Search
Generic filters
Search
Generic filters

সনেটগুচ্ছ

আ মরি বাংলা ভাষা!

সব ভাষাতেই থাকে কৌতুকাভিনেতা
আয়ুবের মত। নেই অলরাউন্ডার,
বঙ্গবন্ধু যেমন ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রণেতা
একটি সুঠাম মানচিত্র আর শাশ্বত ভাষার।
এমন কি কোনো ভাষা জানা আছে, শোণিতেই যার
মাতৃভাষা— অক্ষরসমূহে নক্ষত্রের দ‍্যুতি? সেই
পৃথিবী-মন্থিত ভাষা বঙ্গভাষাতেই
সিংহাসন কবিদের, রাজ‍্যপাট,— সে-ও কবিদের,
সেই এক ভাষা পৃথিবীতে, অশ্রুমাখা, অনুপম!
দোয়েল মাধবী রূপকথা বিশ্বকবি জন্ম দেয়
যে-ভাষায়, দেখেশুনে যতেক অন‍্যায়
রুখে দাঁড়ালেন কবি, বিদ্রোহী ও যম!
বিশ্বে এ কী ভাষা! একাকী, বিরল, যে ভাষায় জিদ
করে তার প্রতিষ্ঠায় দধীচিরা হয়েছে শহিদ।

*

স্বপ্ন

দিবাস্বপ্ন দেখো তুমি, দেখো বা রাতের
তারার রোশনচৌকি যখন আকাশে।
অথবা শিশির পড়ে সকালের ঘাসে।
স্বপ্ন যে স্বপ্ন-ই শুধু, ছবি আপাতের।
স্বপ্ন জলরং, তার আপাদমস্তক
যতই আনাম সুখ-শান্তি মনে হোক,—
ছেঁড়া কাগজের গায়ে আদরা শোলোক।
স্বপ্ন ভেঙে গেলে তাই করিয়ো না শোক।

স্বপ্নভঙ্গ হলে সেই যাদু-কুজ্ঝটিকা
দুর্বিষহ মনে হয়। মনে হয়, কেন
স্বপ্নলোক থেকে এক মহামরীচিকা
শাদা পর্দায় দোলে ছায়াছবি— হেন
স্বপ্নের রাত হোক যতই রঙিন,
দুচোখের দৃশ‍্যাদৃশ‍্য দেখায় তো দিন!

*আনাম= আস্ত, গোটা। আদরা= নকশা।

*

কেন

কেন কাকশালিখের ছড়াছড়ি, আর
গোলাপবাগান সারে ও জলে উঠোনে
কারো কারো, অন‍্যে নিদ্রাহীন দিন গোনে
ছিন্নকন্থা গায়ে, রাতে জোটে না আহার?
তুমি বিশ্বপিতা, বলো অগণ‍্য আতুর
অন্ধ ও বধির করে জন্ম দাও কেন?
সৎমা-কে জানি, তুমি মনে হয় যেন
সৎপিতা, দেখি যত দুঃখভারাতুর।
কণ্ঠে সাতনরী হার, হীরের গহনা
আটটি প্রহর কেন বৈভবে বিলাসে
কারো কারো বসবাস মর্ত‍্যের কৈলাসে
কেউ দিন গুজরায়? ঈশ্বর, কহো না!
ধনীর জাহাজ, তুমি, গরিবের নাও
সমদ্বিখণ্ডিত করে এক করে দাও।

*

জানি, জানি না তো!

নীলাকাশ কখনো যে পায় ধূসরতা।
সবুজ গাছের পাতা বাসন্তী হাওয়ায়
পর্ণমোচনের আগে হলুদ দেখায়।
সুগন্ধী বকুলে দ্বিপ্রহরে স্নানরতা,
তারপর কেশপাশে ফুল কর্ণিকার,
বেসর বাহারি তিল বাক‍্যহীন যার
আধূত অধর, দেহ কাঁপে বারবার,
স্মৃতি শুধু, স্মৃতি আজ শান্ত বিধবার!
বর্ণ গন্ধ অর্থ ঢেউ কেবল আপাত।
ঘোলা ভাগীরথীজল সমুদ্রে সুনীল।
সেই জল বাষ্প হয়, কী আশ্চর্য! আর
হিমালয়ে সেই বারি সুশুভ্র তুষার!
আহা কী নিরর্থ আর অলীক নিখিল!
জানি, তবু মনে হয় কই, জানি না তো!

*

ছিল না, এখন আছে

বঙ্গে না আইলে ইখতিয়ার উদ্দীন
কাগজ কলম বিনে কাটত যে দিন।
আমাদের মাতা ছিল, বাবা ছিল না তো,
স্বরগ নরক ছিল, ছিল না জান্নাত।
আদালত কই ছিল, কোথায় মিনার?
দাদা দাদী ভাই বিনে শূন‍্য এ সংসার!
মহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর
আগমনে প্রচলন আরবি-ফার্সির।
একাদশী ছিল, তবে দালান দরোজা
ছিল না যে, বেহাজির নামাজ ও রোজা।
হিসাব কিতাব বাদশা বেগম বেবাক
সেতার না ছিল, তবে ছিল জয়ঢাক।
ছিল জন্মজন্মান্তর, সন্ধ‍্যা ও প্রভাত,
আইল দোজখ, বেহেস্ত, আইল আখেরাত।

*

আহ্বান

তোমার দুচোখ শুকতারাটির মত
স্বপ্ন দেখায় সুদূর সমুদ্দুরের,
তোমার আনত চোখে হই সন্নত
চুম্বন গাই মেঘমল্লার সুরে।
নীলপদ্ম কি তোমার পায়ের পাতা?
হাতের আঙুলে আলেপ্পি-কারুকাজ,
ওষ্ঠ অধর এখনো অনাঘ্রাতা?
সেখানে দ্রাক্ষা-আসবের মত ঝাঁঝ?
চলো, হাত ধরো, অরণ‍্যে ঝর্নায়
নিশীথিনী জুড়ে আমরা বেড়াব শুধু
দিন কাটে খালি বৃথা ঘরকরনায়
ভোরের আলোয় দেখব কেবল ধূ ধূ
সীমাহীন মেরুজ‍্যোতির সন্নিধান
যেতে হবে আজ ভুলে গিয়ে পিছুটান।

*

তুমি

তোমার একটি চোখে বয় ঝর্নাধারা,
কত মানুষের স্নান সে নির্ঝরিণীতে,
তোমার অপর চোখে মুদ্রিত সাহারা,
পাথরের চোখ শিরাহীন ধমনীতে।
তোমার হৃদয় জুড়ে মুদিত গোলাপ,
তোমার দক্ষিণ হাতে মৌন বরাভয়!
তোমার ভ্রু-মধ‍্যে এ কী! সুপ্ত কালসাপ
নিশীথে ছোবল মারে, শান্তি নয়ছয়!
তবু তুমি বৃক্ষতলে আনত দাঁড়াও,
তবু তুমি মূর্ছা যাও রাত্রি ভালবেসে,
তবু তুমি ঝঞ্ঝারাতে ভগ্ন খেয়া বাও,
অরুণোদয়ের আভা মেখে কালোকেশে।
নদীর এপারে তুমি, একা, একলাটি,
ওপারে তোমার ছদ, হেতালের লাঠি।

*

আমরা পুতুল

আমরা তো আজীবন পুতুলের প্রতিশব্দ, কত
ভাঙাগড়া আমাদের, দিনরাত অন্দর সদর,
যা খেলি জানি না খেলা গড়ে কে নেপথ‍্য কারিগর।
আজ রাজসিংহাসনে, কাল হয় মুহূর্তে পতন।
মন্বন্তরে মরি না তো, সাপ বাঘ নিয়ে খেলা করি,
চাল নেই চুলো নেই, তবু চড়ি সোনার সাম্পান,
স্বপ্নে কত জর্দা চুন ছাড়া খাই ভুলরঙা পান।
অলীক জীবনটাকে কে বাঁচায়, কোন ধন্বন্তরী?
জন্মদাতা পিতামাতা, ভাইবোন পুতুল, পুতুল!
প্রেমিকার ওষ্ঠে মধু, বুকে মধুরতরতা জানি,
তার ঋতুমতী নদীটিকে ঘিরে আমি মহাজন
মহান মূর্খের শাহজাদা, নিজেকেই বলি, ‘শোন,
প্রাণপাখি উড়ে গেলে থাকবে কেবল খাঁচাখানি,
সেইদিন দেখা দেবে পুতুলনির্মাতা নির্ভুল।’

*

পিরামিড, না কাঁটাতার

মানুষ আসবে বলে ধরিত্রীমাতার
কোটি কোটি বছরের তপস‍্যা ও ক্লেশ।
পৃথিবী, সমুদ্র, নদী, দেশ-মহাদেশ
গড়েছে, বিস্মিত তার যত্নপরতার!
মানুষ আসবে বলে ফুলে ফুলে মধু,
সন্ধ‍্যামণি, টিউলিপ, হীরক প্রবাল,
ময়ূরপেখম, মৃগনাভি, হরিয়াল,
হীরক, কাঞ্চন রেখে তার মর্মমূলে।
অবশেষে মানুষের শুভ আবির্ভাব।
প‍্যাপিরাস, মোনালিসা, আল হামরার,
বুদ্ধ যিশু অজন্তা ও জেন্দ আবেস্তার
সমলয়ে কেন আজ এটিলা-স্বভাব?
কিছুই বুঝি না, কেউ আছে বোঝাবার,—
পিরামিড সত‍্য, না কি সত‍্য কাঁটাতার?

*

খোয়াব

সারমেয়, চন্দ্রবোড়া, বৃশ্চিক, ভ্রমরা
বাস্তবে না দংশিলেও স্বপনে দংশায়।
খোয়াবে লাইলা দেখো, জাগ্রতে তোমরা
বেতো কানা দন্তরোগী সেবো, হায় হায়!
বাড়িতে তো পোড়া পিঠা, দুধচিনিহীন,
অর্ধদগ্ধ কাঁচকলা গলিত মাছের
অস্বাদ কুস্বাদময় ভোজ রাত্রিদিন
স্বপ্নে পায়সান্নে গন্ধ খেজুরগুড়ের!
তোমাদের আছে স্বর্গ, আছে রাজপ্রাসাদ,
ঝরোখায় ঝরোখায় হুর পরী মেম,
পেটিকায় সোনা, পান্না, বেশুমার হীরা,
মাণিক‍্যের পানপাত্রে রঙিন মদিরা।
বিশ্বের সুন্দরী এনে ভরেছ হারেম,
স্বপ্নেই কেবল গড়ো স্ফটিকের চাঁদ।

*

জীবনতরঙ্গ

জীবনতরঙ্গ আর মৃত‍্যুর স্তব্ধতা,
এর মাঝে সুখ দুঃখ মুক্তি বেড়াজাল,
স্বাধীন ও পরাধীন। খাঁটি ও ভেজাল।
খেয়ে, রোজা একাদশী রেখে, কথকতা
শুনে অবিরাম শুধু দিন গুজরান।
শত্রুতা মিত্রতা আছে, কালব‍্যাধি আছে
গৃহস্থালি অথবা সন্ন‍্যাস। বারোমাস
কেউ কেউ এ-জীবনময় হা-হুতাশ
করেই কাটায়, কেউ বঞ্চিতের কাছে
পরমবন্ধুর মত, সূর্যের আলোক!
অন্ধের যষ্টির চেয়ে কিঞ্চিৎ অধিক,
যে-আলোয় পথ দেখে বিপন্ন পথিক।
তার বরাভয় ‘সকলের ভাল হোক’।
পৃথিবীতে বেয়াকুব কারো জন্ম, আর
কারো জন্ম বিকাশিতে সুপ্ত প্রতিভার।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ‍্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 4 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »