Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

আক্ষেপ

এতদিনে মনে মনে আমরা অনেকেই বুঝে ফেলেছি যে, এই বাঙালি-জন্মে অনেক কিছুই করা হল না। ভবিষ্যতে যে হবে তেমন সম্ভাবনাও বড় কম। এই কাঠামোতে আর বোধহয় সম্ভব নয়।

এই সম্ভব না হওয়ার দায় কিন্তু আপনার নয়। ভেবে দেখলে তেমন ভাগ্য আপনাকে দেওয়া হয়নি, তাই এই অপূর্ণতা। এই “না পাওয়া” নিয়ে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে একটা লম্বা আক্ষেপের লিস্ট করা যেতেই পারে।

আক্ষেপের কি কোনও রকম হয়? সে হরেকরকমের। বিচিত্র তার রং, বিচিত্র তার গড়ন। ভ্রমণের আক্ষেপ থাকবেই। সুইজারল্যান্ডে স্কেটিং করা বাকি, প্রাইভেট প্লেনে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে উঁকি দেওয়া হয়নি, মেটেনি অরোরা বোরিয়ালিস নিয়ে হালকা মাখামাখির একটুকরো আহ্লাদ।

গ্রিনল্যান্ড, আফ্রিকা বড্ড টানে আপনাকে। টানবেই। অটো করে যে যাবেন, সে উপায় কি আর আছে? ক্যামেরা নিয়ে এস্কিমো বা পিগমিদের সাথে সেলফি তোলার সাধ সেই কবেকার! কেউ নিয়ে গেল না। আপনার এন. আর. আই. পিসেমশাই নেই। শ্বশুরমশাই গ্রিনল্যান্ডে ব্যবসা করেন না। তাই ইগলুর ছবি দেখেই জীবন কেটে গেল। গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ-এর প্রবাল প্রাচীরে স্কুবা ডাইভিং হল না। ব্যাবিলনের ঝুলন্ত বাগানে একটু আনমনা হয়ে বসে ডালগোনা কফিতে চুমুক দিতে দিতে জীবনের প্রথম কবিতা লেখার সাধ যদি জেগেই থাকে, তো সে আর এমন কী বেশি চাওয়া! সেও মিটল না! ক্রিট বা রোডস আইল্যান্ডে নিজের একটা ফার্ম হাউস! ধুর ধুর সব মাটি।

তাও যদি কলকাতায় বরফ পড়ত! ভাবুন একবার, সেরকম এক দৃশ্য। বড়দিনে সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালে গেছেন। পাশে সদ্যবিবাহিত অর্ধাঙ্গিনী। ক্যাথিড্রাল থেকে ঈশ্বরপুত্রের আশীর্বাদ নিয়ে বেরিয়ে আসার পথে গিন্নির সোল্লাস চিৎকার, “ওমা, দেখো দেখো বরফ পড়ছে!” আপনি তাকিয়ে দেখলেন পেঁজা তুলোর মতো বরফ নামছে রবীন্দ্রসদন চত্বরে। দুজনে নেমে পড়লেন বরফ মাখতে। চারপাশ সাদা হয়ে উঠছে ক্রমশ। একটু দূরে ভিক্টোরিয়ার পরীকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। বরফ মাখতে মাখতে সে ভুলে গেল যে, তার ঘোরার ক্ষমতা আর নেই। সে ঘুরতে শুরু করল আবার। ময়দান, প্ল্যানেটরিয়াম, শহিদ মিনার– সব সাদা হয়ে যাচ্ছে একে একে। রেস কোর্সের সব ঘোড়াই যেন পেগাসাস। পাশে কফি-বিক্রেতার করুণ আহ্বান কানে এল আপনার– কফি ছাড়া বরফ জমে না দাদা, মোটে ২০ টাকা কাপ। আপনি কফির অর্ডার দিলেন। কফিতে চুমুক দিতে দিতে আনমনে বলে উঠলেন, ‘‘যাই বলো কুমু, বরফঢাকা কলকাতার মজাই আলাদা, সিমলা-মানালি ধারেকাছে আসে না।’’ বরফমাখা কুমুর মুখে সম্মতির হাসি।

এবার বাস্তবে নেমে আসি। বরফ তো দূরস্থান, মিষ্টি হাসির কুমু– সেও বাংলাদেশে দুর্লভ। সকাল সকাল চায়ের জলের সাথে তেনারা ফোটেন। ঘুম ভেঙে সকাল সকাল যে এক কাপ চা জোটে বাঙালি গৃহকর্তার, তা হল “গজগজে চা”, প্লেট ছাড়াই। সেই চা চটপট গিলে ছোটঘরে সেঁধিয়ে যাওয়া। এই ছোটঘর মানে টয়লেট। কত ভালবাসার, কত বড় একটা কল্পনার জায়গা হতে পারত এই টয়লেট। হতে পারত প্রেমকথা! এখানেই একদিন বাথটাবে বসে আর্কিমিডিস স্যার সেই “প্লবতা সূত্র” আবিষ্কার করে প্যান্ট-জামার কথা বেমালুম ভুলে “ইউরেকা ইউরেকা” করতে করতে ছুটে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিলেন। আপনারও কি ছোটখাটো আবিষ্কারের সুযোগ ছিল না! ছিল বইকি! আলবত ছিল! কিন্তু সেই সুদিন এল না। কারণ সেই গজগজে চা! এ জিনিস কল্পনার জোগান দেয় না। কল্পনা তো দূরস্থান, আমবাঙালির জীবনে ছোটঘরে “ত্যাগের” আনন্দই বা মিলল কই?

আক্ষেপ আরো হাজার হাজার! একটা ভাল প্রতিবেশী যদি পেতেন তা হলেও জীবনটা বর্তে যেত। পেলেন কাকে? না, এক নম্বরের ধড়িবাজ সত্যবাবুকে! একটাও সত্যি বলেন না! আপনার সাথে দিনরাত “টাগ অব ওয়ার” খেলে যাচ্ছেন। কথায় কথায় তর্ক বাধান। আপনার জায়গা চাপিয়ে বাগান করেছেন। গোঁফ নেই, মাকুন্দ। সকাল সকাল এমন মানুষের মুখ দেখা অকল্যাণ!

Advertisement

তবু মুখ দেখতে হয় আপনাকে। মনের সাধ মেটাতে বেশ গুছিয়ে একদিন এই সত্যসুন্দরকে যে পেটাবেন– সে উপায়ও কি দিয়েছেন ভগবান? ৫০ ইঞ্চির বুকের ছাতি হল না, স্ট্যালোনের মতো পেশি হল না, ক্যারাটে কুমফু, জুডো কোনও কিছুতে কেরামতি রপ্ত হল না, বডিওয়েট সারা জীবন ধরে লাট খেল পঞ্চাশের নিচে। মেসি, রোনাল্ডো কিচ্ছু হওয়া হল না। দক্ষতা বলতে শুধু দুই খেলায়– মার্বেল গুলি আর ডাংগুলি। এইসব আক্ষেপ কি এ জীবনে আর সত্যিই মিটবে!

ভাল রেস্তোরাঁ রয়ে গেল নাগালের বাইরে! আমবাঙালির স্বপ্নের হোটেল ওবেরয় গ্র্যান্ড। তার সাথে সম্পর্ক মানে তার সামনের ফুটপাতের সস্তা শার্ট কেনা! বাইপাস আলো করে দাঁড়িয়ে আছে আই টি সি সোনার বাংলা। আহা কী বাদশাহী রূপ! তা দেখতে দেখতে ফুটপাতি চায়ে চুমুক আর শুকনো বিস্কুটে সৌখিন কামড়! এই রসিকতার নাম হল বাঙালি জীবন!

তাহলে পেলেনটা কী? ঈশ্বর বঙ্গদেশে প্রাণ ঢেলে গরম দিয়েছেন। আট মাস ভেপে যাও সেই গরমে। ম্যালেরিয়াকে আপন করে নাও কিংবা ডেঙ্গু। বদহজম চাইতে হয় না, জন্মসূত্রে এ আপনার অধিকার। চিরকাল ‘আমাশার ছলনে’ ভুলে রইল বাঙালি। না চাইলেও পেটের মধ্যে আপনাআপনি চিড়িক দিয়ে উঠবে। বিলাসিতা বলতে কী আছে আপনার? ফুটপাতি তিনফুটি চা। আর গরম তেলেভাজা। এই দুই জিনিসের গুণে পেটে এক অদ্ভুত বিপ্লব শুরু হয়, যার পোশাকি নাম অ্যাসিডিটি। সেই জিনিসের কল্যাণে পেট ফাঁপে। তার জেরে রাতের ঘুমে আসে সেই সব অধরার স্বপ্ন। তার জেরে আপনি সুইৎজারল্যান্ডে স্কেটিং করেন, গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে স্কুবা ডাইভিং। শীতের লেপের নরম আশ্রয়ে আপনার ইগলু-দর্শন হয়, আপনার কল্পনায় আলো জ্বলে।

সেই কল্পনার এক্সপ্রেসই আপনার একমাত্র ভরসা। তাতে চেপে আপনি মনোভ্রমণে যান। সঙ্গে আপনার দুর্বল বৃদ্ধ পিতা, বাতের ব্যথায় কুঁই কুঁই করা মা, আটপৌরে শাড়ি পরা আপনার গিন্নি। ছুটে চলে কল্পনার এক্সপ্রেস। আপনি দেখাতে দেখাতে যান– দেখো বাবা, ওই দূরে নীল নদ, তার পাশে পিরামিড… তার পাশে… তার পাশে…। বাবা আশীর্বাদ করেন, বেঁচে থাক বাবা, তোর জন্য আমাদের চর্মচক্ষু সার্থক হল। কল্পনা ভেঙে গেলে দেখেন দুচোখে আপনার অজান্তেই যেন নেমেছে আষাঢ় শ্রাবণ!

চিত্রণ: মনিকা সাহা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − 2 =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »