে গিয়ে গাঁথনির ইট বেরিয়ে আছে, শ্যাওলা জমেছে ঘরের কোনায় কোনায়। একটি কাঠের পালঙ্ক পড়ে আছে একটি ঘরের মধ্যে। তার নীচে ঘুণের স্তর। বহুদিন কেউ ঝাড়পোঁছ করেনি। ঘরের কাছে যেতেই একটি ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে আসতেই অনুপম সরে এল বারান্দার দিকে। আর তখন শুনল রবির গলা, কী রে কেমন দেখছিস?

খুব খারাপ।

তা তো হবেই। আমাদের সেই ছোটবেলার দিনগুলো আর এখানে ফিরে পাওয়া যাবে না। কাকিমা পড়ে আছে একা। তোর সঙ্গে কে এসেছে?

ছোটছেলে। ক্যামেরা হাতে কোথায় যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আমিও দেখলাম সে নানান ভঙ্গিতে ছবি তুলছে বাড়ির পিছনের দিকে।

হাঁ, খুব ছবি তোলার শখ।

বারান্দায় একদিকে রাখা চেয়ারে বসল দুজনে। রবি বলল, কত দিন আছিস?

সামনের সপ্তাহে চলে যাব।

তোর সঙ্গে কতদিন পরে দেখা। মাঝে মাঝে তো আসতে পারিস?

হয় না। কাজের খুব চাপ। তাছাড়া এ তো কলকাতা নয় যে, লোকাল ট্রেন ধরে চলে আসব? এবার একটা সেমিনার ছিল কলকাতায়।

তাই বা আসতিস কবে? সেই যে গেলি।

ঠিক বলেছিস। বলে হাসল অনুপম।

কিছুক্ষণ ছবি তোলার পর বিভান উঠে এসেছে দোতলায়। বাড়িটির পুকুরের দিকটি এক পাশ থেকে ধসে গেছে। অন্যদিকে বারান্দার এক পাশ থেকে খুলে গেছে সাজানো বাগান। এখন শুধু পুরনো মাটির ঢিবি। বিভান জিজ্ঞেস করল, তোমার কোনও স্টাডি রুম ছিল না?

ছেলের মুখের দিকে তাকাল অনুপম। তারপর বলল, অই যে শেষের ঘরটি দেখছ অইখানে আমার ঘর। ঘরটি খুব ছোট্ট। বহু দিন খোলা হয়নি। বাইরে থেকে বোঝা যায়। দরজাটি খুলল রবি। বলল, দেখ এইটুকু ঘরে কত দিন যে আড্ডা দিয়েছি।

হুম। বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল অনুপম।

ঘরটির মধ্যে একটি বহু পুরনো খাট। চাদর ঢাকা। পড়ে আছে বহু বছর। যতদিন অনুপম চলে গেছে ততদিন থেকে পড়ে আছে। কেউ আর পরিষ্কার করেনি। বিভান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, সো স্মল। এটা আমার ঘরের ওয়ান টেন্থ। এখানে পড়াশুনা করতে তুমি! ভাবাই যায় না।

অনুপম বলল, আমাদের এর চেয়ে বেশি লাগত না।

রবি বলল, তোমার বাবা তো ইস্কুলেই সব পড়া করে আসত। বাড়িতে পড়তেই হত না।

বিভান খুব আশ্চর্যের চোখে দেখল। তার পর বলল, হুম, তোমার মেমারি খুব শার্প আমরা জানি।

হালকা হাসল অনুপম।

এই বাড়িটির একটা ইতিহাস আছে। অনুপমের ছোটবেলায় সে দেখেছে দেশের প্রধান নেতারা এই চন্দননগরে মিটিং করতে এলে তাদের বাড়িতে থেকে যেতেন এক রাত। জ্যাঠামশাই ও বাবা তাদের থাকার তদারকি করতেন। তাদের বাড়ির একটু দূরে গঙ্গার পাড়ে মাঠেয় মঞ্চ থেকে তারা বক্তৃতা দিতেন। বাড়ির ছাদ থেকে মা-জেঠিমা ও পাড়াপড়শিরা দল বেঁধে শুনত। লোকে বলত, স্বদেশ বাড়ি। লোকে এই বাড়ির সামনে দিয়ে যাবার পথে খুব সম্ভ্রমের সঙ্গে তাকাত। আজ আর কেউ ফিরেও তাকায় না।

রবি বলল, জানিস তো তোদের কলাবাগানে আজকাল রাতে চোলাইয়ের আড্ডা বসে। কেউ তো দেখার নেই। কে যে কী করছে রাতের বেলা তার কোনও হিসেব নেই।

করপোরেশন থেকে কিছু করে না?

কী করবে? কথা বলতে বলতেই ছাদের এক দিক থেকে পলেস্তারা খসে নিচে পড়ল। অনুপম ঝুঁকে দেখল বিভান কোথায়। তার মাথায় পড়ল না তো?

না তেমন কিছু হয়নি। বিভানকেও দেখা যাচ্ছে না। রবি আবার বলল, অই যে পুবদিকে গঙ্গার ধারে মাঠ ছিল সে তা এখন বেহাত। চল যাবি নাকি অদিকটা দেখে আসতে?

না। অত সময় হবে না। তার চেয়ে চল বেশ তো গল্প হচ্ছে।

তোদের এই বাড়িটার কত বয়স হল?

প্রায় একশো বছর হবে।

তাদের কথার মাঝে বিভান কোথায় যেন চলে গিয়েছিল। এবার অনুপমের সামনে আবির্ভূত হয়ে বলল, আমি একটা দারুণ জিনিসের ছবি তুলেছি। দেখে বলো তো ওটা কী? বলে অনুপমের চোখের উপর ক্যামেরাটি তুলে ধরলে অনুপম দেখল উজ্জ্বল রুপোলি রঙের সাপের খোলস। বিভান জিজ্ঞেস করল, এটা কী?

সাপের খোলস। কোথায় দেখলি?

বাড়ির পিছনে।

রবি বলল, দু-তিন বছর আগে একদিন একটা বার সাপ বেরিয়েছিল। কাকিমা বলেছে?

না তো। তুই দেখেছিলি?

না। শুনেছিলাম।

কী ছিল বাড়িটা, কী হয়ে গেছে। কিছুই মেলাতে পারি না।

তোরা কাছে থাকিস হয়তো চোখে লাগে না। আমার তো অনেক কিছুই মিলছে না।

না মেলাই স্বাভাবিক।

ভয় হচ্ছে, কোথাও সাপখোপ লুকিয়ে আছে।

ভয় নেই। দিনের বেলা বেরবে না। রাতের বেলা বেরয় হয়তো, ব্যাঙ-পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে।

অনুপম বলল, হুম।

বিভান অনুপমের ছোট্ট ঘরটির ভিতরে ছবি তুলছে। দেওয়াল জুড়ে একটা আলমারি। থরে থরে বই সাজানো। সব বই পোকায় কেটে ঝরঝরে করে দিয়েছে। আর দেবে নাই বা না কেন? এত দিন ধরে নিরুপদ্রব নিরীহ বইগুলো কেউ তো ধরেনি। পোকারা পিকনিক করেছে বছরের পর বছর ধরে। লীলা দোতলায় উঠতে পারে না বেশ অনেক বছর। কীভাবে যে বইগুলো সাজিয়ে রেখে গেছিল আজ আর তা মনে পড়ে না অনুপমের। তবে তার স্পষ্ট মনে আছে প্রিয় রসায়নের বইগুলো একটি ধারে রাখা ছিল। সেগুলো কি আছে? ভেবে আলমারিটা খোলার চেষ্টা করতেই ঝরঝর করে একটি র‌্যাক ভেঙে পড়ল তার পায়ের কাছে। এই বইয়ের স্তূপের মধ্যে অনুপমের চোখে পড়ল একটি নীল খাম। মুহূর্তে সে ফিরে গেল অনেকগুলো বছর। খামটি তাড়াতাড়ি তুলে নিয়ে পকেটে পুরল অনুপম। এইখানে তার লুকনো ছিল তমালিকার চিঠি। কৈশোরের স্মৃতির একটি পুরো ভাগ। কোথায় তমালিকা? জানতে ইচ্ছে করছে। রবিকে জিজ্ঞেস করল অনুপম।

রবি মুচকি হেসে বলল, ওকে তোর মনে আছে? সে এখন আমেদাবাদে থাকে।

কী করে?

জানি না। তবে পড়ায় শুনেছি। তোর সঙ্গে যোগাযোগ নেই?

না। আচ্ছা, আমাদের বাড়ির উত্তরে একটা ছোট পুকুর ছিল, সেটা দেখলাম না। সেটা কি মজে গেছে?

আরে না না। ওটা বুজিয়েই তো বলাকা কমপ্লেক্স হয়েছে। পাড়াটা পুরোই বদলে গেছে।

সেটাই দেখছি। তুই শুধু বদলাসনি। একই আছিস, বলে রসিকতা করল অনুপম।

আমিও বদলেছি। বাইরে তা না বোঝা গেলেও ভিতরে ভিতরে অনেক বদলেছে।

রবির দিকে তাকিয়ে রইল অনুপম।

লক্ষ্য করেনি অধীর আগ্রহের চোখে তাকিয়ে আছে বিভান। অনুপম তার দিকে তাকাতেই বলল, চলো, এবার নীচে যাই। আর একটু পরেই আমরা বেরিয়ে যাব। তোমার ছবি তোলা শেষ?

বিভান বলল, হ্যাঁ।

তিন জনে নীচে আসতেই লীলা মাসির ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। লীলা মাসি জিজ্ঞেস করল, বাবু, কেমন দেখলে বাবার বাড়ি? ছবি তুলেছ?

এটা তো বাড়ি নয়। এটা একটা ডিলাপিডেটেড ইউনিট।

এই কথার মানে কী?

মানে? বলে অনুপমের দিকে তাকাল বিভান।

অনুপম বলল, ও বলছে ভেঙে পড়া ধংসস্তূপ। বাড়ি ঠিক নয়।

লীলা মাসি কিছুক্ষণ থামল। তারপর বলল, তা ত হবেই। তোমার দাদু তৈরি করেছিল। অনেক বয়স হল। ভেঙে তো পরবেই। তুমি বাড়ির ছবি তুলেছ?

বাড়ির নয়। ভাঙাচোরা একটা বাড়ির ছবি। খুব ইন্টারেস্টিং।

লীলা মাসি ইন্টারেস্টিং কথাটার মানে বুঝতে পারল না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঘাড় দোলাল দুপাশে। তার পর বলল, তোমার তো আর এই বাড়ির সঙ্গে কোনও স্মৃতি নেই, অনুভূতি নেই। যেখানে অনুভূতি লেগে থাকে না সে তো ধ্বংসস্তূপই মনে হয়। ঠিকই বলেছ।

অনুপম এবার বলল, রেডি হ। এবার ফিরতে হবে বিভান।

লীলা মাসি বলল, এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে? আর একটু থাকো না। বিভানের সঙ্গে আমার একটা ছবি তুলে দাও অনুপম।

অনুপম বিভানের কাছ থেকে ক্যামেরাটি নিয়ে বলল, বিভান লীলা মাসির পাশে দাঁড়াও। একটা ছবি নেব।

বিভান লীলা মাসির পাশটিতে দাঁড়ালে অনুপম ক্যামেরায় চোখ রেখে চমকে উঠল। ভাঙাচোরা, শিথিল, বরণহীন, বেঁকে যাওয়া একমাথা শনের নুড়ির মত চুলে ভর্তি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আছে বিভান। অবিকল দেওয়ালের গায়ের পেয়ারা গাছে মত। যতবারই একটু আলাদা হতে বলছে অনুপম, লীলা মাসি তাকে কাছে টেনে আনছে। কিছুতেই পেয়ারা গাছটির আলাদা ছবি তুলতে পারল না অনুপম।

মাত্র এক ঘণ্টার ট্রেন জার্নি। চন্দননগর থেকে হাওড়া। ভাগ্যক্রমে জানালার পাশটিতেই সিট পেয়েছিল দুজনে। এক সময় চলন্ত ট্রেন মনোযোগ দিয়ে ক্যামেরায় ছবিগুলো তাকিয়ে দেখছিল বিভান। তার একফাঁকে একগুচ্ছ চিঠিভর্তি নীল খাম জানালা গলিয়ে বাইরে ছুড়ে দিল অনুপম।

চিত্রণ: মুনির হোসেন
1 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »