Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ছোটগল্প : দুই শালিখ

দিকশূন্যপুর।

এই জায়গাটা বাবানের খুব ভাল লাগে। অথবা, ভাল লাগে বলাটা উচিত হল না বোধহয়। এই জায়গাটা বাবানকে ভাবায়। বাবানকে থমকে দাঁড় করায়। যখনই এই চওড়া রাস্তা আর তারই বুক চিরে চলে যাওয়া এই ব্যুলেভার্ডের একপাশে দাঁড়িয়ে কখনও বাবান এই জায়গাটার কথা ভাবতে চেষ্টা করে, তখন প্রতিবারেই একগুচ্ছ ছবি আর গন্ধেরা কোথা থেকে যেন ভিড় করে এসে বাবানের মাথার ভিতরে জটলা করে দাঁড়ায়। কেমন যেন জঙ্গুলে সুখ। শহরের খাস মধ্যখানে হলেও এখানে সবুজের আধিক্য রয়েছে। হয়তো বা থাকবেও। আরও বেশ কয়েকদিন।

রাস্তার একপাশে কলম্বিয়া-এশিয়া, আমরি সল্টলেক, অভিজাত একেকটি বেসরকারি হাসপাতাল। তাদেরকে বাম হাতে রেখে আর-একটু বাইপাসের দিকে এগোলেই পরপর পড়তে থাকবে একের পর এক সরকারি দপ্তর। রাস্তার অন্যপাশে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেট, স্ট্যাডেল আর সবার উপরে বিরাট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন। রাস্তার মাঝে মোটামুটি চওড়া ব্যুলেভার্ড, দুপাশে ইউক্যালিপটাস গাছ। সামাজিক বনসৃজনের উদাহরণ। ক্রীড়াঙ্গনের দিকে তাকালে অবশ্য সবুজের পরিমাণ বাড়ে। এই স্টেডিয়ামকে ঘিরেই তো স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় প্রশিক্ষণকেন্দ্র। কাজেই সবকিছুকে মিলিয়ে এই চত্বর জমজমাট। হাসপাতালগুলিকে ঘিরে বেশ কয়েকটি ছোটবড়, পাকাপোক্ত অথবা ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান। পকেট বুঝে সেগুলির ক্রেতার ধরনও বিভিন্ন। আজ অনেক বছর পর বাবান ওরফে অর্কদীপ এই চত্বরে এসে দাঁড়াল।

ফোন বেজে উঠেছে। বাবান পকেট থেকে ফোন বের করে। সুমনের নম্বর। ‘পৌঁছে গেছিস তুই?’ যন্ত্রটা কানে নিতে না নিতেই সুমনের চিৎকারে বাবানের প্রায় কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার যোগাড়। ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, এইমাত্র পৌঁছলাম। কতদূর তুই?’ বাবান জিজ্ঞেস করে। ‘এই তো চিংড়িহাটা পেরিয়ে গেছি। আসছি, আর পাঁচ মিনিট!’ ‘বেশ আয়’, বাবান জবাব দেয়, ‘আমি সামনেই আছি, বাস থেকে নামলেই দেখতে পাবি আমায়।’

এখন সকাল। তার ওপরে আবার শনিবার। গতকাল বিশ্বকর্মা পুজো ছিল। কাজেই বিধাননগরের গতানুগতিক ব্যস্ততাটাকেও সেই অনুপাতে আজ বোঝা যাচ্ছে না। অন্তত বাবানের তাই মনে হচ্ছিল। মোবাইল ফোনটা কান থেকে নামাতেই সামনে সে দেখল সামনের প্রায় ফাঁকা রাস্তাটার একপাশ দিয়ে কতগুলি স্থানীয় ছেলে একটা ফুটবল নিয়ে হইহই করতে করতে এগিয়ে আসছে। সময় বলছে সকাল সোয়া সাত। ঘড়ি দেখল বাবান। সামনের লম্বামতো ছেলেটা বলটাকে হঠাৎ মাটিতে বাউন্স করাল। পিছন থেকে ঠিক তখনই একটা উচ্চতায় খাটো ছেলে, বলটা একবার মাটিতে ড্রপ খাওয়ার পরেপরেই ছোঁ মেরে ট্যাকলের ভঙ্গিতে সামনের ছেলেটার পা থেকে সেটা কেড়ে নিতে চেষ্টা করল। দুর্দান্ত ভারসাম্যে শরীর হেলিয়ে সামনের ছেলেটা পিছনের ছেলেটাকে নিজের সমস্ত চেহারা দিয়ে আটকে, বলটাকে তখনও নিজের দখলে রাখল। দুজনের কেউই কাউকে ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। খানিক পরে অবশ্য সামনের ছেলেটারই জিত মেনে নিয়ে পিছনের ছেলেটা আবারও কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাঁটতে লাগল। আপাতত সেই বল কার দখলে থাকবে মীমাংসা হয়ে গিয়েছে।

মনে মনে বাবান ওরফে অর্কদীপ বেশ কয়েকবছর পিছিয়ে যায়। অন্তত দেড় দশক বটেই। সেই বছরেই তাদের উচ্চমাধ্যমিক। বাবান আর সুমন একই স্কুলের বন্ধু। একই ক্লাসের, একই সেকশনের। জয়েন্ট পরীক্ষাতে কেবল বাবানের চেয়ে প্রায় শ’দেড়েক ধাপ উপরে ছিল সুমন। যদিও একই দিনে দুজনের কাউন্সেলিং পড়েছিল। এই যুবভারতীতেই। বাবানের সেই প্রথম যুবভারতীতে প্রবেশ। তখনও অনলাইন কাউন্সেলিং অতীত। মুখোমুখি বসে পছন্দের কলেজের নাম বলতে হত জয়েন্ট বোর্ডের তরফে নিয়োজিত আধিকারিকদের। সারি সারি খুপরি। অস্থায়ী ঘরের মতো ব্যবস্থা। তারও পরে রয়েছে বেসরকারি কলেজগুলির জন্য সারি সারি স্টল। তীর্থের কাকের মতো সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা কলেজ আধিকারিক। সেসবের মারপ্যাঁচ অবশ্য তখনও বোঝেনি কেউ। কলেজে ঢোকার পর সেই আধিকারিকদেরই যে অন্যরূপ দেখতে হবে বাবানদের তা ধারণারও বাইরে ছিল। বাবান যখন ঢুকছে সুমন বেরিয়ে আসছে তখন।

‘সরকারিতে হয়ে গেল?’

প্রশ্নটা বাবানের ছিল না। ছিল বাবানের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা বাবানের বাবার। ‘হ্যাঁ কাকু, যাদবপুর।’ সুমনের জবাবটা কোনওমতে কানে আসতেই বাবানের বাবার আঙুলগুলো বাবানের কাঁধে যেন একটু জোর দিয়ে আবারও চেপে বসল। যেন বা বুঝিয়ে দিতে চাইল, ‘বলেছিলাম। আরেকটু পড়লেই…’। বাবানের কাঁধে লাগছিল। বাবান ওরফে অর্কদীপ তাকে আমল না দিয়ে সুমনের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, ‘কনগ্র্যাচুলেশনস ভাই! ভুলে যাস না আবার।’ সুমন হাসল, ‘কথা দিতে পারি যোগাযোগ থাকবে।’ বাবানের সামনে একটা নতুন পৃথিবী তৈরি হচ্ছিল তখন। স্কুল পেরিয়ে একটা নতুন পৃথিবীর দিকে এগচ্ছিল বাবান। সে বহুদিন অবধি বিশ্বাস করতে পারেনি সুমন সত্যিই তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে।

বাবানের তখন এক পিসতুতো দিদির কথা মনে পড়ছিল। অনেকদিন পর বাবান যখন ক্যাম্পাসিংয়ে এক বহুজাতিক আইটি কোম্পানিতে জীবনের প্রথম চাকরির সুযোগ পেয়েছিল, সেই খবর শুনে সেই দিদি তখন স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়াতে দুহাত নাড়িয়ে বলে উঠেছিল, ‘ব্যস, অর্ক’র আর কী চাই। প্রাইভেট কলেজ থেকে বেরিয়ে যা হবার তাই তো হয়েছে। এখন খাওয়া দেখি ভাই। খেল খতম পয়সা হজম!’ আসলে সেই দিদি তখন সেই বছরেই, ডাক্তারিতে কোন এক বিলিতি ইউনিভার্সিটিতে পেপার পড়তে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। অর্কের মনে পড়ে। অর্কের এও মনে পড়ে একদিনও চাকরি না করে সে যখন এমটেক পড়তে গেল আইআইটি’র সরকারি ব্যবস্থায়, দিদির মুখটা একটু হলেও কেমন যেন ম্লান হয়ে এসেছিল। বাবান অনেক পরে বুঝেছিল, সুমনের কাছে সেদিন সে হারেনি। বরং অনেক পরবর্তীতে বাবান যেদিন পিএইচডি’র সময় নিজেও প্রথম বিদেশে গেল রিসার্চ পেপার পড়তে, বাবান আবারও বুঝেছিল আত্মীয় ব্যাপারটা ঠিক কতখানি আপেক্ষিক।

অথচ যুবভারতীতে দাঁড়িয়ে সেদিন বাবানের মনে হয়েছিল, অনেক কিছুতে সে পিছিয়ে পড়ছে বোধহয়। বাস থেকে নেমে এসে বছর বত্রিশের সুমন আজকের এই সকালে যখন সেই পুরনো অর্ককে দু’হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরল, দুজনেই টের পাচ্ছিল জীবনের রাজপথে তারা অনেকদূর এগিয়ে এসেছে। তবুও যেন বাবানের মনের খচখচানিটা কাটছিল না কোনওভাবেই।

রাস্তা পেরোতেই প্রথম টুকুসকে দেখল বাবান। কত বড় হয়ে গেছে টুকুস। টুকুসের সঙ্গে আজ সে স্বাভাবিকভাবেই কথাবার্তা বলবে। টুকুসের সঙ্গে এতরকমভাবে বাবান জড়িয়ে গিয়েছে সে ভেবে উঠতে পারে না। অথচ কী বিশ্রী ভাবেই না কথা বলা বন্ধ হয়েছিল তাদের। তিনদিন আগে অনেক রাত্তিরে যখন প্রথম বাবানের ফোন বেজে উঠেছিল, সে ভাবতেও পারেনি এতগুলো বছর পর আবারও টুকুস তাকে ফোন করবে। ঘটনার আকস্মিকতা মানুষকে কোথায় এনে দাঁড় করায়। টুকুসের এই নতুন পরিচয়টাও বাবান তখনই প্রথম জানতে পেরেছিল। তার আগে অবধি টুকুস মানেই ছিল একরাশ তিক্ততা। কত কাছে থাকতেও কত মানুষকে চিনে ওঠা যায় না। কত দূর থেকেও কতজনই না ফিরে আসে আবার। বাবান আবারও একবার পেরিয়ে আসা ব্যুলেভার্ডের দিকে তাকায়। শালিখটা এখনও বসে আছে। অচঞ্চল।

—‘অর্ক।’
—‘টুকুস’, অর্ক ওরফে বাবান মাথা নামিয়ে নেয়।

আবারও দুজন দুজনের দিকে তাকায়। বাবান যেন টুকুসের চোখদুটোয় একচিলতে শান্তির আভাস দেখতে পায়। মনে মনে সে অনেকগুলো বছর পেরিয়ে যায়। আবারও সেই আপাত তারল্য, যেন হঠাৎই কঠিন হয়ে ওঠে। বাবানের সেই অনেক দিন আগেকার এক দুপুরকে মনে পড়ছিল।

—‘খুব দরকার তোমার ওখানে যাওয়ার? কাল সকালে ওদের বাড়িতে গেলে হত না? হাসপাতাল, তার মানেই একগুচ্ছ ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়ার ব্রিডিং গ্রাউন্ড। এই তো সবে…’
—‘তুমি চুপ করবে? তুমি যদি সঙ্গে না যেতে চাও একটা ট্যাক্সি ডেকে নিয়ে আমি নিজেই চলে যাব। তোমার মুখাপেক্ষী হয়ে আমি বসে থাকব না। এটা নিশ্চয়ই জানা আছে তোমার?’

বাবানের থার্ড ইয়ার তখন। টুকুসের সেকেন্ড। টুকুসের ভাল নাম অনিন্দিতা। টুকুসের বাবা ছিলেন কলকাতার বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। জেনেভার সার্ন গবেষণাগারে অনেকগুলি দেশের মিলিত প্রচেষ্টায় চূড়ান্ত নিরাপত্তার সঙ্গে ঈশ্বরকণা আবিষ্কার নিয়ে যে দুনিয়াকাঁপানো গবেষণা চলছিল, এই দেশ থেকে সামান্য যে কয়েকজন বিজ্ঞানী তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন— টুকুসের বাবা অমিয়কুমার সেন ছিলেন তাঁদেরই একজন। এছাড়াও তিনি ছিলেন বাবানের বাবার বন্ধু। ব্যাচমেট, সতীর্থ। একই কলেজ, পরবর্তীতে একই বিশ্ববিদ্যালয়। বোধহয় ছোটবেলা থেকেই তাই টুকুসের সঙ্গে একটা অলিখিত প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েছিল বাবান। যদিও এর জন্য কখনই সে নিজের বাবাকে দায়ী করতে পারে না। আদতে লড়াইটা ছিল অনেকাংশে তার নিজেরই তৈরি। নিজেরই কল্পনায়। কিন্তু অবচেতনে তৈরি হওয়া এই লড়াইয়েরই কারণে অনেকসময় নিজের বাবারই ওপর সে সমস্তটা উগরে দিয়ে এসেছে। উচ্চমাধ্যমিকের পর বাবান গেল বেসরকারি কলেজে এঞ্জিনিয়রিং পড়তে। টুকুস সুযোগ পেল আইএসআই কলকাতায়। তিক্ততাটা বাবানের বুকের ভিতরে থেকে গেল। কখনও সে বুঝতে দেয়নি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে বাবানের বয়স যত বেড়েছে, সে বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে না পাওয়ার ঘটনাগুলোকে সে ভীষণভাবে পুষে রাখতে চায়। বাইরে তার কদাচিৎ প্রকাশ ঘটে। কিন্তু অন্তরে একটা চূড়ান্ত বিদ্বেষ, হিংসা, নিজের ওপরে রাগ মাঝেমাঝেই ফেটে পড়তে চায়। যেমনটা সেদিন দুপুরেও ফেটে পড়তে চেয়েছিল। যদিও তার প্রকাশ ঘটেছিল আরও কয়েকদিন পর। টুকুসেরই ওপর।

এক শালিখ।

একটা প্রচণ্ড ঘুষির যন্ত্রণাকেই মনে মনে খুঁড়ে তুলতে চাইছিল বাবান। শালিখটা ঝটপটিয়ে উড়ে গেল। বাবান আবারও সেই দুপুরের ঘটনাতেই ফিরে গিয়ে দাঁড়ায়।

সময় আর ভাগ্য বড় অদ্ভুত জিনিস। কলেজে টুকুসের দ্বিতীয় বছরেই দুরারোগ্য অসুখে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তার বাবা বিজ্ঞানী অমিয় সেন। ক্যানসার এতটুকুও সময় দেয়নি। অস্থিমজ্জা থেকে মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়তে সময় লেগেছিল তিনমাসেরও কম। অমিয়কাকুর কেমোথেরাপির প্রথম দিন বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিল বাবান। দুই বন্ধুতে দেখা হয়েছিল। বাবানের হাতটাকেও অমিয়কাকু সেদিন ছুঁয়ে দেখেছিলেন। অদ্ভুত নরম ছিল তাঁর হাত। সেই হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার পরেপরেই ভাইরাল জ্বরে বাবানের বাবা কাবু হয়ে পড়েছিলেন। একমাস। এগারো দিন। সেই দিনই দুপুরে টেলিফোন এসেছিল।

সাধারণভাবে টুকুস দরকার হলে বাবানের ফোনেই ফোন করত। সেদিনই সে প্রথম সরাসরি তার বাবাকে ফোন করেছিল। ঘটনাটাও যে আকস্মিক। তা জেনেও বাবান আজ অবধি টুকুসকে পুরোপুরি ক্ষমা করতে পারে না।

অমিয়কাকু মারা গিয়েছিলেন। ক্যানসার তাঁকে সময় দেয়নি। সেদিন দুপুরে খবর পাওয়ার পর বাবানের বাবা সটান সেই অসুস্থ শরীরেও হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন। বাবানের বারণ শোনেননি। তার প্রয়োজনটুকুও বোধ করেননি। ফল মিলেছিল। দুদিনের মাথাতেই আবারও ভাইরাল জ্বর, ধকল সইতে না পেরে উচ্চ রক্তচাপের দীর্ঘমেয়াদী অসুখে আক্রান্ত বাবানের বাবার শেষ পর্যন্ত হার্ট অ্যাটাক। সপ্তাহ তিনেক পর।

সেই আমরি হাসপাতাল। অমিয় সেনের মৃত্যু এখানে। বাবানের বাবার বাইপাস অপারেশন। টুকুস দেখতে এসেছিল। হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে সমস্ত রাগ একনাগাড়ে টুকুসের ওপর উগরে দিয়েছিল বাবান। এতটুকুও সহানুভূতি ছাড়াই। এখনও চোখ বুজলেই বাবানের মনে পড়ে। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত করিডর। ফটফটে সাদা সিএফএল আলোর নিস্তব্ধতা। টুকুস কাঁদছিল। বাবানও শেষ অবধি কেঁদে ফেলেছিল বোধহয়। কিন্তু বলে দেওয়া কথাগুলোকে কখনও ফেরানো চলে না। কাচের জানালার ওপারে তাকিয়ে বাবান দেখেছিল যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন। বারবার এই ক্রীড়াঙ্গন চত্বরেই পা থেকে বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গিয়েছে তার। বাবান তখন কবিতা লিখত। এমনই কোনও একদিন সে তার ডায়েরিতে গোটা গোটা অক্ষরে লিখে রেখেছিল,

জানি অপলক এই শব্দহীন বেঁচে থাকা,
গ্রন্থিতে হারিয়েছে সবকিছু,
অনন্ত, অসীম সেই নীরবতা,
যেখানে মানুষ কুয়াশায় হেঁটে গেছে,
যার কোনও শুরু নেই,
শেষ নেই যার কোনও,
তবুও মানুষ হাঁটে,
তবুও সে হেঁটে যায়,
কোনও এক প্রাপ্তিকে ধাওয়া করে,
নীরবতা গ্রাস করে তাকে,
গদ্যের ক্রিয়ারেখা, অন্তে থাকে না আর,
যতিচিহ্নেরই মতো, মাঝে এসে বসে,
গদ্যের ভাব থেকে,
পদ্যেরা জেগে ওঠে, অবাক মানবতা,
সে মানুষ বাঁচে কবিতাতে,
কবিতায় জেগে ওঠে,
তার সেই অপলক নীরবতা,
পাহাড়ের কুয়াশার মতো,
ঝুপ করে নেমে আসে, অপলক ঘিরে ফেলে তাকে…

***

—‘সোহম কেমন আছে এখন?’ প্রাথমিক অস্বস্তি কাটিয়ে বাবান টুকুসকে জিজ্ঞেস করে।
—‘এখন ভাল একটু। প্লেটলেট কাউন্ট বেড়েছে। আজ সকালে আর ব্লাড দেবার কথা বলেনি’, জবাব দেয় টুকুস। বাবান মাথা হেলায়।

—‘ওহ হ্যাঁ, আলাপ করিয়ে দিই। এ হচ্ছে সুমন। সুমন সিংহ। আমার স্কুলফ্রেন্ড। তার চেয়েও বড়কথা সেদিন রাত্তিরে সুমন নিজে ওর পরিচিত এক ডাক্তারবন্ধুকে ফোন করেছিল বলেই অত সহজে, অত রাত্তিরে এই আমরি হাসপাতালে দু’দুটো বেডের ব্যবস্থা করা গিয়েছিল। নয়তো আমি তো আকাশ থেকে পড়েছিলাম’, একটানা বলে যায় বাবান।

সুমনের দিকে তাকিয়ে টুকুস ওরফে অনিন্দিতা হাতজোড় করে নমস্কার করে, ‘কী বলে যে ধন্যবাদ দেব আপনাকে। বাড়িতে তখন আমি আর মা একা। তাও আমি সদ্য ফিরেছি বাইরে থেকে। এই শহরে সেভাবে পরিচিত বলতে মা’কে যে নার্সিংহোমে চেক-আপ করাই সেইটুকুই। অত রাত্তিরে ওইরকম দুজন ক্রিটিকাল পেশেন্টকে নিয়ে কী করব, একেবারে খেই হারিয়ে ফেলেছিলাম। তাও সোহমের কললিস্ট থেকে অর্কর নম্বরটা পেলাম তাই। নইলে যে কী হতে পারত’, সুমন টুকুসকে থামিয়ে দেয়, ‘প্লিজ আমাকে আপনি করে বলবেন না। আমি আর অর্ক একই বয়সী, কাজেই তুমিটাই বোধহয় ঠিক আছে। তবে আপনার মাসতুতো ভাইটিকেও বলিহারি বলতে হয়। বউয়ের এমন অবস্থায় নিজে জ্বর বাধিয়ে, বাড়িতে অবধি কিছু জানায়নি?’

টুকুস দু’দিকে হাত ছড়ায়, ‘কী বলবেন বলুন। সোহমের জেদ নিয়ে কিছু বলার নেই। আসলে বাবা-মাকে ছেড়ে বাইরে বাইরেই বড় হয়েছে। হস্টেলে হস্টেলে। তারপর মা-বাবা চলেও গেলেন ওরকম হঠাৎ। ও বোধহয় বাড়াবাড়ি রকমে আত্মনির্ভরতার ব্যারামে ভোগে। অন্তত তাই মনে হয় আমার। কল্যাণী থেকে শুচিস্মিতাদির মা, বাবা, কাকারা সবাই আসতে চেয়েছিলেন। কাউকে আসতে দেয়নি। শেষমেশ জ্বরের ঘোরে ভুল বকছে যখন, তখন শুচিস্মিতাদি কী ভাগ্যিস ফোন করেছিল আমায়।’

বাবান একমনে একপাশে দাঁড়িয়ে শুনছিল।

সোহমের সঙ্গে ওর আলাপ কলেজ-জীবনে। এক বেঞ্চের জিগরি দোস্ত। মানুষ যে সময়ে প্রথম লায়েক হয়ে ওঠে, ওদের সেই সময়কার ইয়ারাপন। অথচ এতবছরেও সে জানতে পারেনি টুকুস আর সোহম সম্পর্কে মাসতুতো ভাই-বোন। অবশ্য অমিয় সেন মারা যাওয়ার পর টুকুস কোনওমতে গ্র্যাজুয়েশন পাশ করেই বিদেশে পাড়ি দিয়েছিল। মাসির বাড়িতে হয়তো তেমন যাতায়াতের সুযোগ ছিল না সোহমের। সোহমের বউ শুচিস্মিতা। সেও বাবানদেরই কলেজে পড়ত। ‘আত্মনির্ভর’ সোহম, শুচিস্মিতা নয়মাসের গর্ভবতী জেনেও নিজেরাই সবদিক সামলে নেবে ভেবে বাড়িতে আত্মীয়স্বজন কাউকেই আসতে দেয়নি। এই সিদ্ধান্ত অবশ্য বাবান যে একেবারেই সমর্থন করে না, তা নয়। ‘রিলেটিভ’ মানে আদতে যে ‘আপেক্ষিক’— এই বিশ্বাস তার মানসিকতায় অটুট। তবুও গত সপ্তাহের শুক্রবারে যে কেলেঙ্কারিটা আর একটু হলেই ঘটে যাচ্ছিল, সেকথা ভাবলেই বাবানের এখনও গা শিউরে ওঠে।

গত সপ্তাহের সোমবার থেকে সোহমের জ্বর আসে। শুচিস্মিতার অতটা অ্যাডভান্স স্টেজ অব প্রেগন্যান্সি জেনেও সে নিজের শরীরকে আমল দেয় না। প্রচুর পরিমাণে জল আর ক্যালপল চালালেই জ্বর ছাড়বে, এই চিরকালীন মধ্যবিত্ত ভাবনাতে নিজেকে সঁপে দিয়েই বিপদ ডেকে আনে সোহম। বৃহস্পতিবার রাত থেকে জ্বর বাড়তে শুরু করে। তখনও, কল্যাণী থেকে শুচিস্মিতার মা-বাবা চলে আসতে চাইলে সে বারণ করে। বলে শনিবার অবধি একটু দেখে নিয়েই না হয় এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। অহেতুক কারওকে বিব্রত করার সে পক্ষপাতী নয়। শুক্রবার রাত থেকে জ্বরের ঘোরে সে ভুল বকতে শুরু করে। অত রাতে কার কাছে যাবে বুঝতে না পেরে শুচিস্মিতা এতটুকু মাথায় রাখে যে, সোহমের মাসতুতো বোন অনিন্দিতা এখন কলকাতায়। কিছুদিন আগেই সে সোহমদের বাড়িতে এসেছিল। অত রাত্তিরে শুচিস্মিতা প্রথম তাকেই ফোন করে। কিন্তু টুকুসও সোহমদের বাড়ি চলে এসে কী করবে ভালভাবে বুঝে উঠতে পারে না। সোহমের ফোন ঘেঁটে সে অবশেষে অর্ককেই ফোন করার সিদ্ধান্ত নেয়। অর্ক যে সোহমের খুবই কাছের তা সে জানত। কিন্তু সেই কারণেই হয়তো সে সোহমকে বারণ করে দিয়েছিল বাবান ওরফে অর্ককে তার কথা বলতে। বাবান। এই সবই ভাবছিল তখন।

সুমনের কল্যাণে আমরিতে সোহম-শুচিস্মিতা দুজনেরই জন্য বেডের ব্যবস্থা হয়। শুচিস্মিতার ক্ষেত্রেও বিষয়টা ক্রমশই গর্ভের অন্তিম অবস্থার দিকে যাচ্ছিল। হাসপাতালে রক্তপরীক্ষায় সোহমের ডেঙ্গি ধরা পড়ে। শুচিস্মিতার সিজারিয়ানের সিদ্ধান্ত হয়। আজ তার অপারেশন।

হাসপাতাল থেকে একটু এগোলেই সিটি সেন্টার ওয়ান সল্টলেক। সেদিন কী কারণে জানি একা একাই হঠাৎ মতলব কষে সিটি সেন্টারের ঠিক ডানপাশে ইজেডসিসি প্রেক্ষাগৃহে হিন্দি নাট্যোৎসব দেখতে চলে এসেছিল বাবান। নাটক শুরু হতে তখনও দেরি আছে। কাজেই রাস্তার এপাশে চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে সে সময় কাটাতে চায়ে চুমুক দিচ্ছিল। চায়ের নেশাটা বোধহয় তার জন্মগত। আপনমনেই বাবান হেসে ফেলে। তখনই সে মোড়ের ওপার থেকে খুব চেনা দুটো অবয়বকে রাস্তা পেরিয়ে এগিয়ে আসতে দেখে। কলেজের তখন সেকেন্ড ইয়ার তার। একটি ছেলে আর একটি মেয়ে, হাত ধরাধরি করে রাস্তা পেরিয়ে আসছে। দুজনকেই চিনতে পারে বাবান। ছেলেটি মেয়েটিকে একটা অটোয় তুলে দেয়। তার আগে দুজন-দুজনকে জড়িয়ে ধরে। বাতাসে অদ্ভুত এক মিষ্টতা টের পায় বাবান। কিন্তু নতুন করে সে আবারও তখন হেরে যাচ্ছিল। ভেতরে ভেতরে তার সেই চণ্ডাল রাগটুকুই ক্রমশ দানা বেঁধে উঠছিল বোধহয়।

অটোটা চলে গেলে পিঠে হাত দিয়ে বাবান ছেলেটিকে ডাকে। ছেলেটি অবাক হয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। সেও ভাবতে পারেনি এই সময় সে বাবান ওরফে অর্ককে এই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবে। কলেজজীবনে প্রথম ত্রিকোণ প্রেম। রক্ত তখন গরম ছিল সবার।

কিন্তু বাবানের মুখ চলত বেশি। সেই মুখের ওপরেই ঘুষিটা এসে পড়েছিল। কোনও এক কুকথার জবাবে। হইহই করে রাস্তার লোক ছুটে এসেছিল। নাক ফেটে গিয়ে বাবানের শার্ট রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বাবান নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে জানে, কলেজ জীবনের প্রথম দিককার সেই বালখিল্যতাগুলোর আদতে কোনও মূল্য ছিল না। অনেক বেশি করেই, কলেজ জীবনের চার-চারটে বছর তাদেরকে বন্ধু চিনতে শিখিয়েছিল সেই সময়। যে মানুষ দুটোকে অর্ক ওরফে বাবান রাস্তা পেরিয়ে এপারে আসতে দেখেছিল, আজ সেই দুজনেরই জন্য সে আবারও এই আমরি হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে। সে টুকুসের দিকে তাকায়। শুচিস্মিতা আর বাবানের বিষয়ে এই প্রথম দিককার ঘটনাগুলো নিশ্চয়ই সোহম তাকে বলেনি। বললেও তার ভারী বয়ে গেছে সেই নিয়ে মাথাখারাপ করতে। সে আবারও পিছনের দিকে তাকায়। শালিখটাকে খুঁজে বের করতে চেষ্টা করে।

হাসপাতালের ভেতর থেকে শুচিস্মিতার বাবা বেরিয়ে এসেছেন। হাত নেড়ে ডাকছেন ওদের। ওরা এগিয়ে যায়। শালিখটাকে এতক্ষণে খুঁজে পেয়েছে বাবান। এত বছরের মধ্যে যতবার সে এই চত্বরে এসেছে, প্রতিবারেই সমাপ্তি ঘটেছে নিস্তব্ধতায়। বাবানের খুব ভয় করছিল। সে কুসংস্কার মানে না। মানতে চায় না কোনওভাবেই। কিন্তু প্রতিবারেই, ব্যুলেভার্ডের ওপর এই একখানি করে বসে থাকা শালিখ! বাবানের নিজের গালে চড় মারতে ইচ্ছে হয়। ঈর্ষার হাত থেকে সে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে এতখানি ভয়, এতখানি অবিশ্বাস। এই চত্বরটা যেন বাবানের কাছে আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুচিস্মিতার বাবাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন মাইল খানেক পেরিয়ে তাঁর কাছে পৌঁছতে হবে। বাবানের মাথা ভার হয়ে আসে। সে যেন আর কোনও কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।

***

এই জায়গাটা বাবানের খুব ভাল লাগে। অথবা, ভাল লাগে বলাটা উচিত হল না বোধহয়। এই জায়গাটা বাবানকে ভাবায়। বাবানকে থমকে দাঁড় করায়। যখনই এই চওড়া রাস্তা আর তারই বুক চিরে চলে যাওয়া এই ব্যুলেভার্ডের একপাশে দাঁড়িয়ে কখনও বাবান এই জায়গাটার কথা ভাবতে চেষ্টা করে, তখন প্রতিবারেই একগুচ্ছ ছবি আর গন্ধেরা কোথা থেকে যেন ভিড় করে এসে বাবানের মাথার ভিতরে জটলা করে দাঁড়ায়। কেমন যেন জঙ্গুলে সুখ। শহরের খাস মধ্যখানে হলেও এখানে সবুজের আধিক্য রয়েছে। হয়তো বা থাকবেও। আরও বেশ কয়েকদিন।

তখন বিকেল। বাস নয়, উবের থেকে নেমে এল সুমন। ওর স্ত্রী অবশ্য আজ আসতে পারেনি। যে স্কুলে সে পড়ায়, সেখানে কী যেন এক অনুষ্ঠান পড়েছে। কিন্তু পরে কোনও একদিন এমন আড্ডাতে সে আসবেই কথা দিয়েছে। টুকুস আর বাবান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল। ওরা দুজনেই এখনও অবধি গণপরিবহণে বিশ্বাসী। এবং, ওরা এখনও বিবাহিত নয়। নিজ নিজ ক্ষেত্রে অনেকটা উপর অবধি পৌঁছলেও দুজনের সম্পর্কটাকে ওরা কিছুতেই বন্ধুত্বের চেয়ে উপরে উঠতে দিতে চায়নি। সচেতনভাবে এক স্বাস্থ্যকর দূরত্ব বজায় রেখে এসেছে। সুমন-সোহমের শত উসকানি অথবা কাউন্সেলিং সত্ত্বেও কারও এতটুকুও পদস্থলন ঘটেনি। আজ ওরা এই চত্বরে এসে দাঁড়িয়েছে, কারণ সোহম-শুচিস্মিতার প্রথম সন্তান কাবেরী, এমবিবিএস পাশের আনন্দে আজ তাদেরকে খাওয়াতে চায়। জন্মের প্রথম মুহূর্তে, তার মা-বাবার যে বন্ধুরা সবচেয়ে আগে দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, কাবেরী তাদেরকেই প্রথম একসঙ্গে দেখবে আজ। বাবান ওরফে অর্কর ভাল লাগছিল।

আজও সেই ব্যুলেভার্ডের ওপর শালিখ বসে আছে।

এক শালিখ।

অথচ বাবান জানে, যেমনই তারা রাস্তা পেরতে শুরু করবে— অমনিই পাখিটা ফুড়ুৎ করে ডানা মেলবে, আর ঝোপের আড়াল থেকে ঠিক তক্ষুনিই পাখির জোড়াটাও বেরিয়ে আসবে। যেমনটা বাবান কাবেরীর জন্মের দিনেও প্রত্যক্ষ করেছিল। শুচিস্মিতার বাবার দিকে বাবানকে সেদিন আর আলাদা করে তাকিয়ে দেখতে হয়নি। সুখবরই যে অপেক্ষা করছে ওই ব্যুলেভার্ডের দিকে তাকাতেই বাবানের কাছে তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বাবান এখন মধ্যে মধ্যে চিন্তা করে কেবল, পিছনে ফেলে আসা এতগুলো দিন, এতগুলো ঘটনাক্রম, প্রত্যেকদিনই কি তাহলে শালিখের জোড়াটা আদতে তারই ইঙ্গিতের জন্য ঝোপের মধ্যে অপেক্ষা করে থাকত? নাকি জীবন আসলে ফুটবলেরই সঙ্গে তুলনীয়?

একেকবারে মিসপাস হলেও প্রত্যেক খেলোয়াড়েরই জীবনে গোল আসবে সঠিক সময়ে; ততদিন প্রত্যেকেরই জীবনে কেবলই অনুশীলন!

চিত্রণ: মুনির হোসেন
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »