Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ছোটগল্প: আরণ্যক ও তার চালতাগাছ

শি ব রা ম  দে

আগুনের লেলিহান শির্খা ঊর্ধ্বমুখী হয়ে দাউ দাউ করে জ্বলছে। মাঝে মাঝে আগুনের ভেতর থেকে কাঁচা কাঠ পোড়ার পটপট শব্দ শোনা যাচ্ছে। পাশের খালের দিক থেকে হাওয়া এসে ঊর্ধ্বমুখী আগুনের শিখাকে মাথানত করতে বাধ্য করছে। ছোট ছেলেটা একভাবে চেয়ে দেখছে, সর্বভুক অগ্নি আর জীবনদায়ী হওয়ার খেলা। দূর থেকে তার বাবার কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে, ‘সংসারের বটগাছটা চলে গেল।’

ঠাকুরদা তাহলে এতদিন বটবৃক্ষ হয়ে সংসারের সব ঝড়ঝাপটা সামলেছেন? আজ থেকে বাবাকেও বটগাছ হয়ে সংসারের সব ঝড় সামলাতে হবে? বটগাছ তো অনেক বড় গাছ। সংসারের বড়রাই তাহলে গাছের মতো সংসারের মানুষগুলোকে সকল ঝড়ঝাপটা থেকে বুক দিয়ে আগলে রাখে? ছোট ছেলেটা শ্মশানের চারপাশের গাছগুলোকে ভাল করে লক্ষ্য করতে লাগল। আজ বাবার কান্নাভেজা কথাগুলো তার মনে গাছ সম্পর্কে আলাদা অনুভূতির জন্ম দিল। ঠাকুরদা মারা যাবার কয়েক মাস আগে, বাড়ির পেছন দিকটায় একটা চালতাগাছের চারা পুঁতেছিলেন। ছোট আরণ্যক জলের বালতি নিয়ে হাজির হয়েছিল। চালতার চারাগাছটা পোঁতা হলে ঠাকুরদা বলেছিলেন, ‘দাদুভাই, আজ থেকে এই তোমার বন্ধু, একে যত্ন নিয়ে বড় করে তুলবে। যখন আমি থাকব না, তখন যদি মনখারাপ হয়, এই বন্ধুর কাছে এসে দাঁড়াবে। মন ভাল হয়ে যাবে তোমার।’

ঠাকুরদার কথামতো ছোট আরণ্যক শ্মশান থেকে ফিরে চালতাগাছের কাছে এসে দাঁড়াল। চালতা গাছের সরু কাণ্ডে, পাতায় হাত বোলাতে লাগল। কেমন যেন একটা অনুভূতি হল। সেই থেকে চালতাগাছের সঙ্গে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হল সে।

ভালই ছিল তাদের সংসার। দুই ভাই, এক বোন, মা-বাবা। বাবার সরকারি চাকরি। তিন ভাইবোনের গ্রামের স্কুল এই লেখাপড়া। উচ্চমাধ্যমিক পাস করে কলকাতায় উচ্চশিক্ষার জন্য চলে এল আরণ্যক। বাবা নিউ সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিংয়ে পোস্টিং। কলকাতায় ছোট একটি ঘরে ভাড়া থাকতেন। আরণ্যক সেখানে থেকেই পড়া চালিয়ে যেতে লাগল। মাস্টার ডিগ্রি শেষ করার আগেই তার জীবনে নেমে এল চরম বিপর্যয়। বাবার ক্যানসার ধরা পড়ল, রাহুকাল শুরু হল তার জীবনে। একটামাত্র ঘর, সেই ঘরে একদিকে অসুস্থ বাবা শুয়ে। তার পরিচর্যা করা, রান্না করা, মাঝেমধ্যে বাবার অফিসে গিয়ে কাজ করে দিয়ে আসা। এরই মধ্যে নিজের পড়াশোনা এবং সেই পড়াশুনো চালিয়ে যাওয়ার জন্য কয়েকটা টিউশন পড়ানো। এইসব চালিয়ে যেতে মাঝেমধ্যে হাঁপিয়ে উঠলে ছুটে চলে যেত গ্রামের বাড়িতে। বন্ধুর কাছে গিয়ে তার হালকা পোড়ানো ইট রঙের পিচ্ছিল কাণ্ডে আলতো করে লেগে থাকা শুকনো বাকলে হাত বুলিয়ে বন্ধুর পরশ নিয়ে নিজেকে চার্জড করে নিত আরণ্যক। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখত, এক আকাশ সবুজ নিয়ে তারুণ্যে ভরা বন্ধু চালতাগাছটাকে। শহরের সব ক্লান্তি দূর হত একলহমায়।

বাবাকে চোখের সামনে তিলে তিলে হারিয়ে যেতে দেখে ভীষণ কষ্ট পেল আরণ্যক। বাবা যেদিন চলে গেলেন না-ফেরার দেশে, সেদিন চালতাগাছের তলায় বসে খুব কাঁদল আরণ্যক। কী আশ্চর্য, সেই সময়ে কয়েকটি সবুজ পাতা তার গায়ে-মাথায় ঝরে পড়ল। আরণ্যক চোখের জল মুছে গাছের দিকে তাকাতে তার নজরে এল, একঝাঁক সবুজ পাতা নিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বন্ধু যেন বলছে, ‘ভয় কী বন্ধু, আমি তো আছি।’

বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে সংসারের সব দায়দায়িত্ব আরণ্যককে নিতে হল। অনেক চেষ্টা করে বাবার অসমাপ্ত চাকরিতে ছোটভাইকে ঢুকিয়ে দিতে পারল। কলকাতায় ফিরে গিয়ে মাস্টার ডিগ্রির ফাইনাল পরীক্ষাটা দিল সে। পরীক্ষার পর বিভিন্ন জায়গায় চাকরির চেষ্টা করতে শুরু করল সে। বেশ কিছুদিন পর তার গ্রামের বাড়িতে পোস্ট অফিস থেকে পিওন এসে একটি খামে ভরা চিঠি পৌঁছে দিয়ে গেল। রামঝোড় টি এস্টেট-এর হেড অফিস থেকে চিঠিটা পাঠিয়েছে। আরণ্যক মাকে জানাল, ‘মা, উত্তরবঙ্গের কালচিনি ব্লকের একটা চা বাগানে লেবার অফিসার পদে চাকরি পেয়েছি।’

একথা শুনে মা বললেন, ‘ওসব জায়গায় কী সব আন্দোলন হচ্ছে না? তুই কি ওখানে থাকতে পারবি?’

আরণ্যক বলল, ‘এখানেও তো কিছু হচ্ছে না মা!’

আরণ্যকের কথা শুনে তার মা একটা দীর্ঘশ্বাস চাপা দিয়ে বললেন, ‘দেখ রে, সময় না হলে কিছু হয় না। যাবি যখন ঠিক করেছিস, যা, সাবধানে থাকিস। কোনও ঝামেলার মধ্যে জড়িয়ে না পড়িস।’

আরণ্যক মায়ের সঙ্গে কথা বলে বাড়ির পেছনের বাগানে গিয়ে উপস্থিত হল। উত্তরবঙ্গে চলে গেলে কতদিন পর গ্রামে ফিরতে পারবে কে জানে! এসব ভাবতে ভাবতে চালতাগাছের কাছে গিয়ে উপস্থিত হল। চালতার কাণ্ডে হাত রাখতেই টিপটিপ করে দুটো পাকা চালতা পড়ল তার সামনে। আরণ্যক একটু হেসে, চালতাদুটো হাতে নিয়ে তার বন্ধুর দিকে কিছু সময় চেয়ে দেখল। মনে মনে বলল, ‘আসি বন্ধু, আবার কবে দেখা হবে জানি না!’

চালতা হাতে করে নিয়ে এসে মাকে বলল, ‘‘মা, ঘুরতে ঘুরতে বন্ধুর কাছে যেতে সে বলল, ‘তোমার মা কেমন আছে?’ আমি বললাম, ‘ভাল না।’ এ কথা শুনে সে বলল, ‘শোনো বন্ধু, দুটো চালতা দিলাম নিয়ে যাও। আবার কবে দেখা হয় তার তো ঠিক নেই!’’

***

ডুয়ার্সের সবুজ প্রকৃতির মাঝে ভালই কাটছিল তার। এই চা বাগানের সহজ-সরল চা-শ্রমিকদের নিয়ে তার কাজ। তবে যে পরিবেশ এতদিন সে দেখে এসেছে, এখানকার পরিবেশ একদম আলাদা। পুরুষ মানুষগুলো সারাদিন নেশা করে পড়ে থাকে। ওদের বাড়ির মহিলারা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে ঘরে ফেরে। যে শান্তির জন্য মানুষ ঘরে ফেরে, সে শান্তি তো দূরের কথা নেশা করার টাকা না পেলেই অশান্তি। সারাদিন খেটে ঘরে ফিরে মরদের হাতে মার খেয়ে কান্নাকাটি করে। আরণ্যকের খুব কষ্ট হয় সমাজের এইসব মেয়ের কথা ভেবে। এইসব নিয়েই ভালমন্দে কেটে যাচ্ছিল কিন্তু কামতাপুরী আন্দোলন নামক বিষাক্ত পরিস্থিতি বেশিদিন ভাল থাকতে দিল না। চা-শ্রমিকদের হপ্তান্তে মজুরির টাকা দেওয়ার জন্য বীরপাড়া স্টেট ব্যাংক থেকে টাকা তুলে আনার সময় ব্যাগভর্তি টাকা লুট হয়ে গেল। হপ্তার টাকা না পেয়ে লেবার অফিসারকে নেশাগ্রস্ত পুরুষগুলো কুকরি নিয়ে ঘেরাও করে রখল। সেইসঙ্গে অকথ্য গালিগালাজ। আরণ্যক এর আগে অনেক খারাপ পরিস্থিতি দেখেছে কিন্তু আজ যা ঘটল তার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। আজকের ঘটনায় সে ভেতরে ভেতরে ভয় পেল কিন্তু বাইরে প্রকাশ করল না। যদিও বা হেড অফিসের হস্তক্ষেপে ব্যাপারটা মিটে গেল। আরণ্যক সিদ্ধান্ত নিল, এই চা বাগানের চাকরি সে আর করবে না। সে বাড়িতে মাকে সব জানিয়ে চিঠি লিখল। তার চিঠির উত্তরে মা লিখলেন দুটি লাইন। ‘অসুস্থ পরিবেশে থেকে নিজেকে আর অসুস্থ কোরো না। ফিরে এসে সুস্থ পরিবেশ খোঁজার চেষ্টা করো।’

চা বাগানের চাকরি ছেড়ে এসে কলকাতায় বিভিন্ন পরিচিতদের কাছে যোগাযোগ করে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে একটা অস্থায়ী চাকরি জুটিয়ে নিল। এই চাকরি করতে করতে স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দিয়ে উত্তর ২৪ পরগনার নিউ বারাকপুরের একটি স্কুলে স্থায়ী সহশিক্ষক পদে যোগ দিল। কিছুদিন এখানে কাটানোর পর সে মিউচুয়াল বদলি নিয়ে গড়বেতা হাইস্কুলে চলে গেল। গড়বেতার পরিবেশটা ভালই ছিল। আরণ্যক এখানকার হস্টেলে থেকে দুটি কাজকে লক্ষ্য করে নিল। এক বিদ্যালয়ের আশেপাশের দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের বিনা পারিশ্রমিকে পড়ানো আর দ্বিতীয়ত বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে সবুজায়ন গড়ে তোলা। বেশ ভালই চলছিল সবকিছু কিন্তু আরণ্যকের কপালে বেশিদিন সুখ যে সয় না। এলাকার রাজনৈতিক নেতারা তার বিনা পারিশ্রমিকে ছাত্রদের পড়ানোর বিষয়টা ভাল মনে নিতে পারল না। তারা বিভিন্ন সময়ে নানা রকমভাবে চাপ সৃষ্টি করতে লাগল। এইরকম অস্থির রাজনৈতিক পরিমণ্ডল এবং অবিশ্বাসের বাতাবরণ মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল তার। হাঁপিয়ে উঠছিল সে। গ্রামে ফিরে মাকে বলল, ‘মা, ওখানকার রাজনৈতিক এবং অবিশ্বাসের পরিবেশে মন দিয়ে পড়াতে পারছি না। প্রতি পদক্ষেপে রাজনৈতিক নেতাদের রক্তচক্ষু আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে।’

মা মন দিয়ে সব শুনে বললেন, ‘তুমি আবার পরীক্ষা দিয়ে অন্য কোথাও চাকরি নাও।’

আরণ্যক কিছু সময় নীরব থেকে বলল, ‘মা, আমি শিক্ষকতাই করতে চাই।’

মা বললেন, ‘বেশ তো, তবে আবার স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় বসে পড়ো।’

আরণ্যক বলে, আমি আর এই জেলায় থাকতে চাই না। এখানে বড্ড রাজনীতি।’

মা বললেন, ‘ঠিক আছে, যেখানে তোমার ভাল লাগে সেখানেই চেষ্টা করো।’

দুপুরের দিকে চালতাগাছের ছায়ায় বসে শান্তির শ্বাস নেয় আরণ্যক। আজও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। গাছের কাণ্ডে হাত রাখতেই উপর থেকে একটা পাতা তার গায়ে এসে পড়ল। এতদিন ব্যাপারটা নিয়ে ভাবেনি। আজ যেন তার সমস্ত শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। সে উপর দিকে তাকাতে দেখতে পেল, মৃদুমন্দ হওয়ায় ডালসমেত পাতাগুলো দুলছে। মনে হল, যেন তার হাতের স্পর্শে বেশ আনন্দিত তারা। মাথা দুলিয়ে তারই বহিঃপ্রকাশ করছে। মনটা অনেকটা হালকা হয়ে গেল। আরণ্যক বুঝতে পারল, তার উপস্থিতি বন্ধু চালতাগাছকে আনন্দ দেয়, আবার নতুন উদ্যমে শুরু হল পথচলা।

এবার নদীয়া জেলার একটি স্কুলে যোগ দিল সে। এখানেও শুরু হল তার সেই লক্ষ্যপূরণের কাজ। যেটুকু শূন্য ছিল ভূমি, ভরিয়ে তুলল সবুজে সবুজেভ কিছুদিনের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠল সে। একদিন স্টাফরুমে বসে প্রধানশিক্ষক অমিয়ভূষণ বাবু বললেন, ‘সেই কবে ভগীরথ শঙ্খ বাজিয়ে আহ্বান করে ছিল মা গঙ্গাকে, অনেকদিন পর আরণ্যক চারাগাছ পুঁতে আহ্বান করছে অরণ্যকে।’

উপস্থিত সকলের হেসে উঠেছিল হো হো করে। আরণ্যক থেমে থাকেনি। ছাত্রদের কাছে আরণ্য থেকে ‘অরণ্য স্যার’ নামেই বেশি পরিচিতি লাভ করল সে।

আরণ্যকের বড় মামা দিল্লিতে থাকতেন। তিনি একদিন ফোন করে আরণ্যকের মাকে বললেন, ‘দিদি, বাপিকে এবার বিয়েটা দেওয়া দরকার। আর কতদিন বোহেমিয়ান জীবনযাপন করবে!’ মা বললেন, ‘দেখেশুনে একটা বিয়ের ব্যবস্থা কর। সারাদিন শুধু গাছপালা নিয়েই পড়ে থাকে। এবার ওকে একটা বিয়ে দিয়ে সংসারী করে দে না ভাই।’

প্রবাসী বাঙালি মেয়ে। বাংলার বাইরেই বেড়ে ওঠা। সেই মেয়ের সঙ্গেই পথচলা শুরু হল আরণ্যকের। বিয়ের জন্য বেশ কিছুদিন গ্রামের বাড়িতে থাকতে হল তাকে। এই সময়ে বাড়ির পেছন দিকটাতে কিছু আম জাম সবেদা গাছের চারা লাগিয়ে দিল। বাড়ির সকলের সঙ্গে কয়েকটা দিন আনন্দে কেটে গেল। সেদিন বুদ্ধপূর্ণিমা। রাতের দিকে নববধূ সেঁওতিকে নিয়ে বাড়ির ছাদে উঠে এল আরণ্যক। আকাশে উথলে নেমে আসা জোছনায় ভেসে যাচ্ছে চারিদিক। সে-দৃশ্য দেখে তার স্ত্রীর মুখ থেকে অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল, ‘বাহ, কী অপূর্ব লাগছে গো!’

দুজনে ছাদের পিছন দিকের রেলিংয়ের ধার ঘেঁষে দাঁড়াল। আকাশে চাঁদ। প্রকৃতির সবুজ গালিচার ওপর বিছিয়ে আছে রুপোলি চাদর। জোছনার সঙ্গে চালতাগাছও ঘোর লাগিয়ে দিল মনে। এই সময় ‘চোখ গেল চোখ গেল’ বলে একটি পাখি চালতাগাছের উপর থেকে উড়ে গেল। সেঁওতি আরণ্যকের কাছে জানতে চাইল, ‘এটা কি পাখি?’

আরণ্যক বুঝতে পারল তার দিল্লিতে বেড়ে ওঠা স্ত্রী এ পাখির সঙ্গে পরিচিত নয়। সে বলল, ‘এর নাম পাপিয়া পাখি। এরা জ্যোৎস্না রাতে ‘চোখ গেল চোখ গেল’ বলে উড়ে বেড়ায়।

সেঁওতি বলল, ‘চোখ গেল চোখ গেল বলে কেন?’

—‘রাতের বেলায় এত আলো ওদের চোখ নিতে পারে না হয়তো!’

—‘বাহ বেশ তো!’

—‘তবে এই পাখির আর-একটা বিশেষত্ব আছে।’

—‘সেটা কী?’

—‘এই পাখির যখন প্রজননের প্রয়োজন হয়, তখন এরা ‘পিউ কাঁহা পিউ কাঁহা’ বলে ডেকে সঙ্গিনী খোঁজে।’

—‘সেটা কেমন?’

—‘এই এমন।’ বলে বুকে জড়িয়ে নিল সেঁওতিকে।

আরণ্যকের বুকে মাথা রেখে সেঁওতির চোখ চালতাগাছটার ওপর পড়ল। সে লক্ষ্য করল, চালতাগাছটা হাওয়ায় দুলছে আর ওই চালতাগাছের পাতায় পাতায় জোছনার বিচ্ছুরণ। মনে হচ্ছে, মাথা দুলিয়ে সে দাঁত বের করে হাসছে। সেই দৃশ্য মনের মধ্যে একরকম ঘোর লাগিয়ে দেয় সেঁওতির।

***

এরমধ্যে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। আরণ্যক একটা ফুটফুটে কন্যাসন্তানের বাবা হয়েছে। সেই ফুটফুটে মেয়েটা আজ অনেক বড়। আরণ্যক এখন এক প্রাচীন জনপদের মহীরুহসমান বিদ্যালয়ের প্রধান। সার্ধশতবর্ষ পার করা একটি প্রাচীন জ্ঞানবৃক্ষসমান বিদ্যালয়ের শিকড় বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই জনপদের মানুষের গর্ব এই বিদ্যালয়। আরণ্যক যেন মনে মনে চাইছিল এমন একটি বিদ্যালয়ে কাজ করতে। এই পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সে এইরকম একটি বিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে সব সময় মনের মধ্যে একটা উত্তেজনা অনুভব করে। পলাশ, কাঁঠালচাঁপা, বট-অশ্বত্থ, আম-কাঁঠাল, করমচা, কামরাঙ্গা, সবেদা, বকুল, নাগেশ্বর, কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া, জারুল। এদের দিয়ে শুরু হল সবুজায়ন। এক পাশে গোলাপের বাগিচা। স্কুলের মাঠকে মাঝখানে রেখে চারিধারে সবুজ করিডর। মাঝেমধ্যে এই সবুজ করিডরে হাঁটতে বেশ লাগে আরণ্যকের।

সার্ধশতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়া বিদ্যালয়ের কলেবরে প্রাচীনত্বের জীর্ণ ছাপ ধরা পড়ছে প্রতিনিয়ত। আরণ্যক তার স্বভাবসুলভ অময়িক ব্যবহার নিয়ে হাজির হল বিভিন্ন সরকারি আধিকারিকের দরজায়। এই প্রবীণ জ্ঞানবৃক্ষস্বরূপ বিদ্যালয়টির প্রতিনিধিকে খালি হাতে ফেরাতে পারল না কেউ। সরকারি সাহায্য যা পাওয়া গেল, তাই দিয়ে শুরু হল কর্মযজ্ঞ। কিছু করার তাগিদে দারুণ কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ল সে। কত মানুষ এল তাকে শুভেচ্ছা জানাতে।

এই বিদ্যালয়ের কিছু দূরে নামকরা বালিকা বিদ্যালয় আছে। সেখানকার প্রধানশিক্ষিকা শ্রীমতি সুবর্ণা মুস্তফা। তার মনে মনে বহুদিন ধরে ইচ্ছা ছিল, পাশের সার্ধশতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়া বিদ্যালয়টা দেখবার। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আর-একটি কৌতূহল, এই প্রাচীন বিদ্যালয়ে বহু আলোচিত সদ্য যোগ দেওয়া প্রধানশিক্ষক আরণ্যক মুখোপাধ্যায়। এই দুই কৌতূহল নিয়ে হাজির হলেন তিনি। বিদ্যালয়ের প্রধান দরজা দিয়ে গুটিগুটি পায়ে প্রবেশ করে দেখতে পেলেন, একজন পরিচ্ছন্ন জামা-প্যান্ট পরা মানুষ, মাটিকে গর্ত করে ফুলগাছের চারা পুঁতে চলেছেন। সুবর্ণা ম্যাডাম ধীর পায়ে তার কাছে এসে জানতে চাইলেন, ‘প্রধানশিক্ষক মহাশয়ের ঘরটা কোন দিকে একটু বলবেন?’

আরণ্যক মুখ তুলে ম্যাডামকে একবার দেখে নিয়ে বলল, ‘ওই যে, ওই কোণের ঘরটাই প্রধানশিক্ষকের। আপনি ঘরে গিয়ে বসুন, উনি আসছেন।’

আরণ্যক ফ্রেশ হয়ে নিজের ঘরে ঢুকে সুবর্ণা ম্যাডামকে প্রণাম জানিয়ে নিজের চেয়ারে বসল। সুবর্ণা ম্যাডাম একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘আপনিই তাহলে আরণ্যক মুখোপাধ্যায়?’

আরণ্যক মজা করে বলল, ‘হ্যাঁ, মা-বাবা এই নামই রেখেছিল বটে!’

আগস্ট মাসের শেষের দিকে এক বিকেলে সুবর্ণা ম্যাডাম এবং সঙ্গে আর-এক ম্যাডাম আরণ্যকের কাছে এসে হাজির। আরণ্যক তখন বড় চৌবাচ্চায় জলপদ্ম ফুল গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত। আরণ্যক সুবর্ণা ম্যাডামদের দেখে বলল, ‘আসুন ম্যাডাম। এই বিকেলে আমার কাছে কী মনে করে?’

—‘চলুন না, আপনার বাগানের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি।’

আরণ্যক হাত ধুয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, চলুন।’

হাঁটতে হাঁটতে ম্যাডাম বললেন, ‘আরণ্যকবাবু, মাঝে মাঝে আপনাকে দেখে অবাক লাগে।’

—‘অবাক লাগে কেন?’

—‘একদিকে কংক্রিটের অরণ্য আর একদিকে সবুজের অরণ্য। কী করে পারেন?’

—‘ম্যাডাম, আমি গ্রামের ছেলে। সবুজের মধ্যে বড় হওয়া। তাই সবুজ আমার প্রথম ভালবাসা আর কংক্রিটের অরণ্যের কথা যদি বলেন, এটা প্রয়োজনের তাগিদে।

—‘আরণ্যকবাবু, এই যে আপনি এখানে আছেন, এই বয়সে এত পরিশ্রম করছেন, গাছের মধ্যে কাটাতে সত্যিই ভাল লাগে আপনার?’

—‘ম্যাডাম, গাছ দেখেছেন? গাছগুলো কেমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে? কবে তার কাছে কেউ আসবে। প্রত্যেক মানুষের ভেতরেও একটা করে গাছ থাকে। মানুষও অপেক্ষা করে। কেউ প্রিয়জনের জন্য, কেউ সুসময়ের জন্য, আবার কেউ অপেক্ষা করে অন্যের ক্ষতি করার জন্য। ভালমন্দ সব মানুষই একসময় গাছের মতো অপেক্ষা করে। তাই না?

ম্যাডাম বলেন, ‘লজিক্যালি ঠিকই বলেছেন।’

আরণ্যক বলে, ‘জানেন ম্যাডাম, আমার মনে হয় কী, স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চাগুলো প্রত্যেকেই এক-একটা তরতাজা চারাগাছ। ঠিকমতো যত্ন করলে এই চারাগাছগুলো একসময় এক-একটা মহীরুহে পরিণত হবে। কত মানুষকে ছায়া দেবে। যখন দেখি ফুলের মতো স্নিগ্ধ সুন্দর একঝাঁক শিশু হুটোপাটি করছে, খিল খিল করে হাসছে, তখন বয়সের কথা মাথায় থাকে না। তখন মনে হয়, আরও কিছু যদি করে যেতে পারি এদের জন্য।’

কথা বলতে বলতে দুজনকে নিয়ে নিজের ঘরে এনে বসাল আরণ্যক। সুবর্ণা ম্যাডাম ব্যাগ থেকে একটা আমন্ত্রণপত্র বের করে আরণ্যকের হাতে দিয়ে বললেন, ‘এ বছর আমার স্কুলের শিক্ষক দিবসে আপনি প্রধান অতিথি।’

—‘আমন্ত্রণ করলেই হত। আবার প্রধান অতিথি কেন?’

—‘যে ইচ্ছেশক্তি দিয়ে এই কর্মযজ্ঞ শুরু করেছেন, সেই ইচ্ছেশক্তি এবং আদর্শের বড়ই অভাব আমাদের মধ্যে। তাই আপনার আদর্শ, মূল্যবোধের কিছু কথা যদি আমাদের সঙ্গে শেয়ার করেন, তবে আমরা যারা সেদিন উপস্থিত থাকব সকলেই উপকৃত হব।’

—‘কিন্তু আমি যে বেলা দুটো-আড়াইটের আগে পেরে উঠব না।’

—‘আপনি তিনটের মধ্যে গেলেই হবে।’

শিক্ষক দিবস। সারাদিন খুবই ব্যস্ততার মধ্যে ছিল আরণ্যক। তবুও ঠিক তিনটের মধ্যে উপস্থিত হল। সুবর্ণা ম্যাডাম যথাযোগ্য সম্মান জানিয়ে মঞ্চে নির্দিষ্ট আসনে বসিয়ে দিলেন। এমনিই আশেপাশের স্কুলগুলির মধ্যে আরণ্যককে নিয়ে কৌতূহলের বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল, সেই কারণে তার উপস্থিতি সভার মধ্যে মৃদু গুঞ্জনের সৃষ্টি করল। আরণ্যক মঞ্চে বসে বুঝতে পারল যে, সুবর্ণা ম্যাডাম যতই ঘরোয়া অনুষ্ঠান বলুন, আয়োজনের কোনও কমতি রাখেননি। সুবর্ণা ম্যাডাম নিজেই মঞ্চে ঘোষণা করলেন, ‘আজকের এই পবিত্র দিনে উপস্থিত সকলকে স্মরণ করিয়ে দেবার চেষ্টা করছি মাত্র। আপনারা সকলেই জানেন, এই প্রাচীন জনপদে এক সময় কর্মযোগী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পদধূলি পড়েছিল। বহুদিন পর সেই বিদ্যাসাগরের জন্মভূমি বীরসিংহ গ্রামের আর এক কৃতি সন্তান শ্রীআরণ্যক মুখোপাধ্যায় আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন। আজকের দিনে তাঁর কাছে শিক্ষক দিবসের তাৎপর্য নিয়ে কিছু কথা শুনব আমরা।’

আরণ্যক উঠল। মুখে মৃদু হাসি, চোখে হালকা ফ্রেমের চশমা। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল পোডিয়ামের কাছে। মাইক্রোফোনটা হাতে চেপে ধরে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সামনের দিকে। তারপর বলতে শুরু করল:

‘প্রথমেই বলে রাখি, আমার মতো একজন সামান্য মানুষকে আজকের অনুষ্ঠানে আপনাদের মধ্যে একটু স্থান দিয়েছেন বলে আমি কৃতজ্ঞ। ছোট্ট একটা গল্প দিয়ে শুরু করি। গৌতম বুদ্ধের একজন ধনী ব্যবসায়ী ভক্ত ছিলেন। সেই ধনী ভক্ত বুদ্ধের শিষ্যদের ভরণপোষণের জন্য প্রচুর অর্থ খরচ করতেন। বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে দেওয়ার জন্য তার স্ত্রী খুবই অসন্তুষ্ট হচ্ছিলেন এবং এই নিয়ে সংসারে খুবই অশান্তি শুরু হয়। যেমন আমাদের ঘরেও হয়। এই খবর কী করে গৌতম বুদ্ধের কাছে পৌঁছল। বুদ্ধদেব তখন ঠিক করেন যে, তিনি সেই ধনী ব্যক্তির গৃহে যাবেন এবং তার স্ত্রীকে বোঝাবেন। সেইমতো তিনি সেই ভক্তের গৃহে পৌঁছলেন এবং খুব অল্প সময়ে সেই ভক্তের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বললেন। কী আশ্চর্য, কিছু সময় পর সেই স্ত্রীলোকটি গৌতম বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন এবং নিজের স্বামীকে দেবতার মতো শ্রদ্ধা করতে শুরু করলেন।’

এইটুকু বলে আরণ্যক তার রিডিং গ্লাসটা খুলে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুছে নিল। তারপর আবার বলতে শুরু করল:

‘গৌতম বুদ্ধ, যিশুখ্রিস্টের মতন বিভিন্ন ধর্মের সব মহান মানুষ এই পৃথিবীর মানবজাতির শিক্ষক ছিলেন। পরবর্তীকালে অনেক বড় বড় শিক্ষকও যেমন এসেছিলেন, তেমনই শিষ্য বা ছাত্র পেয়েছিলেন তাঁরা। যেমন সক্রেটিস জন্মেছিলেন বলে প্লেটোকে আমরা পেয়েছিলাম, আবার প্লেটো ছিলেন বলে অ্যারিস্টটলকে পেয়েছি। আবার অ্যারিস্টটলের ছাত্র ছিলেন বিশ্ববিজয়ী আলেকজান্ডার। রামকৃষ্ণের জন্য বিবেকানন্দকে পেয়েছি। যে আলেকজান্ডার বা বিবেকানন্দ সারা বিশ্বকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। এরকম কত গুরু-শিষ্যের উদাহরণ আছে। সব আলোচনা করতে গেলে অনেক সময় কেটে যাবে।

আপনারও শিক্ষক। আমাদের এই শিক্ষকতা পেশা এতই গৌরবময় পেশা যে, আমরা কাউকে স্যার বলি না, অথচ আমরা স্যার শুনি। কেন শুনি জানেন? কারণ, সমাজ বলুন, দেশ বলুন, সব ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। আমরা যদি সঠিক শিক্ষা দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের আলোকিত করতে না পারি, তবে সমাজ, দেশ সব পিছিয়ে যাবে। আমাদের কাছে ছোট ছোট শিশুরা যখন আসে, তখন তাদের হৃদয় অজ্ঞতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকে। আমাদের কাজ হল তাদের হৃদয়কে জ্ঞ্যানের আলোয় আলোকিত করে সমাজ তথা দেশের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা।

যে গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেই গল্পের কথায় আসি। গৌতম বুদ্ধ কোনও ঐশ্বরিক ক্ষমতাবলে সেই স্ত্রীলোকটিকে বুঝেছিলেন কি? না কোনও ঐশ্বরিক ক্ষমতা দিয়ে বোঝাননি। গৌতম বুদ্ধ খুব সুন্দর কথার মালা সাজিয়ে ওই স্ত্রীলোকটির হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন। তবেই স্ত্রীলোকটি গৌতম বুদ্ধকে গুরুরূপে বরণ করে নিয়েছিলেন। ঠিক এমন করেই ছাত্র-ছাত্রীদের হৃদয় জয় করতে হবে আমাদের। মনে রাখতে হবে, একজন শিক্ষক হয়ে কোনও ছাত্রছাত্রীকে আনন্দ দিয়ে তার হৃদয় প্রবেশ করতে না পারি, তবে সেই ছাত্র বা ছাত্রী আমাদের কথা শুনবেই না। মনে রাখতে হবে, ছাত্র বা ছাত্রীরা আমার ওপর ক্ষুব্ধ, আর আমি একজন ভাল শিক্ষক, এটা কোনওদিন হয় না।

নিস্তব্ধ সভা। আরণ্যক বক্তব্য শেষ করে ধীর পায়ে ফিরে গিয়ে মঞ্চের নির্দিষ্ট চেয়ারে গিয়ে বসল। সারা মুখে একটা বিষন্ন হাসি।

সারাদিন পর ঘরে ফিরতে আজ বেশ দেরি হল। রাতের দিকে মায়ের ফোন এল, ‘বাপি, এবার লক্ষ্মীপুজোতে সবাইকে নিয়ে বাড়িতে এলে আমার খুব ভাল লাগবে। কতদিন তোদের দেখি না।

আরণ্যক বলে, হ্যাঁ মা, এবার অবশ্যই যাব।’ সেই ঠাকুরদার সময় থেকে গ্রামের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো হয়ে আসছে। মা যতদিন আছে হয়তো ততদিনই। তারপর কী হবে কে জানে!

লক্ষ্মীপুজোর আগের দিন মেয়ে আহেলী ও স্ত্রী সেঁওতিকে নিয়ে সকাল সকাল গাড়ি করে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ল আরণ্যক। বীরসিংহ গ্রামের রাস্তায় গাড়ি ঢুকতে পুরনো স্মৃতিগুলো সব হুড়মুড়িয়ে চলে এল। একটা সময় গ্রামের রাস্তার ইট-পাথরগুলোও চেনা ছিল। প্রতিটা মোড়, প্রতিটা গলি, কোন বাড়ির পাঁচিলের ওপর রঙ্গন ফুলের ডাল ঝুঁকে পড়ত, কোন বাড়ির সামনে শিউলি ফুল পড়ে থাকত ঘাসের ওপর, কোন বাড়িটায় নাকউঁচু মেধাবী মেয়েটা থাকত— সবকিছুই জানা ছিল একসময়। এখন সবই স্মৃতি।

আরণ্যক বাড়ি পৌঁছে বারদরজা থেকে ভেতরে ঢোকার সময় লক্ষ্য করল, লক্ষ্মীর পদচিহ্ন। সেই ছোটবেলায় যেমনটা দেখেছে। কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়েই বাড়ির পেছনের দিকে গেল। কত গাছগাছালিতে ভরেছে এই বাগান। ছায়াঘন পরিবেশ। কত রকমের পাখির ডাক। গরমের সময় চালতা গাছের নিচে মাদুর পেতে বই পড়ত আরণ্যক। সেই চালতাগাছের কাছে যেতে গিয়েও যাওয়া হল না কোনও কারণে।

লক্ষ্মীপুজোর দিন বিকেলের দিকে দু-এক পশলা বৃষ্টি হল। পুজোআচ্চা মিটে গেলে সন্ধের দিকে মেয়ে আহেলীকে নিয়ে ছাদে উঠে এল আরণ্যক। ঠিক সন্ধে নামার মুখে চালতাগাছের মাথায় যেন মেঘের পাগড়ি। গাছের পাতায় পাতায় জমে থাকা বৃষ্টি টুপটাপ খসে পড়ছে মাটিতে। দুজনের দৃষ্টিই তখন চালতাপাতার বৃষ্টিবিন্দুতে। কোজাগরি পূর্ণিমার জোছনার সেই বৃষ্টিবিন্দুর বিচ্ছুরণ চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। কে যেন মুঠো মুঠো হিরে ছড়িয়ে দিয়েছে চালতাগাছের ওপর।

আহেলী সেদিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাবা, তোমার চালতাগাছের এই রাজকীয় সৌন্দর্য আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে।’

আরণ্যক বলল, ‘হ্যাঁরে মা, প্রথম যেদিন তোর মাকে নিয়ে ছাদে এসেছিলাম, সেদিন ছিল বুদ্ধপূর্ণিমা। সেই জোছনা রাতে চালতাগাছের এই রূপ দেখে তোর মায়ের মনে ঘোর লেগেছিল। আজও সেই ঘোর কাটেনি। কাল অনেক রাত পর্যন্ত ছাদে বসেছিল।’

আহেলী বলল, ‘মাকে ডেকে আনি না বাবা।’

—‘নারে মা, এখন নয়, রাতভর আজ জোছনায় স্নান করবে প্রকৃতি। পরে আমরা সকলে মিলে আসবখন।’

আহেলী বলল, ‘ঠিক আছে, বাবা।’

—‘জানিস মা, প্রতিটা পূর্ণিমার রাতে বাড়ির চালতাগাছ এখনও আমাকে টানে।’

—‘বাবা, সেই জন্যেই কি প্রতি পূর্ণিমার রাতে তুমি একা ছাদে বসে থাকো?’

—‘কেন যেন মনে হয়, এই প্রকৃতির কাছে সঙ্গে বিশেষ করে এই চালতাগাছের সঙ্গে আমার যেন একটা আত্মিক সম্পর্ক আছে।’

—‘বাবা, একটা কবিতা বলো না। অনেকদিন তোমার মুখে কবিতা শুনি না।’

—‘শুনবি? তবে শোন।’

সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে!
আমি চলে যাব ব’লে
চালতাফুল কি আর ভিজিবে না শিশিরের জলে
নরম গন্ধের ঢেউয়ে?
লক্ষ্মীপেঁচা গান গাবে নাকি তার লক্ষ্মীটির তরে?
সোনার স্বপ্নের সাধ পৃথিবীতে কবে আর ঝরে!

আরণ্যক পুরো কবিতাটাই আবৃত্তি করে শোনায় মেয়েকে। তারপর কিছু সময় নীরব রইল দুজনে। আহেলি প্রথম নীরবতা ভেঙে বলল, ‘জীবনানন্দ দাশ, তাই না বাবা?’

—‘হ্যাঁ। কবিতা, ‘সেইদিন এই মাঠ’।’’

—‘বাবা, জীবনানন্দ দাশ তোমার খুব প্রিয়, বলো?’

—‘হ্যাঁ। জানিস মা, যে বাঙালি জীবনানন্দ দাশ এবং বিভূতিভূষণ পড়েনি, তার বাঙালিয়ানা পূর্ণতাই পায়নি।’

বাকরুদ্ধ আহেলী। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের পথে সময় গড়িয়েছে অনেক। মাথার উপর এক থালা চাঁদ। আহেলী কোনওদিনও এমন জোছনায় নীলাভ সাদার স্নেহময় স্পর্শ অনুভব করেনি।

বেশ আনন্দ করেই কেটে গেল ক’টা দিন। এই দিনগুলোতে কোনও এক সময় আরণ্যক তার চালতাগাছের কাছে এসে তার গায়ে হাত বুলিয়েছে। যথারীতি উপর থেকে কয়েকটা পাতা তার গায়ে এসে পড়েছে। পাকা চালতা তো প্রতিদিনই পড়েছে তার পায়ের কাছে। আরণ্যক চালতা হাতে নিয়ে গাছের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার হাসি এসেছে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এল। এবার বেরোতে হবে। আরণ্যক স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। গ্রামের রাস্তা দিয়ে কিছুটা চলার পর পাকারাস্তায় ওঠার বাঁকে আরণ্যক ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। দেখল, মা মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক যেন তার চালতাগাছ। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, প্রিয়জনকে বিদায় জানাতে।

চিত্রণ: মুনির হোসেন
4.5 2 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
4 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Ashis Guha
Ashis Guha
8 months ago

গাছ আমাদের কত আপন তা যে বোঝে সেই জানে। সেই গাছ কে নিয়ে ভালবাসার এক সুন্দর গল্প। দারুন লাগল।

শ্যামল সমাদ্দার
শ্যামল সমাদ্দার
8 months ago

ভীষণ ভীষণ ভালো লাগলো,ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য এরকম আরো গল্প চাই.

Subhananda Das
Subhananda Das
8 months ago

Darun laglo…

Swati Roy
Swati Roy
8 months ago

এই আরণ্যক ভদ্রলোকটিকে খুব চেনা চেনা লাগছে। খুব সুন্দর লেখা।

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »