প্রে মা শি স দে
পাহাড়গ্রাফি
রোদের কারসাজিতে রক-পাইথনের মতো রাস্তাটা এঁকেবেঁকে বারোয়ারি সবুজের পলস্তারার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। গন্ধ সব সময় অডিও-ভিজুয়াল।
বড় বাকলওয়ালা স্তম্ভিত গাছের কাছে দাঁড়ালে মায়ের ভাঁজে ভাঁজে ছিঁড়ে যাওয়া বেনারসির কথা মনে পড়ে। জঙ্গলের গন্ধে একটা ছেলেবেলা আছে।
আছে ভয়, আবিষ্কার আর অবাধ্যতার আনন্দ। পাহাড়ে সূর্যোদয় আর অস্ত ছাড়া উত্তেজনাহীন ফুসফুসিও নির্জনতা বায়বীয়। বরং রাতে পাহাড় প্রপঞ্চময়। যেন দালির কালচে আকাশের নীচে জলরঙের গগন ঠাকুর। রাতের অন্ধকারে কালোর পাশে কালো দাঁড়িয়ে থাকে বিবাগী অভিমানী, সে তো পর্ণমোচী পাহাড়গ্রাফি।
সূর্যের মস্তানি ঘুচে গেলে দেখি, একটা স্কাই রঙের আকাশে চায়ে চুবানো ইংলিশ মারির মতো আধখানা চাঁদ বেহায়ার মতো ঝুলে আছে। আমি দু’হাতে মাখানো বহু দিনের পাপ শিশিরে ঘষে হাওয়ায় কান পাতি। পাখিদের দীনতা নেই। তারা হাওয়ায় ভাসমান ধ্বনি মুখে করে ছুড়ে দেয় জুনিপারের সবুজ দেওয়ালে। হিমেল শব্দরা ছুঁয়ে যায় আমার শরীর। এখানে আলোর সাথে সবাই কাজে নামে। সূর্য আর পাহাড়পাখি আর পাহাড়ি মানুষেরা যে যাক দৃশ্যে এগিয়ে যায়। আমি জুনিয়র আর্টিস্টের মতো দাঁড়িয়ে থাকি স্থানু আর প্রকৃতির সঙ্গে মিছিমিছি মিশে যাওয়ার রি-টেক দিই। তবু যে আমি আছি, থেকে গেছি এই ঢের। আনন্দের লোভে ঠুকরে গেছি বোলতার টোপ। তবু গাঁথেনি প্রকৃতি জড়ায়নি মায়ায়, সেও এক পাওয়া! আগুনের সঙ্গে শলা করা আছে। যেদিন জড়াবে তার আগে ছোঁবে না। তার আগে কিছু ক্লোজ শট। কুঁজো থেকে পিপাসার নামার মতো চিবুক গড়িয়ে কিছু অভিমান নেমে যাবে বুকের পাকদণ্ডী বেয়ে ভালবাসার চাতালে। সেখানে তুমি নেই। তোমার ঘ্রাণে জ্বলে উঠবে জোনাকি। সেই আলোক দশায় শরীরের সমস্ত কোষে ক্লোরোফিল জড়ো হয়ে শুষে নেবে সবুজ। ছড়ানো শেকড় টেনে নেবে প্রাণজল। তন্ত্রীতে বেজে উঠবে লুকানো এস্রাজ। তারপর কাট শুনতে পেলেই এগোব আগুনের দিকে।
ভালবাসা প্রেতযোনি, অশরীরী, স্পষ্টের অতীত। রোমকূপে লেগে থাকে। ভাসমান জলজ শৈবাল। রাত বাড়লে জল উঠে আসে বুকে, মগজ টলোমলো। কোহল-সন্ধান তাই ভালবাসার চাতালে একাকী ব্যতিক্রম। শ্বাস-প্রশ্বাস যেন। যতটা গ্রহণ ছাড়লেও ততটাই। দিনযাপনের প্রশ্বাস পেরিয়ে এই শরীরী প্রত্যয়, সে তো সাপের খোলস-বদল।
তবু যে ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকি, ধরে থাকি হাত, জীবনের বৈতরণী পেরিয়ে মায়াদর্পণে মুখ দেখব তাই। এই উচ্চতা শৈত্যপ্রবাহ পর্বতচূড়া শুধুই আগুনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেয়, আর কিছু নয়।
সূর্যকে উঠলে বাকিদের ডেকে দেয় আলো। আলো আমার বোন। প্রতিদিন ও, রাতের হাতে বন্দি থাকে। সূর্য এসে উদ্ধার না করলে ওর মুক্তি নেই। ও ঘুমভাঙানিয়া জাগরণী। সবাইকে ঠেলে কাজে পাঠায়। আমি বাতাসের পিঠে চেপে এদিক-ওদিক ভেসে যাই। গাছ থেকে গাছে। কখন ঢুকে পড়ি বাঁশিওয়ালায়। সুর ভাসিয়ে নিয়ে যাই নৌকার পালে। মাঝদরিয়া থেকে মাঝিদের গান নিয়ে যাই বহু দূরে উনুনের ওপর শূন্য হাঁড়ির দীর্ঘশ্বাসে।
ফুলেদের সাথে পাখিদের সাথে আমার ভাব থাকলেও ওরা বড্ড ঢলাঢলি করে আমাকে নিয়ে।
বরং বাতাস ভাল। বুকে নিয়ে আমাকে ভাসায়। নদী পার করে, ডানা দিয়ে বিলি কেটে দেয়।
পাহাড় বড় দাম্ভিক। কারও বিপদেই একচুল নড়ে না। তবু আমি তার বন্ধু। তার শরীর ছুঁয়ে হিমেল আলপনা দিয়ে সাজিয়ে তুলি। সে শরীরী। আমায় উপুড় করে জাপটে থাকে। যতক্ষণ না আলো এসে মুক্তি দেয়। তারপর নদীকে আদর করি। নদী আমারই বয়সি। তাই যৌবনের নিষিদ্ধ আলাপন চলে তার সাথে। মাঝে মাঝে আমার বিভ্রম ঘটে। অলিন্দে বায়ু নিরালম্ব হলে আমি নিলয় ঠেলে উল্টো ছুট দিই। মানুষ ঝড় ভেবে গালমন্দ করে। তারপর একদিন কমল সরোবরে আলোকে পাশে নিয়ে স্থির বসি। বরুণ আলিঙ্গনে নৈর্ঋতে সুরতরঙ্গে বিহঙ্গেরা। ইসরাফিলের শিঙ্গায় নবধারাপাতের ডাক।
আমি ফিসফিস করে বলি ‘ওগো কমলিকা, বুঝিলে না আমি কত অসহায়!’
তারপর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে দিই বিগত দিনের পাশে আগামী দিন।
গাছের ফাঁকে পাহাড়, পাহাড়ের বুকে নদী, নদীর ওপর আলো বাতাস পাখি— সবাই মুচকি হেসে বলে ‘জানি জানি আজ তোমার জন্মদিন’।
°°°
চিত্রণ: মৃণাল শীল





