Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

নিঃসঙ্গতা

মাঝরাতে যখন ঘুম ভাঙল, গ্রীষ্মের মৃদু হাওয়ায় জানলার পর্দা আবছা নড়ছে। কিছুক্ষণ চোখ ধাঁধিয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে দেখতে পেলাম ঘরে থাকা জিনিসপত্রের ছায়া। আঁধার হোক বা আলো, তারা যেখানে থাকে সেখানেই রয়ে যায়। ঠিক সেরকম আমার মন এবং শরীরের অস্থিরতা। দিনের আলোয় বুক কেঁপে ওঠে, রাতের নিদ্রা কেটে যায় অর্থহীন চিন্তাধারায়। দোটানায় হারিয়ে ফেলেছি স্বস্তি, নিশ্চল হওয়ার ক্ষমতা হয়েছে শূন্য। ঘরে কেউ নেই, আমি একা, সব মিলিয়ে যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। না, আর না। এবার ঘুমানো যাক।

বিছানায় গা দিতেই ঠান্ডা তোষক যেন ছ্যাঁকা দিল; গায়ের গরমের সঙ্গে মিলিয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। পাশ ফিরে শুয়ে হাতটা রাখতেই বুঝলাম, আমি একা নই; উষ্ণ কোমল দেহ আমার বরফ-ঠান্ডা হাতটাকে যেন নিমেষে গলিয়ে দিল। ঘরে কোনও শব্দ নেই, কোথাও কেউ নেই, আমার বুকের ভেতরে হালকা ঝড় উঠেও সঙ্গে সঙ্গেই উবে গেল। এ তো অজানা কিছু নয়, প্রায়শই হতে থাকা আমার বিবেচনার নিয়মিত খেলা। খুব একটা সময় লাগে না বাস্তব ছেড়ে কল্পনায় ডুবে যেতে। সহজ লাগে, দিনকালের কষ্ট থেকেও সহজ। ভয়ে লাগে না স্রোতের সাথে ভেসে যেতে।

আমার পাশে শুয়ে থাকা শরীরটা একটু নড়ে উঠল। দেখতে পেলাম, তার বুকে নিশ্বাসের উত্থান যেন উপত্যকার প্রতীত। আমার দিকে চেয়ে দেখল। চোখ দুটো নম্র, আকাশে থাকা আবছা মেঘের মত। আমার দিকে তাকিয়েও যেন সে দৃষ্টির রেখা অন্য কোথাও বিচ্যুত। তা কেনই বা হবে না?

এই গোটা পৃথিবীতে দুঃখ শুধু আমার একার নয়। তার স্বাদ আলাদা হলেও মনের ভেতরেই সর্বদা পাওয়া যায় তাকে। গভীরতার পার্থক্য নেই, তাই ভয় করে না। এই নেশার কোনও শারীরিক ক্ষতি নেই, তাই কোনও বাধা নেই। নিজের সাথে কথা বলি, অচেনা লাগে না, তবুও একাকিত্বের নাম শুনলে বুকটা যেন রুদ্ধশ্বাসে ছোটে। মাঝেমধ্যে দম বন্ধ হয়ে ওঠে।

জীবনে এমন পরিস্থিতি আসে যখন স্নেহ, মায়া, মমতা সব গঠন হয়ে তৈরি হয় একটা পথ। এই ভাগ্য সবার হয় না, তবে সেটা অস্বাভাবিক কিছু না। কিছু মুহূর্ত ক্ষণিকের জন্য হলেও এক অদ্ভুত শান্তি নির্মাণ করে। আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল এই যে, কোনওদিনও মুখফুটে বলতে পারলাম না, ঠোঁটের কোণে শব্দগুলো এসেও যেন আবার হারিয়ে গেল। আজও সেই ক্ষণগুলো চোখের পলকের নিমেষে উপস্থিত হয়— এইসবেই তাকে আমার আপন মনে হয়। কিন্তু অনেকেই আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে যার কোনও পরিণতি নেই তার কী মানে? কেন নিজেকে এইরকম অন্ধকূপের মধ্যে কষ্ট দিয়ে রাখা? ওইজন্যেই বোধহয় বলে, মানুষের অতীত এবং ভবিষ্যৎ তার বর্তমানকে কুরে কুরে খায়।

আমার পৃথিবীটা বড্ড ছোট, ব্রহ্মাণ্ডের এক খুবই ক্ষুদ্র অংশ। সেখানেই আমি খুশি। আলমারি, বইয়ের সেল্ফ, আয়না, দরজা সব ফ্যাকাশে লাগে, যেন তারা থেকেও নেই। আমিও কি তা নই? শরীরের থেকে মনের দূরত্ব এতটাই যে কখনও নিজেকে ছুঁয়ে বলতে পারব না, এই তো আমি।

এখনও?

আমাকে প্রশ্ন করেছিল দিবাকর, যার উত্তরে আমি সবসময় একটা ম্লান হাসি দিয়ে থাকি, কোনও সময়ে কথা এড়িয়ে অন্য কিছু নিয়ে চর্চা করতে বসি। প্রশ্নটা দিবাকর ভুলে গেলেও আমি ভুলি না। কারণ উত্তর আমার কাছে একটাই।

এখনও।

আমার দিন শুরু হয় কলেজ এসে ছাত্রদের পড়িয়ে। গ্রিক থিওরি, ট্র‌্যাজেডি, ফাইন আর্টস কত বিষয় নিয়েই জল্পনা করা হয়, কিন্তু অনেক কথা এমন ছিল যা এসে ঠোঁটের কোণ ছুঁয়ে হারিয়ে যেত। আমি জানি না কীভাবে তাদের উচ্চারণ করতে হয়। অনেক কিছু শিখেছি জীবনে, কিন্তু নিজের সম্বন্ধে কোনও শব্দ গঠন করে আজ অবধি কিছু বলে উঠতে পারিনি।

সেদিন রাতে যেন ঘুমের মধ্যে কে জানি এসে আমার হাতটা ধরল। বরফ-ঠান্ডা সেই ছোঁয়া, এক বিস্তরতার ইঙ্গিত দিল যেন। সেই আবার ওই মুখ। জলছবির মত একদৃষ্টিতে আমাকে দেখছে, হাতটা বাড়িয়ে আমায় স্পর্শ করছে। বুঝতে পারলাম, আমার শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। সেই উষ্ণতার ছোঁয়া কি তার লাগছে? সে কি বুঝতে পারছে আমি জীবন্ত?

কী চাও তুমি?

তার জবাব নেই। সে আবার ছায়ার সঙ্গে মিলিয়ে যায়, আমি চোখ খুলে এদিক-ওদিক চেয়ে বিছানায় উঠে বসি। সেই জলছবি যখন মিলিয়ে যায়, আমার দিকে লক্ষ্য করে যেন একটা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।

এখনও?

এখনও।

দিবাকর ছাড়া আর আমার সেরকম কোনও বন্ধু ছিল না। ও সবটাই জানত, সেটা নিয়ে কোনওদিন বিরক্ত হওয়া বা অভিযোগ, কিছুই করেনি, বুঝতে পারতাম ও চায় না আমি একা থাকি। মা-বাবা মারা যাওয়ার পর কলকাতায় একাই থাকতাম, তবুও বেশিদিনের জন্য না। তখনই সাক্ষাৎ হয়েছিল বিনয়ের সাথে। একসঙ্গে থেকেওছিলাম। কিন্তু সে পুরোনো কথা। আমাদের ঘরটা আর নেই, সব জিনিস অগোছালো থাকা সত্ত্বেও আমাদের স্মৃতিগুলো পরিচ্ছন্ন, খোলামেলা। আমাদের বন্ধ ঘরের মধ্যে যেন আলো জ্বালার অপেক্ষায় আজও বসে আছি।

রিসার্চের জন্য পন্ডিচেরি ইউনিভার্সিটির উদ্দেশে রওনা হলাম। দিবাকরও ছিল আমার সঙ্গে। ছ’মাসের জন্য কলকাতাকে বিদায়, নতুন কিছুর অপেক্ষার আরম্ভ। এই জন্যেই বোধহয় যার স্বপ্ন দিন রাত আমাকে গ্রাস করে রাখত সে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিল। একটা চাপা ব্যথা যেন ক্রমশ কমতে লাগল।

নতুন শহর, নতুন লোক, এবং নতুন সাহিত্যের ছোঁয়া খুবই অদ্ভুত লাগে। প্রথমে অচেনা লাগলেও, সেখানকার সংস্কৃতি যেন নিজের মধ্যে আপনা থেকেই বেড়ে ওঠে। তবুও যেন একটা ভয় লুকিয়ে ছিল, মনে হল সে অভিমান করেছে, আর দেখা দেয় না। প্রায়শই কলেজ থেকে ফেরার পথে এদিক-ওদিক ঘুরে যেতাম, পিজি-তে ফিরতে দেরি হত।

প্রায় তিন মাস কেটে যাওয়ার পর দিবাকর জোরজবরদস্তি একদিন আমাকে নিয়ে যায় সমুদ্রের পাড়ে। জলের প্রতি আমার কোনও অনুতাপ নেই। সাঁতার না জানলেও পাড়ে বসে ঢেউয়ের আওয়াজ শুনেই তৃপ্ত। এই সমুদ্রের পার থেকে একটু হেঁটে গিয়ে কতগুলো ঝাউবন পেরিয়ে একটু জঙ্গলের মধ্যে ভেতরে একটি মন্দিরের অস্তিত্ব। এখানে আসার আগে অনেকবার এই মন্দিরের কথা শুনেছি, আজ একটু কৌতূহল হল। বালির মধ্যে হেঁটে খানিকটা গিয়ে দু-চারজন লোককে দেখা গেল। আরও কিছুটা যেতেই সেই বনের মধ্যে সমতলে সেই মন্দিরের স্থাপনা।

জায়গাটা শান্ত হলেও কেমন যেন ভূতুড়ে। মন্দিরের খানিক সামনে গিয়ে এক দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম, সেটাই বোধহয় ছিল আমার মনের কথা, আমার প্রার্থনার ভাষা। নিজেকে হালকা মনে হল। আমার এক কলিগের কাছে এই পুরোনো মন্দিরের কিছু কথা জিজ্ঞেস করলাম। সেখানে এখন আর পুজো হয় না, কিন্তু লোকে বিশ্বাস করে সেই মন্দির ভীষণ জাগ্রত। ভগবান নিয়ে পড়াশোনা করে থাকতে পারি, কিন্তু ভগবানকে বিশ্বাস করার লোভ ছিল আমার স্বভাবের বিপরীত।

দিবাকরের সাথে ভূত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা উঠতেই মন্দিরের সম্বন্ধে কয়েকটা বিষয় বেশ আশ্চর্যের লাগল। একটু ভেবে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কি মনে হয়, এই মন্দিরে কোনও ঠাকুরের পুজো হত?

মন্দিরে এক স্তম্ভের দিকে চেয়ে দিবাকর বলল, এখানে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর কারওরই পুজো করা হত না, এটা নিশ্চিত।

কীভাবে?

এখানে নর্থ-হিন্দু পুরাণের ভগবানদের অতটা গ্রাহ্য করা হয় না, খুবই কম বলা যেতে পারে। তবে আয়াপ্পান নামক এক দেবতার পুজো হত শুনেছিলাম। পুরাণ অনুযায়ী ভগবান বিষ্ণু এবং শিবের সন্তানসন্ততি সে। কিন্তু এই সমাজের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই ভগবান তুচ্ছ।

দিবাকর চুপ হতেই আমি আবার প্রশ্ন তুললাম, তুমিও কি তাই মনে করো?

একটা হাসি দিয়ে বলল, আমি মনে করলেই বা কী না করলেই বা কী?

বিশ্বাস করো?

সেটা বলা সহজ। আমার জীবনে বিশ্বাসের প্রভাব খুব কম।

দিবাকরের সরাসরি উত্তর শুনে চুপ হয়ে গেলাম। ভাল-খারাপ মিশিয়ে ও আমার সবটাই জানত।

আমার নীরবতা দেখে সে আবার বলে উঠল, আসলে সব কিছুই আমাদের সমাজের প্রতিলিপি। আমরা কী করব, না করব, কী খাব, কার সাথে থাকব, বহুকাল ধরে এই সমাজই চালনা করে আসে। তারপর আসে কিছু অনুভূতি, যার কোনও সংজ্ঞা থাকে না।

সত্যি তাই। এই ভাষার কোনও অনুবাদ নেই। কারণ অনুবাদ পড়ার সেই পাঠক নেই। কথাটা হল এটাই, এরকম অনেকেই আছে যারা অনুবাদ পড়তে রাজি হন কারণ সেই অনুবাদে তারা নিজেদের ভাবনার প্রকাশ খুঁজে পান। কী অদ্ভুত। এক লেখকের বোধহয় এটাই মস্ত আপত্তির বিষয়— সেই একজন বাদে আর সবাই তার লেখার মানে উদ্ধার করতে ইচ্ছুক।

দিনে স্টুডেন্টদের পড়ানো আর রাতে রিসার্চ নিয়ে বসে জেগে থাকা, এরকমই চলতে থাকায় বাইরে ঘোরার সময় থাকত না। দিবাকর এক-দুবার জিজ্ঞেস করেছিল সেই মন্দিরে যাওয়ার জন্যে কিন্তু আমি সেটাকে এড়িয়ে গেছি।

কলকাতায় ফেরার পর ট্র‌্যাজেডি অ্যান্ড আর্টস-এর ক্লাসে দেখা হয়ে পিয়ালীর সঙ্গে। স্কলার ছিল সে, এখন নতুন প্রফেসরের চাকরি। পিয়ালী বয়েসে আমার থেকে দু-তিন বছরের ছোট। আমরা দুজনকে অনেকবার দেখেছি কিন্তু কোনও দিন কথা বলা হয়নি। আমি নিজের খেয়ালে থাকতাম, সেটা অবশ্য দিবাকর জানত। আর কারওর সাথে আমার এই খামখেয়ালিপনা ভাগ করতে চাইতাম না।

একদিন লাইব্রেরি যাচ্ছি এমন সময় আমার পাশে এসে পিয়ালী বলে উঠল, তোমার কাছে লাল পেন হবে?

ওর দিকে তাকিয়ে বুকের পকেট থেকে পেনটা বার করলাম। এগিয়ে দিলাম তার কাছে।

ধন্যবাদ। আসলে পেপার চেক করতে হবে, আমার পেনটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তোমাকে কালই ফেরত দিয়ে দেব।

এর পর প্রায়শই স্বল্প কথার ভাঁজে আমাদের দুজনের মধ্যে একটা চেনা কিছুর নির্মাণ গড়তে থাকল। আমি আন্দাজ করতে পেরেছিলাম এর মানে, সেসব নিয়ে অবশ্য পিয়ালীকে কিছু বলিনি।

কিন্তু কিছু যেন বদলে গেল কয়েকদিনের মধ্যে। এতদিনের চিন্তা, মানসিকতা, গভীর নিদ্রা, সেসব ক্রমাগত আমার পুরোনো অভ্যাসে পরিণত হতে লাগল। মাঝরাতে ঘুমের মধ্যে টের পেলাম একটা ছায়া আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সেই এক ছবি। ধড়ফড় করে উঠে বসে পড়লাম। আরও কিছুদিন এরকম হওয়ার পর, দিবাকরকে এই ব্যাপারে জানালাম। সে ভুরু কুঁচকে আমাকে প্রশ্ন করল— তুমি কি কাউকে নিয়ে চিন্তা করছিলে?

না। কিন্তু একবার-দুবার ভেবেও এরকম কিন্তু হয়নি। সেই দম আটকে যাওয়া, মাঝরাতে উঠে জেগে থাকা, সব আগের মত আবার।

তাহলে? পাল্টা প্রশ্ন করল দিবাকর।

দু-একবার ভেবে আমি সোজা হয়ে বসলাম। কিছু একটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, স্থির হয়ে ভাবার চেষ্টা করলাম। তখনি দিবাকর আবার প্রশ্ন তুলল।

একটা কথা বলো— তোমার এই ব্যাপারটা কেমন লাগছে?

চেয়ে রইলাম ওর দিকে।

মানে?

দেখো, পিয়ালী তোমাকে পছন্দ করতেই পারে। কিন্তু তুমি যে কথাগুলো বললে, হয়তো তুমি কিছু চিন্তা করছিলে বলেই এরকম মনে হচ্ছে।

এই কথাগুলো যেন আমার বুকে বিঁধল। পিয়ালীর সাথে এখন রোজই দেখাসাক্ষাৎ হয়ে, কথা হয়। আমাদের দুজনের একই টপিকে লেকচার এবং পড়ানোর ভার দেওয়া হয়েছিল, আমার ছিল পার্ট ওয়ান আর ওর পার্ট থ্রি। তাই আমাদের মধ্যে একটা কমন বিষয় থাকার জন্যে অনেকটা সময় আমরা পড়ার ব্যাপারেই ডিসকাস করে কাটাতাম। সাহিত্যচর্চার জন্য সব সময়েই পার্সপেক্টিভ ম্যাটার করে। পিয়ালীর লজিক এবং আর্গুমেন্টস অনেক কিছুর সাথে ভ্যালিড ছিল— কয়েকবার মনে হতে লাগল আমাদের চিন্তাধারা যেন একই।

একদিন কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছি এমন সময় ভীষণ মেঘ গর্জন করে বৃষ্টি নেমে গেল। পিয়ালী আর আমি মাঝরাস্তায় কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা না পেয়ে একটা ছোট প্যাস্ট্রির দোকানে ঢুকে পড়লাম। আমার শার্ট ভিজে চুপচুপ, মাথার চুল উস্কোখুস্কো। পিয়ালী আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, আচ্ছা, তোমার বাড়ি তো এখান থেকে আরও কিছুটা যেতে হবে। আর এই বৃষ্টিতে আবার ভিজে ভিজে বাড়ি ফিরবে— তার থেকে আমার বাড়ি অনেকটাই কাছে। ফ্রেশ হয়ে এককাপ চা খেয়ে না হয় যেয়ো?

আমি তোমাকে বাড়ি অবধি পৌঁছে দিতে পারি। সেই পথ দিয়ে আমি চলে যাব।

আবার ভিজে ভিজে বাড়ি ফিরবে? বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত থেকে যাও।

আমার বুকটা ধপ করে উঠল। এর মানে আমি ঠিক জানতাম। কিন্তু না বলে তাকে নিরাশ করতে আমার খারাপ লাগল।

বৃষ্টির মধ্যে দৌড়িয়ে আমরা দুজনেই ভিজে গেছিলাম, ওদের বাড়ির দরজার শেডের নিচে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। পিয়ালী দরজা খুলে আমাকে ভেতরে প্রবেশ করতে বলল। সেখানেই যেন আমি পাথর হয়ে গেলাম। আমার তখন কোনও কিছু মাথায় ছিল না। মনে মনে ভাবলাম, যেটা অনুমান করেছি সেটা যেন সত্যি না হয়।

কী ভাবছ? হঠাৎ এই প্রশ্ন শুনে যেন অপ্রস্তুতিতে পড়ে গেলাম। পিয়ালী আমার অনেক কাছে এসে দাঁড়াল।

ঢোঁক গিলে বললাম— আসলে, এবার আমার বেরোনো উচিত, বৃষ্টি কমে গেছে।

আমার থেকে চোখ না সরিয়ে তার ডান হাতটা তুলে রাখল আমার বুকের ভেজা কাপড়ের ওপর। খুব ধীর গতিতে সেই হাত শার্টের ওপর থেকেই এসে পৌঁছাল আমার কাঁধের কাছে। আমার গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। আমার হাতদুটোর মধ্যে সে নিজেকে লেপ্টে নিল। ইতিমধ্যেই আমার অসাড় হাতের স্পর্শ পেয়ে সে আমার দিকে জিজ্ঞাসু চোখ নিয়ে তাকাল।

আমি চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কোথাও একটা মস্ত বড় ভুল হয়ে যেতে পারে, আমার সচেতন সংকেত করল। পিয়ালীর স্থির দৃষ্টির দিকে মাথা তুলে বললাম, তুমি খুব ভাল মেয়ে। তোমার প্রকৃত স্বভাব, তোমার জ্ঞান, আরও অনেক উঁচু স্তরে নিয়ে যাবে তোমাকে। আর তার থেকেও বড়কথা— তুমি আমার বন্ধু। এই সম্মান তোমার প্রতি চিরকাল রয়ে যাবে।

পিয়ালীর মুখটা ফ্যাকাশে, দৃষ্টিহীন চোখে আমার দিকে তাকাল। আর তখনি মনে পড়ে গেল সেই জলছবির কথা, রোজ রাতের আগমন, আমার আসল জীবনধারা। দূরে সরে গিয়ে আমার দিকে তাকাল, তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল খোলা জানলার ওপর। আমার ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে তার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলাম। তারপর কী মনে হতে, কিছু না বলে বেরিয়ে পড়লাম।

ভেজা শার্টটা খুলে বারান্দার তারে শুকোতে দিয়ে বিছানায় এসে বসলাম। এসবের কোনও মানে নেই, মানুষ একলা আসে, আবার একলা চলে যাবে। তবুও আমার আছে কিছু মুহূর্ত, কিছু স্মৃতি। আমি তাতেই মগ্ন, কেউ আটকাবার নেই। আমার সব কিছুর শুরু এখানেই, শেষটা না হয় দেখা যাবে। তবে দেখতে পাচ্ছি সেই চেনা রীতি, ঘুমের মধ্যে আমাকে গ্রাস করে, চোখ বুঝলেই আমাকে কাবু করে নেয়। মনে হয় এক গভীর জঙ্গলের পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছি। পেছনে কী ফেলে এলাম জানি না। কিন্তু ফিরছি না আমি। আমি আর ফিরছি না।

চিত্রণ: মুনির হোসেন
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

সনজীদা খাতুন: শ্রদ্ধাঞ্জলি

সাতচল্লিশ-পরবর্তী পূর্ববঙ্গে বেশ কিছু সাংস্কৃতিক সংস্থা গড়ে ওঠে, যাদের মধ‍্যে ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমী’, ‘ক্রান্তি’, ‘উদীচী’ অন‍্যতম। রাজনৈতিক শোষণ ও পূর্ববঙ্গকে নিপীড়নের প্রতিবাদে কখনও পরোক্ষভাবে কখনও সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল এইসব সংগঠন। ‘ছায়ানট’ এমনি আর এক আগ্নেয় প্রতিষ্ঠান, ১৯৬৭-তে জন্মে আজ পর্যন্ত যার ভূমিকা দেশের সুমহান ঐতিহ‍্যকে বাংলাদেশের গভীর থেকে গভীরতরতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে সুস্থ ও সংস্কৃতিবান নাগরিক গড়ে তোলা। ওয়াহিদুল হক ও সনজীদা খাতুনের মানসসন্তান এই ছায়ানট। মূলত রবীন্দ্রনাথের আদর্শে গড়ে ওঠা সঙ্ঘ, কাজী নজরুলের প্রিয় নামটিকে জয়ধ্বজা করে এগিয়ে চলেছে বহু চড়াই-উৎরাই, উপলব‍্যথিত গতি নিয়ে।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর গুচ্ছকবিতা

বিলাপ অভিসার জল আনতে চল রে সখী, জল আনতে চল নিভু নিভু আলোর সাজে সূর্য অস্তাচলে শেষবিকেলের রশ্মিমালায় বুকে ব্যথার ঢল লজ্জা আমার আবির হয়ে

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

যত মত তত পথ

বহুদিক দিয়েই একজন স্বতন্ত্র মননের ধর্মীয় সাধক। তাঁর অনুগামীর সংখ্যা ধারণাতীত, আর তা কেবল তাঁর স্বদেশ বা এই উপমহাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, সারা বিশ্বব্যাপী। এবং দিনের পর দিন তাঁর অনুগামীর সংখ্যা বাড়ছে। শ্রীরামকৃষ্ণ এবং সারদামণি ও স্বামী বিবেকানন্দকে কেন্দ্র করে যে ভাব-আন্দোলন, তার ফলশ্রুতিতে তাঁদের নিয়ে নিয়ত চর্চা ও গবেষণা হয়ে চলেছে। পৃথিবীব্যাপী দুশোর ওপর রামকৃষ্ণ মিশনের কার্যাবলি প্রমাণ করে (প্রতিবছর এর সংখ্যা বাড়ছে), আজকের এই অশান্ত বিশ্বে তাঁরা মানুষের কতখানি আশ্রয়।

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব ছয়]

রবীন্দ্রভাবনায় যে নৃত্যধারা গড়ে উঠল তা দেশিবিদেশি নৃত্যের সমন্বয়ে এক মিশ্র নৃত্যধারা, তৎকালীন শিক্ষিত শহুরে বাঙালির সংস্কৃতিতে যা নতুন মাত্রা যোগ করল। নাচের প্রতি একরকম আগ্রহ তৈরি করল, কিছু প্রাচীন সংস্কার ভাঙল, মেয়েরা খানিক শরীরের ভাষা প্রকাশে সক্ষম হল। এ কম বড় পাওনা নয়। আরও একটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, শিল্পক্ষেত্রে ভাবের সাথে ভাবনার মিল ঘটিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টির প্রচেষ্টা। গতে বাঁধা প্র্যাক্টিস নয়। নিজের গড়ে নেওয়া নাচ নিজের বোধ অনুযায়ী।

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব পাঁচ]

বাংলার মাটি থেকে একদা এই সুদূর দ্বীপপুঞ্জে ভেসে যেত আসত সপ্তডিঙা মধুকর। আর রবীন্দ্রনাথের পিতামহ, যাঁর কথা তিনি কোথাও প্রায় উল্লেখই করেন না, সেই দ্বারকানাথ-ও বাংলার তৎকালীন ব্যবসায়ীকুলের মধ্যে প্রধান ছিলেন। শুধু তাই-ই নয়, একদা তাঁর প্রিয় জ্যোতিদাদাও স্টিমারের ব্যবসা করতে গিয়ে ডুবিয়েছেন ঠাকুর পরিবারের সম্পদ। নিজে রবীন্দ্রনাথ বাণিজ্য সেভাবে না করলেও, জমির সম্পর্কে যুক্ত থাকলেও একদা বাংলার সাম্রাজ্য বিস্তার, বাণিজ্য-বিস্তার কী তাঁরও মাথার মধ্যে ছাপ ফেলে রেখেছিল? তাই ইউরোপ থেকে আনা বাল্মিকী প্রতিভার ধারাকে প্রতিস্থাপন করলেন জাভা বালির কৌমনৃত্য দিয়ে?

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব চার]

তৎকালীন দেশের বাস্তব সত্যের সঙ্গে মিলছে না বর্ণবাদ, উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ, মিলছে না পিকেটিং ও বিদেশি দ্রব্য পোড়ানোর আন্দোলন। রবীন্দ্রনাথ দেখতে পাচ্ছেন গ্রামে গ্রামে গরিব মানুষের খাওয়া নেই, নেই বেশি দাম দিয়ে দেশি ছাপ মারা কাপড় কেনার ক্ষমতা। দেখছেন পিকেটিংয়ের নামে গরিব মুসলমানের কাপড়ের গাঁঠরি পুড়ে যাচ্ছে যা দিয়ে সে তার পরিবার প্রতিপালন করে। রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করছেন তাঁর লেখায়। ‘গোরা’ ও ‘ঘরে বাইরে’ এমনই দু’টি উপন্যাস। গোরা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় প্রবাসী পত্রিকায়। পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশ ১৯১০ সালে। ঘরে বাইরের প্রকাশকাল ১৯১৬।

Read More »