রাতে শুতে যাবার সময় সেদিন খুব করে ছোটবেলার অনেক কথা মনে পড়ল মিনির। এসব কথা কেন মনে পড়ছে হঠাৎ? গুরুত্ব দিল না সে। ঘুম এসে গেল। পরের দিন আবার একই ঘটনা। ছোটবেলার কত ঘটনার ছোট ছোট টুকরো কাগজ ওড়া শুরু করল মনের ভেতর। এবার মিনির মনে হল, তার মন হয়তো অজান্তেই কোনও গল্প খুঁজছে। অনেকদিন কিছুই লেখা হয়ে ওঠেনি। তাই হয়তো মন লেখার তাগিদ নিজেই খুঁজে নিচ্ছে! বিষয়টাকে তেমন পাত্তা দিল না মিনি। শুধু মনে মনে ভাবল, কী জানি! হয়তো এগুলো নিয়েও কখনও নাড়াচাড়া করা যেতে পারে গল্পের পাতায়। তবে এসব অতি সাধারণ, দৈনন্দিন ঘটনার মধ্যে কি কোনও গল্পের সম্ভাবনা থাকতে পারে? মাইক্রোর কথা মনে হল খুব। ভাবল, যদি কখনও গল্পটা লেখা হয়, তখনই বরং মাইক্রোকে সেটা পাঠিয়ে অবাক করে দেবে সে। আগে থেকেই ফোন করে কিছু বলার দরকার নেই। তাছাড়া আজকাল তেমন রোজকার যোগাযোগও নেই। তাই আর মাইক্রোকে ফোন করা হয়নি। আসলে এ গল্প খাতার পাতায় জায়গা পাবে এমনটা কখনও মনে হয়নি। এ তো আর কোনও গল্পকথা নয়, এ হল গিয়ে সত্যি জীবনের অংশ। বড় হয়ে ওঠার প্রতিটি মুহূর্তের ক’টা চন্দনে সুবাসিত সোনালি ক্ষণ।
আশির দশক দোরগোড়া। একান্নবর্তী পরিবার। সাড়ে তিন বছরের ছোট্ট মিনির সামনে, আড়াই বছরের আরও ছোট ভাইটিকে বসিয়ে দিতে দিতে মা বলেছিলেন, ‘মিনি, তুমি বড়দিদি। এর খেয়াল তোমাকেই সব সময় রাখতে হবে।’ সেই দিন থেকে শুরু। ভাইটির গায়ে যাতে একটি মাছিও বসে, না বিরক্ত করতে পারে, তার জন্য ছোট্ট মিনির প্রচেষ্টার শেষ ছিল না। ভাইটির সূত্র ধরেই মিনির নিজেকে বড় মনে করার শুরু। এই একটা জায়গাতেই তার সব গিন্নিপনা আর কর্তৃত্বের কোনও প্রশ্ন ওঠে না! মিনির আঙুল ধরে ভাইটির এদিক-ওদিক চলা… তারপর থেকেই সবাই জানত যেখানে মিনি, সেখানে মাইক্রো!
মিনি তখন সবে মাছের কাঁটা বেছে খেতে শিখেছে। মাইক্রো ওসব মোটেও পছন্দ করে না। মিনি নিজেই সে ভার নিল। কাঁটা বেছে, টুপ টুপ করে ভাতের ‘ডাইবুড়ি’ সাজিয়ে, গল্প করতে করতে, ভাইটির মুখে ছোট-ছোট হাতে গ্রাস ভরিয়ে দিত মিনি। কখনওবা ভাতের গোলা বানিয়ে, তার মাথায় মাছের টুকরো রেখে, মিনি ঠাকুমার মতো বলত, ‘এই হল গিয়ে ভাত রাজার মাথায় মাছ সোনার মুকুট। এটা যে খাবে সে আরও বড় রাজা।’ এটা শুনতেই নাদুস-নুদুস মাইক্রো ‘আঁ’ বলে মুখ খুলত আর ওমনি মিনি তার মুখে চটপট গ্রাস ভরাত। মিনির এগুলো ভারি ভাল লাগত। আরও ভাল লাগত মিনির প্রতি মাইক্রোর বাধ্যতা। একবার কিছু বললে হল, মাইক্রো তাতে সদা রাজি!
মাইক্রো, মিনিকে ‘দিদি’ বলে ডাকত। আর এই সূত্রে সে, মিনির বাবা-মাকে জেঠু-জেঠিমা বলে, তথাকথিত সামাজিক সম্বোধন না করে বলত, ‘দিদির বাবা’ আর ‘দিদির মা’। মানে হল গিয়ে, তার কাছে ‘দিদি’ শব্দটার বিশেষ গুরুত্ব ছিল। মাইক্রো তখন বছর পাঁচেকের হবে। মিনির খুব ইচ্ছে হল, একদিন তাকে নিজের নতুন গোলাপি ঘাগরা পরিয়ে দেয়। বেচারা মাইক্রো তাতেও একটুও প্রতিবাদ বা আপত্তি করল না। টকটকে ফর্সা মাইক্রোকে ঘাগরা পরিয়ে, গাল ধরে চুল আঁচড়ে দিল, কপালে দিল কাজলের টিপ। তারপর আঙুল ধরে তাকে নিয়ে গেল পাশে পিসির বাড়ি দেখাতে। কী আনন্দের দিন ছিল সেটা।
সমস্যা শুরু হল যখন মিনি, মাইক্রোকে ছেড়ে কিছুতেই স্কুলে ভর্তি হতে চাইল না। অবশেষে হেডমাস্টারের হাতে-পায়ে ধরে মাইক্রোকেও একই ক্লাসে ভর্তি নেবার অনুরোধ করা হল। মিনির হাত ধরে মাইক্রোর সময়ের পূর্বেই স্কুল যাওয়া শুরু। প্রথম কিছুদিন মা পৌঁছে দিতেন স্কুলে। তারপর অর্ধেকের কিছু বেশি রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে, মা বা কাকিমা বলতেন, ‘এবার এখানে দাঁড়িয়ে দেখি, তোমরা নিজে নিজে, দু’জনে মিলে স্কুল যেতে পারো কি না।’ এমনি করতে করতে, একদিন মাইক্রো আর মিনি পুরো স্কুলের রাস্তাটা হাত ধরে ধরে নিজেরাই চলে যেতে শিখে গেল। মা বা কাকিমা মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে দেখতেন। তারপর ওই আনারস আর ডাবের আকারের চটক রঙের ওয়াটার বোতলগুলোর রং ফিকে হয়ে আসতে দেখলেই, মা বা কাকিমা ঘরে ফিরে আসতেন। ধীরে ধীরে মাইক্রো, মিনির বন্ধুবান্ধব হল। আরও ক’জনের সঙ্গে মিলেমিশে স্কুল যেতে লাগল তারা।
একদিন স্কুলে মাইক্রো প্যান্টে পটি করে ফেলেছে। মিনি তখনও তাকে সামলে নিয়ে এসেছে বাড়ি। রাস্তায় একবার তাকে ধমক দিয়েছে। আর পরক্ষণেই বলেছে, ‘তুই ভয় পেয়েছিলি মাইক্রো? ভয় পাস না। আমি তো আছি।’ ফিক করে হেসে ফেলেছিল মাইক্রো। আবার অপরাধীর মতো বলেছিল, ‘দিদি, এমন আর হবে না।’
বাবা, কাকা দু’জনেই রেলে চাকরি করতেন। সেই সূত্রেই রেল কলোনিতে থাকা। দুটো কোয়ার্টার না নিয়ে, একটা কোয়ার্টারেই ছিল তাদের একান্নবর্তী পরিবার। মাইক্রোর দুষ্টুমিতে নাজেহাল কাকিমা, বেশ তাল-দুমাদুম লাগাতেন তাকে। তাতেও তার কোনও আপত্তি ছিল না! এই বিছানায় চাদর পাতা হল, তাতে ঠিক দু’মিনিট গিয়ে বসল মাইক্রো। চাদর একেবারে এলোমেলো হয়ে গেল। মিনি বলল, ‘এটা কী করে হল?’ তুরন্ত বলতো মাইক্রো, ‘কী জানি দিদি! আমি বসলেই, চাদর নিজেই কেমন গুটিয়ে যায়!’ মিনি চোখ পাকিয়ে বলত, ‘হ্যাঁ তাই তো! চাদর তোকে ভয় পায় কিনা!’
ঝর-ঝর করে বৃষ্টি হয়ে গেল। এ বৃষ্টি দেখেই মাইক্রো আন্দাজ করেছে, রেল কলোনির ঠিক কোন কোন জায়গায় জল জমেছে, আর কতদূর সে অনায়াসেই যেতে পারে। কিন্তু সে একা যাবে না। মিনির কাছে কাকুতি-মিনতি শুরু। ‘এই দিদি, চল না! জল দেখে আসি।’ মিনি জবাব দিত, ‘নালা, রাস্তার জল সব এক হয়ে যায়। ও নোংরা জলে আমি যাচ্ছি না।’ মাইক্রো এমন জোর করত যে রাজি হতেই হত। তারপর আমতলা মাঠ পেরিয়ে, ভোলাদের বাড়ি পার হতেই, রাস্তার জল পায়ের চেটো ছাড়িয়ে, গোড়ালি ছুঁতে শুরু করত। আরও এগোত ওরা। জলও গোড়ালি পেরোত। কুইন্ মেরি মাঠের সামনের রাস্তাটার কাছে পৌঁছতেই জল হাঁটু ছুঁত। এখানে এসে একটু ঘাবড়ে যেত মিনি। মাইক্রো জলের মধ্যে ছুটোছুটি করত। মিনির ভয় হত, ‘নালার মধ্যে যদি পড়ে যাই আমরা? যদি নালা কোথায় তা আমরা বুঝতে না পারি?’ মাইক্রো বলত, ‘ধুর! পড়ব কেন? আমরা আন্দাজ করে নেব, নালা কোথায়! আরে! নালা কোথায়, তা তো আমরা আগে থেকে চিনি!’ মিনির তার কথায় মোটেও ভরসা হত না। নোংরা জলে ভেসে যাওয়া, চিপসের প্যাকেট, দেশলাই কাঠি, শুকনো পাতা, যা না তাই (!) দেখতে দেখতে মিনি বলত, ‘ছি! এই নোংরা জলে কেউ পা দেয়! বাড়ি গিয়ে বকুনি তো খাবই, আবার চানও করতেই হবে।’ মাইক্রো চট করে জবাব দিত, ‘বকুনি ঠিক আছে; কিন্তু চান কেন? বৃষ্টির জলে চান তো হয়েই যাচ্ছে!’ এক বর্ষায় মাইক্রো কোত্থেকে খবর আনল, ‘আসল জল জমে স্ট্র্যাচি রোডে। জেনিন্স রোডের জল তার কাছে নস্যি!’ মাইক্রো বলল, ‘এরপর যেদিন বৃষ্টি হবে, সেদিন স্ট্র্যাচি রোডে যাব দিদি।’ মিনি মোটেও রাজি হল না, ‘ও অনেক দূর! অতদূর গেছি জানলে, মা-কাকিমা তুলোধোনা করবে আমাদের।’ মাইক্রো নাছোড়। বলল, ‘একদিন বরং গিয়ে দেখে আসব, ঠিক কতটা জল জমে সেখানে।’ একদিন রাতে খুব বৃষ্টি হল। ভারি দুঃখ পেল মাইক্রো। রাতে তো আর বাড়ি থেকে বেরিয়ে বৃষ্টির জল দেখতে যাওয়ার নিয়ম নেই!
পরদিন সকালে স্কুল থেকে ফিরতি পথে, মাইক্রো তার ছেলে-বন্ধুদের দল থেকে আলাদা হয়ে এসে মিনিকে ডেকে বলল, ‘দিদি, চল। পট করে এইবেলা গিয়ে স্ট্র্যাচি রোডের জলের পরিমাণটা দেখে আসি গে।’ মিনি চোখ পাকিয়ে বলল তাকে, ‘এখন বৃষ্টি হচ্ছে না। তুই জমা জলে নেবে, জামা-কাপড় ভিজিয়ে বাড়ি ঢুকলে কেমন পিটুনি খাবি বুঝছিস?’ মাইক্রো বলল, ‘জলে নাবব না। খালি দেখে আসব কতটা জল।’ ‘আর ওখানে গেলে, বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যাবে। তাতেও বাড়িতে পিটুনির ভয় আছে’, বলল মিনি। একথাটা মাইক্রোও জানত। সে বলল, ‘তবে কী হবে দিদি? জল কী করে দেখব?’ ‘পরে বাড়ি গিয়ে ভাবব’, জবাব দিয়ে সে-কথোপকথনের ইতি টানল মিনি। মাইক্রো কিন্তু জল দেখার আশা ছাড়েনি। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর মিনি যখন উঠোনপারের নিমগাছটার পড়া ফল কুড়িয়ে এনে, পুতুলের থালায় সেগুলোকে কাল্পনিক ‘ডিম’ বলে খেতে দিচ্ছে, মাইক্রো হাজির হল, ‘দিদি কী ভাবলি?’ ‘কীসের কী?’ এতটা বলেই থামল মিনি। মনে পড়েছে। ‘ও হ্যাঁ, আজ বিকেলে খেলতে না গিয়ে দেখে আসব।’ খুব খুশি হল মাইক্রো। তারপর বিকেল চারটেতে দুটিতে মিলে বেরোল হাঁটতে হাঁটতে। পিয়ার্স রোডের কাছে পৌঁছতে মাইক্রো বলল, ‘এই জায়গাটা মোটেও ভাল নয়। এখানে জল জমে না। তাই তো এখানে স্কুল করেছে! জানিস দিদি, স্ট্র্যাচি রোডের কাছে যারা থাকে, তাদের কী মজা! তারা বৃষ্টিতে কেউ স্কুলে আসে না। আর তার জন্য বকুনিও খায় না। তারপর আরও এগিয়ে গিয়ে, টাউন সাপ্লাই বিজলি অফিস পেরিয়ে, গার্ডেন রোডের বকুলঢলা রাস্তা পার হয়ে, স্ট্র্যাচি রোডের মুখে পৌঁছতেই, ওদের চক্ষু চড়কগাছ! ‘ওরে বাবা এত জল! এ তো বড় মানুষদের কোমর পর্যন্ত জল দেখছি!’ বলল মিনি। মাইক্রো গম্ভীর হয়ে বলল, ‘চল দিদি, এ জলে খেলা যাবে না। এ জল আমার নাক পর্যন্ত এসে যাবে মনে হচ্ছে।’
বাড়ি ফেরার পথে রাধাচূড়া ঢাকা রাস্তাটাতে হলুদ কার্পেট পাতা আছে বলে মনে হল মিনির। কত রকমের গল্প করতে করতে দুটিতে ঘরে ফিরে এল। আসার পথে মাইক্রো আফসোস করেছিল, ‘বাজে জল! ও জলে তো নামা যাবেই না। আজকের বিকেলের খেলাটাও ওই জলের জন্য টলে গেল।’
একবারের কথা তো না বললেই নয়। সেজকাকার বাড়ি ছিল টিফিন বাজারে।একবার ওদের খুব ইচ্ছে হল, ওরা সেজ কাকার বাড়ি নিজেরা চিনে যেতে পারে কি না সেটা পরীক্ষা করার। বাড়িতে কাউকে কিছু না বলে, দু’জনে বেরিয়ে পড়ল। মিনির হাত ধরে মাইক্রো চলেছে। মাঝরাস্তায় একটু একটু ভয়ও করতে লাগল। তখন ‘ছেলে-ধরা’ কথাটার খুব চলন হয়েছিল। বস্তায় ভরে ছেলে-ধরা নাকি বাচ্চাদের অজ্ঞান করে ধরে নিয়ে যায়। মাইক্রো মাঝেমাঝেই বলল, ‘আ্যই দিদি! আমার হাতটা ধর।’ যেতে যেতে পৌঁছে গেল সেজকাকার বাড়ি। সেজকাকিমা তো অবাক। তখনকার দিনে তো আর ফোন করে সঙ্গে সঙ্গে জানানোর কোনও উপায় ছিল না। সেজকাকিমা খুব যত্ন করে খাইয়ে-দাইয়ে সন্ধের দিকে সেজো কাকার সঙ্গে মাইক্রো-মিনিকে রেল কলোনির বাড়িতে পৌঁছে দিতে পাঠালেন। ওদিকে মিনি, মাইক্রোদের বাড়িতে তখন খোঁজখোঁজ, হুলুস্থুলু পড়ে গেছে। মিনি আর মাইক্রোকে দুপুরের পর থেকে পাওয়া যাচ্ছে না! সেজকাকার সঙ্গে ওদের দেখে, বাড়িতে সবাই নিশ্চিন্ত হল তো পরে, কিন্তু আগে প্রশ্নবাণ শুরু হল: ‘এমন বুদ্ধিটা ওদের মাথা থেকে বেরোল কোন দুঃখে? ওরা নিজেরাই ওভাবে অতদূর চলে যাওয়ার সাহস পেল কোত্থেকে?’ সে-যাত্রা সেজকাকা সব সামলালেন। আজ মনে হয়, সেজকাকার বাড়ির কাছে যেহেতু বছরে একবার বিন্ধ্যবাসিনীর মেলা বসত, তাই হয়তো বছরের মাঝেও ওই মেলা বসেছে কি না, তা দেখার বিশেষ কৌতূহল, ওদের সেজকাকার বাড়ি যেতে উদ্বুদ্ধ করে থাকবে! এই বিন্ধ্যবাসিনীর মেলা থেকে মাইক্রো একবার সবুজ রংয়ের প্লাস্টিকের ছোট একটা স্কুটার উঠিয়ে আনল। বাড়িতে আসার পর সেই স্কুটার তার হাফ প্যান্টের পকেট থেকে আবিষ্কার হল। মাইক্রোর মা মানে কাকিমা রণমূর্তি ধরলেন। ‘তোর কাছে তো আট আনা ছিল না। তুই এটা আনলি কী করে? আমি কিছু জানি না। কালই তুই এ ফেরত দিয়ে আসবি।’ পরদিন দুপুর তিনটে নাগাদ আবার মেলায় যাওয়া স্থির হল। ভিতু ভিতু গলায় মাইক্রো চুপিচুপি বলল, ‘দিদি কী করে ফেরত দেব? লোকটা যে ভাববে আমি চুরি করেছিলাম।’ এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, মা-কাকিমার কড়া হুকুম ছিল, ফেরত দেবার সময় বলে ফেরত দিবি। মাইক্রোর গলার ওই আকুতি শুনে সেদিন মিনি বলেছিল, ‘তুই শুধু ফেরত দিবি। আমি বলব, আমরা এটা ভুল করে নিয়ে গিয়েছিলাম।’ আজও মনে আছে, মেলাতলার দোকানের হাড়গিলগিলে লোকটা সেদিন হাসিমুখে বলেছিল, ‘তোমরা এইটে ফেরত দিতে এয়েছ? ঘরের লোকের শিক্ষে আছে বলতে হবে।’ সেদিন সবুজ স্কুটার ফেরত দেবার পর চার আনার ফুচকা খাবার শেষে নিজের ফাউ ফুচকাটা মাইক্রো মিনিকে দিতে চেয়েছিল।
একটা ঘটনার কথা আজও অবাক করে। স্কুল থেকে ফিরতি রাস্তায় কুইন মেরি মাঠের পাশের, ছোট মাঠটার কোণের দিকে একটা বিশাল বড় ড্রেন ছিল। একদিন শর্টকাটের লোভে ওখান দিয়ে বাড়ি ফেরার স্থির হল। ওরা সেদিন তিন-চারজন সঙ্গে ছিল। মাইক্রো হাইটে ছোট হওয়া সত্ত্বেও ওই ড্রেন টপ করে পেরিয়ে গেল। বাকি দু’জনও পেরোল। মিনি অনেক চেষ্টা করেও ও ড্রেন কিছুতেই পেরোতে পারল না। ওই ড্রেনের তরতর করে বয়ে যাওয়া জল দেখলেই মিনির মনে হচ্ছিল, ‘যদি পড়ে যাই? আমিও বয়ে যাব।’ শেষে মিনি বলল, ‘তোরা যা। আমি মাঠ পেরিয়েই আসছি বরং।’ মিনি চলা শুরু করল। মাঠের মাঝামাঝি পৌঁছেছে সে। পিছন থেকে আওয়াজ এল, ‘আ্যই দিদি…’, মিনি পিছনে ফিরে দেখল, মাইক্রো আসছে হাঁফাতে হাঁফাতে। ‘কীরে তুই?’ শুধোল মিনি। মাইক্রো বলল, ‘আবার বড় ড্রেন পার হয়ে চলে এলাম দিদি। তুই একা একা এতটা হাঁটবি?’ মনে আছে, তারপর বেশ ক’দিন দুপুরে মিনি বাড়ির উঠোনে বড় ড্রেনের আকারের দূরত্ব চক দিয়ে এঁকে, তা পার হওয়া শুরু করল। সে ওই ড্রেনের দূরত্ব থেকে আরও বেশি দূরত্ব এক লাফে পার হয়ে যেত। কিন্তু সত্যি সত্যি ওই ড্রেনটা সে কিছুতেই পার করতে পারত না। ওখানে এলেই তার ভয় হত, ‘যদি পড়ে যাই!’ একদিন মিনি স্থির করল, ‘আজ আমি ও ড্রেন পার হবই।’ সে ওখানে পৌঁছে মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়েই রইল। সবে যখন ‘যদি পড়ে যাই’ খেয়ালটা ঘন হতে শুরু করেছে, মাইক্রো হাজির। ওপাশ থেকে হাত বাড়িয়েছে সে। ‘আ্যই দিদি আয়। আমার হাত ধরে পার হ।’ মিনি কত সহজেই ওই বাড়ানো হাত ধরে, ড্রেন পার করেছিল সেদিন।
থালায় মিষ্টি এলেই মাইক্রো টপ করে নিজেরটা খেয়ে নিত। তারপর মিনিকে বলত, ‘খোন্তাখুন্তি দাও না।’ মিনি প্রথমে ‘না’ বলত। কিছুক্ষণ পর, সেও ওই খেলায় যোগ দিত। পরে তার খেয়াল হত তার মিষ্টির অনেকটাই মাইক্রো এই খোন্তাখুন্তির চক্করে খেয়ে ফেলেছে। কতবার মিনির রাগ দেখে মাইক্রো বলেছে, ‘পরের বার আমার মিষ্টির অর্ধেকটা তোর।’ দিতেও এসেছে সে। মিনি কোনওদিন ভাইয়ের মিষ্টির অর্ধেকটা প্রাণে ধরে নিতে পারেনি।
বাড়িতে ‘নবান্ন’ উৎসবের কথা খুব মনে পড়ে। গ্রামের নতুন চাল আসার বন্দোবস্ত হলে, তার কিছুটা শিলবাটায় পিষে, কাঁসার বড় জামবাটিতে দুধ, নারকেল কোরা, নানারকমের ফল, মিষ্টি আর গোটা-গোটা আম দিয়ে খাওয়া! মাইক্রো তো আর একা আম খেত না! তার পুরো মুখ, হাত, জামার অর্ধেকটা, সব আমে মিলেমিশে যেত! তা দেখে মিনি বলত, ‘ইস্’! মিনি কখনও গোটা আম, ওভাবে খেতে পারত না। মা-কাকিমাকে সবসময় আম কেটে দিতে বলত। মাইক্রো কখনওই সেসবের তোয়াক্কা করত না। একটা আম খাওয়া শেষ হলে, সে দ্বিতীয় আম খুব খুশি হয়ে খেতে চাইত।
সেবার মিনির বাবা খুব অসুস্থ হলেন। রেলের হাসপাতালে বেশ কিছুদিন ভর্তি ছিলেন তিনি। একদিন বাড়ির বড়দের সঙ্গে, মিনি আর মাইক্রোও হাসপাতালে গেল। ফেরার পথে মাইক্রো, মিনিকে বলল, ‘দিদি, এবার একবার হাসপাতালে ভর্তি হতেই হবে! যা দেখলাম, ওখানে থাকলে পাঁউরুটি, কলা, ডিম যতখুশি খাওয়া যাবে। দিদির বাবা তো কিছুই খেতে পারছে না। আমি থাকলে দেখিয়ে দিতাম, খাওয়া কাকে বলে।’ মিনি একথার কোনও উত্তর দেয়নি। বেশ কিছুদিন পরের কথা। মাইক্রো হঠাৎ বলল, ‘আমি চোখে ঠিক করে দেখতে পাচ্ছি না। ডাক্তারের কাছে নিয়ে চলো।’ তাই করা হল। রেলের হাসপাতালে ডাক্তারবাবু, খুব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, মাইক্রোকে দিলেন জোর ধমক। তারপর বললেন, ‘সব ঠিক আছে। চোখে কোনও গড়বড় নেই| ফের মিছে কথা বললে, চোখে ইনজেকশন লাগাব।’ বাড়ি ফিরে মাইক্রো মনখারাপ করে বসেছিল। মিনি জিজ্ঞেস করল, ‘তোর চোখে কী হচ্ছিল?’ মাইক্রো বলল, ‘ভাবলাম, চোখে চশমা আর হাসপাতালে ভর্তি হয়ে পাঁউরুটি, কলা, ডিম সব এক ঢিলেই হয়ে যাবে।’ মিনি বলল, ‘চোখে চশমা মানে?’ মাইক্রো জানাল, তার চোখে চশমা পরার বড় শখ হয়েছে। চশমা পরলে তাকে নাকি খুব স্মার্ট আর বুদ্ধিমান দেখাবে! তাই সে চোখের ডাক্তারকে নির্বাচন করেছিল। প্ল্যান ভেস্তে যাওয়ায় সে যারপরনাই দুঃখী হয়েছিল। সেদিন! তার সব কথা শুনে, পেট ধরে হাসির কথা মিনির আজও মনে আছে।
একদিন বিকেলবেলা, মাইক্রো ছোটনের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলছে। পাশের বাগানে মিনি রমার সঙ্গে গল্প করছে। হঠাৎ বেশ ক’জন ছেলে, বড়দের আওয়াজ এল, ‘পাগলা বাঁদর! পালাও, পালাও।’ মিনির নজর দৌড়ানো শুরু করল। ‘কোথায় পাগলা বাঁদর?’ আচমকা সে দেখল, মাইক্রো শাটল্ কক্ আসার অপেক্ষায় ছোটনের দিকে তাকিয়ে আছে, আর কাকে যেন বলছে, ‘আরে, ছাড় না আমায়!’ মিনির এবার চোখে পড়ল, ছোট বাঁদরটা জড়িয়ে ধরেছে মাইক্রোর পা। আতঙ্কে মিনি ‘মাইক্রো, মাইক্রো’ বলে চ্যাঁচাতে শুরু করল। ওদিকে রমা আর ছোটনও যোগ দিল। বাঁদরভায়া পালানোর আগে মাইক্রোকে কামড়ে দিয়ে গেল। আর কী? তারপর চোদ্দো দিন ধরে মাইক্রোর পেটে প্যাঁক-প্যাঁক করে চোদ্দোটি ইনজেকশন ফুটল। আরও মনে আছে, লাস্ট ইনজেকশনের দিন মাইক্রো সকাল-সকাল ইনজেকশন নিয়ে এসে জেদ করে চিড়িয়াখানা যেতে ছাড়েনি। ‘শেষে কিনা বাঁদরের কামড় খেলি তুই মাইক্রো?’ এ কথার উত্তরে মাইক্রো জবাব দিয়েছিল, ‘কুকুরের কামড় তো সবাই খায়!’
মাইক্রো আর মিনি খুব সুন্দর রথ বের করত। বাড়ির বড়রা কাঠের রথ, রঙিন, কাগজ, ফুল-পাতা দিয়ে সাজিয়ে দিত। মাইক্রো রথ টানত, মিনি সামলাত। একবারের ঘটনা। ওরা তখন ফোর-ফাইভে পড়ে। ধরণি পাণ্ডার বড় রথ, একশো-এক নম্বর বিল্ডিংয়ের সামনের রাস্তা দিয়ে পার হয়ে আরও ক’টা রাস্তায় ঘুরতে গেল। মিনি, মাইক্রোর রথও বের হল। নিয়ম ছিল, আমতলা মাঠের আগে নিয়ে যাওয়া যাবে না। বাড়ির কাছে, আশপাশে, চালাও যত খুশি। তাই হল। রথ আমতলা মাঠ থেকে প্রায় বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। একটু পরে সন্ধে হবে। মাইক্রো বলল, ‘দিদি চল না। ওই পাশের রাস্তাটায় একবার যাই। গিয়েই চলে আসব।’ মিনির প্রথমে একটু আপত্তি থাকলেও তারও উৎসাহ ছিল রথটাকে একটু ঘোরানোর। জগন্নাথদেব তাঁর ভাই-বোনের সঙ্গে এত তাড়াতাড়ি মাসির বাড়ি পৌঁছে যান, এই কনসেপ্টটা সে মেনে নিতে পারছিল না। তার নিজের অভিজ্ঞতাই বোধ হয় তাকে সেটা মেনে নিতে দিচ্ছিল না। প্রথমে দুটো ট্রেন, তারপর বাসে চড়ে, তারপর কিছুটা রাস্তা গরুর গাড়ি চড়ে, তবে মিনি একবার তার বড় মাসির বাড়ি পৌঁছেছিল। যাইহোক, ওই যেখানে দাঁড়ালে রেলওয়ে হাসপাতালটা সোজা দূরে দেখা যায়, ওরা জেনিন্স রোডের ঠিক সেই তিনমাথার কাছে রথ নিয়ে এল। মাইক্রো দেখল, ওই দূরের রাস্তা দিয়ে বেশ অনেক লোক আসছে। মিনি ততক্ষণে তাড়া লাগানো শুরু করেছে, ‘ভাই চল, এবার বাড়ি যাই।’ মাইক্রো শুনল না। বলল, ‘দাঁড়া না দিদি! ওই দ্যাখ, কত লোক আসছে। ওদের নকুলদানা দেব, আর অনেক পয়সা পাব।’ ভিড় ততক্ষণে আমতলা মাঠ পার করে এগিয়ে আসছে। আর কতক সেকেন্ড পর ভিড় যখন আর মাত্র কিছুটা দূরে, খুব স্পষ্ট হয়ে উঠল ‘বলো হরি, হরি বোল’ ধ্বনি। মাইক্রো রথ ফেলে দিল ছুট বাড়ির দিকে। তার পথ অনুসরণ করল মিনিও। দুটিতে হাঁফাতে-হাঁফাতে বাড়ির পেছনের রাস্তা দিয়ে আসতে গিয়ে পড়ল ড্রেনে। সে যা তা কাণ্ড! সাফাইয়ের পর বাড়ির বড়রা শুধোলেন, ‘হল কী? রথ কই?’ এবার তাদের রথের কথা মনে পড়ল। মা বললেন, ‘চল আমার সঙ্গে। রথ কোথায় ফেলে এলি তোরা দেখা। রথ নিয়ে আসি।’ মাইক্রো কিছুতেই ও পথে যেতে চাইল না। অগত্যা মিনিকেই বকুনি খেয়ে, মায়ের সঙ্গে রথ আনতে যেতে হল। রথ বাড়ি পৌঁছল। তবে রথের ভেতর থেকে জগন্নাথদেবের সোনালি মূর্তি সব হাওয়া! সেগুলি বড় পিসির বাড়ি থেকে এনে, রথে বসানো হয়েছিল। অনেক দিন পর মিনি-মাইক্রোরা যখন সপরিবারে সব পুরী গিয়েছিল, সেখান থেকে ওই একই রকম সোনালি জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা মূর্তি এনে মা-কাকিমা বড় পিসির বাড়িতে উপহার পাঠিয়ে ছিলেন।
মিনি, মাইক্রো যখন বেশ বড় হয়েছে, তখন কতবার মিনি তার প্রিয় বন্ধু মা-সোনার সঙ্গে খেলতে খেলতে বা গল্প করার সময় বলেছে, ‘যা না মাইক্রো! তুই আর বাবুসোনা (মা-সোনার ভাই) নিজেদের মতো খেল গে যা না। নিজেদের বন্ধুদের সাথে।’ মা-সোনা তাতে সায় দিয়েছে। কিন্তু বাবুসোনা আর মাইক্রো সপাট জবাব দিয়েছে, ‘তোরাও তো আমাদের বন্ধু। আমরা এখানেই থাকব।’ সেই জন্যেই বোধ হয় বন্ধু-বান্ধব সব একাকার হয়ে গেছিল বারো-তেরো জন মিলে একসাথে কত বিকেলে লুকোচুরি, জেলে-মাছ, তালা-চাবি, ছোঁয়া-ছুঁই, জোড়া-ছাড়া, বুড়ি-বসন্ত, ইঁদুর-বিড়াল খেলেছে ওরা। একবার লুকোচুরির সময় মাইক্রোটা তারক আর সুমনদার সঙ্গে জামগাছে চড়ে লুকোতে গিয়েছিল। সেখান থেকে পড়ে তার ভাঙল হাত। ফর্সা চোখ-মুখ তার যন্ত্রণায় লাল হয়ে গেছে। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে তবু সে বলছে, ‘আমি তোকে ধাপ্পা বলে দিয়েছি বান্টি! আমি জামগাছ থেকে সপাট তোর ওপরেই পড়েছি প্রায়।’ সেদিনও মিনি তার হাত ধরে তাকে বাড়ি নিয়ে এসেছিল। তারপর রেলের হসপিটাল, হাওড়া অর্থোপেডিক, হাত অপারেশন, প্লাস্টার কত কি না চলেছিল ক’মাস। অত যন্ত্রণাতেও মাইক্রোর হাসি কখনও মিলিয়ে যায়নি। সে মিনিকে বলেছিল, ‘দিদি জামগুলো কাঁচা দেখলাম। নইলে ক’টা তোর জন্য ঠিক পেড়ে আনতাম।’ মিনি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তা তুই হঠাৎ জামগাছে চড়ে লুকোতে গেলি কেন? তুই তো গাছে চড়তেও জানিস না…।’ মাইক্রো বলেছিল, ‘গাছে চড়া আমি শিখে গেছি সেদিনই। আর দেখলি, বান্টিকে ধাপ্পাটা কেমন দিলাম?’ মিনি বলেছিল, ‘হা ভগবান!’
মিনির নাচের স্কুলের ফাংশনে, দুর্গার মহিষাসুর বধ দেখানো হয়েছে। মহালয়ার ঠিক আগে, মাইক্রো বলল, ‘চল দিদি, আজ আমরাও দুর্গার অসুর বধটা বাড়িতে করে দেখাই।’ মিনির দুর্গা সাজতে বেশ ভালই লাগত! ‘তা অসুর কে হবে?’ জবাবে মাইক্রো বলল, ‘কেন? আমি।’ মিনি বলল, ‘যাঃ! তুই নাচ জানিস না।’ মাইক্রো ছাড়বার পাত্র নয়। অসুর সে হবেই! মাইক্রো বলল, ‘দিদি, তুই শুরু কর।’ ‘আরে, আগে অসুর এসে হন্বিতস্বি করবে, তবে তো দুর্গা আসবে’, বলল মিনি। মাইক্রো মানল না। মা-কাকিমা বললেন, ‘বেশ তো মিনি, তুইই শুরু কর। আমরা ধরে নেব, অসুর লুকিয়ে আছে।’ বেগুনি রঙের ওপর, রুপোলি জরির ফুলকাটা শাড়ি পরে, ছোট মিনি দুর্গার নাচ শুরু করেছে। মা-কাকিমা সব খুব খুশি হয়ে দেখছেন। মিনিট পাঁচেক পর ডিগবাজি খেয়ে মাইক্রো ফিল্ডে নামল! তারপর সে, যা উদ্ভট ধাতিং নাচ আর লাফালাফি শুরু করল, তা দেখে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেল। মিনি বলল, ‘এ যুদ্ধে অসুর জিতেছে।’
যখন কৈশোরকাল, মিনি-মা-সোনার দল, দুর্গাপুজোর সন্ধেয় কলোনির দুর্গাঠাকুরগুলো দেখতে যাবে বলে রওনা হয়েছে। হঠাৎ ওরা লক্ষ্য করেছে, একটু দূরত্ব রেখে মাইক্রো, বাবুসোনাও তাদের দু-চারটি বন্ধু নিয়ে কখনওবা শুধু দু’জনেই পিছু নিয়েছে। মিনি বলেছে, ‘সেকী রে, এরা আবার কখন ও-পাড়া, সে-পাড়ার ঠাকুর দেখতে উৎসাহী হল?’ মা-সোনা হেসে জবাব দিয়েছে, ‘বুঝলি না? ওরা পাহারাদারি করছে!’
অসাধারণ মুখস্থবিদ্যা ছিল মাইক্রোর। ইতিহাসের বইটার প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা দাঁড়ি-কমা সহ সে গড়গড় করে বলে যেতে পারত। পরীক্ষার পর সে আফসোস করে বলত, ‘যত তাড়াতাড়ি বলা যায়, তত তাড়াতাড়ি যদি লেখা যেত!’ কতবার আমতলা মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে মিনি, মাইক্রো, মা-সোনা, বাবুসোনা, বান্টি, স্নেহাশীষ, বড়বাবু, রুম্পা, তারক, বুলু, বিশু, অরূপ, দীপালি আকাশে একরাশ ফড়িং ওড়া দেখত। কতবার সন্ধে হবার আগে যখন মাথার উপর ‘মমহুমমহু’ করা ঝাঁকঝাঁক মশা ওড়া শুরু হত, ওরা কেউ কেউ লাফিয়ে লাফিয়ে মশা মারার চেষ্টা করত! হাতে যদি তিনটি মশা মারতে পারত, বলত, ‘আমি তিন মার পালোয়ান!’ মরা মশার সংখ্যাই কে কত পালোয়ান তা নির্ধারণ করে দিত! কখনওবা মশার দল মাথার ওপর এলেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটে যেত ওরা। ওদের সঙ্গে সঙ্গে মশার দলও ছুটত। কতবার শরতের আকাশের পেঁজা তুলোর মতো ভেসে যাওয়া মেঘগুলোর সঙ্গে সঙ্গে ভাসতে ইচ্ছে হত ওদের। কত বিকেলে নীল আকাশ দেখতে দেখতে হাতদুটো ছড়িয়ে দিত ওরা। গোল গোল ঘোরা শুরু হত। কিছুক্ষণ পরে মাথাটা ঘুরছে বুঝতেই সব ধপ্ ধপ্ করে মাঠের সবুজ ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ত। একটু ধাতস্থ হবার পর চোখ খুললেই মনে হত নীল আকাশটা ওদের কাছ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। পৃথিবীটাকে সত্যিই গোল বলে মনে হত। কেউবা শুয়ে শুয়েই চেঁচিয়ে বলত, ‘পৃথিবীটা গোল রে! প্রমাণ হল।’ যেন এই প্রমাণটা না পেলে, বইয়ে পড়া তথ্যটার কোনও মূল্যই ছিল না এতদিন! ঠাকুমার কাছে শোনা গল্পের পুষ্পবৃষ্টি দেখার শখ হত কতবার। মিনি অস্তর দেওয়া লাল জর্জেটের ফ্রকের আঁচলে মা-সোনার সঙ্গে কাঁটা গাছের হলুদ ফুলের পাপড়ি জমা করত। তারপর অনেক পাপড়ি জমা হলে, বাবুসোনা, মাইক্রোকেও ডাকা হত। কাছাকাছি দাঁড়াত ওরা চারজন। ওই জমা ফুলের পাপড়ি আকাশের দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হত। সেকেন্ডের পুষ্পবৃষ্টির অনাবিল আনন্দ মনে ছবি হয়ে আছে। বর্ষার মাঠের কাদা মেখে মাইক্রো যখন ফুটবল খেলে বাড়ি আসত, তাকে চেনা দায় হত। একদিন মেরুন-সবুজ আর একদিন লাল-হলুদের জার্সি পরে খেলতে যেত মাইক্রো। ফেব্রিক দিয়ে জার্সিতে দশ নম্বরও লিখেছিল। পাড়ার বড় ছেলেরা তার খেলার প্রশংসা করে তাকে ‘প্লাতিনি’ বলে ডাকত। এতে মনে মনে খুব খুশি হত মাইক্রো। সে মাঠের কত গল্পই না মিনিকে শোনাত! মিনি সবটা বুঝতও না। বিশেষত ফুটবল, ক্রিকেটের টেকনিকাল টার্মগুলো… মাইক্রোর সেসব জলভাত ছিল। তাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করত, ‘হ্যাঁরে, তুই ইস্টবেঙ্গল না মোহনবাগান সাপোর্টার?’ সে বলত, ‘ঠিক করতে পারছি না।’ সে যদি টিভিতে ক্রিকেট খেলা দেখতে বসত, আর তার কোনও বিশেষ বসার ধরনে যদি ভারতীয় খেলোয়াড় চার-ছয় মেরেছে বা বোলার অপোনেন্টের কাউকে আউট করত, মাইক্রো সেই একই পজিশনে বসে থাকত। সে বলত, তার ওই বিশেষ ধরনের জন্যই টিমের ‘লাক্’ আসছে! মিনিকেও সে প্রায় জোর করেই সঙ্গে বসিয়ে খেলা দেখাত। আর মিনির বসার পরে যদি ভারতীয় খেলোয়াড় ভাল রান তোলে তা হলে সে কিছুতেই মিনিকে সেখান থেকে উঠতে দিত না। বাড়িতে মিষ্টি ওষুধ রাখার জো ছিল না। মাইক্রো তাক বুঝে ঠিক তা খেয়ে নিত। কোনও বকাবকিতে কাজ হত না। সোজা বলে দিত, ‘ওষুধ শেষ হয়ে গেছে। তোমরা খেয়াল করোনি।’
রেমো দাদা, মানে সেজকাকার বড়ছেলে, মিনির ছেলে পুতুলের জন্য খুব সুন্দর শার্ট বা পাঞ্জাবি বানিয়ে দিত। একবার মিনিকে সে একটা ছোট্ট কালীঠাকুর তৈরি করে দিয়েছিল। মিনির তা খুব পছন্দ হল। সে, রেমোদাদার হাতের কাজ কত ভাল, সে কথা সবাইকে জানাচ্ছিল। হঠাৎ দু’দিন পরে দেখল, কালীঠাকুরের পা ভেঙে গেছে। এত সাবধানে রাখা সত্ত্বেও পা ভাঙল কী করে? পরে জানা গেল, সেটা মাইক্রোর কীর্তি! তখন খুব রাগারাগি, বকাবকি হল। কিন্তু মাইক্রো নির্বিকার। অনেক পরে মিনি বুঝেছিল, মিনি কারও খুব প্রশংসা করুক, সেটা মাইক্রো পছন্দ করত না। তার হিংসে হত!
ওঃ! সেই মাধ্যমিকের রেজাল্টের দিন কী যে হচ্ছিল বুকের ভেতর! মাইক্রো ঘরে নেই। একেবারে গায়েব। মিনি বেলা বারোটা নাগাদ স্কুল যাবার জন্য দুরুদুরু বুকে তৈরি হচ্ছে। ঘরের জানলা থেকে দেখল মাইক্রো দূর থেকে ছুটতে ছুটতে আসছে, ‘মা, দিদির মা… দিদি ফার্স্ট ডিভিশন! লেটার!’ ‘আর তোর রেজাল্ট?’ তাকে মাঝপথেই থামিয়ে জিজ্ঞেস করল মিনি। মা, কাকিমাও যোগ দিলেন ওই প্রশ্নে। মাথা চুলকাতে শুরু করল মাইক্রো। বোকার মতো হাসতে হাসতে বলল, ‘এই যাঃ সেটা তো দেখতেই ভুলে গেছি। আচ্ছা আবার যাচ্ছি।’ বলেই সে আবার ছুট দিল। মিনি ততক্ষণে বড় সাইকেলটা বের করে ফেলেছে। জোর গতিতে সাইকেল চালাতে চালাতে প্রায় মাইক্রোর কাছাকাছি পৌঁছে বলেছে, ‘চল, দু’জনে মিলে রেজাল্ট দেখে আসি।’ পরে বাড়ি ফিরে যখন মিনি একান্তে তাকে বলেছে, ‘হ্যাঁরে তুই কী? নিজের রেজাল্টটা আগে দেখিসনি?’ মাইক্রো খুব সরলভাবে বলেছে, ‘খেয়ালই ছিল না দিদি।’
এমন কত ঘটনার ঘনঘটা দিয়ে সময় পেরিয়েছে। পরে নিজের নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়েছে সবাই। একান্নবর্তী পরিবার নিজের সময়-সুবিধেমতো ‘নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি’ হয়েছে। এখন কোনও বিশেষ উৎসব-অনুষ্ঠানে কথাবার্তা হয়। দেখা-সাক্ষাৎ হয় মানুষের। জীবনের তাগিদে মাইক্রো আর মিনিরও ভিন্ন ভিন্ন শহরে অধিষ্ঠান হয়েছে। সম্পর্ক সবই আছে। তবে তাতে ছোটবেলার চমক গিয়ে, বড়বেলার পরত লেগেছে। সেদিন মাঝরাতে খবর পেল মিনি। মাইক্রো আর নেই। হার্ট অ্যাটাক। সবে চুয়াল্লিশের কোটা। ধপ্ করে বসে পড়ল মিনি। হাত-পা তার চলছে না। সব থেমে গেল যেন। বিশ্বাস হল না কিছুতেই। এ খবর কেন যে মিথ্যে হয় না? কান্না, কান্না থামা, আবার কান্না চলতেই থাকল। সব ওলোট-পালোট হয়ে গেল যেন। নিজেকে গোছানোটা এবার সহজ ছিল না। ‘আ্যই দিদি!’ মাথার ভেতর সারাক্ষণ শুনতে থাকল মিনি। সময়ের সঙ্গে মিনির মনে হল, ছোটবেলা মনের মধ্যেই ঘুমিয়ে থাকে; তাকে জাগাতে পারলেই সবকিছু কত সহজ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমরা মানুষেরা, বড় হওয়ার নেশায় সেই ছোটবেলাটাকে ভুলেই যাই। সম্পর্কগুলোকে অযথা ব্যস্ততার মোড়কে মুড়িয়ে দিই, নইলে সহজতা এড়িয়ে যাই। কত মান-অভিমান জমা হয়। সেগুলো কখনও মিটিয়ে নিই, কখনও বা তার তোয়াক্কা করি না। কত কথা মনে পড়ল মিনির। ‘মিনির ভাই মাইক্রো’ থেকে ‘মাইক্রোর বোন মিনি’ হিসেবে পরিচিতির সফরটা তো কম রোমাঞ্চকর ছিল না। মাইক্রো ঘুড়ি ওড়াবে, লাটাই ধরতে হবে মিনিকে। মিনি পড়তে বসলে, মাইক্রো গজগজিয়ে বলবে, ‘আ্যই দিদি, তুই পড়তে বসলি কেন? এবার আমাকেও পড়া নিয়ে বসতে বলবে।’ এমনকী মিনির, মনে-মনে প্রথম প্রেমে পড়াটাও মাইক্রোর সবচেয়ে প্রশংসার পাত্রের সঙ্গে। কারও সম্বন্ধে শুনে শুনেই তাকে ভালবেসে ফেলা! কী সব দিন ছিল তখন! সম্পর্কগুলোর মধ্যে কেমন একটা ওজন, একটা গুরুত্ব ছিল যেন। দিদি, দাদা মানে হল গিয়ে সম্মানের পাত্র। একটু ভয়, একটু সমীহের পরত চড়ার শুরু। তাই হয়তো পরে আর বন্ধুত্ব থাকেনি। আজকাল কোনও বন্ধুত্ব কি থেকে যায়? আসলে সম্পর্কগুলোকেও তেল-জল দিয়ে নাওয়াতে-খাওয়াতে হয়। সময় বদলেছে। তখনকার দিনে, যখন-তখন অতিথিতে ভরা থাকত ঘর। আজকাল তো ফোনটাও কখন করা যাবে বা আদৌ করা যাবে কি না তার জন্য অনুমতি নেওয়ার চল হয়েছে! না বললেও বুঝে নেবে এমন যুগ চিরস্থায়ী হচ্ছে না আর। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা, পারিপার্শ্বিক চাপ মানুষকে অনেকটা অসুরক্ষিত করেছে আজকাল। আগে ভালবাসি না বললেও চলত। এখন মনে হচ্ছে ‘ভালবাসি’ বা ‘আই ডু কেয়ার’ কথাটা মাঝেসাঝে বলতে, বোঝাতে পারা, আর বলতে, বোঝাতে থাকা দুটোই জরুরি। বক্তার জন্যও, শ্রোতার জন্যও। এতে একটা অদ্ভুত রকমের নিশ্চয়তা ধরা দেয়। মুশকিল হল, আমরা পরোয়া করি না! আমরা হয়তো বুঝিও না তাদের আমরা কত ভালবাসি। আর হঠাৎ সব শেষ হয়ে গেলে আফসোসের সীমা থাকে না। অসহ্য লাগল মিনির। সত্যিটা এত সহজ। তাই কি আমরা সত্যিকে অগ্রাহ্য করি? মিনি খুব বুঝল, মাইক্রোর চলে যাওয়া তাকে ভেঙে দিয়ে গেছে। সে ভাবল, সে ভেঙে গেলেও মাইক্রোকে তো আর ভেঙে দেওয়া যায় না, ভুলে যাওয়া যায় না। মনে হল মিনির, যতদিন সে আছে, মাইক্রোর একটা অংশ তার মনের মধ্যেই যে আছে। সে নিজের মনের জমা জলে, প্রথমে পায়ের পাতা, তারপর গোড়ালি, তারপর হাঁটু এই করে-করে সাহস জুটিয়ে পুরো ডুব দিল। দেখল, আজও সেখানে তাকে পার করানোর জন্য হাসিমুখে মাইক্রো দাঁড়িয়ে আছে। ‘আ্যই দিদি…’ শুনতে পেল সে। মিনি সাঁতরাচ্ছে…!
চিত্রণ: মনিকা সাহা







