
ওড়িশা সীমান্ত বঙ্গে বৈষ্ণব পদাবলী
বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ বৈষ্ণব পদাবলী। শ্রীচৈতন্য-পূর্ব যুগে বৈষ্ণব পদাবলী রচিত হলেও পদাবলী সাহিত্যের বিকাশে শ্রীচৈতন্য-এর অবদান অনস্বীকার্য। বর্তমান আলোচনার মূল লক্ষ্য ওড়িশা সীমান্ত বঙ্গে

বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ বৈষ্ণব পদাবলী। শ্রীচৈতন্য-পূর্ব যুগে বৈষ্ণব পদাবলী রচিত হলেও পদাবলী সাহিত্যের বিকাশে শ্রীচৈতন্য-এর অবদান অনস্বীকার্য। বর্তমান আলোচনার মূল লক্ষ্য ওড়িশা সীমান্ত বঙ্গে

India’s First Bengali Daily Journal. মহানগরী কলিকাতায়, সাতসমুদ্র পারের ইংরেজি নাম বহন করা এক–দু’টি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে পরিচারক স্তরের কোনও পদে নিযুক্ত এক–দু’জন ভাগ্যশালী যুবক অনেকের ঈর্ষার পাত্র হওয়া স্বাভাবিক। অভূতপূর্ব কেশসজ্জায় সজ্জিত হয়ে তারা গ্রামে আসত। গ্রামে যে ক’দিন থাকত প্রতিদিনেই একাধিকবার সুগন্ধি তেল মেখে তারা সেই অভূতপূর্বতার যত্ন নিত। পকেটে চিরুনি রাখা এমনকি খোদ শিক্ষকমশাইদের সামনে তা বের করে চুল আঁচড়ানোর মতো বিংশ শতকীয় আধুনিকতার তারাই ছিল প্রবর্তক।

India’s First Bengali Daily Magazine. বাঘাযতীনদের নিয়ে গান, কবিতা লেখার বিরাম নেই। সুকুমার সাহুর লেখা ‘চষাখণ্ডর সেনাপতি’ লোকের মুখে মুখে ফেরে। নজরুলের ‘নবভারতের হলদীঘাট’ কবিতার ব্রজনাথ রথ-কৃত অনুবাদও সমান জনপ্রিয়। বাঘাযতীন সম্পর্কে ছোট ছোট পুস্তিকারও অভাব নেই। কিন্তু ওড়িয়া ভাষায় তাঁর কোনও পূর্ণাঙ্গ জীবনীগ্রন্থ আজ পর্যন্ত লেখা হয়নি। বিষয়টি উপলব্ধি করে ওড়িয়া ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী অশ্বিনীকুমার পাত্র ওড়িয়া ভাষায় বাঘাযতীনের পূর্ণাঙ্গ জীবনী লেখার আহ্বান জানিয়েছেন। আশ্বাস দিয়েছেন সরকারি খরচে গ্রন্থটি প্রকাশ করার।

India’s First Bengali Daily Magazine. আলোচ্য ভূখণ্ডে প্রাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন, প্রচলিত জনশ্রুতি, লোককথা এবং বর্তমান অধিবাসীদের জীবনচর্যা থেকে একথা বলা যায় যে, প্রায় অষ্টম-নবম শতক থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে সর্প উপাসনা চলে আসছে এবং ভারতীয় সর্পসংস্কৃতির ক্ষেত্রে আলোচ্য ভূখণ্ড একটি বিশিষ্টাঞ্চল বললে বোধহয় অত্যুক্তি হয় না। ওড়িয়া, বঙ্গ এবং ক্ষেত্রবিশেষে ঝাড়খণ্ডী বা মানভূমি সর্পসংস্কৃতিকে স্বীকার করলেও আলোচ্য ভূখণ্ডের সর্পসংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্যকে অস্বীকার করা যায় না। বিশেষ করে সর্পদেবী রূপে কীচকেশ্বরীর প্রতিষ্ঠায়। ওড়িশা, বাংলা তথা ভারতের আর কোথাও বোধহয় সর্পদেবী রূপে কীচকেশ্বরী পূজিত হন না।

India’s First Bengali Daily Journal. বহুকাল পূর্বে এক সুন্দরী রাজকুমারীর এক রূপহীন বৃদ্ধর সঙ্গে পলায়নজনিত ঘটনার স্মারকী সেই উৎসব। বৃদ্ধটি রাজপ্রাসাদে এসেছিল কোনও কাজে। রাজকুমারীর দৃষ্টি পড়ল তার ওপরে— আর সে হল ইতিহাসে ক্ষিপ্রতম ‘প্রথম দৃষ্টিতে প্রেম’-এর দৃষ্টান্ত। মনে রাখো, এ তোমাদের গতানুগতিক প্রেমকাহিনি নয়— যেখানে বৃদ্ধটি এক ছদ্মবেশী রাজকুমার বা অভিশপ্ত গন্ধর্ব হতে বাধ্য। আমাদের এ ছিল আসল বৃদ্ধ। নির্মল বার্ধক্যের উজ্জ্বল আকর্ষণেই রাজকুমারী তার প্রেমে পড়েছিল।

লুলুর্ভা অরণ্যের মন্ত্রিমণ্ডলের সভাপতিরূপে সিংহশেখর দীর্ঘ কুড়ি বৎসর শাসনারূঢ় ছিলেন। যে অধিবেশনে সিংহশেখর নির্বাচিত হয়েছিলেন, তার পরে আর কোনও দিন মন্ত্রিমণ্ডলের মণ্ডলাকারে বসার কথা জানা নেই। সমগ্ৰ শাসনক্ষমতা বৃদ্ধ সভাপতির হাতে ন্যস্ত ছিল। কেউ কেউ বলে সভাপতি মন্ত্রিমণ্ডলের সদস্যদের সন্তানতুল্য মনে করতেন তাই তাদের ভারাক্রান্ত করতে চাইতেন না। আবার অনেকে বলে, সভাপতির সুশাসন ও ব্যক্তিত্বের প্রভাবে অরণ্যে কোনও রকম জটিল সমস্যার উদ্ভব হয়নি; ফলে মন্ত্রিমণ্ডলের কিছু করার ছিল না।

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।