Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

কুলিকে, শামুকখোলের কলোনিতে

শ্রাবণের শুরুতেই এবছর বর্ষা এসেছে গৌড়বঙ্গে। গৌড়বঙ্গ বলতে মালদা, উত্তর এবং দক্ষিণ দিনাজপুর জেলাকেই বোঝায়। কিন্তু এবছর বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই উত্তর দিনাজপুরের জেলা সদর রায়গঞ্জের কুলিক পক্ষীনিবাস ভরে উঠেছে পরিযায়ী পাখিতে। রায়গঞ্জের আকাশ জুড়ে এখন পরিযায়ী পাখিদের উড়ে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে।

প্রতি বছর রায়গঞ্জের কুলিক নদীর ধারে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশের বনাঞ্চল ভরে ওঠে এই পরিযায়ী পাখির কলকলানিতে। সবুজ বনাঞ্চল বছরের কিছু সময়ের জন্য হয়ে যায় শ্বেতশুভ্র। কারণ এখানকার সব পরিযায়ী পাখির গায়ের রং সাদা। মূলত জুন মাসের শেষ থেকে নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এই বনাঞ্চলে পরিযায়ী পাখিরা ভিড় করে থাকে।

সবুজ বনাঞ্চল বছরের কিছু সময়ের জন্য হয়ে যায় শ্বেতশুভ্র।

বন দফরের বক্তব্য অনুযায়ী, এই বনাঞ্চলে করমোর‌্যান্ট, ইগ্রেট, নাইট হেরন, এশিয়ান ওপেনবিল স্টর্ক বা শামুকখোল— এই চার প্রজাতির পাখি দেখা যায়। উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় শামুকখোলের উপস্থিতি এই কুলিক পক্ষীনিবাস বা কুলিক পাখিরালয়কে এশিয়ার বৃহত্তম শামুকখোলের কলোনি বানিয়েছে। এরাই পরিযায়ী পাখি হিসাবে পরিচিত। প্রতি বছর এই নির্দিষ্ট সময়ে বনাঞ্চল ছেয়ে যায় পরিযায়ী পাখিদের কলতানে। কোথা থেকে এই পরিযায়ী পাখিরা কুলিক নদী সংলগ্ন এই বনাঞ্চলে আসে, সেটা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেউ বলেন, পাখিগুলি আসে সুদূর তিব্বত থেকে। আবার কারও দাবি, পাখিরা আসে সাইবেরিয়া থেকে। এই পরিযায়ী পাখিদের সঠিক বাসস্থান নিয়ে গবেষণাও শুরু হয়েছে। কিন্ত এখনও পর্যন্ত কোনও গবেষকই বলতে পারেননি এই পরিযায়ী পাখিদের আদি বাসস্থান।

কৃত্রিমভাবে তৈরি ক্যানেলে পাখিদের প্রয়োজনীয় খাবারের ব্যবস্থা হয়।

তবে স্থানীয়ভাবে সমীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, এখানে এই পাখিরা আসে মূলত বংশ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। কুলিকে পৌঁছনোর এক-দুদিনের মধ্যেই তারা সঙ্গী নির্বাচন করে ফেলে এবং মিলনের প্রস্তুতি নেয়। এরপর শুরু হয় বাসা তৈরির কাজ। বাসাটিকে একটি নির্দিষ্ট আকার দিতে ১২-১৫ দিন সময় নেয় তারা। বাসা মূলত তৈরি হয় গাছের ডালপালা, নরম সবুজ পাতা এবং ঘাস দিয়ে। স্ত্রী-পুরুষ উভয়ে মিলে বাসা বানায়। ডিম পাড়ার পরে উভয়েই পালা করে ডিমে তা দেয়। এইভাবে বনাঞ্চলের গাছে বাসা তৈরি করে সেখানে ডিম পেড়ে শাবকের জন্ম দিয়ে, সেই শাবককে আকাশে উড়তে শিখিয়ে তবেই আবার ফিরে যায় নিজেদের দেশে।

.

বিগত কয়েক বছর দুর্গা পুজোর দিনগুলির আগে বা পরে রায়গঞ্জে বৃষ্টি হয়েছিল। ঝড়-জলে বনাঞ্চলের গাছগুলি থেকে পরিযায়ী পাখিদের তৈরি করা বাসাগুলো মাটিতে আছড়ে পড়েছিল। সেই সময় পাখিদের বাসায় ছিল সদ্যেজাত শাবকরা। ঝড়-জলে সেই শাবকদের অধিকাংশ মাটিতে পড়ে মারা গিয়েছিল। সেই সব বছরগুলিতে এই পাখিরা নিজেরাই তাদের ফিরে যাওয়ার সময় পিছিয়ে দিয়েছিল। তারা আবার নতুন করে বাসা বানিয়ে তাতে ফের ডিম পেড়ে, সেই ডিম ফুটিয়ে শাবকের জন্ম দিয়ে, তাদেরকে আকাশে উড়তে শিখিয়ে তবেই ফিরে গিয়েছিল। প্রবল বর্ষণ কিংবা প্রখর সূর্যের তাপের থেকে রক্ষা করতে পরিযায়ী পাখিরা নিজেদের ডানাগুলিকে ছাতার মত করে মেলে ধরে শাবকদের রক্ষা করে। এই দৃশ্য হামেশাই দেখা যায়।

Advertisement
.

প্রতি বছরই এখানে আসা পরিযায়ী পাখিদের সংখ্যা প্রায় একলাখের কাছাকাছি। উত্তরোত্তর পাখিদের সংখ্যা বাড়ছে। সেটা অবশ্য পাখি গণনাতেই জানা যাচ্ছে। আমরা আদম সুমারি, গণ্ডার সুমারি বা বাঘ সুমারির কথা শুনেছি। কিন্তু কুলিক নদীর ধারের এই বনাঞ্চলের পরিযায়ী পাখিদের ‘পক্ষী সুমারি’ প্রতি বছর করেন বনকর্মীরা। বনকর্মীদের এই কাজে গত কয়েক বছর ধরে সাহায্য করছে রায়গঞ্জের কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এই পক্ষী সুমারির পদ্ধতিটি যথেষ্ট মজাদায়ক।

.

বন দফতরের কথা অনুযায়ী, প্রথমে প্রতিটি গাছে পাখির বাসা গোনা হয়। তারপর সেই বাসায় একজোড়া দম্পতি পাখি এবং তাদের দুটো শাবক ধরে নিয়ে হিসাব করা হয়। সেই হিসাব প্রতি বছরই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এই পরিযায়ী পাখিদের জন্য বনাঞ্চলের ভিতরে কৃত্রিমভাবে তৈরি ক্যানেলে প্রয়োজনীয় খাবারের ব্যবস্থা করে রাখেন বন দফতরের কর্মীরা। নানা ধরনের ছোট মাছ, বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় বা সরীসৃপ ছেড়ে রাখেন জঙ্গলের ভিতরে। তারপরেও খাবারের খোঁজে পরিযায়ী পাখিরা উড়ে যায় শহরের আশেপাশের গ্রামাঞ্চলে। শাবক যখন ছোট থাকে, তখন মা পাখি ঠোঁটে করে খাবার নিয়ে এসে শাবকদের মুখে দিয়ে দেয়। পরে শাবক একটু বড় হলে তারা নিজেরাই এই বনাঞ্চলে ঘুরে ঘুরে খাবার সংগ্রহ করে। যখন শাবক উড়তে শেখে, সেসময় অভিভাবক পাখি শাবকদের নিয়ে আকাশে উড়তে শিখিয়ে দীর্ঘ পথচলার প্রশিক্ষণ দিয়ে এই বনাঞ্চল ছেড়ে উড়ে চলে যায়। ইংরেজি সালের সেই বছরের ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ।

চিত্র: লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 − 5 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »